স্বাধীনতা যখন প্রশ্নবিদ্ধ

0
27

ভক্তিবেদান্ত বুক ট্রাস্ট আফ্রিকার পক্ষ থেকে জোহান্সবার্গের উইটস ইউনিভার্সিটিতে প্রদত্ত দ্বিতীয় বার্ষিক ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রবচন।

শ্রীমৎ দেবামৃত স্বামী


স্বাধীনতা বা মুক্তি এমন একটি বিষয় যা সমস্ত মানুষকে অনুরনিত করে। আপনি এই ধারণাটি অনেক দৃষ্টিকোণ থেকে অবলোকন করতে পারেন, যেমন রাজনৈতিক স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা, শিল্প সম্বন্ধীয় স্বাধীনতাসহ আরো অনেক স্বাধীনতা। লোকেরা স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতি আসক্ত। যখনই আপনি শুনেন কোন কিছু স্বাধীন, তখন স্বভাবতই আপনি বুঝতে পারেন সেখানে আর কোন সীমা, সীমাবদ্ধতা নেই: মুক্ত ইলেক্ট্রন, মুক্ত বাজার, মুক্ত ভালোবাসা, মুক্ত চিন্তা। বিপণনকারীরা মানুষের স্বাধীনতা ও বিষয়ের প্রতি ভালোবাসাকে কাজে লাগায় । দোকানে গেলে দেখা যায় ‘দুটি কিনলে, একটি ফ্রি’। বিপণনকারীরা জানে আপনার দুটির প্রয়োজন কিন্তু আপনি কোনকিছু ফ্রি বা বিনামূল্যে পাবেন এই প্রলোভন সামলাতে পারবেন না। তখন নিজেকে যুক্তি দেখান, “আমি দোকানে এসেছি একটি কিনতে, কিন্তু অন্যটি আমি বেক আপ বা বাড়তি হিসেবে থাকলে ভাল অথবা কাছের কাউকে উপহারও দিতে পারব।
বিষয়টি হলো, স্বাধীনতা ও মুক্ত বিষয়ের প্রতি সবার সহজাত আকর্ষন রয়েছে তবুও আমাদের চেষ্টা করা উচিত স্বাধীনতার ধারণাটি আরেকটু গভীর থেকে উপলব্ধি করা।
নেলসন মেন্ডেলা বলেছেন: “আংশিক স্বাধীনতা বলতে কোন কিছুই নেই।” কিন্তু আংশিক স্বাধীনতা, আমাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নেতারা বিশ্বকে নিবেদন করছে। এ বিষয়ে স্বাধীনতা সম্পর্কে গভীর উপলব্ধি অর্জন করা উচিত। তবে সেটি জড়বাদের ওপর নয় বরং পারমার্থিক বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে উপলব্ধি করা উচিত। ইস্কন প্রতিষ্ঠাতা ও আচার্য এ.সি. ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ দক্ষিণ আফ্রিকায় দু’বার এসেছিলেন। তিনি কেনিয়াতেও গিয়েছিলেন, যেখানে তিনি শিক্ষার্থী, সাধারণ জনগণ ও নেতাদেরকে তাদের জাতিকে পারমার্থিক স্তরের প্রেক্ষাপটে গড়ে তোলার জন্য অনুপ্রেরণা দেন। আজকের এই রাতে আমি যে বিষয়টি প্রস্তাব করব তা কার্যকর হবে তখনই যদি আমরা প্রকৃত প্রগতি অর্জনে বদ্ধপরিকর হই। সেটি হল আমাদের পারমার্থিক স্তরে উপনীত হওয়া প্রয়োজন এবং তখন আমরা আংশিক স্বাধীনতার বিপরীতে পূর্ণ স্বাধীনতা সম্পর্কে উপলব্ধি করতে পারব।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাতিসংঘে বিশ্বের অনেক জাতি একত্রে সমবেত হয়েছিল এবং সেখানে মানবাধিকারের বিশ্বজনীন সিদ্ধান্তটি সর্বসম্মতভাবে অনুমোদন হয়েছিল। তখন সারাবিশ্ব দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মর্মান্তিক বেদনার দ্বারা পীড়িত ছিল, যে যুদ্ধে ৫৫ মিলিয়ন লোক মারা যায়। সে সময় চেতনাটি ছিল “আর কখনো নয়! চলুন আমরা সবাই মিলে মানবাধিকারের বিশ্বজনীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি, এবং এভাবে মানবতার প্রগতির পথে অগ্রসর হই।”

মানব প্রগতির পাঁচটি প্রচলিত বিষয়

মানব প্রগতির পাঁচটি বিষয় প্রচলিত আছে এবং সবগুলোই সন্দেহের উদ্রেক করে।
প্রথমটি হল : অর্থ সুখ নিয়ে আসে। আমি এই বিষয়ে কয়েক বছর পূর্বে কেপটাউন ইউনিভার্সিটিতে বক্তৃতা দিয়েছিলাম, তখন সেখানে প্রায় দু’শ জন শিক্ষার্থী ও অধ্যাপক উপস্থিত ছিলেন। আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেছিলাম: “আমি নিশ্চিত আপনারা সাম্প্রতিক সুখের বিজ্ঞানের সঙ্গে সবাই পরিচিত। যা এখন ২০ বছরের পুরানো। আপনারা গবেষণায় দেখে থাকবেন অর্থনৈতিক অর্জনের ক্ষেত্রে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ঊর্ধ্বে, অধিক সম্পদ অর্জন আপনাকে অধিক সুখী করতে পারে না।” যারা এ বিষয়ে অবগত তাদেরকে হাত তুলতে বলি। উপস্থিত প্রায় ৮০% ব্যক্তি এই গবেষণা সম্পর্কে পূর্ব থেকেই অবগত ছিলেন। শিক্ষাবিদগণ এ বিষয়ে কিছুটা গবেষণা করতে পারে. কিন্ত সাধারণ বিষয় বা ধারণাটি সবাই গ্রহণ করেছে। এরপর আমি বললাম, “এটা জেনে এবং আপনার বুদ্ধিমত্তা ও সফলতার ক্ষমতার স্তর সম্পর্কে জেনে, আপনাদের মধ্যে এমন কতজন রয়েছেন যারা এরকম মধ্যবিত্ত শ্রেণীর স্তরে জীবন যাপন করতে প্রস্তুত। তখন কোন হাতই উঠল না।”
এখান থেকে আমরা যেটি দেখতে পাই তা হল জ্ঞান ও লাইফ স্টাইল এর মধ্যে বিচ্ছিন্নতা। ভারতের প্রাচীন বৈদিক দর্শনানুসারে এক্ষেত্রে সমস্যাটি হল প্রচলিত সেই জ্ঞানটি প্রকৃত জ্ঞান নয়। প্রকৃত জ্ঞান আমাদের কার্যকলাপের মাধ্যমে প্রকাশ পায়।
দ্বিতীয়টি হল: প্রযুক্তি কল্যাণ নিয়ে আসে। আমাদের প্রযুক্তিময় জটিল জীবন কি প্রকৃতপক্ষে উদ্বিগ্নতা থেকে মুক্তি, মানসিক চাপ থেকে মুক্তির চেয়েও উত্তম? কিন্তু তবুও আমরা অর্থ ও প্রযুক্তির বিভিন্ন লক্ষ্যের চিন্তায় গভীরভাবে নিয়োজিত ।
এরপরেই তৃতীয় প্রচলিত ধারণা: সম্ভবত এই ধারণাটি দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রচলন নেই তবে অন্যান্য দেশে রয়েছে। এখনও পর্যন্ত সারা বিশ্বে এই তৃতীয় ধারণাটির বেশ প্রভাব রয়েছে। মারণাস্ত্র, নিরাপত্তা নিয়ে আসে। বিশ্বের অনেক বিখ্যাত জাতি সরকারি অর্থের অন্তত শতকরা পঞ্চাশ ভাগ ব্যয় করে প্রতিরক্ষা খাতে। কর দাতারাও এতে সাড়া দেয়: “এ সমস্ত অর্থ প্রতিরক্ষা খাতের জন্য এবং মানবতার সুরক্ষার জন্য।”
চতুর্থ প্রচলিত ধারণা : আমাদের ভোগের জন্য পৃথিবীতে অপরিসীম সম্পদ রয়েছে।
পঞ্চম প্রচলিত ধারণা : আমাদের ভোগের পর পৃথিবীতে সেই বর্জ্যগুলা অপসারনের জন্য অপরিসীম স্থান রয়েছে।

প্রচলিত ধারণাগুলোর প্রতিস্থাপন

বর্তমানে এ সমস্ত ধারণাগুলো ব্যর্থ হচ্ছে, কিন্তু এগুলোর পরিবর্তে আমরা কি প্রতিস্থাপন করতে যাচ্ছি? আমাদের প্রকৃতপক্ষে গভীর পারমার্থিক উপলব্ধিটি না থাকলে, কখনো জাগতিক এ সমস্ত ফাঁদ-অর্থনীতি, রাজনীতি ইত্যাদি থেকে মুক্ত হতে পারব না। এগুলোর প্রয়োজন রয়েছে, কিন্তু আমরা এমন এক সময়ে এসে উপনীত হয়েছি যখন জাগতিক জীবনের সর্বোচ্চ ধারণাটিও আজ নড়বড়ে। এমনকি গণতন্ত্রের সামগ্রিক ধারণা ও নির্দিষ্ট লক্ষ্যে অর্থনৈতিক প্রগতির ওপর এর প্রভাবটিও নড়বড়ে।
সম্প্রতি, দ্যা ইকোনমিস্ট ম্যাগাজিনের প্রতিবেদনে সমাজ বিজ্ঞানিরা উল্লেখ করেন, “আমরা সততার সঙ্গে বলছি: গণতন্ত্র সমস্যার সম্মুখীন” । গণতন্ত্রের প্রেরণার জন্য সর্বোচ্চ অর্জনটি ছিল বিংশ শতাব্দীতে। সোভিয়েত সাম্রাজ্যের পতন, জাতিবিদ্বেষের পতনসহ আরো অন্যান্য বিষয় আনন্দ উল্লাস নিয়ে এসেছিল। কিন্তু যখন একবিংশ শতাব্দিতে পদার্পন করি। গত আট বছরে, রাজনৈতিক গবেষণা অনুসারে, বিশ্বের বহু দেশে গণতন্ত্র পিছু হটছে। এর দুটি কারণ রয়েছে। এ দুটি কারণ উপলব্ধি করা গুরুত্বপূর্ণ কেননা স্বাধীনতা বা মুক্তি সম্পর্কে আমাদের অনেকেরই ধারণা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। শত শত বছর পূর্বে প্লেটো উল্লেখ করেছিলেন যে, গণতন্ত্রের দুর্বল দিক হল, ক্ষণস্থায়ী অর্জন ক্ষণস্থায়ী উদ্দীপনার মাধ্যমে খুব সহজেই জনগণদের হাত করা। ইকোনমিস্ট সে বিষয়টিই সঠিক বলে দাবি করে। তবে আমাদের সমস্ত পরিকল্পনা বিপর্যস্ত করেছে কে? বিশ্ব অর্থনীতির মন্দা: গণতন্ত্র যা সমাধান করতে হিমসিম খাচ্ছে। এটি ব্যাংকিং সিস্টেমকে সংশোধন করতে পারেনি ।
কিন্তু এর চেয়েও বড় কারণ হল: চীন দেখাচ্ছে যে, মত প্রকাশের স্বাধীনতা থেকেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো যেকোনোভাবে অর্থনৈতিক প্রগতি অর্জন করা। যখন আমেরিকার অর্থনীতি চূড়ায় অবস্থান করছিল, তখন সেখান থেকে দেশটির জীবনযাত্রার মান দ্বিগুনে উন্নীত করতে ৩০ বছর লেগেছিল। যেটি চীন প্রতি দশ বছর অন্তর অন্তর করে থাকে। দেশটির নেতারা এখন বলে: “স্বাধীনতা নিয়ে আবার এত কথা কিসের? তোমাদের অর্থনৈতিক প্রগতি কেমন? আমাদের দৃষ্টান্ত দেখ! আমাদের রয়েছে অত্যন্ত কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত সমাজ ব্যবস্থা যা পেশাধারী ব্যবস্থাপকদের মাধ্যমে পরিচালিত। আমরাই জনগণের জন্য কি কল্যাণ হবে তার সিদ্ধান্ত নিই।”
চায়নাতে বর্তমানে দেখা যায় জমকালো বিমানবন্দর, দ্রুতগতির বুলেট ট্রেন, সুদৃশ্য ও আশ্চর্যকর হাইওয়ে, নজরকাড়া বৃহদাকার ব্রিজ। এমতাবস্থায় সারাবিশ্বের জনগণ ভাবছে: “আমরা তো এটাই চাই-তড়িৎ অর্থনৈতিক প্রগতির ফল। আমরা তা বাকস্বাধীনতা, মুক্ত চিন্তার স্বাধীনতা, ঐক্যমতের স্বাধীনতা ছাড়াই করতে পারি। এক্ষেত্রে যদি আমাদের অস্থায়ী উদ্দীপনা থাকে, যা কেবল একটি উন্নত ভোক্তা সমাজই প্রদান করতে পারে।”
এর পরিপ্রেক্ষিতে আমরা যেটি বলতে পারি, যদি তড়িৎ অর্থনৈতিক প্রগতিই লক্ষ্য হয়ে থাকে? যদি এটিই মানুষকে সন্তুষ্ট করতে পারে, তবে এর জন্য যা প্রয়োজন তাই করা যাক। যদি সমৃদ্ধি স্বাধীনতার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকে, তবে আমাদের রাজনৈতিক অর্থনীতির পূনর্গঠন করা উচিত।
চায়নিজরা বলছে এই হচ্ছে পন্থা। “তোমার গণতান্ত্রিক পদ্ধতি আবার কি? তাদের নেতারা সেটি উন্মুক্তভাবে বলে বেড়ায়, তোমরা অদক্ষ নেতা নির্বাচন কর: তোমরা মিষ্টভাষীদের নির্বাচন কর। তবে আমাদের দেখ! আমরা সবচেয়ে প্রতিভাবান, দক্ষ লোকদের সম্মিলনে সমাজকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করি। দেখ আমরা জনগণদের কি প্রদান করতে সক্ষম। আমাদের জীবন-যাত্রার মানের দিকে দেখ, কত দ্রুত আমরা অগ্রসর হচ্ছি!” প্রধান বৈদিক শাস্ত্র শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতায় ভগবান সবকিছুর পরম উৎস, সত্য ও বাস্তবতা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতায় বলা হয়েছে, যখন আমরা প্রকৃত স্বরূপ ভুলে নিজেদের জড় বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করি তখন আমরা প্রকৃতপক্ষে মোহের মধ্যে বিরাজ করি। তখন প্রগতির সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়, কারণ আলোকিত হওয়ার বিষয়টি এখানে প্রাধান্য পায় না। হ্যাঁ, আমরা জাগতিক প্রয়োজনগুলো মেটাব, তবে এক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বন্টনেও অবিচার হয়। আমরা প্রধান যে বিষয়টি ভুলে যাই যে, আমাদের প্রকৃত পরিচয় হল আমরা চিন্ময় আত্মা এবং এজন্যে পরমাত্মার সাথেও সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়েছে। আমরা যদি পারমার্থিক সমৃদ্ধি নিয়ে আসতে পারে এমন নেতা না পাই তবে আমরা সর্বদা দেখব যে রাজনৈতিক, অর্থনীতির বিভিন্ন পুনর্গঠন ও বিপ্লব সত্ত্বেও কিভাবে সমাজের অধঃপতন হয় ।
আমরা প্রকৃতপক্ষে তেমন কোন পরিবর্তন দেখতে পাব না। হয়ত অনেক পরিবর্তন, আশা, বাহ্যিক সমন্বয় প্রদর্শন হতে পারে। কিন্তু তা সত্ত্বেও বারবার জনগণদের হতাশ হতে হবে। প্রায়শই রাজনৈতিক পরিবর্তনগুলোর অর্থ দাড়ায় বাহ্যিক বিষয়কে আভ্যন্তরীন আর আভ্যন্তরীণ বিষয়কে বাহ্যিকভাবে প্রদর্শন করা। এক্ষেত্রে মানব জাতির প্রকৃত প্রয়োজন পূরনের কি কোন পন্থা রয়েছে?

পরমেশ্বরকে উপলব্ধির ৫টি স্তর

সম্ভবত আমরা মূল আলোচ্য বিষয় থেকে কিছুটা দূরে সরে গেছি। আমি এখানে দৈনন্দিন জীবনে প্রকৃত পরম সত্যকে দর্শন করার সম্ভাব্য পন্থা সম্পর্কে তুলে ধরব। এক্ষেত্রে পাঁচটি স্তর রয়েছে যেগুলোর তিনটি জড়া প্রকৃতিতে সাধারণ জাগতিক অস্থিত্ব সম্বন্ধীয় এবং অন্য দুটি জড় পদার্থ, স্থান, কালের উর্ধ্বে অপ্রাকৃত বিষয়। এই পাঁচটির মধ্যে সর্বোত্তম দুটি গ্রহণ না করলে, আমরা মানবতার কল্যাণ নিয়ে আসতে ব্যর্থ হব।
আমি স্তরগুলো সংস্কৃত শব্দে ব্যাখ্যা করব। সংস্কৃত ভাষা কোন আলোকিত বিষয় আলোচনার জন্য যথার্থ। প্রতিটি ভাষারই একটি শক্তি রয়েছে। ইংরেজি হল ব্যবসায়িক ভাষা; জার্মান এখনও পর্যন্ত বৈজ্ঞানিক ভাষা, বিশেষত ইঞ্জিনিয়ারিং এর জন্য; ফ্রান্স ভাষা বোধহয় ভালবাসার ভাষা; আর সংস্কৃত হল পারমার্থিক বিজ্ঞানের ভাষা।
আমাদের জীবনে পরমেশ্বরকে উপলব্ধির প্রথম স্তরটিকে বলা হয়, অন্নময় : খাদ্যের মাধ্যমে ভগবানকে উপলব্ধি। বিষয়টি হল আমি খাদ্যের মাধ্যমে জীবন-ধারণ করি এবং আমার জন্য সর্বত্র খাদ্য রয়েছে, এটিই হল ভগবানকে উপলব্ধির অত্যন্ত প্রাথমিক পন্থা। আমরা নিজেদের প্রতিপালন করতে পারি না। আমরা প্রযুক্তির প্রগতি সত্ত্বেও প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। যেহেতু কেউ খেতে পারে আর এজন্যই সে ভগবানকে স্বীকার করে, যদিও ভগবানের অস্থিত্ব থাকা বিষয়ে এ প্রকার সম্মতি অপূর্ণ। লোকেরা বলে, “আমার টেবিলে খাবার আছে, আমি জানি ভগবানই তা করতে সমর্থ।” সেটি সঠিক। এটি হল ভগবানকে উপলব্ধির একেবারে প্রাথমিক পন্থা । নেলসন ম্যান্ডেলার মৃত্যুর ওপর জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার একটি প্রশংসা স্তুতির কথা আমার মনে পড়ে। তারা এই উপলব্ধির জন্য তাঁর প্রশংসা করে যে, প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতার অনেকাংশই নির্ভর করে খাদ্যের ওপর, এবং তা শুধুমাত্র খাদ্য উৎপাদনের ওপরই নয় বরং বিতরনের ওপরও।
তাই ভগবানকে উপলব্ধির প্রথম স্তর প্রকৃতপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা খাদ্য ছাড়া বেঁচে থাকতে পারি না। তবুও জাতিসংঘের পরিসংখ্যান মতে বিশ্বের মোট উৎপাদনের এক তৃতীয়াংশ অপচয় হয়: প্রায় বার্ষিক ১.৩ বিলিয়ন মেট্রিক টন। যুক্তরাজ্যে যত ফল ও সবজি উৎপাদন হয়, তার ৩০% অপচয় হয় প্রসাধনীর জন্য : ভোক্তাদের জন্য এ পরিমাণ ফল ও শাকসবজিই যথেষ্ট নয় বলে মনে হয় । ভগবানকে উপলব্ধির প্রথম স্তরটিই যদি এত সমস্যার সম্মুখীন হয় তবে, অন্যগুলোতে আর কিভাবে এগোনো যায়? মাতৃকালে একটি শিশুর কথা ভাবুন: শিশুটির যত মনোযোগ মাতৃদুগ্ধ পান করা। খাওয়ার জন্য পৃথিবীতে অনেক সমস্যা রয়েছে। এক বিলিয়ন লোক বিশ্বে অনাহারে ভুগছে এবং অন্য দিকে এক বিলিয়ন লোক অতিরিক্ত খেয়ে স্থূলকায় হচ্ছে। এক্ষেত্রে সঠিকভাবে খাদ্য বিতরণের অভাব ও মানুষ কতটা সরল জীবন-যাপন করছে সেই ব্যাপারগুলো সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।
ভগবানকে উপলব্ধির এর পরের স্তরটি হল প্রাণময় : অর্থাৎ বেঁচে থাকার মাধ্যমে ভগবানকে উপলব্ধি করা। গীর্জাগুলোতে শিশুরা দাড়িয়ে প্রশংসাপত্র পাঠ করে: “আমি আমার পিতা-মাতার জন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানাই, আমি আজকে বেঁচে আছি সেজন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানাই।” সুপ্রাচীন বৈদিক শাস্ত্রে প্রদত্ত ত্রুটি হল ভগবৎ উপলব্ধির দ্বিতীয় স্তর। পৃথিবীতে এরকম অনেক স্থান রয়েছে যে, কালকে কি হবে সে নিয়ে আপনি ভীত। বেঁচে থাকার জন্য ভগবানকে ভগবানকে উপলব্ধির এগুলো হল প্রাথমিক স্তর। দেখুন আপনার নির্ভরশীলতা, অসহায়ত্বতা। আপনি ধনী কিংবা দরিদ্র হোন, আপনার জীবন অত্যন্ত নড়বড়ে। বিশ্ব খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা অত্যন্ত নড়বড়ে। একজন ধার্মিক ব্যক্তি এরকম প্রাথমিক স্তরে ভগবানের অস্থিত্ব বা উপস্থিতি দর্শন করতে পারেন।
আরেকটি প্রাথমিক স্তর হল জ্ঞানময়। এই স্তরটি ইউনিভার্সিটির মত স্থানে আলোচনা করাটা যথার্থই বলতে হবে। এ স্তরটি হল, আপনি ভাবনা-চিন্তা, যুক্তি-তর্ক, বোধশক্তি, শিক্ষা, সংস্কৃতির মাধ্যমে ভগবানের অস্থিত্ব উপলব্ধি করতে পারেন। বুদ্ধিমত্তা জ্ঞান অর্জনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় হলো একটি ব্যস্ত স্থান। কিন্তু সেই জ্ঞানের উদ্দেশ্য কি? ভক্তিবেদান্ত স্বামী, শ্রীল প্রভুপাদ এ বিষয়ে উল্লেখ করেছেন যে, যদি আমরা জড় জ্ঞানের জাগতিক বিভিন্ন পরিবর্তনশীল জ্ঞানের মধ্যে আটকে যাই, তবে আমরা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান সম্পর্কে বিস্মৃত হব। সেই জ্ঞানটি চিন্ময় চেতনার জ্ঞান যেটি সংস্কৃতে আত্মা নামে পরিচিত। আমরা এভাবে জীবনের অনেক সময় নষ্ট করেছি। হ্যাঁ, মানব জাতির জন্য বুদ্ধিমত্তা, শিল্প, সংস্কৃতির প্রয়োজন রয়েছে এবং এভাবে তারা চিন্তাশীল হওয়ার মাধ্যমে পরম প্রকৃত সত্যের উপস্থিতি সম্পর্কে স্বীকার করতে পারে।

জড় স্তরের ঊর্ধ্বে

এই তিনটি স্তরের উর্ধ্বে রয়েছে ভগবৎ উপলব্ধির গভীর স্তর শ্রীভগবদ্‌গীতায় বলা হয়েছে আমাদেরকে অবশ্যই সেই চতুর্থ স্তরে উপনীত হতে হবে, যেটি বিজ্ঞানময় হিসেবে পরিচিত। এই স্তরে উপলব্ধি হয় যে, এই দেহ ও মনের উর্ধ্বে আমাদের চিন্ময় পরিচয় রয়েছে। যখন আমরা চিন্ময় ল্যাবরেটরীতে প্রবেশ করব তখন আত্মা ও পরমাত্মার মধ্যে সম্পর্কের শক্তি সম্পর্কে উপলব্ধি শুরু হয় ।
ভগবৎ উপলব্ধির পঞ্চম স্তরটি হল আনন্দময়। এ স্তরটি সমস্ত অর্জনের মুকুটস্বরুপ : ভগবৎপ্রেম, আত্মা ও পরমাত্মার মধ্যকার সম্পর্ক আস্বাদন করা, যেখানে আত্মা হল পরমাত্মার অংশ। ভগবদ্‌গীতা অনুসারে এই প্রকার সম্পর্ক জীবকে পরম সন্তুষ্টি প্রদান করে। কোন জাগতিক সমন্বয়, গঠন, পুনঃগঠন আপনাকে ও আপনার সমাজকে সন্তুষ্ট করতে পারে না । কারণ পরম সত্য থেকে, ভগবানের কাছ থেকে আমরা বিচ্ছিন্ন হওয়াই আমাদের প্রকৃত সমস্যা। আমরা যখন বলি ‘কৃষ্ণ’, তখন তার মাধ্যমে আমরা ভগবানকে সম্বোধন করি। ‘কৃষ্ণ’ শব্দের প্রকৃত অর্থ হল “সমস্ত আনন্দের পরম উৎস।” ভগবদ্‌গীতা অনুসারে সমস্ত জীব তাঁরই অংশ, তাঁর সন্তান। জড় জগতে আমরা এ সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে জীবনের পরম উদ্দেশ্য সম্পর্কে বিস্তৃত হয়ে পড়েছি কিভাবে এ থেকে প্রকৃতপক্ষে মুক্ত হতে পারব।
নেলসন ম্যান্ডেলা রোবেন দ্বীপে তার ২৭ বছরের কারাগার জীবনের ১৮ বছরই কাটিয়েছিলেন। সেখানে শ্বেতাঙ্গ, কৃষ্ণাঙ্গ সবাই একত্রে থেকে একই মানের খাদ্য গ্রহণ করে। সময়ের সাথে সথে নমনীয়তার মান অনুসারে বন্দীরা A, B, C কিংবা D শ্রেণীর বন্দী হিসেবে পদবি লাভ করেন। এ অবস্থায় আপনি কি করবেন? আপনি কি কারাগারের অবস্থা উন্নতি করার চেষ্টা করবেন? অবশ্য, বন্ধী যদি ভিন্ন শ্রেণীর হয় যেমন রাজনীতিবিদ, বর্ণ বৈষম্যের বিরুদ্ধে যোদ্ধা, ইত্যাদি শ্রেণীবিভাগের সঙ্গে থাকলে কারাগারে আপনার সুযোগ সুবিধাও বেড়ে যাবে। কিন্তু কারাগারের মধ্যে সংগ্রাম করার মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে তারা সংগ্রাম বিহীন জীবনের প্রতিই যত মনোযোগ স্থাপন করে। এ বিষয়টিই বৈদিক শাস্ত্র আমাদেরকে উপদেশ দেয় কিভাবে এই অস্থায়ী জগতে বেঁচে থাকতে হয়; আমরা অস্থায়ী এই জগতে অস্থায়ী জড় শরীরে বন্দী। হ্যাঁ, আমাদের আরামদায়ক জীবন যাপন, মান-মর্যাদার সাথে জীবন-যাপন করা উচিত। কিন্তু আবার এটিও জানা উচিত যে, স্বাধীনতা বা মুক্তি যেন জড় স্তরেই (কারাগারের মধ্যেই) সীমাবদ্ধ না হয়। প্রকৃত মুক্তি নিহিত রয়েছে চিন্ময় বাস্তবতায়। যদি আমরা সেই চিন্ময় চেতনায় উদ্ভাষিত না হই, তবে আমরা সর্বদাই হতাশ থাকব।


“মানুষের সদগুণ হল একটি অগ্নিশিখা যা হয়ত গুপ্ত থাকতে পারে কিন্তু তা কখনো নিভে না।” মানুষের কিরকম সদগুণ রয়েছে? আমাদের অপ্রাকৃত জ্ঞানের প্রয়োজন, যার মাধ্যমে আমরা জানতে পারব যে, এই জ্ঞান জড়পদার্থের ঊর্ধ্বে; তখনই আমরা মানুষের প্রকৃত ক্ষমতা, সদগুণ সম্পর্কে উপলব্ধি করতে পারব।

নেলসন ম্যান্ডেলার আরেকটি উক্তির কথা মনে পড়ে: “মানুষের সদগুণ হল একটি অগ্নিশিখা যা হয়ত গুপ্ত থাকতে পারে কিন্তু তা কখনো নিভে না।” মানুষের কিরকম সদগুণ রয়েছে? আমাদের অপ্রাকৃত জ্ঞানের প্রয়োজন, যার মাধ্যমে আমরা জানতে পারব যে, এই জ্ঞান জড়পদার্থের উর্ধ্বে; তখনই আমরা মানুষের প্রকৃত ক্ষমতা, সদগুণ সম্পর্কে উপলব্ধি করতে পারব। তখন সেই গুপ্ত অগ্নিশিখা সম্পর্কে প্রকৃত উপলব্ধি করতে পারব। কেননা জাগতিক পন্থায় আমরা চিন্ময় প্রকৃতি দর্শন করতে পারি না। যখন তা দর্শন করতে পারব না তখন খুব সহজেই জাগতিক বাসনার দ্বারা পরিচালিত হব ।
মানুষকে পারমার্থিক জ্ঞানে শিক্ষিত হতে হবে। আমি কোন নির্দিষ্ট ধর্মীয় বিশ্বাস সম্পর্কে বলছি না। আপনারা যে ধর্মেই থাকুন না কেন আপনার স্বরূপ কি? আপনি কি জাগতিক না পারমার্থিক? আমি কোন বাস্তবতায় রয়েছি? এই জ্ঞান হল আবশ্যক। যদি জনগণ এই ধরনের জ্ঞান অর্জন করে, তারা আর তখন অস্থায়ী অর্থনৈতিক প্রগতির দ্বারা পরিচালিত হবে না, যেটি তাদেরকে কোনভাবেই সন্তুষ্ট করতে পারে না ।

তিনটি E

এই তিনটি E মানবতার অন্যতম সমস্যা।
Environment (পরিবেশ)
Energy (শক্তি) এবং
Economic (অর্থনীতি)
প্রথম দিকের সমস্যাগুলো সমাধানকে এড়িয়ে চলে। কোন জাগতিক অর্জনই মানুষকে পরম সন্তুষ্টি প্রদান করবে না। মানুষের ক্রমবর্ধমান জাগতিক বাসনা পূরনের জন্য জাগতিক অর্জনগুলো যথেষ্ট নয় ।
আমার অনুরোধটি হল অন্য পথে গমনের বিষয়টি বিবেচনা করুন। দুর্নীতি এবং ত্রুটিপূর্ণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পদ্ধতিসমূহ সংশোধন করা প্রয়োজন । কিন্তু যখন কারাগারের মধ্যে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে যাব, তখন কারাগার থেকেই মুক্ত হওয়ার বিষয়টি বিস্তৃত হওয়া উচিত নয় । যুক্তিটি হল পরমাত্মার সঙ্গে সম্পর্কিত আত্মার মুক্তি। এই জ্ঞানই কৃষ্ণ প্রদান করেন। এই জ্ঞানটিই প্রদান করার জন্য অনেক পূর্বে ভক্তিবেদান্ত স্বামী এখানে এসেছিলেন : পারমার্থিক স্তরে জাতিকে গড়ে তুলুন। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রচেষ্টার মধ্যেও আপনার স্বরূপ যে চিন্ময় আত্মা এবং পরমাত্মার সঙ্গে আপনার সম্পর্ক সম্বন্ধে কখনো বিস্মৃত হবেন না ।
বৈশ্বিক জাগতিক মন্ত্র দ্বারা বশীভূত হবেন না। আমি গত বছর চায়নাতে ছিলাম। সেখানে মনোবিদ শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে ব্যাখ্যা করছিলাম যে, চায়নার একটি মন্ত্র রয়েছে, এই একই মন্ত্র গোটা বিশ্বকে বন্ধী করে রেখেছে: “কাজ কর, ক্রয় কর, ভোগ কর।” এই হল মর্মান্তিক দৃশ্য এবং আমাদের নেতারা জনগণকে এই লক্ষ্য ছাড়া আর অন্য কোন কিছু প্রদান করতে পারে না। এই যদি মানুষের জীবন যাত্রা হয় তবে বর্তমান বিশ্বের সমস্যাগুলোর কোন সমাধান হবে না।
আমি আপনাদের সবার কাছে আবেদন করছি, আপনারা অন্য পন্থাটির কথা বিবেচনা করুন। হ্যাঁ, আপনারা আরামদায়ক জীবন-যাপন, শরীর ও মনের যত্নগ্রহণ নিন, কিন্তু সে সাথে উপলব্ধি করুন যে, এমন সব প্রচেষ্টা নিতান্তই বাহ্য; সেগুলো জীবনের পরম লক্ষ্য নয়। পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন একমাত্র পারমার্থিক স্তরেই সম্ভব।


লেখক পরিচিতি : দেবামৃত স্বামী আমেরিকার নিউইয়র্কে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭২ সালে ইয়েল ইউনিভার্সিটি থেকে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করার পর শ্রীল প্রভুপাদের সেবায় নিয়োজিত হন। তিনি ১৯৮২ সালে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। তিনি অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা ও আমেরিকায় ইসকন গভর্নিং বডি কমিশনের (জিবিসি) একজন নিবেদিত সদস্য।


 

অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০১৭ ব্যাক টু গডহেড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here