হৃদয়ে প্রকাশিত দিব্যজ্ঞান

0
83

এ জড় দেহে আমরা অনেক দুঃখ কষ্টের শিকার হই। কিন্তু দিব্যজ্ঞানের উদয় হলে সেগুলো লাঘব হয়।

শ্রীমৎ রাধানাথ স্বামী

ভুলে যাওয়া ও মনে রাখার দুটি বিষয়

প্রথমটি, কেউ আমাদের প্রতি খুব খারাপ কিছু করলো, আমাদের উচিত অন্তর থেকে তাদেরকে ক্ষমা করা ও তার কৃত খারাপ কর্মটি ভুলে যাওয়া। তাহলে আমাদেরকেও পরমেশ্বর ভগবান ক্ষমা করবেন। কাউকে ক্ষমা করতে পারা একটি মহৎ গুণ।
দ্বিতীয়টি, যখন আমরা কারো উপকার করি তখন যদি আমরা আমাদের ভাল কাজ বা কাউকে উপকার করার কথা মনে রাখি তাহলে আমরা অহংকারী হয়ে উঠব। অহংকার সব ধ্বংস করে দেয়। আমাদের অন্তরে এই ধারণা পোষণ করা উচিত যে, আমরা শুধুই নিমিত্ত মাত্র। আমাদেরকে উপলক্ষ্য করে ভগবানই সবকিছু করছেন। ভগবানও কামনা করেন আমরা যেন নিজেদেরকে শুধুমাত্র একজন বাহক হিসেবে মনে করি। ভগবান তাঁর নিজের পরিকল্পনাটিকে আমার মাধ্যমে রূপদান করছেন মাত্র। সবসময় স্মরণে রাখার দুইটি বিষয় : প্রথমটি মুত্যু : যেকোনো সময় যেকোনো মুহূর্তে মৃত্যু আমাদের সামনে উপস্থিত হবে। একটি ক্ষুদ্র পিপীলিকা থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপ্রধান পর্যন্ত, কেউ মৃত্যু নামক অমোঘ সত্যকে অস্বীকার করতে ও তার থেকে পালিয়ে বাঁচতে পারে না। ভাবা উচিত, আমরা কি মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত?
দ্বিতীয়টি, ভগবানের দিব্য নাম : যেহেতু মৃত্যু “যেকোনো সময় আমাদের সম্মুখে উপস্থিত হতে পারে, সেহেতু মৃত্যুর প্রস্তুতি স্বরূপ ভগবানের দিব্যনামকে এক মুহূর্তের জন্যও ভুলে যাওয়া উচিত নয়। সবসময় ভগবানের দিব্যনামের স্মরণ নিতে হবে। ভগবানের করুণার বহিঃপ্রকাশ হয় এই দিব্যনামের মধ্য দিয়ে

আশাই আমাদের সকল দুঃখের স্থল

ভগবান যাই করেন সবই আমাদের মঙ্গলের জন্য, প্রথম দিকে তা আমাদের জন্য বেদনাদায়ক হলেও অন্তে তা আমাদেরকে আনন্দ দান করে। যদি আমাদেরকে ভগবান শাস্তিও দেন তা আমাদের এই নশ্বর শরীরের জন্য বেদনাদায়ক হলেও অন্তে আমাদের আনন্দই দান করে। ভগবান কর্তৃক প্রদত্ত শাস্তি তাঁর করুণার একটি রূপ। জীববিজ্ঞানের ভাষায় বেদনা বা কষ্ট কি?
বিভিন্ন স্নায়ুর ভিন্ন ভিন্ন সংবেদনশীলতাই আমাদের কাছে কষ্ট বা বেদনারূপে প্রতিভাত হয়। আমাদের সুখ ও বেদনার প্রধান কেন্দ্র হলো এই স্নায়ু, কত বিচিত্র এই সৃষ্টি।
যেহেতু দুঃখ কষ্ট ভগবানের এক বিচিত্র সৃষ্টি। তাই স্নায়ুকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আমাদেরকে বেদনা দিতে পারে এরূপ কোনো যন্ত্র বিজ্ঞান তৈরি করতে পারেনি। বিজ্ঞান আমাদের শরীরকে কষ্ট দিতে পারে, কষ্টের যে অনুভূতি তা কখনোই সৃষ্টি করতে পারবে না। একজন আঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তি যার স্নায়ুগুলো কাজ করছে না। এরূপ ব্যক্তির কষ্টের কোনো অনুভূতিই থাকে না।
ভগবান আমাদের আনন্দ বিধানের জন্য প্রতি বেদনাকে বিশেষভাবে রূপায়িত করেন। প্রকৃতপক্ষে সবকিছুই আত্মার সন্তুষ্টি বিধানের জন্য এবং তাকে তাঁর নিত্য আলয়ে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য যা তার আসল ঠিকানা। আমাদের জীবনে যা-ই ঘটে তাই ভগবানের অলৌকিকত্বের প্রকাশ এবং তাঁর অহৈতুকী করুণার ফল। প্রকৃত যে সুখ তা নিহিত রয়েছে ভক্ত ও ভগবানের ভালবাসার আদান প্রদানের মধ্যে।

প্রকৃত সংস্কার কি?

সংস্কৃতি হচ্ছে কোনো মানুষের বিনম্রতা, নৈতিকতা, মানবতা ও হৃদয়ের প্রজ্ঞা, যা প্রকাশিত হয় তার জীবনযাপন প্রণালীতে ও তার কার্যকলাপে। আমরা কি পরিধান করি এবং কিরূপ সংগীত শ্রবণ করছি তার মাধ্যমে আমাদের সংস্কৃতি প্রকাশ পায় না। যেমন : জার্মানির হিটলার, তার মধ্যে দেবত্ব ও পশুত্বের দুইটি রূপ আমরা দেখতে পাই। পশুত্বকে ব্যবহার করছে হাজার হাজার অসহায় মানুষকে হত্যা করার পরিকল্পনা করতে ও তাদের হত্যার আদেশ দিতে। তথাপিও তিনি ব্যক্তিগত জীবনে যথেষ্ট ভদ্রলোকের মতো আচরণ করতেন। কেতাদুরস্ত কাপড় চোপড় পরিধান করতেন, কথাবার্তার মধ্যেও যথেষ্ট শিষ্টাচার ছিল এবং তিনি আহারও করতেন অভিজাত ব্যক্তির মতো। তার চিত্রকলার প্রতিও যথেষ্ট অনুরাগ ছিল। তিনি শাস্ত্রীয় সংগীত পছন্দ করতেন এবং সংগীত, কবিতা ও নাটকের উন্নয়নের জন্য যথেষ্ট পৃষ্ঠপোষকতাও করতেন। এই সব দিক থেকে যদি আমরা বিচার করি তাহলে তিনি একজন আদর্শ সংস্কৃতিমনা ব্যক্তিত্ব ছিলেন। কিন্তু হৃদয়ের দিক বিচার করলে দেখা যায় যে, তিনি ছিলেন এক হৃদয়হীন পাষণ্ড ব্যক্তি, যার নির্দেশে হত্যা করা হয়েছে হাজার হাজার নিরীহ আবালবৃদ্ধবনিতাকে। তার নির্মমতার হাত থেকে রক্ষা পায়নি মৃত্যুপথযাত্রী বৃদ্ধ পর্যন্ত। তাহলে সে কিভাবে একজন সংস্কৃতিমনা ব্যক্তি হতে পারে? সত্যিকার সংস্কৃতি আমাদের জীবনযাপন প্রণালী ও আচরণের ওপর নির্ভর করে না। তা নির্ভর করে আমাদের মানবতা, বিনম্ৰতা ও হৃদয়ের প্রজ্ঞার ওপর।
সবকিছুই সূর্যোদয়ের সাথে সাথে শুরু হয় এবং সূর্যাস্তের সাথে সাথে পরিসমাপ্তি ঘটে। ভগবান আমাদের যা প্রদান করেছেন তার মধ্যে সবচেয়ে মহিমান্বিত ও মূল্যবান হলো সময়। সময় অমূল্য সম্পদ। ধন, সম্পদ, প্রতিপত্তি, এমনকি সম্মানও যদি আমাদের হারিয়ে যায় তবে তা কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে ফিরে পাওয়া সম্ভব কিন্তু সময় যদি একবার নষ্ট হয়ে যায় তবে তা সমগ্র সৃষ্টির বিনিময়েও ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়।
সময় ও স্রোত কারো জন্য অপেক্ষা করে না। যখন আমরা বাল্যকালে বিদ্যালয়ে পাঠাভ্যাস করতাম তখন আমরা কখন সপ্তাহটি শেষ হবে তার জন্য অপেক্ষা করে থাকতাম। তখন একটি সপ্তাহকে একটি যুগের মতো মনে হতো, যখন আমরা বড় হলাম তখন আমাদের মনে হতে লাগলো একটা একটা দিন যেন একটা একটা মিনিট। কখন যে একটা সপ্তাহ পার হয়ে গেল তা আমরা টেরই পাই না। খুব শীঘ্রই আমাদের এই নশ্বর দেহ পরিত্যাগ করে যেতে হবে। আমরা ফেলে আসা দিনগুলোর দিকে ফিরে তাকাই এবং ভাবতে থাকি। সেই দিনগুলো কোথায় চলে গেছে? তখন আমাদের মনে হয় যেন একটা মুহূর্তের মধ্য দিয়ে আমাদের সমগ্র জীবন অতিবাহিত হয়ে গেছে। অতএব আমাদেরকে সময়ের মূল্য অনুধাবন করতে হবে। সময়ের সদ্ব্যবহার করতে হবে এবং জানতে হবে কিভাবে সময়ের সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে আমাদের এই মনুষ্য জীবনকে সার্থক করতে পারি। বিভিন্ন বৈদিক শাস্ত্রে বর্ণনা করা হয়েছে যে, প্রতিটি সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের মধ্য দিয়ে আমরা মৃত্যু নামক অমোঘ সত্যের দিকে দিন দিন এগিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু আমরা কি সময়ের সদ্ব্যবহার করছি? আমরা কি আমাদের মূল্যবান সময়কে জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানতে, ভগবানের দিব্য মহিমা শ্রবণ করতে ও তাঁর দিব্যনাম জপ করার জন্য ব্যয় করছি? কিন্তু প্রতিটি সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত আমাদের জানিয়ে দিচ্ছে, তুমি মৃত্যুর খুব নিকটেই ।

অনুসন্ধানী শক্তি

মহান মহান ব্যক্তিগণ বলে গেছেন যে, প্রতিটি জীব তার জীবন ব্যয় করে কতগুলো প্রশ্ন ও তার উত্তর অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে। সূর্যোদয়ের মাধ্যমে যখন একটি পাখি জেগে উঠে তখনই সে প্রশ্নের সম্মুখীন হয় এবং উত্তর খোঁজার চেষ্টা শুরু করে দেয়।
এমনকি সে যখন দিবা অবসানে তার নীড়ে ফিরে আসে তখনও তার প্রশ্ন ও উত্তর অনুসন্ধানের চেষ্টা অব্যাহত থাকে। মানব সমাজেও সকল ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, আইনজীবি, শিল্পী ও কলাকুশলী থেকে শুরু করে কৃষক পর্যন্ত সবাই প্রশ্নের সম্মুখীন হয় এবং তার উত্তর খোঁজার জন্য অক্লান্ত প্রচেষ্টা করে। জীবন হলো প্রশ্ন উত্তরের মালায় গাঁথা এক বিচিত্র
অধ্যায় :
(১) কিভাবে আমরা আমাদের চিরাচরিত সমস্যাগুলোকে সমাধান করতে পারি?
(২) কিভাবে আমরা সুখী হতে পারি ?
(৩) কিভাবে আমরা দুঃখ কষ্ট হতে মুক্তি পেতে পারি?
(৪) কিভাবে ভগবানের সাথে আমাদের হারানো সম্পর্ক পুনঃস্থাপিত করতে পারি?
(৫) কিভাবে আমাদের শক্তি ও মর্যাদা লাভ করতে পারি? অবশ্য বর্তমান যুগ যে প্রশ্ন ও উত্তরের, তা হলো কিভাবে আমি প্রচুর অর্থ উপার্জন করতে পারি? বৈদিক শাস্ত্র মতে প্রতিটি মানুষের অনুসন্ধান করা উচিত, ‘আমি কে’? কিন্তু বর্তমানে তা বাদ দিয়ে আমরা মগ্ন আহার, নিদ্রা, ভয়, মৈথুন নিয়ে । যা জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য নয় তার পিছনে ছুটছে সমগ্র জগৎ। মানব জীবনকে সার্থক করার জন্য আমাদের প্রশ্নের
সম্মুখীন হওয়া উচিত। (১) আমি কে? (২) আমি কেন দুঃখ ভোগ করছি? (৩) আমি কোথা হতে এসেছি? (৪) মৃত্যুর পর আমরা কোথায় যাব? (৫) পরমেশ্বর ভগবান কে? (৬) এই পার্থিব জগতের স্বভাব কি রকম? (৭) পরমেশ্বর ভগবানের সাথে আমাদের সম্পর্ক কি? (৮) ভগবানের সাথে আমার যে সম্পর্ক তা কি শুধুমাত্র এই পৃথিবীতে সীমাবদ্ধ?
যখন একজন মানুষ এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার জন্য প্রচেষ্ঠা করে তখনই তার প্রকৃত আধ্যাত্মিক জীবনের সূচনা ঘটে। যদি আমরা প্রকৃতপক্ষে খাদ্যবস্তুকে হজম করতে চাই তবে আমাদের আগে ক্ষুধা থাকতে হবে। যদি আমাদের ক্ষুধা না থাকে তবে ধারণা করতে হবে আমাদের হজম শক্তি দুর্বল। ক্ষুধা আমাদের জীবনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি আমাদের হজমের শক্তি প্রদান করে। এই ব্যাপারটি আমাদের পারমার্থিক জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রেও সত্যি। যখন আমরা এই মানবজীবনের অসারতা অনুভব করি এবং প্রকৃত জ্ঞান অর্জনের জন্য ক্ষুধা অনুভব করি তখন আমরা জীবনের প্রধান সমস্যাকে অনুসন্ধান করি। খুঁজতে থাকি সেই ব্যক্তিকে যিনি আত্ম উপলব্ধির মাধ্যমে এই প্রশ্নের উত্তর জানতে পেরেছেন এবং ভগবানের দিব্যবাণী অবিকৃতভাবে প্রচার করছেন। তখনই আমাদের সত্যিকার মানবজীবনের সূচনা ঘটে। বৈদিক শাস্ত্রের মাধ্যমে আমরা অন্তিম পরীক্ষার কথা জানতে পারি। এই অন্তিম পরীক্ষার নাম হলো মৃত্যু। এটা আমাদের জন্য ভয়াবহ কিছু নয়, যদি আমরা যথাযথ প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারি। অন্তিম পরীক্ষায় ফেল করলে তখন তা খুব দুর্দশাময় অবস্থা হয়ে দাঁড়াবে আমাদের জন্য। কিন্তু আমরা যদি পাশ করি তবে তা সকল জীবের জন্য এক মহান সুযোগ। আমরা এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারি জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্যের উত্তর খুঁজে বের করার মাধ্যমে এবং প্রশ্নগুলোর উত্তর আমাদের পরিচালিত করবে জীবনের মূল লক্ষ্যের দিকে।

প্রকৃত ঔষধ

এই জাগতিক জীবনে অনেক অলঙ্ঘনীয় ধ্বংস বিদ্যমান। কয়েক বছর আগে ভারতের গুজরাটে এক ভয়ঙ্কর ভূমিকম্প আঘাত হানে। হাজার হাজার মানুষ নিমিষেই মৃত্যুবরণ করে। ভূমিকম্পটির স্থায়িত্ব ছিল মাত্র ৪৫ সেকেন্ড। এতে লক্ষ লক্ষ ডলার ক্ষতি হয় এবং হাজার হাজার জীব হারিয়ে যায় মুহূর্তের মধ্যে। আমাদের মুম্বাইয়ের ভক্তিবেদান্ত হাসপাতালের চিকিৎসক ও সেবাকর্মীরা ছুটে যায় দুর্ঘটনা কবলিত এলাকায়। সেখানে গিয়ে দেখা যায় সারি সারি মানুষ, যাদের কারো মাথা ফেটে গেছে, আবার কারো বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ভেঙ্গে গেছে। যেটা ছিল সত্যিকার অর্থেই খুব হৃদয়বিদারক এক দৃশ্য। ডাক্তার তাদের চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছিলেন এবং সেখানে সারাক্ষণ হরিনাম চলছিল এবং ভগবানকে নিবেদিত প্রসাদ সবাইকে বিতরণ করা হচ্ছিল। প্রত্যেক সন্ধ্যা বেলায় গুজরাটি ভাষায় ভগবদ্‌গীতার ওপর প্রবচনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল এবং সকাল ও বিকাল বেলার ক্লাসের জন্য তারা কাপড় দিয়ে একটি মঞ্চের মতো বানিয়েছিল। তাদের মধ্যে অনেকেই এই জ্ঞান অনুধাবন করতে পেরেছিল এবং ডাক্তারি ঔষধের চেয়ে বেশি প্রশান্তি দিচ্ছিল তাদের দিব্য হরিনাম। শারীরিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক দিক দিয়ে এটা খুব পীড়াদায়ক যখন আপনি দেখবেন আপনার চোখের সামনে আপনার মা, বাবা, ভাই, বোন, স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, আত্মীয় মারা যাচ্ছে। সারা জীবন তিল তিল করে অর্জন করা আপনার সকল সম্পদ মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংস হয়ে গেছে। অবশিষ্ট আর কিছুই নেই।
শুধুমাত্র ৪৫ সেকেন্ডের ভূমিকম্পে সবকিছুই শেষ। তখন আপনার কাছে সমস্ত জীবন অসার বলে প্রতিপন্ন হবে। আপনার বেঁচে থাকতে ইচ্ছা করবে না। শরণার্থী শিবিরে দেখা যায় কিভাবে মানুষ কষ্ট পাচ্ছে। তারা সবাই হৃতসর্বস্ব ও হতভম্ব। তারা জানে না কি করবে, কোথায় যাবে। তারা সারা জীবন পার করেছে তাদের পরিবার, সন্তান ও প্রিয়জনদের নিয়ে। কঠোর পরিশ্রম করে সম্পদ গড়েছে। যার কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। ডাক্তার তাদের ভাঙ্গা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের যন্ত্রণা লাঘব করার চেষ্টা করছে। ত্রাণ শিবিরের কর্মীরা জনগণের সেবা করার চেষ্টা করছে। কিন্তু আসলে কি তারা এই হতভাগ্য ব্যক্তিদের জন্য কিছু করছে? কিছু ডাক্তার ও সেবাকর্মী হয়তো তাদের শারীরিক যে কষ্ট তা থেকে কিছু সময়ের মধ্যে মুক্তি দিচ্ছে। কিন্তু ধ্বংস তার জীবন থেকে যা কেড়ে নিয়েছে তা কি ফিরিয়ে দিতে পারবে? তাদের জীবনে বেঁচে থাকার অবলম্বন বলতে কিছুই অবশিষ্ট নেই। যখন এই ব্যক্তিগুলো কিছুটা সুস্থ হলো তখন তারা মঞ্চে আসলো। তখন ভগবানের দিব্যনাম, ভগবদ্‌গীতার মহান শিক্ষা তারা লাভ করল। পেল বেঁচে থাকার প্রেরণা।
অনেক লোক আসল এবং বলল, এটাই হলো আসল ত্রাণকার্য। যা আমাদের হৃদয়কে আরোগ্য দান করেছিল এবং আত্মাকে করেছিল তৃপ্ত। সেখানে হাজার হাজার প্রতিষ্ঠান ছিল যারা তাদের শারীরিকভাবে সুস্থ করার জন্য চেষ্টা করছিল। যা সত্যিই মহৎ কাজ ও প্রশংসার দাবিদার। কিন্তুযখন গ্রামবাসীরা আমাদের কাছে এসেছিল তখন তারা বলছিল যে, আমরাই চেষ্টা করেছিলাম তাদের মন ও আত্মাকে আরোগ্য করতে এবং তাদের মধ্যে বেঁচে থাকার আশা জাগিয়ে ছিলাম। শিখিয়েছিলাম বেঁচে থাকার চরম কারণ অনুসন্ধান করতে এবং এই অবস্থাকে কিভাবে মোকাবেলা করতে হয় এবং কিভাবে এটাকে অতিক্রম করা যায়। তারা খুব কৃতজ্ঞ ছিল। তারা আমাদের ছাড়তে পারছিল না। এটার মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি আসলে মানুষ কি চায় এবং মানুষের কি প্রয়োজন।
তারা শারীরিকভাবে আহত অথবা সুস্থ হোক। কিন্তু তাদের হৃদয়ে পঙ্গুত্ব থাকবে যতক্ষণ না তারা জানতে পারছে, তারা কে? ভগবানের সাথে তাদের সম্পর্ক কি? মানুষ জাগতিক অবস্থার পরিবর্তনের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করে। কিন্তু পরিণামে ব্যর্থ হয়। আমরা চেষ্টা করি জাগতিক অবস্থার পরিবর্তনের সাথে সাথে তার যে জড় প্রবৃত্তি তা অতিক্রম করার কৌশল শেখাতে এবং তার আত্মিক উন্নয়ন সাধন করতে। যখন আমরা তাদের শিক্ষা দান করতে পারবো কিভাবে ভগবানকে ভালবাসতে হয়, কিভাবে তাঁর সেবা করতে হয় এবং কিভাবে মৃত্যু নামক অমোঘ সত্যের মুখোমুখী হতে হয়। তখন তাদের যথার্থ কল্যাণ সাধিত হবে। সেটাই হবে আমাদের তরফ হতে তাদের জন্য অনন্য উপহার।
শ্রীমৎ রাধানাথ স্বামী ১৯৫০ সালে শিকাগোতে জন্মগ্রহণ করেন। যুবক বয়সে ভগবজ্ঞান অর্জনের জন্য ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেন। অবশেষে ভারতে অবস্থানকালে শ্রীল প্রভুপাদের সাক্ষাৎ করেন। তিনি এ বিষয়গুলো তার বিখ্যাত দ্যা জার্নি হোম গ্রন্থে তুলে ধরেন। শ্রীল প্রভুপাদের সন্তুষ্টি বিধানের জন্য শ্রীমৎ রাধানাথ স্বামী মহারাজ বৃন্দাবন থেকে নব বৃন্দাবনে গমন করেন। তিনি সেখানে দৃঢ়ভক্তি ও তপস্যা সহকারে দীর্ঘ আট বছর সেবা করেন। এরপর ১৯৮৭ সালে আমেরিকার বিভিন্ন কলেজে প্রচার শুরু করেন। ভারতে প্রচার প্রজেক্ট উন্নয়নে সহায়তা করেন। তিনি ভারতের মুম্বাইয়ে অবস্থিত চৌপাট্টিতে শ্রীশ্রী রাধাগোপীনাথ মন্দির ও ইস্কন বেলজিয়াম মন্দিরে কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচার আন্দোলনে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। তাঁর নির্দেশনায় কানপুর, নাসিক ও নিগধিতে প্রচার কার্যক্রম প্রসারিত হচ্ছে। তিনি প্রতিবছর হাজার হাজার ভক্তদের নিয়ে বিভিন্ন তীর্থ পরিক্রমা করেন। তিনি বেলজিয়ামের ভক্তিবেদান্ত কলেজেরও একজন ট্রাস্টি।


 

ত্রৈমাসিক ব্যাক টু গডহেড, অক্টোবর – ডিসেম্বর ২০১৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here