মাছি নয় মৌমাছি হও

প্রকাশ: ৩ মে ২০১৯ | ১:০৩ অপরাহ্ণ আপডেট: ২১ মে ২০১৯ | ৪:১৪ পূর্বাহ্ণ

এই পোস্টটি 1267 বার দেখা হয়েছে

মাছি নয় মৌমাছি হও

মূর্তিমান মাধব দাস: বাংলায় একটি কথা প্রচলিত রয়েছে-

সুজনে সুযশ গায় কুযশ ঢাকিয়া,
 কুজনে কুযশ গায় সুযশ নাশিয়া।

সংস্কৃতে বলা হয়, সজ্জনা গুণম ইচ্ছন্তি। দোষম ইচ্ছন্তি পামরাঃ  অর্থাৎ সাধু, সজ্জন, সুজন ব্যক্তিরা সর্বদা অন্যদের গুণ দর্শন করেন। কিন্তু কুজন, পামর বা দুর্জন ব্যক্তিরা সর্বদা অন্যের দোষ দর্শন করেন। এ প্রসঙ্গে মহাভারতে একটি ঘটনা রয়েছে, একবার যুধিষ্ঠির ও দুর্যোধনকে তাদের বয়োজ্যেষ্ঠরা ডেকে পাঠিয়েছিল। যুধিষ্ঠিরকে বলা হয়েছিল, “যাও, তোমার থেকে নিকৃষ্ট কাউকে খুজেঁ নিয়ে আস”। দুর্যোধনকে বলা হয়েছিল,” যাও, তোমার থেকে শ্রেষ্ঠ কাউকে খুজেঁ নিয়ে আস”। দু’জনেই বেরিয়ে গেলেন এবং কিছুদিন পর ফিরে আসলেন।
যুধিষ্ঠির ফিরে এসে বলেছিলেন, ” হে প্রভু,আমি এমন কাউকে খুজেঁ পায়নি সে আমার থেকে বেশি ত্রুটিপূর্ণ,পাপী। আমার থেকে নিকৃষ্ট কেউই নেই”। দুর্যোধন ফিরে এসে বলেছিল,” সকলেই ত্রুটিতে পরিপূর্ণ। আমি যাকেই দেখেছি তার মধ্যে কিছি ত্রুটি রয়েছে যে কারণে সে আমার চেয়ে নিকৃষ্ট”। এভাবে দুর্যোধন তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ আর কাউকেই খুজেঁ পায়নি।
যুধিষ্ঠিরকে বলা হয় ‘অজাতশত্রু’ অর্থাৎ’যার কোনো শত্রু নেই’ যুধিষ্ঠির এমনকি শত্রুদেরও কল্যাণ করতেন। একবার তিনি গন্ধর্বদের হাত থেকে দুর্যোধনকে রক্ষা করেছিলেন। এমনকি মহাভারত যুদ্ধের পরও তিনি ধৃতরাষ্ট্রকে শত্রু গণ্য করার পরিবর্তে রাজা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি তাকে নিজের পিতার মতো দেখতেন। তিনি এমনকি নিম্নস্তরের মানুষদের মধ্যেও গুণাবলী দর্শন করতেন ঠিক যেমন ভ্রমর বিষ্ঠাপূর্ণ স্থানে প্রস্ফূঠিত পুষ্পেও মধু আহরণ করতে যায়। অন্যদিকে দুর্যোধন পান্ডবদের পাশাপাশি দ্রোণাচার্য, বিদুর, ভী­ষ্ম, ধৃতরাষ্ট্র প্রভৃতি প্রবীণ ব্যক্তিদের প্রতি অমার্জিত আচরণ করতেন। সে এমনকি পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সাথেও অভদ্রতা করেছিল। সেজন্য সে সবার মধ্যে দোষ দর্শন করেছিল। ঠিক যেমন সুগন্ধি পুষ্পে বাগান পূর্ণ হলেও মাছি সরাসরি বিষ্ঠায় উপবেশন করে। এটি মাছির মতো ছিদ্র অন্বেষণকারীদের প্রবণতা।
শ্রীমদ্ভাগতের তৃতীয় স্কন্ধে একটি শ্লোকের তাৎপর্যে,শ্রীল প্রভুপাদ উল্লেখ করেছেন, দোষ দর্শন বা ছিদ্র অন্বেষণ একটি আসুরিক প্রবৃত্তি। অন্যকে আমরা যখন একটি আঙ্গুল(তর্জনী) দেখিয়ে বলি, ‘তুমি,তুমি,একমাত্র তুমিই এর জন্য দায়ী’ তখন তিনটি আঙুল আমরা নিজেদেরকে দেখায়। এই জগৎ একটি আয়না – এর মত এবং আয়নাতে আমি তো নিজের চেহারাই দেখতে পাব। আমি অন্যদের মধ্যে যে দোষ ত্রুটি, দোষ,ভুল দর্শন করছি তা প্রকৃতপক্ষে আমারই দোষ। সে ব্যক্তি সেরকম সে অন্যদেরকেও সেরকম বলে মনে করে। একজন চোর রাস্তায় মধ্যরাতে শায়িত লোককে চোর বলে মনে করে, মদ্যপ তাকে তার মতো মদ্যপ ভাবে আর একজন সাধু তাকে তার চেয়েও বড় সাধু বলে মনে করে।
একটি প্রবাদ রয়েছে,সূঁচকে চালুনী বলে,”ওহে সূঁচ! তোমার পেছনে সে একটি ছিদ্র!”
সূঁচ চালুনীকে বলে, “ভাই,আমার পেছনে যে একটি ছিদ্র সে কথা সত্য। কিন্তু তোমার পেছনে যে শত শত ছিদ্র রয়েছে”। সাধারণত আমরা নিজের গুণ দর্শন করি, আর অন্যদের দোষ দর্শন করি,ঠিক দুর্যোধনের মতো। ছিদ্র অন্বেষণ বা দোষ দর্শনের কারণ হচ্ছে ঈর্ষা বা মাৎসর্য।
শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত ঠাকুর বলেছেন- উত্তম অধিকারী সর্বদা অন্যদের থেকে নিজেকে হীন বা অধম মনে করেন। নিজের আচার,আচরণ বিচার না করে অন্যের দোষ অন্বেষণের চেষ্টা কেন? বৈষ্ণবের ক্রিয়া-মুদ্র বিজ্ঞে না বুঝয়। আপাতঃ দৃষ্ঠিতে যা প্রতীয়মান, তার দ্বারা বিভ্রান্ত হওয়া উচিত নয়। আপাত প্রতীয়মান দৃশ্যের ওপর নির্ভর করার ফলে বহু মানুষ পাথরকে মুক্তা, সাপকে দড়ি, মন্দকে ভাল বলে ভুল মনে মোহ বিভ্রান্তির শিকার হয়েছে। যখন অন্যের দোষ ত্রুটি তোমাকে বিপথে পরিচালিত বা বিভ্রান্ত করে, তখন তোমার উচিত ধৈর্য অবলম্বন করে চিন্তাশীল হওয়া,আত্মানুসন্ধান করা- নিজের দোষ অনুসন্ধানে চেষ্টা করা। জেনে রাখ তুমি যদি নিজের ক্ষতি না কর,তাহলে অন্য কেউ তোমার ক্ষতি করতে পারবে না”।
চাণক্য পন্ডিতের নীতিদর্শন অনুসারে, বিষ থেকেও অমৃত গ্রহণ করা উচিত(,বিপৎ অপি অমৃতং গ্রাহ্যং)। তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হচ্ছেন, পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। যখন পূতনা রাক্ষসী কালকূট বিষ মিশ্রিত স্তন পান করিয়ে হত্যা করতে এসেছিল ভগবান সেই বিষমিশ্রিত স্তন পান করে তাকে ধাত্রীমাতার গতি দান করেছিলেন। রমেশ্বর ভগবান ও বৈষ্ণবগণ হচ্ছেন,’ অদোষদর্শী’অর্থাৎ তারা কারও দোষ দর্শন করেন না।
মানুষদের মধ্যে গুণ অন্বেষণ করাটা স্বর্ণখনির থেকে স্বর্ন আহরণ করার মতো। অল্প পরিমাণ কিছু স্বর্ণ আহরণ করতে অনেক কুইন্টাল মাটি অপসারণ করতে হয়। তেমনি বিশেষতঃ এই কলিযুগ হচ্ছে দোষের সাগর। সকলের মধ্যেই দোষ রয়েছে।কিন্তু সবার মধ্যে কিছু গুণও অবশ্যই রয়েছে। আমরা যদি দোষ খুঁজি তবে তা মাটি অপসারণের মতো যা বহু পরিমান পাওয়া যাবে। কিন্তু সজ্জন ব্যক্তিগন সেই সব দোষ গ্রহণ না করে কেবল সৎগুণটিই গ্রহণ করে থাকেন। হরে কৃষ্ণ।

সম্পর্কিত পোস্ট

‘ চৈতন্য সন্দেশ’ হল ইস্‌কন বাংলাদেশের প্রথম ও সর্বাধিক পঠিত সংবাদপত্র। csbtg.org ‘ মাসিক চৈতন্য সন্দেশ’ এর ওয়েবসাইট।
আমাদের উদ্দেশ্য
■ সকল মানুষকে মোহ থেকে বাস্তবতা, জড় থেকে চিন্ময়তা, অনিত্য থেকে নিত্যতার পার্থক্য নির্ণয়ে সহায়তা করা।
■ জড়বাদের দোষগুলি উন্মুক্ত করা।
■ বৈদিক পদ্ধতিতে পারমার্থিক পথ নির্দেশ করা
■ বৈদিক সংস্কৃতির সংরক্ষণ ও প্রচার। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ অনুসারে ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তন করা ।
■ সকল জীবকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ করানো ও তাঁর সেবা করতে সহায়তা করা।
■ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ অনুসারে ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তন করা ।
■ সকল জীবকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ করানো ও তাঁর সেবা করতে সহায়তা করা।