সৃষ্টির প্রথম নারীর অস্তিত্ব

0
34

বৈজ্ঞানিক গবেষণায় পৃথিবীর আদি মাতার খোঁজ ।

সদাপূত দাস


বিখ্যাত ও মর্যাদাপূর্ণ জার্নাল ‘নেচার’ এ ১৯৮৭ সালে একটি আর্টিকেল প্রকাশিত হয় যেখানে তিনজন বায়োকেমিস্ট মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ সম্পর্কিত একটি গবেষণা পরিচালনা করেন পাঁচটি মহাদেশের ১৪৭ জন মানুষের উপর। তারা জানান, সকলের মাইটোকন্ড্রিয়াল DNA প্রায় ২ লক্ষ বছর পূর্বে আফ্রিকায় বসবাসকারী কোন এক নারী থেকে উদ্ভূত বলে স্বীকার করা হয়েছে। (Rebecca Cann, Mark shoneking and Allen wilson “Mitochondial DNA and Human Evouhon,” Nature, Vol.325, January 1, 1987)
এই খবরটি চরম উন্মাদনা সৃষ্টি করে। সেই নারীকে বলা হলো আফ্রিকান ইভ (শতরূপা)। নিউজ ইউক ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে এই গবেষণা পত্রটি ছাপানো হয়েছিল। অর্থাৎ সেই আফ্রিকান নারীটি হলেন পৃথিবীর সকল মানুষের আদি মাতা। যদিও গবেষণায় অধিকাংশ মানুষের আদি মাতা হিসেবে সেই আফ্রিকান ইভ জড়িত কিন্তু কিছু কিছু মানুষের সাথে ডি.এন.এ এর সাথে সেই আদি মাতার সম্বন্ধ পাওয়া যায় নি। বিবর্তনবাদ এর শিক্ষার্থীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল এশিয়ান প্রাচীন মানব । গবেষণা অনুসারে Homo erectos গোত্রীয় প্রাচীন মানব আমাদের পূর্ব পুরুষের অন্তর্গত নয়। এইপ ম্যানরা বংশ ধারায় পৃথিবীর প্রথম নারী ইভ থেকে আসেনি। যদিও পূর্বে তা মনে করা হতো, কেননা ape men গণ ২ লক্ষ বছর পূর্বে এশিয়ায় বসবাস করতো। মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ (mtDNA) (এর ব্যাখ্যা ১৩ পৃষ্ঠায় দেখুন) মানুষের কোষের শক্তি উৎপাদক অংশসমূহ থেকে বংশ পরম্পরার তথ্য তথ্য জেনেটিক তথ্য বহন করে। এই জেনেটিক তথ্যসমূহ পিতার সাহায্য ব্যতীত মাতা থেকে তার সন্তানদের মধ্যে বয়ে চলে । তার অর্থ হলো mtDNA এমন একটি বংশ পরম্পরার বহু শাখা বিশিষ্ট বৃক্ষ যা সম্পর্কে জানা দুরুহ।
উপরোক্ত গবেষণা কর্মে ১৪৭ জন মানুষের (যারা পৃথিবীর জনসংখ্যার প্রতিনিধিত্ব করে) তথ্য সমূহকে কম্পিউটারে বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, মানুষের বংশানুক্রমিক ধারা দু’টি উপশাখায় গঠিত। তার মধ্যে শুধুমাত্র আফ্রিকানরা একটি শাখা থেকে উদ্ভূত। পৃথিবীর বাকি অংশের মানুষ এমনকি কিছু কিছু আফ্রিকানও অন্য আরেকটি শাখা থেকে উদ্ভূত হয়েছে। সুতরাং সকলেরই আদি মাতা হিসেবে একজন আফ্রিকান নারীর খোঁজ মেলে। ১৯৯১ সালে mtDNA অনুক্রমের ওপর আরেকটি গবেষণা চালানো হয় ১৮৯ জন মানুষের ওপর এবং পরিশেষে গবেষণায় প্রমাণিত হয়, ইভ হলেন আমাদের ১০ হাজার পূর্ব বংশীয় ঠাকুর দিদি।

আফ্রিকান ইভ তত্ত্বের পতন

দুর্ভাগ্যবশত গবেষণায় পৃথিবীতে ইভ তত্ত্বের পতন হয়েছিল খুব অল্প সময়ে। ১৯৯২ সালে ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রজনন বিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ অ্যালেন টেম্পেলটেন সায়েন্স জার্নালে বলেন, “মানব বংশানুক্রমিক ধারার বৃক্ষের শাখা প্রকৃতপক্ষে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী আফ্রিকায় নয়। (Sharon Begley, Eve Takes Another Fall” Newsweek, 3/1/92) সুতরাং আফ্রিকান ইভ এর মতবাদটি কম্পিউটার বিশ্লেষণের ত্রুটি বলেই মনে হয়।
mtDNA এর অনুক্রম থেকে তৈরিকৃত ও অঙ্কিত বংশানুক্রমিক বৃক্ষটি বলা হয় কৃপণ তত্ত্ব। নিচের চিত্রটি দিয়ে আমরা তা ব্যাখ্যা করতে পারি।
চিত্রটি উপস্থাপনের জন্য আমি mtDNA এর চারটি বর্ণের অনুক্রম তৈরি করেছি। ১ নং চিত্রে abcd দিয়ে শুরু হয়েছে যেটি হল আদি পিতা মাতা, তারপর কিছুটা পরিবর্তন ও মিথস্ক্রিয়া করে আমি বংশধর প্রদান করেছি যা হল avcd এবং abud। আবার avcd থেকে একটি মাত্র পরিবর্তনের মাধ্যমে আমি দুইজন বংশধর পেয়েছি যারা হল aven এবং rved । ধরে নিই আমাদের দেওয়া অনুক্রমগুলো হল aven, rved এবং abud। এবার যদি আমাদের বলা হয় যে, উপরোক্ত তথ্য থেকে পূর্বপুরুষ অনুমান করুন। তাহলে আপনারা কিভাবে তা বের করবেন? mtDNA গবেষকগণ যে মতবাদ দিচ্ছেন তা হল, তাদের পূর্বপুরুষ এবং বংশধরেরা অনেক ক্ষেত্রে সদৃশ হবে। কিন্তু সদৃশ্যতা পরিমাপ করার একটি পদ্ধতি হল পূর্বপুরুষ এবং বর্তমান বংশধর পর্যন্ত কতবার পরিবর্তন হয়েছে তার সংখ্যা বের করা। যে সমস্ত বৃক্ষের শাখার কম সংখ্যক পরিবর্তন রয়েছে তাদের সাদৃশ্যতা বেশি। যেমন-১নং বৃক্ষের রয়েছে ৪টি পরিবর্তন।
৩নং বৃক্ষের রয়েছে ৮টি পরিবর্তন। তাহলে বিজ্ঞানীরা বলতে পারেন যে, ১নং বৃক্ষটি প্রকৃত পূর্বপুরুষের উৎপত্তিগত বৃক্ষ । এটি সম্ভাবনাময় কিন্তু যদি ১নং বৃক্ষকে আদি বলে ধরা হয় তবে অবশ্যই ২নং বৃক্ষে কমপক্ষে ৫টি পরিবর্তন থাকতে হবে। কিন্তু ২নং বৃক্ষটি একটি ভিন্ন প্যাটার্ন প্রদর্শন করছে। এই ধরনের বৃক্ষ সদৃশ পদ্ধতির একটি অসুবিধা হল এখানে লক্ষ লক্ষ শাখা উপশাখার প্রয়োজন হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই ধরনের গবেষণা পরিচালনা করার জন্য একটি মেইনফ্রেম কম্পিউটারের মাসখানেক সময় লেগে যায়। টেম্পলটেনের মতে যে কম্পিউটার গবেষণায় আফ্রিকান ইভকে আদি বলে ধরা হয়েছে সেই গবেষণায় মূলত কিছু গুরুত্বপূর্ণ শাখা উপশাখা বাদ দেওয়া হয়েছে। যখন একই বিষয়ে আরো ব্যাপক গবেষণা করা হয় তখন দেখা যায় যে, সেই বৃক্ষের আদি শাখাটি আফ্রিকায় নয় বরং ইন্দো এশিয়ার দিকে নির্দেশ করছে।
বিবর্তনবাদের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়টি হলো যদি ভিন্ন প্রাণীর অঙ্গপ্রত্যঙ্গে সাদৃশ্যতা থাকে তবে তারা সমগোত্রিয় এবং তাদের বিবর্তন হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু যেহেতু আমাদের জানা মানব ইতিহাসের দৈর্ঘ্য এতটাই ছোট যে, এই বিষয়ে পরিপূর্ণ ও সঠিক কোন তথ্য দেওয়া সম্ভব নয়, তাই বিবর্তনবাদীরা ফসিল গবেষণায় পাওয়া সীমিত তথ্য দিয়ে তার সাদৃশ্যতা ও বৈসাদৃশ্যতা বিচারে একটি বিবর্তন তত্ত্ব প্রদান করেছেন ।
যেমন মানুষ আর বনমানুষের রয়েছে একই পূর্বপুরুষ কারণ তাদের সাদৃশ্যতা রয়েছে। ১৯ শতকের শেষের দিকে বিখ্যাত শরীরস্থানবিদ থমাস হাঙ্কলি এবং রিচার্ড ওয়েনের মধ্যে দ্বন্দ দেখা দেয় মানব ও উল্লুক তথা বনমানুষের একই পূর্বপুরুষ বিষয়ে, বিশেষত তারা স্বগোত্রিয় কিনা। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা নয় কেননা মানব মস্তিষ্কের সাথে বিশেষত মস্তিষ্কের হিপ্পোক্যাম্পাস অংশটির সাথে বনমানুষের মস্তিষ্কের কোন মিল নেই। যদিও থমাস হাঙ্কলি চাতুর্যপূর্ণভাবে দেখান যে বনমানুষে মানব মস্তিষ্কের সেই অংশটি রয়েছে। এভাবে তিনি বিতর্কে জয় লাভ করেন এবং সকলে সেই তথ্য গ্রহণ করে। কিন্তু বিতর্কে জয় লাভ করার পর তিনি তার স্ত্রীকে এক পত্রে লিখেন, – “পরবর্তী শুক্রবারের সন্ধ্যার মধ্যেই তারা সকলেই (the British Association of Science) বুঝতে পারবে যে তারা সকলেই এক একটা বানর।”

(সূত্র: Wendt, 1972, p. 71)

মানুষ ও বন মানুষের মধ্যে সাদৃশ্য

অবশ্যই মানুষ এবং বনমানুষ (ape) এর মধ্যে সাদৃশ্য রয়েছে। তাই যদি তাদের দুজনেরই পূর্ব পুরুষদের মধ্যে সাদৃশ্য না থেকে তবে তাদের নিজেদের মধ্যে কিভাবে সাদৃশ্য থাকতে পারে? বাইবেলে মানব উৎপত্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, ভগবান মানুষ এবং বনমানুষকে ভিন্নতর স্থিতির ওপর বিচার করে সৃষ্টি করেছেন। তাই তারা ভিন্ন গোত্রিয় । কিন্তু বনমানুষের বিবর্তনের মাধ্যমে মানব উৎপত্তি ঘটেনি। অনেক বিজ্ঞানীদের মতে এই বিষয়টি সম্পূর্ণ অসন্তোষজনক। প্রজণন বিজ্ঞানী ফ্রান্সিসকো অ্যাইলা বলেছেন, “সৃষ্টিতত্ত্ববিদগণ ভগবানকে প্রবঞ্চক বলে দোষারোপ করছে এবং যে সমস্ত বিষয়ে সাদৃশ্যতা নেই বিজ্ঞানীরা সেখানে সাদৃশ্যতা ব্যক্ত করছেন। এটি ঈশ্বর নিন্দা।”

(joel Davis, Blow to Creation
Myth, Omni, August, 1980)

অন্য কথায় ভগবান কেন আমাদের মিথ্যা কোন তথ্য প্রদান করবেন যার সাথে আমাদের মানব ইতিহাসের কোন সম্বন্ধ নেই? ফ্রান্সিসকো আইলার মন্তব্য থেকে প্রাপ্ত তথ্য স্তন্যপায়ী প্রাণীদের পায়ের সাথে তুলনীয়। সকল প্রকার স্তন্যপায়ী প্রাণী যারা সমতলে বসবাস করে সকলের পায়ের হাড় সমগোত্রীয়।প্রজাপতিগণ থেকে শুরু করে বংশ পরম্পরা ধারায় সঙ্গমের মাধ্যমে জীবের আবির্ভাব সনাতন সময় থেকে এখনো বিদ্যমান রয়েছে। ডারউইনের বিবর্তনবাদ অনুসারে বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভব হয়েছে মিথস্ক্রিয়া ও প্রাকৃতিক নির্বাচন অনুসারে যেখানে নেই কোনো বুদ্ধিমান পরিচালক কিন্তু ভাগবত অনুসারে সৃষ্টি তত্ত্ব পরিচালিত হচ্ছে একক ঈশ্বরের অধ্যক্ষতায়।
সুতরাং স্তন্যপায়ীদের উরুর হাড়, জঙ্ঘাস্থি সমূহের মধ্যে সাদৃশ্যতা রয়েছে। যেহেতু বর্তমান জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অনেক সমৃদ্ধ তাই একজন জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ার হয়তো এমন একটি প্রাণী সৃষ্টি করতে চাচ্ছেন যার পা হবে একটি সুনির্দিষ্ট পরিবেশের অনুকূল। কিন্তু তিনি কি স্বাভাবিক স্তন্যপায়ী প্রাণীর পায়ের হাড়ের পরিবর্তনের মাধ্যমে অন্যকোন স্তন্যপায়ী প্রাণীর প্রজাতি সৃষ্টি করতে পারবেন? তাই যদি সম্ভব হয় তাহলে শুধুমাত্র সামান্য পরিবর্তন নয়, তিনি চাইলে স্তন্যপায়ী প্রাণীর একটি নতুন হাড়ের সেট তৈরি করতে পারেন। তাহলে যদি একজন মানুষ পারে তবে কেন ভগবান নয়? তিনি অবশ্যই কাছাকাছি গোত্রিয় কিন্তু ভিন্নতর প্রজাতি একই সময়ে সৃষ্টি করতে পারেন। সেই জন্য ভগবানকে বিবর্তনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে না।
বৈদিক সাহিত্যে বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভব ও বিকাশ এসেছে স্বজাতীয় জীবিত প্রাণী থেকে । শ্রীমদ্ভাগবত মতে প্রাণীদের বংশ পরম্পরা আদি থেকে সামান্য পরিবর্তন ছাড়া সুনির্ধারিতভাবে চলে আসছে। সকল প্রজাতি তাদের পূর্ব পুরুষ ও পরবর্তী বংশধরের সাথে সম্বন্ধযুক্ত। পূর্বপুরুষ থেকে আমরা বিভিন্ন গঠনাকৃতির সাদৃশ্যতা লাভ করি। তাই ভাগবতের তত্ত্ব অনুসারে যেকোনো প্রজাতির সাদৃশ্যতা কিংবা বৈসাদৃশ্য বিবর্তন তথ্য দ্বারা তুলনাযোগ্য ।
নব্য ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্ব অনুসারে পূর্ববর্তী প্রজাতি থেকে জটিলতর উপায়ে পরিবর্তিতভাবে নতুন প্রজাতির বিকাশ হয় এবং প্রতিনিয়ত বিবর্তনের মাধ্যমে পরিবর্তিত হচ্ছে। কিন্তু শ্রীমদ্ভাগবত তত্ত্ব মতে ব্রহ্মা, সৃষ্টির আদি জীব হলেন একজন অতিমানব। ব্রহ্মা সৃষ্টির শুরুতে প্রজাপতি (মনুষ্য সদৃশ জীব) নামক জীবের সৃষ্টি করেন। পরবর্তীতে প্রজাপতি অন্যান্য নিম্নবর্ণের জীবসমূহ সৃষ্টি করেন যাদের মধ্যে বৃক্ষ, পশু-পাখি, মানুষ ইত্যাদি। প্রজাপতিগণ থেকে শুরু করে বংশ পরম্পরা ধারায় সঙ্গমের মাধ্যমে জীবের আবির্ভাব সনাতন সময় থেকে এখনো বিদ্যমান রয়েছে। ডারউইনের বিবর্তনবাদ অনুসারে বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভব হয়েছে মিথস্ক্রিয়া ও প্রাকৃতিক নির্বাচন অনুসারে যেখানে নেই কোনো বুদ্ধিমান পরিচালক । কিন্তু ভাগবত অনুসারে সৃষ্টি তত্ত্ব পরিচালিত হচ্ছে একক ঈশ্বরের অধ্যক্ষতায়।

বুদ্ধিমান স্থপতি

উপরোক্ত বিষয়সমূহ আমাদের মাঝে মানব উৎপত্তির বিভিন্ন ধারা ও সংযোগ সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রশ্নের অবতারণা ঘটায়। প্রথমটি হলো যদি একজন জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ার একটি বিশেষ নকশায় বিশেষ কার্য সম্পাদনে সক্ষম প্রাণী তৈরি করতে চায় তাহলে তিনি একটি বিশেষ নকশা তৈরি করতে পারেন। কিন্তু তিনি যদি একটি বিশাল বাস্তুসংস্থানের সমস্ত জীবের উৎপত্তি ঘটাতে চান তখন তাকে একটি বিশেষ পরিকল্পনার মাধ্যমে ভিন্নতর জীবসত্তা সরবরাহ করতে হবে। সেই স্বাভাবিক পরিকল্পনাটি হতে পারে বিভিন্ন স্তন্যপায়ী প্রাণী সরবরাহ যেমন পাখি, মৎস্য ইত্যাদি । এসকল পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার জন্য তিনি একটি বৃক্ষের নকশা করতে পারেন যেখানের শাখা-প্রশাখাগুলো হবে সাদৃশ্য কিংবা বৈসাদৃশ্যপূর্ণ প্ৰাণীগণ ।
এই পরিকল্পনার মাধ্যমে আমরা বিবর্তনবাদ তত্ত্বের একটি অসুবিধা দূর করতে পারি। বিশেষত বিবর্তনবাদের মিথস্ক্রিয়া ও প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্ব দ্বারা প্রমানিত হবে না এমন জটিল কিছু জীবন্ত সত্ত্বা (জীব) রয়েছে এবং এগুলো বিবর্তনবাদীদের জন্য বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি করছে। এমনকি বহু ক্ষেত্রে বিবর্তনবাদীরা দুটি ভিন্নতর প্রজাতির মধ্যকার অন্তসম্পর্ক খুঁজে পেতে ব্যর্থ হন। এসকল সমস্যা নিরসনের একটি যথাযথ তত্ত্ব হচ্ছে একজন বুদ্ধিমান স্থপতি বা নকশাকারের ইচ্ছানুসারে সকল প্রজাতির উদ্ভব ও বিকাশের তত্ত্ব মেনে নেওয়া ।
এই বিষয়টি ব্যাখ্যা করার জন্য আমরা একটি কম্পিউটার প্রোগ্রাম তৈরির সমস্যার কথা উদাহরণ হিসেবে আনতে পারি। অনেক সময় একজন প্রোগ্রামার পুরাতন কোন কোডকে সামান্য পরিবর্তন করে নতুন প্রোগ্রাম তৈরি করেন। এর কিছুদিন পর তিনি সেই প্রোগ্রামের একটি ক্রমিক বৃক্ষ সদৃশ ধারা কিংবা বিভিন্ন ভার্সন তৈরি করেন। কিন্তু একটি ভার্সনের প্রোগ্রাম থেকে অন্য আরেকটি ভার্সনে পরিবর্তন করতে গেলে তা এক বিশাল পরিবর্তন দেখা দেয়। এটি সেরকম নয় যে, কোনো একটি প্রোগ্রামে মিথস্ক্রিয়া করলেই আমরা সহজভাবে নতুন কোনো প্রোগ্রাম লাভ করব।
সুনির্দিষ্ট বিষয়টি হলো একজন মানব ইঞ্জিনিয়ারের নকশাকৃতির রয়েছে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা কিন্তু ভগবানের শক্তি অসীম এবং তার কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই। শ্রীমদ্ভাগবতে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে একজন সর্বশ্রেষ্ঠ নকশাকার রূপে আখ্যায়িত করা হয়েছে। শ্রীমদ্ভাগবত (২/১/৩৬) মতে- “বিভিন্ন প্রকার পাখীরা তাঁর (ভগবান শ্রীকৃষ্ণ) বিচিত্র শিল্প নৈপুণ্য । মানবজাতির পিতা মনু তাঁর বিচারবুদ্ধির প্রকাশ এবং মানবজাতি তাঁর আবাসস্থল। গন্ধর্ব, বিদ্যাধর, চারণ, অল্পরা আদি উচ্চতর লোক নিবাসী মানুষেরা তাঁর সঙ্গীতাত্মক স্বরলহরী এবং আসুরিক সৈনিকেরা তাঁর শক্তি।”

সূক্ষ্ম শক্তি

আমরা আমাদের সর্বশেষ বিষয়ে উপনীত হয়েছি। সমস্ত জীবসত্ত্বা ব্রহ্মা থেকে উদ্ভূত হয়ে বংশ পরম্পরায় পৃথিবীসহ নানা গ্রহে বসবাস করছে যা আমাদের অনেকের অজানা। ব্রহ্মাসহ উচ্চতর প্রজাতিগণের দেহসমূহ সূক্ষ্ম শক্তি দ্বারা সৃষ্টিকৃত । এ ধরনের শক্তির অস্তিত্ব আধুনিক পদার্থ বিদ্যার কাছে কল্পনাতীত। গন্ধর্ব ও বিদ্যাধরগণ হলেন সূক্ষ্ম শক্তি দ্বারা সৃষ্ট জীবের উদাহরণ।
আধুনিক পদার্থ বিদ্যা এবং বৈদিক মতে আমাদের জীবসমূহ স্থুল শক্তি উপাদান দ্বারা গঠিত। মানুষ, পশুপাখি এবং বৃক্ষরাজি সকলের দেহ বিভিন্ন জড় পদার্থ দিয়ে তৈরি তারা যদি সূক্ষ্মদেহ সম্পন্ন জীবসমূহ থেকে বংশ পরম্পরায় এসে থাকে তবে নিশ্চয় সেই পদ্ধতিতে একটি শক্তি রূপান্তরের ধারা বিদ্যমান। ভাগবত মতে সেই প্রকারের ধারার বাস্তবিক অস্তিত্ব রয়েছে। জীব সমূহের উৎপত্তির জানার জন্য শ্রীমদ্ভাগবত আধুনিক বিজ্ঞানীদের সম্মুখে দুটি গবেষণার বিষয় তথা ভবিষ্যদ্বাণী প্রদান করছে। প্রথমত সূক্ষ্ম দেহধারী জীবেরা হলো স্কুল দেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সমৃদ্ধ জীবের অগ্রদূত। দ্বিতীয়ত সূক্ষ্ম দেহ থেকে স্থুল দেহ সৃষ্টি করার জন্য একটি পদ্ধতি রয়েছে।
এখন আমাদের জানার বিষয় হল উপরোক্ত দুটি বিষয়ের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ উপস্থাপন করতে আধুনিক বিজ্ঞানের কত সময় লাগতে পারে? ভষিষ্যতই বলবে সেই কথা।

লেখক পরিচিতি : সদাপুত দাস তথা রিচার্ড, এল. থম্পসন বিখ্যাত করনেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিত বিষয়ে পি.এইচ.ডি ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি বৈদিক সৃষ্টিতত্ত্বের ওপর গবেষণায় সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখেন। এ বিষয়ে তাঁর অনেক বিখ্যাত গ্রন্থ রয়েছে, যা সারা বিশ্বে খ্যাতি লাভ করে। তিনি ভক্তিবেদান্ত ইনস্টিটিউটের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য।


 

জানুয়ারী-মার্চ  ২০১৮ ব্যাক টু গডহেড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here