সামাজিক উন্নতির মূলে ভগবানের প্রসন্নতা

0
36

কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ
প্রতিষ্ঠাতা আচার্য: আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইস্‌কন)
১৭ জুলাই ১৯৭২, ইংল্যান্ডের এডিনবরা শহরের ইস্‌কন মন্দিরে কথোপকথন


শ্রীকৃষ্ণ আমাদের সব চাইতে অন্তরঙ্গ প্রভু, সখা, পিতা, পুত্র ও প্রেমিক। শ্রীকৃষ্ণকে ভুলে যাওয়ার ফলে আমরা প্রশ্ন এবং উত্তরের কত বিষয় উদ্ভাবন করেছি, কিন্তু তার একটিও আমাদের পূর্ণ প্রসন্নতা প্রদান করতে পারে না।
শ্রীকৃষ্ণ ব্যতীত সব কিছুই কেবল ক্ষণিকের আনন্দ। তাই আমরা যদি পূর্ণরূপে পরিতৃপ্ত হতে চাই, তবে শ্রীকৃষ্ণ সম্বন্ধে জানতে হবে।
শ্রীকৃষ্ণ-বিষয়ক জ্ঞানের মাধ্যমে আমরা সর্বোচ্চ আনন্দ পেতে পারি। শ্রীমদ্ভাগবতের আলোকে সমস্ত সামাজিক, রাজনৈতিক অথবা ধর্ম-বিষয়ক সমস্যার সমাধান করাই মানুষের কর্তব্য।
“কিভাবে কৃষ্ণভাবনামৃত অনুশীলনের মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি সাধন সম্ভব? কে উত্তর দেবে?
প্রদ্যুম্ন প্রভু: যদি দেশ প্রধান, সেনাবাহিনী প্রধান, আর স্কুলপাঠ্য গ্রন্থ লেখকরা এবং যাঁরা বিচার-কার্য সমাধা করেন, তারা যদি ভগবদ্ভক্ত হন, তা হলে তাঁরা এমন একটি সরকার গড়তে পারেন, যাতে প্রকৃত জনকল্যাণ কি, তা জনগণকে বোঝানো যাবে।
প্রভুপাদ: হুঁম্; প্রকৃত জনকল্যাণ জিনিসটা কি
প্রদ্যুম্ন প্রভু: জীবনের এমন একটি লক্ষ্য যার দ্বারা দেশের সমস্ত কিছু ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেবাতেই লাগানো যাবে। সরকার যদি তাই করে তবে সেটি কৃষ্ণভাবনাময় সরকার হবে।
প্রভুপাদ: তা হলে, সেটাই ঠিক?
রেবতীনন্দন প্রভু: তা ছাড়া, যদি নেতারাও কৃষ্ণভাবনাময় হন, তবে তাঁরা দুর্নীতির প্রকোপ বন্ধ করতে পারেন, যে দুর্নীতির ফলে মানুষ ভগবদ্‌বিমুখ হয়ে পড়েছে। আর, কৃষ্ণভাবনাময় ভগবদ্ভক্ত নেতারা কসাইখানাগুলিও বন্ধ করে দিতে পারেন।
প্রদ্যুম্ন প্রভু: কৃষ্ণভাবনাময় সমাজের ভবিষ্যৎ পরিবেশে আর রাজনৈতিক ছলচাতুরি থাকবে না, কারণ সমাজনেতারা তখন জ্ঞানবৃদ্ধ ঋষিতুল্য পণ্ডিত এবং ব্রাহ্মণ তথা ভক্তদের কাছ থেকেই দেশনীতি পরিচালনার জন্য সর্বপ্রকার পরামর্শ গ্রহণ করতে আগ্রহী হয়ে উঠবেন। তখন আর নোংরা রাজনীতি থাকবে না এবং শাস্ত্রীয় অনুশাসনাদি উপলব্ধির দিন ফিরে আসবে।
প্রভুপাদ: এটা হলে রাজনৈতিক উন্নতি ও সামাজিক উন্নতির কি হবে?
রেবতীনন্দন প্রভু: সামাজিক উন্নতি এই হবে যে, ভাল নেতৃত্বের অধীনে জনগণ কৃষ্ণভাবনাময় হয়ে উঠলে, তখন তারা সরল জীবন যাপনে সন্তুষ্ট হতে শিখবে। তখন তাদের জীবনধারা সহজ সরল হয়ে উঠবে, প্রত্যেকে সুখী হবে।
প্রভুপাদ: মূল নীতিটি হল যেনাত্মা সুপ্রসীদতি। সামাজিক উন্নতির মূল কথা। যৎকৃতঃ কৃষ্ণসংপ্রশ্নো যেনাত্মা সুপ্রসীদতি। আজ প্রত্যেক গৃহস্থ… প্রত্যেকটি মানুষ অসন্তুষ্ট। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে, পিতা-পুত্রের মধ্যে সুখের সম্পর্ক নেই। অবশ্য একসাথেই আমরা বাস করছি। কিন্তু প্রত্যেকে ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করে চলেছে। পাশ্চাত্য দেশগুলিতে তো কারও সাথে কারও মতের মিল নেই। প্রত্যেকেই নিজের অভিমতে চলে। তাই পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যদি সকল জনগণের ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু হন-তবেই সমাজে স্থিতিশীলতা আসবে। কিন্তু বাস্তবিকই, যদি আমরা শ্রীকৃষ্ণের সেবায় যথাযথ গুরুত্ব আরোপ করি, তা হলে দ্বিমত কিছুই থাকবে না। একটি মাত্র মত থাকবে কিভাবে পরম পিতা পরমেশ্বর ভগবানের সেবা সাধন করতে পারি।
তাই, পারিবারিক জীবনে যদি আমরা এই অর্চা-বিগ্রহ-সেবা প্রবর্তন করতে পারি, তা হলে খুব উপকার হবে। প্রত্যেক পরিবারেই শ্রীশ্রীরাধা-কৃষ্ণের শ্রীবিগ্রহ, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর চিত্রপট রাখা যেতে পারে এবং আমরা যেমন প্রত্যেক কৃষ্ণভাবনামৃত কেন্দ্রে অর্চনা করে থাকি, তেমনি সকলেই তা করতে পারেন। তাতে সমস্ত সামাজিক সমস্যা মিটে যাবে।
লন্ডনে টন টন টমেটো সেদিন সমুদ্রের জলে ফেলে দিল। ওটাই আমাদের আধুনিক সভ্যতার এক সমস্যা। ভগবান যথেষ্ট জিনিস আমাদের আহার্যের জন্য দিয়েছেন। কিন্তু যেহেতু সেদিন কর্মীরা ধর্মঘট করল, তাই কল-কারখানা বন্ধ রইল, ফলে বহু জিনিসের অপচয় হলো ফেলে দিতে হলো। তাই মানুষ যদি কৃষ্ণভাবনাময় হয়, তা হলে ধর্মঘট হবে কেমন করে? ধর্মঘট মানে হল-ওরা আরও আরও টাকা চায়।


প্রত্যেকেই রেষারেষি করছে। ভগবানের ওপর বিশ্বাসের অভাবেই ভগবদবিমুখ সভ্যতায় এমনি অনাবশ্যক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু মানুষ যদি মনে প্রাণে ভগবদমুখী হয়, সে সুখী হবেই। যেনাত্মা সুপ্রসীদতি। ভগবদ্ভক্তির এই মূল নীতি অনুসরণের মাধ্যমেই মানুষ সুখী হবে।


তার কোনই শেষ নেই আমি যখন আমেরিকায় প্রথম যাই তখন নিউইয়র্কে পরিবহন ধর্মঘট চলছিল। লোকেদের খুব কষ্ট হচ্ছিল। কৃষ্ণভাবনামৃতের আস্বাদন না পেলে মানুষের ইন্দ্রিয় পরিতৃপ্তির কোন সীমা থাকে না। কেউ জানে না, কিন্তু কৃষ্ণভাবনাময় ভক্ত জানে কিভাবে অল্পে সন্তুষ্ট থাকা যায়। ভারতের মানুষ গরীব হলেও অল্পে সন্তুষ্ট হতে জানে। তারা ভাবে, “কৃষ্ণ আমাকে এইটুকু দিয়েছেন। এতেই খুশি থাকতে হবে। যা দিয়েছেন কৃষ্ণ, এই যথেষ্ট। কেন আমি বেশি চাইব?”
ভারতে বৈদিক শাস্ত্রাদির মধ্যে সেই নির্দেশই দেওয়া আছে যে,

তসৈব হেতোঃ প্ৰয়তেত কোবিদো
ন লভ্যতে যন্ত্রমতামুপর্যধঃ। (ভা-১/৫/১৮)

অর্থাৎ, আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতির জন্য আমাদের জীবনের মূল্যবান সময় ব্যয় করা অনুচিত। এই অবস্থাটি তো নির্ধারিত হয়েই আছে।
তাই, কৃষ্ণভাবনামৃত অনুশীলনকারী জানেন, পরম করুণাময় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আমাদের জন্য যা করেছেন, যা কিছু করবেন, তাই যথেষ্ট।
আমাদের মূল্যবান এই মনুষ্য-জীবনটির সদ্ব্যবহারের জন্য আমরা শুধু জীবনভর হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র জপ করে কাটাই।
লোকে অবশ্য তাতে রাজী হবে না। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, কেউ যদি মনের শান্তি চায়, যেনাত্মা সুপ্রসীদতি, তা হলে এই জীবনধারা গ্রহণ করাই সমীচিন । এটা বাস্তব সম্মত পন্থাও বটে ।
অনেক সাধুসজ্জন ঋষিতুল্য মানুষ আছেন। তাঁরা কোথাও ঘুরতে চেষ্টা করেন না, কোথায় টাকা রোজগারে যাবেন, কিংবা কি খাবেন কিছু ভাবেন না। তাঁরা কৃষ্ণভাবনাতেই নিয়ত মগ্ন থাকেন । “ভগবান শ্রীকৃষ্ণ করুণা করে যদি কিছু আহার পাঠান তো খাব। না হলে, কিছু যায় আসে না। উপবাসে থাকব।” এমনই তাঁদের দৃঢ় ভগবৎ বিশ্বাস ।
এটা তাঁদের কঠোর মনোবল। কোথাও তাঁরা যান না, পরমেশ্বর ভগবান পরম পিতা শ্রীকৃষ্ণই তাঁদের জন্য সব কিছু পাঠিয়ে দেন। ঠিক যেমন ছিলেন বিল্বমঙ্গল ঠাকুর। তিনি কোথাও যেতেন না। তিনি থাকতেন বৃন্দাবনে। পরম করুণাময় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং আসতেন তাঁকে দুধ খাওয়াতে। বিল্বমঙ্গল ঠাকুর অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন; তিনি চোখে দেখতে পেতেন না। তাই শ্রীকৃষ্ণ একটি ছোট ছেলের মতো তাঁর কাছে আসতেন “বিল্বমঙ্গল, আমার মনে হয় তোমার ক্ষিধে পেয়েছে। খানিকটা দুধ খাও তুমি”। বিল্বমঙ্গলের মন তাতে খুব খুশি হত। পরের দিনেও ছেলেটি আসে। ঠাকুরের তখন
উপলব্ধি হয়, “কে এই ছেলেটি? আমি চোখে দেখি না। রোজ এসে এসে সে দুধ দিয়ে যায়।” যোগক্ষেমং বহাম্যহম। গীতা (৯/২২) রাজগুহ্যযোগ অধ্যায়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ প্রতিশ্রুতি দিয়ে এই কথা বলেছেন, “অনন্যচিত্তে আমার চিন্তায় মগ্ন হয়ে যাঁরা আমার উপাসনা করেন, আমি তাঁদের সমস্ত অভাব পূরণ করি এবং তাঁদের প্রাপ্ত বস্তুর সংরক্ষণ করি।” একো বহূনাং যো বিদধাতি কামান্ ॥ সেই একটি মাত্র পরম পুরুষ সমস্ত জীবের সব রকম প্রয়োজন মেটাচ্ছেন। তিনি হলেন ভগবান। ভগবান ভিখারি নন। ভগবান প্রত্যেকের অভাব বাস্তবিকই পূরণ করেন।
মানুষ অসুখী হয়ে আছে অর্থনৈতিক সমস্যায়, কারণ ভগবানে তেমন ভরসা তাদের নেই। প্রত্যেকেই রেষারেষি করছে। ভগবানের ওপর বিশ্বাসের অভাবেই ভগবদ্‌বিমুখ সভ্যতায় এমনি অনাবশ্যক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু মানুষ যদি মনে-প্রাণে ভগবমুখী হয়, সে সুখী হবেই। যেনাত্মা সুপ্রসীদতি । ভগবদ্ভক্তির এই মূল নীতি অনুসরণের মাধ্যমেই মানুষ সুখী হবে।


 

জানুয়ারী-মার্চ ২০১৭ ব্যাক টু গডহেড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here