শ্রীমতি রাধারাণীকে হৃদয়ঙ্গম করার পদ্ধতি

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২০ | ৭:১৭ পূর্বাহ্ণ আপডেট: ২৫ আগস্ট ২০২০ | ৭:১৯ পূর্বাহ্ণ

এই পোস্টটি 569 বার দেখা হয়েছে

শ্রীমতি রাধারাণীকে হৃদয়ঙ্গম করার পদ্ধতি

শ্রীমতি রাধারাণীর আবির্ভাব তিথিই হলো শ্রীরাধাষ্টমী। কৃষ্ণের আবির্ভাবের ১৫ দিন পরে রাধারাণী আবির্ভূত হয়েছিলেন। রাধারাণী হচ্ছেন কৃষ্ণের হ্লাদিনী শক্তি। রাধাকৃৃষ্ণ প্রণয় বিকৃতির্হ্লাদিনী-শক্তিঃ। পরমেশ্বর ভগবানের বিবিধ শক্তি রয়েছে, যে কথা বৈদিক শাস্ত্রে নিশ্চিত করে বলা হয়েছে: পরাস্য শক্তির্বিবিধৈব শ্রুয়তে (চৈ.চ.মধ্য ১৩/৬৫) ন তস্য কার্যং করণং চ বিদ্যতে। পরমেশ্বর ভগবানের ব্যক্তিগতভাবে কিছুই করণীয় নেই। ঠিক যেমন এই জড় জগতেও আমরা দেখি যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ডিরেক্টর বা দেশের প্রধানমন্ত্রী, প্রেসিডেন্টরা ব্যক্তিগতভাবে মাঠে ময়দানে সশরীরে কিছুই করো না। কারণ তাদের বহু সেবক থাকে যারা তাদের হয়ে কাজ করে। তেমনি ষড়ৈশ্বর্যপূর্ণ পরমেশ্বর ভগবানকেও কিছু করতে হয় না। তাঁর বহু সেবক রয়েছে। সর্বতঃ পানিপাদস্তৎ। ভগবদ্গীতায় বলা হয়েছে: সর্বত্র তাঁর হাত ও চরণ রয়েছে। তুমি কৃষ্ণকে দেখ, তার কিছুই করণীয় নেই। তিনি শুধু ভক্তদের সাথে লীলানন্দে মগ্ন থাকেন। অসুর বধও কৃষ্ণ নিজে করেন না। কৃষ্ণ যখন অসুর বধ করেন, তিনি তখন বাসুদেব কৃষ্ণ; মূল কৃষ্ণ নন। কৃষ্ণ নিজেকে বিস্তার করেন। তাঁর প্রথম বিস্তার হল বলদেব। বলদেব থেকে সঙ্কর্ষণ, প্রদ্যুম্ন, অনিরুদ্ধ, বাসুদেব। সেই বাসুদেব রূপে তিনি মথুরা এবং দ্বারকায় লীলাবিলাস করেন। কিন্তু কৃষ্ণ তাঁর আদি রূপে বৃন্দাবনে নিত্য বিরাজমান থাকেন।
রাধারাণী হচ্ছেন কৃষ্ণের হ্লাদিনী শক্তি। আমরা যেটি বৈদিক সাহিত্য থেকে বুঝতে পারি তা হল, কৃষ্ণের বহু অচিন্ত্য শক্তি রয়েছে। যেখানে আমরা বর্তমানে বাস করছিÑএটাকে বলা হয় জড় জগৎ। বহিরঙ্গা শক্তি। এর সংস্কৃত নাম হচ্ছে বহিরঙ্গাÑকৃষ্ণের বাহ্য শক্তি। কতো সুন্দরভাবে জড়া প্রকৃতির কাজ চলছে, জড়াশক্তির মাধ্যমে সবকিছুই কতো স্বাভাবিকভাবে চলছে। একথা ভগবদ্গীতাতেও ব্যাখ্যা করা হয়েছে, ময়াধ্যক্ষেণ প্রকৃতিঃ সূয়তে স চরাচরম্্ (গীতা ৯/১০)। “আমার অধ্যক্ষতায় জড়া প্রকৃতি কাজ করছে।” জড়া শক্তি অন্ধ নয়। এর পেছনে রয়েছে শ্রীকৃষ্ণ। ময়াধ্যক্ষেণ প্রকৃতিঃ-প্রকৃতি মানে জড়া শক্তি। এ হচ্ছে বহিরঙ্গা শক্তি। অনুরূপভাবে, আরেকটি শক্তি রয়েছে যা হচ্ছে অন্তরঙ্গা শক্তি। অন্তরঙ্গা শক্তির মাধ্যমে চিজ্জগৎ প্রকাশিত হচ্ছে। পরস্তস্মাৎ তু ভাবঃ অন্যঃ (গীতা ৮/২০)। আরেকটি শক্তি হল পরা তথা উৎকৃষ্টা এক দিব্য শক্তি, যা হচ্ছে চিজ্জগৎ। এই জড় জগৎ যেমন বহিরঙ্গা শক্তির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, ঠিক তেমনি চিজ্জগৎও অন্তরঙ্গা শক্তির দ্বারা পরিচালিত হয়। সেই অন্তরঙ্গা শক্তি হচ্ছে শ্রীমতী রাধারাণী।
রাধারাণী হচ্ছে আনন্দদায়িনী শক্তিÑহ্লাদিনী শক্তি। আনন্দময়োহভ্যাসাৎ (বেদান্ত সূত্র ১/১/১২)। বেদান্তসূত্রে পরমসত্যকে আনন্দময় বলে বর্ণনা করা হয়েছে। তিনি সর্বদাই হ্লাদিনী শক্তির মধ্যে রয়েছেন। ঠিক যেমন তুমি যখন আনন্দ চাও, তা তুমি একা একা আস্বাদন করতে পার না। একাকী আনন্দ উপভোগ করা যায় না। যখন তুমি বন্ধুদের মধ্যে, পরিবার বা অন্যান্য সঙ্গীদের সঙ্গে থাক, তখনই তুমি আনন্দ অনুভব কর। ঠিক যেমন আমি কথা বলছি। বহু লোক এখানে উপস্থিত থাকলে কথা বলা খুবই আনন্দদায়ক বলে মনে হয়। আমি এখানে একাকী কথা বরতে পারি না। সেটা আনন্দ নয়। গভীর রাত্রে আমি এখানে কথা বলতে পারি না। সেটা আনন্দ নয়। আনন্দ মানে অন্যদের উপস্থিতি অত্যাবশ্যক। তাই, পরম সত্য শ্রীকৃষ্ণ যেহেতু আনন্দময়, তাই একহম্্ বহুশ্যাম, তিনি বহু রূপ পরিগ্রহ করলেন। আমরাও কৃষ্ণের অংশমাত্র, কৃষ্ণকে আনন্দ দানের জন্যই। আর প্রধান আনন্দদায়িনী শক্তি হচ্ছে শ্রীমতী রাধারাণী।
রাধাকৃষ্ণপ্রণয়বিকৃতির্হ্লাদিনীশক্তিরস্মাদ্।
একাত্মনামপি ভুবি পুরা দেহভেদৌ গতৌ তৌ।
চৈতন্যাখ্যং প্রকটমধুনা তদ্বয়ং চৈক্যমাপ্তম
রাধাভাবদ্যুতি সুবলিতং নৌমি কৃষ্ণস্বরূপম্্ ॥
শ্রীরাধিকা শ্রীকৃষ্ণের প্রণয়ের বিকারস্বরূপ; সুতরাং শ্রীমতী রাধারাণী শ্রীকৃষ্ণের হ্লাদিনী শক্তি। এই জন্য তাঁরা একাত্মা। কিন্তু একাত্মা হলেও তাঁরা অনাদিকাল থেকে গোলোকে পৃথক দেহ ধারণ করে আছেন। এখন কলিযুগে সেই দুই দেহ পুনরায় একত্রে যুক্ত হয়ে শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য নামে প্রকট হয়েছেন। শ্রীমতী রাধারাণীর এই ভাব ও কান্তিযুক্ত শ্রীকৃষ্ণস্বরূপ শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্যকে আমি আমার প্রণতি নিবেদন করি। রাধারাণী হচ্ছেন কৃষ্ণের হ্লাদিনী শক্তি।
কৃষ্ণ মানে সর্বাকর্ষক। কিন্তু রাধারাণী এতই মহান যে তিনি কৃষ্ণকেও আকর্ষণ করেন। কৃষ্ণ হচ্ছেন সর্বাকর্ষক। আর রাধারাণী হচ্ছেন সেই সর্বাকর্ষক শ্রীকৃষ্ণেরও আকর্ষক। তাহলে ভেবে দেখুন, রাধারাণীর পদ কত সুউচ্চ? এই তিথি সম্পর্কে আমাদের জানতে চেষ্টা করা উচিত এবং রাধারাণীর চরণে আমাদের প্রণাম নিবেদন করা উচিত।
তপ্তকাঞ্চন গৌরাঙ্গী রাধে বৃন্দাবনেশ্বরি।
বৃষভানু-সুতে দেবী প্রণমামি হরিপ্রিয়ে ॥
হে শ্রীমতী রাধারাণী, আপনি কৃষ্ণের কত প্রিয়, তাই আমরা আপনাকে সশ্রদ্ধ দণ্ডবৎ প্রণতি নিবেদন করছি।
রাধারাণী হচ্ছে হরিপ্রিয়া। কৃষ্ণের অত্যন্ত প্রিয়। তাই আমরা যদি রাধারাণীর মাধ্যমে, তাঁর কৃপাকে আশ্রয় করে কৃষ্ণের কাছে যেতে চাই, তাহলে তা অনেক সহজ হবে। রাধারাণী যদি সুপারিশ করেন যে এই ভক্তটি খুব চমৎকার, কৃষ্ণ তাহলে সঙ্গে সঙ্গে সেই ভক্তকে গ্রহণ করেন। তাই দেখবেন বৃন্দাবনের ভক্তরা কৃষ্ণের থেকেও রাধার নাম বেশি জপ কীর্তন করেন। যেখানেই যাও, দেখবে ভক্তরা “জয় রাধে” বলে সম্বোধন করছে। এখনও বৃন্দাবনে এই রেওয়াজ চলছে। তারা রাধারাণীর মহিমা কীর্তন করছে। তারা রাধারাণীর আরাধনা করতে বেশি আগ্রহী। কেননা আমি যতই অধঃপতিত হয়ই না কেন, কোনো না কোনো ভাবে যদি রাধারাণীকে খুশী করতে পারি, তাহলে কৃষ্ণকে উপলব্ধি করা আমার পক্ষে খুবই সহজ হযে পড়বে।
অন্যথায় যদি জল্পনা কল্পনার মাধ্যমে কৃষ্ণকে বুঝতে চাও, তাহলে বহু জন্ম লেগে যাবে। কিন্তু যদি ভক্তিমূলক সেবায় নিযুক্ত হও, শুধু রাধারাণীকে খুশি করার চেষ্টাকর, তাহলে খুব সহজেই কৃষ্ণকে লাভ করতে পারবে। কেননা রাধারাণী কৃষ্ণকে প্রদান করতে পারেন। তিনি এতই মহান ভক্ত। মহাভাগবতের প্রতিমূর্তি স্বরূপা। এমনকি কৃষ্ণও রাধার গুণ মহিমা বুঝতে পারে না। এমনকি কৃষ্ণ, যিনি বলেছেন “আমি সব জানি” বেদাহং সমতীতানি (গীতা ৭/৬), তিনিও রাধারাণীকে বুঝতে ব্যর্থ হন। রাধারাণী এতই মহান। রাধারাণীকে উপলব্ধি করার জন্য কৃষ্ণ রাধারাণীর ভাবমূর্তি গ্রহণ করেছেন। কৃষ্ণ রাধারাণীর শক্তি বুঝতে চেয়েছেন। কৃষ্ণ ভেবেছেন যে, অমি সর্বতোভাবে পূর্ণ। কিন্তু তবুও আমি রাধারাণীকে বুঝতে চাই। কেন? এই প্রবণতা থেকেই কৃষ্ণ রাধার ভাব গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। কৃষ্ণ স্বয়ং নিজেকে বুঝতে চেয়েছিলেন।
এগুলি অবশ্য অত্যন্ত মহান বিজ্ঞান। যারা কৃষ্ণভাবনামৃতে অত্যন্ত উন্নত এবং শাস্ত্রে অত্যন্ত পারদর্শী তারা এগুলি বুঝতে পারে। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমরা শাস্ত্র থেকে এসব আলোচনা করতে পারি। যখন কৃষ্ণ নিজেকে বুঝতে চাইলেন, তিনি শ্রীমতী রাধারাণীর ভাব প্রবণতা গ্রহণ করলেন। আর সেটিই হল শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু। রাধারাণী সর্বদাই কৃষ্ণ বিরহ অনুভব করছেন। অনুরূপভাবে, রাধারাণীর ভূমিকায় ভগবান শ্রীচৈতন্যদেবও কৃষ্ণবিরহ অনুভব করছিলেন। এই হচ্ছে চৈতন্যদেবের শিক্ষা, বিরহ অনুভব, মিলন নয়। চৈতন্য মহাপ্রভু এবং তাঁর পরম্পরা প্রদর্শিত ভক্তিমূলক সেবার শিক্ষা পদ্ধতিটি হল, কিভাবে কৃষ্ণ থেকে বিরহ অনুভব করা যায়। এটিই হল রাধারাণীর অবস্থা-সর্বদাই বিরহয়ে অনুভব করা।

সম্পর্কিত পোস্ট

‘ চৈতন্য সন্দেশ’ হল ইস্‌কন বাংলাদেশের প্রথম ও সর্বাধিক পঠিত সংবাদপত্র। csbtg.org ‘ মাসিক চৈতন্য সন্দেশ’ এর ওয়েবসাইট।
আমাদের উদ্দেশ্য
■ সকল মানুষকে মোহ থেকে বাস্তবতা, জড় থেকে চিন্ময়তা, অনিত্য থেকে নিত্যতার পার্থক্য নির্ণয়ে সহায়তা করা।
■ জড়বাদের দোষগুলি উন্মুক্ত করা।
■ বৈদিক পদ্ধতিতে পারমার্থিক পথ নির্দেশ করা
■ বৈদিক সংস্কৃতির সংরক্ষণ ও প্রচার। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ অনুসারে ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তন করা ।
■ সকল জীবকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ করানো ও তাঁর সেবা করতে সহায়তা করা।
■ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ অনুসারে ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তন করা ।
■ সকল জীবকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ করানো ও তাঁর সেবা করতে সহায়তা করা।