শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর শিক্ষাষ্টক (পর্ব-১)

0
132

সনাতন গোপাল দাস ব্রহ্মচারী

হরিনামই সাধনা

চেতোদর্পণমার্জনং ভবমহাদাবাগ্নিনির্বাপণং
শ্রেয়ঃকৈরবচন্দ্রিকাবিতরণং বিদ্যাবধূজীবনম্।
আনন্দাম্বুধিবর্ধনং প্রতিপদং পূর্ণামৃতাস্বাদনং
সর্বাত্মস্ন্নপনং পরং বিজয়তে, শ্রীকৃষ্ণসংকীর্তনম্ ॥

চিত্তরূপ দর্পণের মার্জনাকারী, ভবরূপ মহাদাবাগ্নির নির্বাপণকারী, জীবের মঙ্গলরূপ কৈরবচন্দ্রিকা বিতরণকারী, বিদ্যাবধূর জীবনস্বরূপ, আনন্দ-সমুদ্রের বর্ধনকারী, পদে পদে পূর্ণামৃতাস্বাদনরূপ এবং সর্বস্বরূপের শীতলকারী শ্রীকৃষ্ণসংকীর্তন বিশেষরূপে জয়যুক্ত হোন।
চেতোঃ-র্দপণ-মার্জনম্ঃ চিত্তদর্পণ মার্জিত হয়। হৃদয় পরিশুদ্ধ হয়। মানুষ যদি কৃষ্ণনাম গ্রহণ করে তবে সর্বকলুষ থেকে সে মুক্ত হতে পারবে। আগেকার দিনে কাঁসা-পেতলের গোল চাকতি আকারের জিনিস যাতে মুখ দেখা হতো তাকে দর্পণ বলে। যত সুন্দর করে সেই দর্পণ মাজাঘষা করা যাবে ততই তাতে মুখের প্রতিকৃতি সুস্পষ্ট দেখা যাবে। তেমনই আমরা যতই সুন্দরভাবে হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র গ্রহণ করব, ততই আমাদের নিজেদের সুন্দর রূপ কোন্টি তা পরিস্ফুটিত হবে। আমরা স্বরূপত শ্রীকৃষ্ণের দাসানুদাস তা হৃদয়ঙ্গম হবে। আমাদের মন কখনও ভালো থাকে না। প্রায় দিনই মন বিক্ষুব্ধ থাকে, বিষন্ন বা অবসন্ন থাকে। মনকে সুন্দর সুরক্ষিত করতে হলে মন্ত্র (মনকে ত্রাণ করে যা), বিশেষ করে হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র জপ করতে হবে। তা হলে মন শুদ্ধ হবে।
ভব-মহাদাবাগ্নি-নির্বাপণম্ঃ ভব-সংসারের ভয়ঙ্কর দাবানল নির্বাপিত হয়। ভবতি অস্মিন্ ইতি ভব। যা হচ্ছে এখানে তাই-ই ভব। মানুষ মোহগ্রস্ত হয়ে দুঃখময় জন্ম-মৃত্যুর চক্রে ঘুরপাক খাচ্ছে। দাবাগি বলতে বোঝায় জঙ্গলে গাছে গাছে ঘষাঘষি হয়ে আগুন উৎপন্ন হয়, সেই আগুন সারা জঙ্গলটিকে পুড়িয়ে ফেলে। মহাদাবাগ্নি বলতে সারা জঙ্গলটিতে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতে থাকে যেখানে অসংখ্য গাছপালা পুড়ে ছারখার হয়ে যায়। তেমনই ভব সংসারে বদ্ধ মানুষে-মানুষে যে কোন কারণে সংঘর্ষ ঘটে এবং তারা ভালোমতোই দগ্ধীভূত হতে হতে মৃত্যুবরণ করে। বিপুল পরিমাণে জল বর্ষণ করতে পারলে দাবানল নিভে যাবে। তেমনই বিপুলভাবে শ্রীকৃষ্ণ নাম করতে থাকলে সংসারের ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি নিভে যাবে। হৃদয়ের জ্বালা উপশান্ত হবে। সর্ব অনর্থ থেকে মুক্তি লাভ হবে।
শ্রেয়ঃ-কৈরব-চন্দ্রিকা-বিতরণম্ঃ মঙ্গলময় পদ্মগন্ধ ও চন্দ্রকিরণ বিতরিত হয়। শ্রেয়ঃ কৈরব বলতে মঙ্গলরূপ পদ্ম বোঝায়। পদ্ম সুন্দরভাবে বিকশিত হয় চন্দ্রকিরণ স্পর্শে। তখন সেই জ্যোৎস্নাতে প্রস্ফুটিত পদ্মের পবিত্র গন্ধ সবাইকে আমোদিত করে। তেমনই, হরিনাম গ্রহণ করলে আমাদের জীবন সুন্দররূপে বিকশিত হবে। হরিনাম-চন্দ্রকিরণ প্রভাবে আমাদের জীবন শান্ত, স্নিগ্ধ ও সুন্দর হবে। সমস্ত শুভ উদয় হবে। সর্বপ্রকার ভক্তির উদয় হবে।
বিদ্যা-বধূ-জীবনম্ঃ হরিনাম হচ্ছে বিদ্যাবধূর জীবন স্বরূপ। শ্রীকৃষ্ণনাম বিনা বিদ্যাদেবী থাকতে পারেন না। সরস্বতী কৃষ্ণপ্রিয়া, কৃষ্ণভক্তি তাঁর হিয়া। বধ্নাতি প্রিয়ম্ ইতি বধূ। বধূ বলতে বোঝায় প্রেমরজ্জুতে প্রিয়কে বন্ধন করেন যে রমণী। (বলদের বিদ্যাভূষণ) নবপরিণীতা স্ত্রীর যদি প্রিয় স্বামী না থাকে তবে তার জীবন বৃথা হয়ে যায়। প্রিয় স্বামীকে কেন্দ্র করেই তার জীবন সুন্দর ও আনন্দময় হয়ে ওঠে। হরিনামই আমাদের জীবনের আনন্দ স্বরূপ।
আনন্দ-অম্বুধি-বর্ধনম্ঃ হরিনামে আনন্দের সমুদ্র বৃদ্ধি হয়। শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং আনন্দস্বরূপ। তাঁর নামও আমাদের সমস্ত পাপজনিত দুঃখ হরণ করেন। তাঁর নামই পরম আনন্দ দান করে। তাঁর নাম মহিমা কীর্তন শ্রবণাদিতে মগ্ন হয়ে লোক আনন্দসাগরে নিমজ্জিত হয়। সাগর বাড়ে কমে কিনা কে জানে, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণের আনন্দসাগর বাড়তে থাকে।
প্রতিপদম্ পূর্ণ-অমৃত-আস্বাদনম্ঃ হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র জপ বা কীর্তন করতে থাকলে প্রতি পদে পদে পূর্ণ অমৃত আস্বাদন হয়। যার শ্রীকৃষ্ণে প্রীতি অনুভব নেই, তার প্রীতির আনন্দ কি করে হবে? যে অমৃত ফল খায়নি, সে কি করে তার আস্বাদন বুঝবে? যারা কৃষ্ণনামে ব্রতী হয়, তারাই প্রেমামৃত আস্বাদন করেন। কোনও বস্তু ভোজনের পর একটি সময়ে ভোজন বন্ধ করতে হবে, কেন না, বেশী পরিমাণে ভোজন করলে বিপদ থাকে। যত বিচিত্র রকমের রান্না করা পদ থাকুক না কেন, অতি ভোজন নিষিদ্ধ। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণনামের বাধ্যবাধকতা নেই। ভক্তগণ প্রতি পদে পদেই প্রেম-অমৃত আস্বাদন করতে থাকেন পূর্ণভাবেই। যাকে বলে কৃষ্ণপ্রাপ্তি।
সর্ব-আত্ম-স্নপনম্ঃ স্নান করে আমরা শূচি, সুন্দর ও শীতল হই। তেমনই শ্রীকৃষ্ণনামে মতি থাকলে সব জীবের হৃদয় শুচি সুন্দর ও শীতল হয়। হরিনামের মনোরম পবিত্র জলে স্নান করে আত্মা আনন্দিত হয়। শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর বলেছেন, জড় উপাধিগ্রস্ত জীব স্থূল ও সূক্ষ্মভাবে যে সব মলিনতা লাভ করেছে, সে সবই কীর্তন প্রভাবে বিধৌত হয়। জড় অভিনিবেশ ছেড়ে গেলে কৃষ্ণোন্মুখ জীব সুশীতল কৃষ্ণপাদপদ্ম-সেবা লাভ করে।
পরম্ বিজয়তে শ্রীকৃষ্ণ-সংকীর্তনম্ঃ বিশেষভাবে বা চূড়ান্তভাবে শ্রীকৃষ্ণ সংকীর্তন জয়যুক্ত হোক। সবদিকে বিশ্বের সর্বত্র, সমস্ত গ্রাম, সমস্ত নগরে হরিনাম সংকীর্তন প্রসার লাভ করুক।

সর্ব অবস্থায় নাম সাধন

নাম্বামকারি বহুধা নিজসর্বশক্তি
স্তত্রার্পিতা নিয়মিতঃ স্মরণে ন কালঃ।
এতাদৃশী তব কৃপা ভগবন্মমাপি
দুর্দৈবমীদৃশমিহাজনি নানুরাগঃ ॥ ২ ॥

হে শ্রীকৃষ্ণ ! অহৈতুকী কৃপা পরবশে তুমি জীবের জন্য সর্বমঙ্গলপ্রদ তোমার বিভিন্ন নাম বহুপ্রকারে প্রকাশ করেছ। ঐ সব নামে তোমার নিজের সমস্ত শক্তি নিহিত করেছ। সেই নামের স্মরণে সন্ধ্যাবন্দনাদির মতো কোন বিশেষ কালও নির্ধারিত করনি। অর্থাৎ অহর্নিশ সর্বক্ষণ নাম গ্রহণ করা যায়, এরকম বিধান করেছ। তোমার এমন কৃপা। কিন্তু আমার এরকম দুর্ভাগ্য যে, তোমার নামে আমার অনুরাগ জন্মালো না।
নাম্নাম্ অকারি বহুধাঃ শ্রীকৃষ্ণের নাম বহু প্রকারে প্রকাশিত। মুখ্য নাম আছে কৃষ্ণ, রাধারমণ, গোপীজনবল্লভ প্রভৃতি নাম। এই সব নাম ভগবানের মাধুর্য রূপের। আবার বাসুদের, রাম, নৃসিংহ প্রভৃতি নাম ভগবানের ঐশ্বর্য রূপের। ভগবানের মুখ্য নাম সমূহ নামী শ্রীভগবানের সঙ্গে অভিন্ন। তাতে সমস্ত শক্তি একাধারে সমর্পিত আছে। গৌণ নাম আছে ব্রহ্ম, পরমাত্মা, অন্তর্যামী প্রভৃতি নাম। গৌণ নাম সমূহে শ্রীভগবানের বিবিধ শক্তি আংশিকভাবে বর্তমান।
নিজ-সর্ব-শক্তিঃ-তত্র-অর্পিতাঃ নামের মধ্যে কৃষ্ণ সর্বশক্তি দিয়েছেন। দান, ব্রত, তপ, তীর্থযাত্রা প্রভৃতিতে, শ্রেষ্ঠ দেবগণে, রাজসূয় অশ্বমেধাদি যজ্ঞে এবং অধ্যাত্ম-বস্তুর জ্ঞানে যে সর্বপাপনাশিনী ও মঙ্গলদায়িনী শক্তিসমূহ নিহিত আছে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সেই সমস্ত শক্তিকে আকর্ষণ করে নিজ নাম সমূহে অর্পণ করেছেন।
নিয়মিতঃ স্মরণে ন কালঃ : নাম ভজনে শৌচ-অশৌচ, কাল-অকাল নিয়ম নেই। কখন নাম করা উচিত, কখন নাম করা উচিত নয়, এরকম কোনও বিচার করার দরকার নেই। ভোজন, শয়ন, নিদ্রা, শূচি-অশুচি, সুখে-দুঃখে, দিনে-রাতে, ঊষা-সন্ধ্যায়, সর্ব অবস্থায় সর্বকালে নামভজন করা যায়। আমাদের বুঝতে হবে নাম স্মরণ করতে করতে জীবনের অন্তিমে জড় সংসার থেকে মুক্ত হয়ে চিন্ময় জগতে উত্তীর্ণ হওয়া যায়। জীবনের অন্তিমকালটা যে কোনও সময়েই যে কোন অবস্থায় হতে পারে। তাই হরিনাম সব সময়েই সব অবস্থাতেই স্মরণীয়। চলমান ….

শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর শিক্ষাষ্টক (পর্ব-২)


 

চৈতন্য সন্দেশ নভেম্বর – ২০২১ প্রকাশিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here