সহনশীলতা

0
98

পরিস্থিতি বাধ্য করে অসহিষ্ণু হতে? কিন্তু ভগবদ্ভক্তদের একটি অন্যতম গুণ হল সহনশীলতা তাদের শিক্ষা ও দৃষ্টান্তের মাধ্যমে আমরা এ গুণটি অর্জন করতে পারি।

শ্রীমৎ রাধানাথ স্বামী

শ্রীমদ্ভাগবতে আমরা দেখতে পাই যে বৈষ্ণবের সকল গুণাবলি বিদুরের মধ্যে থাকার ফলে তিনি শ্রীকৃষ্ণের অত্যন্ত প্রিয় হয়ে উঠেছিলেন এবং ভগবান স্বয়ং দুর্যোধনের রাজকীয় অভ্যর্থনা ও মহাভোজের থেকে বিদুরের কাছ থেকে একটি সাধারণ কলা গ্রহণকে অধিক গুরুত্ব দিতেন। ভাগবতে আমরা এও প্রাপ্ত হই যে সকলের প্রতি, এমনকি তাঁকে যারা ঘৃণা করত, তাদের প্রতিও বিদুর কতটা শুভাকাঙ্খী বন্ধু ও সেবক স্বরূপ ছিলেন।
লীলা পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণ গ্রন্থটিতে শ্রীল প্রভুপাদ লিখেছেন, “প্ররোচনামূলক অবস্থার মধ্যে সহ্য করার সমর্থতার দ্বারাই কারও মহত্ত্ব নির্ণীত হয়।” এবং শ্রীমদ্ভাগবতের কোনো একটি শ্লোকের ওপর প্রবচন প্রদানকালে শ্রীল প্রভুপাদ বর্ণনা করেছেন যে, কেন এই জড় জগত এতটা দুঃখ দুর্দশাপূর্ণ কেননা যারাই এই জগতে আগমন করে তারা প্রত্যেকে ঈর্ষাপরায়ণ: প্রত্যেকেই যে কারো প্রতি সুপ্তভাবে হলেও ঈর্ষাপরায়ণ। কেন মানুষেরা ঈর্ষাপরায়ণ সে কথা ব্যাখ্যা করে শ্রীল প্রভুপাদ বলেছেন, যেহেতু আমরা ভগবান হতে চাই, মালিক, নিয়ন্তা এবং ভোক্তা হতে চাই, তাই আমাদের সেই লক্ষ্যে পৌছানোর জন্য যে কারও সঙ্গে এক সুপ্ত দ্বন্দ্ব থাকে । শ্রীল প্রভুপাদ দুর্যোধনের উদাহরণ প্রদান করেছেন। তার সবই ছিল–বিপুল সম্পদ, প্রচণ্ড প্রভাব ও শক্তি, যৌবন, সৌন্দর্য, বুদ্ধি। যুধিষ্ঠির ও তাঁর ভাইয়েরা ছিলেন সম্পূর্ণ নির্দোষ। তারা সকলে দুর্যোধনকে ভালোবাসতো। কিন্তু দুর্যোধন তাদের প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ ছিল কেননা তাদের যা আছে সে তা চাইত। সে ভীমের শক্তির প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ ছিল, সে ন্যায়পরায়ণতার প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ ছিল এবং সে সিংহাসনে তাদের ন্যায্য উত্তরাধিকারীত্বের প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ ছিল। তার এই ঈর্ষায় সে তার পিতা সহ অন্যদেরও প্রভাবিত করত পাণ্ডবদের নানাভাবে ধ্বংস করতে চেষ্টা করার জন্য, এমনকি বার বার তাদের হত্যা করতে চেষ্টা করা হয়েছিল ।
এসব বিয়োগান্তক ঘটনার সাক্ষী ছিলেন বিদুর । সর্বদিকেই শুদ্ধভক্ত, বিদুর ছিলেন সকলের শুভাকাঙ্খী। তিনি কুরু ও পাণ্ডবদের, উভয়েরই সমানভাবে কাকা ছিলেন এবং তিনিই ছিলেন ধৃতরাষ্ট্রের একমাত্র ভাই, যিনি বেঁচে ছিলেন। তিনি দেখেছিলেন যে কীভাবে তার ভ্রাতা কেবলমাত্র দৃশ্যতই অন্ধ ছিলেন না, উপরন্তু ঈর্ষাপরায়ণ দুর্যোধনের সঙ্গ প্রভাবে সামাজিক ও পারমার্থিকভাবেও অন্ধ ছিলেন। ষড়যন্ত্রের পর ষড়যন্ত্রে পাণ্ডবদের জীবন যাপন ও একের পর এক বিয়োগান্তক ঘটনাগুলি দর্শন করে বিদুর সর্বতোভাবে বিষয়গুলির সমাধানের চেষ্টা করেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে বিদুরই যুধিষ্ঠির মহারাজের কাছে বার্তা পাঠিয়েছিলেন, “তোমরা দাহ্য পদার্থ দ্বারা তৈরিকৃত এক ভয়ংকর ভবনে বাস করছ। একটি নির্দিষ্ট দিনে সেটিতে আগুন লাগিয়ে তারা তোমাদের পুড়িয়ে মারার পরিকল্পনা করছে।’ এই বার্তার জন্যই পাণ্ডবেরা উদ্ধার পেয়েছিল। তারপর তিনি দেখলেন পাণ্ডবেরা প্রতারিত হয়ে তেরো বৎসরের জন্য বনে নির্বাসিত হলেন এবং তাদের ধ্বংস করার জন্য ভয়ঙ্কর রটনা, নিন্দা ও বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হল ।
বিদুর ধৃতরাষ্ট্রের কাছে গিয়ে বললেন, “পাপের মূর্ত বিগ্রহ আপনার ঈর্ষাপরায়ণ পুত্র দুর্যোধনের প্রতি আপনার আসক্তির ফলে, কেবল আপনিই ধ্বংসপ্রাপ্ত হবেন না, আপনার রাজবংশেরও বিনাশ হবে। আপনি কি দেখতে পাচ্ছেন না যুধিষ্ঠির কেমন নিষ্কলঙ্ক, ভীম সর্পের মতো ক্রুদ্ধ হয়ে রয়েছে, প্রতিশোধ প্রার্থনা করছে এবং তাঁদের সর্বশ্রেষ্ঠ শুভাকাঙ্খী বন্ধু হচ্ছেন সর্বলোক মহেশ্বর, পরমেশ্বর ভগবান কৃষ্ণ। আপনি কি আপনার কাণ্ডজ্ঞানহীনতা বুঝতে পারছেন না? পাণ্ডবদের তাদের যা প্রাপ্য তা দিয়ে দিন।”
বিদুর এই সমস্ত কিছুই, নীতিবিরুদ্ধ কাজ করে চলা উদ্ধত দুর্যোধনের উপস্থিতিতে বলেছিলেন। বিদুর ছিলেন অকুতোভয়। দুর্যোধন চীৎকার করে উঠল, “ওকে এখানে কে আসতে বলেছে?” সে এতটাই ক্রুদ্ধ হয়েছিল যে তার ঠোঁট দুটো কাঁপছিল। “এক দাসীপুত্রকে এখানে কে আসতে বলেছে? সে এতটাই শঠ যে যারা তাকে প্রতিপালন করছে তাদের বিরুদ্ধে শত্রুর স্বার্থে গোয়েন্দাগিরি করছে। তাকে এক্ষুনি এই প্রাসাদ থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বার করে দাও এবং সে নিজে কি করে বাঁচে বাঁচুক।”
এই কথাগুলো নির্গত হয়েছিল এমন একজনের কাছ থেকে যাকে বিদুর অত্যন্ত স্নেহ করতেন, তাঁর আপন ভাইপো। শ্রীমদ্ভাগবতে এইসব বলা হয়েছে। আরও বলা হয়েছে যে এই কথা যেন তীরের মতো কানের ভিতর দিয়ে বিদুরের অন্তঃকরণে আঘাত করেছিল এবং বিদুরের হৃদয়কে ছিন্নভিন্ন করেছিল।
ধৃতরাষ্ট্রও তাঁর পুত্রের পক্ষ নিলেন। বিদুরকে যে শুধুমাত্র তীব্রভাবে নিন্দা করা হল তা-ই নয়, তাঁকে তাঁর নিজ গৃহ থেকে বিতাড়িত করা হল। তাঁকে তাঁর পরিবার, পত্নী, সন্তান, গৃহ সবকিছুই ত্যাগ করে বনে গমন করতে হয়েছিল। কিন্তু বিদুর ঘটনাটিকে ভগবান কৃষ্ণের এক দিব্য আয়োজন রূপে দর্শন করলেন, যাতে তিনি প্রাসাদের সকল ভয়ঙ্কর রাজনীতি থেকে মুক্ত হতে পারেন এবং একাকী পবিত্র তীর্থসমূহে গমন করে সাধুসঙ্গ করতে পারেন। বছরের পর বছর ধরে বিদুর ভারতের পবিত্র স্থানসমূহ ভ্রমন করেছিরেন।
বিদুর তাঁর এই চমৎকার তীর্থ পরিক্রমা থেকে হস্তিনাপুরে এসেছিলেন একটিমাত্র কারণে, সেটি হল ধৃতরাষ্টকে উদ্ধার করার জন্য, যে ছিল তাঁর প্রতি নিষ্ঠুর, যে তাকে তাঁর নিজের গৃহ থেকে নির্বাসিত করেছিল, স্বয়ং ভগবান ও তাঁর মহান ভক্তের প্রতি যে ছিল অপরাধী। বিদুর বুঝতে পেরেছিলেন যে ধৃতরাষ্ট্রকে জঘন্যতম নরক যন্ত্রণা ভোগ করতে হবে, যদি না তাকে উদ্ধার করা যায়। তাই কেবলমাত্র তাকে বোঝানোর উদ্দেশ্যেই বিদুর বন থেকে ফিরে এসেছিলেন ।
আশ্চর্যের বিষয় এই যে, ধৃতরাষ্ট্র এতটাই মায়ার দ্বারা আচ্ছন্ন ছিল যে বিদুরের কথা বুঝতে তার দীর্ঘ সময় লেগেছিল। বিদুর একই কথা বছরের পর বছর ধরে ক্রমান্বয়ে বলে গেছেন, কিন্তু পুত্রের প্রতি আসক্তিবশত ধৃতরাষ্ট্র তা শুনতে পাননি। কিন্তু এখন যখন সবকিছু নিঃশেষ হয়েছে, বিদুর হৃদয়ঙ্গম করলেন এবার হয়তো ধৃতরাষ্ট্র তার কথা শুনবেন এবং হলোও তাই, ধৃতরাষ্ট্র শুনলেন। “যাকে আপনি সর্বতোভাবে ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন, সেই যুধিষ্ঠির মহারাজের দ্বারা এখন আপনি রক্ষিত হচ্ছেন। কি লজ্জা! কি অপমান। আপনি আমার সাথে বনে গমন করুন এবং আপনার পাপসমূহের প্রায়শ্চিত্ত করে পরমেশ্বর ভগবানের আশ্রয় গ্রহণ করুন।”
ধৃতরাষ্ট্রকে বোঝানোর পর বিদুর তাকে নিয়ে বনে গমন করলেন। আত্মোপলব্ধির পথ প্রদর্শন করার জন্য। আর ফিরে এলেন না। শ্রীল প্রভুপাদ ব্যাখ্যা করেছেন যে, এটিই হল বৈষ্ণবের স্বভাব। বিভিন্নভাবে অপমানিত হওয়ার পরেও তিনি সর্বদা সকলের শুভাকাঙ্খী, ক্ষমাশীল এবং বিনীত ।
এখানে এই নবদ্বীপেও আমরা এই একই জিনিস বার বার দেখতে পাই। ফুলিয়াগ্রামের নিকটে হরিদাস ঠাকুর নিন্দিত হয়েছিলেন এবং তাকে ঘাতকরা আঘাত করেছিল, তথাপি ভগবানের কাছে একটিই বর তিনি প্রার্থনা করেছিলেন, “তাদের ভগবৎ-প্রেম দাও। আমার প্রতি তারা যে আচরণ করছে, তাকে অপরাধ বলে বিবেচনা করবেন না তাদের ক্ষমা কর এবং তোমার প্রেম দান কর।”

“যাকে আপনি সর্বতোভাবে ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন, সেই যুধিষ্ঠির মহারাজের দ্বারা এখন আপনি রক্ষিত হচ্ছেন। কি লজ্জা! কি অপমান। আপনি আমার সাথে বনে গমন করুন এবং আপনার পাপসমূহের প্রায়শ্চিত্ত করে পরমেশ্বর ভগবানের আশ্রয় গ্রহণ করুন।”


নিত্যানন্দ প্রভু জগাই-মাধাই দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলেন। যাদের উদ্দেশ্য ছিল তাঁকে হত্যা করা। তারা ব্রাহ্মণ-কন্যা ও পত্নীদের নির্যাতন করত, তারা খুনী, তারা গো-হত্যাকারী, তারা মদ্যপ, তারা লোকের বাড়ি পুড়িয়ে দিত। কিন্তু নিত্যানন্দ প্রভু শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন, “আমি যদি কোনো শুভ, পুণ্য কর্ম করে থাকি, যদি আমি আপনার কোনো সেবা করে থাকি, তবে তার সকল গুণের বিনিময়ে তাদের (জগাই, মাধাইকে) ক্ষমা করা হোক এবং তাদের ভগবৎ প্রেম প্রদান করুন।”
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুও স্বয়ং একবার তাঁর ভক্তগণকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, “রাত্রিতে আমাদের নিদ্রা ত্যাগ করা উচিত। এটি সময়ের অপচয়। আমরা আগামী এক বছর, প্রতি রাত্রিতে, সারা রাত্রিব্যাপী শ্রীবাস-অঙ্গনে কেবল হরিনাম সংকীর্তন করব।”এবং তাঁরা সেটি করেছিলেন। তাঁরা ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিতেন, যাতে জড় জাগতিক মানুষেরা তাদের বিরক্ত না করতে পারে।
কিন্তু সেইসব জাগতিক মানুষেরাও শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ও তাঁর ভক্তদের ঘৃণা করত। তারা দরজায় এসে কড়া নাড়ত আর বলত, “আমাদেরও ঢুকতে দাও!” কিন্তু তাদের প্রবেশ অনুমোদিত ছিল না। তাই তারা বাইরে থেকে চিৎকার করে সকলকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলত, “আমরা জানি এরা ওখানে কি করছে। এরা এতটাই অপদার্থ এবং হত-দরিদ্র যে খাদ্যের জন্য ভিক্ষা করতে গিয়েও যথেষ্ট খাদ্য পায় না আর যেহেতু তারা যথেষ্ট খাদ্য যোগাড় করতে পারে না, তাই ক্ষুধায় তারা চিৎকার করছে সারা রাত্রি জুড়ে। তারা সেখানে দেবী দুর্গার উদ্দেশ্যে তান্ত্রিক আচার অনুষ্ঠান করে। তা না হলে কেন তারা সৎ, পণ্ডিত ব্রাহ্মণদের সেখানে ঢুকতে দিচ্ছে না? তার কারণ আমরা তাদের সবকিছু ফাস করে দেব। তারা সেখানে মদ পান করে। তারা সেখানে যুবতীদের সঙ্গে ব্যভিচার করে। তারা তাদের বাড়িতে নিয়ে এসে তাদের দামি দামি পোশাক আর অলঙ্কারে সাজিয়ে, নেশার পানীয় পান করে, প্রত্যেক রাতে, সারা রাত ধরে ব্যভিচারে লিপ্ত হয়। তারা কেবল এইসবই করে। এদের জন্য সমগ্র নবদ্বীপ শহরের সর্বনাশ হবে।”
একজন বললো, ‘নিমাই ভালো ছেলেই ছিলো। কিন্তু তার পূর্ব পাপকর্মের ফলে এবং তার এই ভক্তদের সঙ্গে মেলামেশার ফলে আর তার বাবার দ্বারা সঠিকভাবে প্রশিক্ষিত না হওয়ার ফলে সে উন্মাদ, খেপা ও পাপী হয়ে উঠেছে। এই শ্রীবাসকে আমাদের ধরা উচিত আর তাকে শাস্তি দেওয়া উচিত। তার বাড়িটিকে ভেঙে ফেলে গঙ্গায় ছুড়ে ফেলা উচিত ৷”
তারা সবাই এরকমই বলতো। শুধু তাই নয়, তারা নিরীহ মানুষকে ধরে কীর্তনের কাছে নিয়ে যেত আর বলতো, “তুমি ঐ চিৎকার শোন, দেখ ওরা কি করছে। তুমি কি জান কেন ওরা আমাদের ভিতরে প্রবেশ করতে দেয় না? আর তারা এইসব কটুক্তি বার বার করত।
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ও তাঁর ভক্তগণ কেবল তাঁদের নাম সংকীর্তন চালিয়ে যেতেন। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নাম সংকীর্তন আন্দোলন জুড়ে এই ধরনের অপবাদ সবসময়ই চলত। ঐ একই ব্রাহ্মণেরা চাঁদ কাজীর কাছে অভিযোগ জানালে, চাঁদ কাজী আইন তৈরি করে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ও তাঁর আন্দোলনকে নষ্ট করতে চেষ্টা করেছিলেন এই কঠিন অবস্থার মোকাবিলার জন্যই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু নবদ্বীপের পথে পথে প্রথম প্রকাশ্য হরিনাম সংকীর্তন শোভাযাত্রার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এমনকি যদিও চাঁদ কাজী বৈষ্ণবদের প্রতি অতি কঠোর ও অত্যন্ত অপবাদকারী ছিলেন, তবুও মহাপ্রভু তার গৃহে গমন করে তাকে উদ্ধার করলেন। এখানেই সবকিছু থেমে নেই। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর জীবনীতে আমরা পাঠ করি যে, কীভাবে তিনি বিদুরের মতো ভাব অবলম্বন করে নবদ্বীপ ত্যাগ করেছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত যারা তার বিনাশের চেষ্টা করেছিল তাদের উদ্ধার করার জন্য ফিরে এসেছিলেন।
একবার গোপীভাব অবলম্বন করে তিনি ‘গোপী’ নাম কীর্তন করছিলেন। তখন এক উদ্ধৃত ছাত্র তার প্রতিবাদ করে বললো, “কেন আপনি ‘গোপী’ বলছেন? কোন্ শাস্ত্রে এ কথা বলা হয়েছে? এটা ভণ্ডামী। আপনার কৃষ্ণ নাম করা উচিত।” তখন ভাবোন্মত্ত অবস্থায় শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু একটি লাঠি উঁচিয়ে ধাওয়া করে বললেন, “কেন আমি কৃষ্ণ নাম করব? সে তো একজন প্রতারক । বালী একজন সৎ বানর ছিল, কিন্তু সে তাকে অহেতুকভাবে হত্যা করেছিল। আর বলী মহারাজও অতিশয় ভদ্র মানুষ ছিলেন, কিন্তু তবুও সে (কৃষ্ণ) বলী মহারাজের সবকিছু হরণ করেছিল আর তাকে পাতাল লোকে প্রেরণ করেছিল।”
মহাপ্রভু তখন ভাবোন্মত্ত ছিলেন। কিন্তু সেই ছাত্রটি অন্যান্য ছাত্রদের কাছে গিয়ে এই সংবাদ দান করল। তাদের উদ্ধত্যের জন্য তারা ক্রোধ দ্বারা প্রভাবিত ছিল। তারা নবদ্বীপের সারা শহরে ছড়িয়ে পড়ে বলতে লাগলো, “কে এই নিমাই পণ্ডিত? সে নিজেকে কী মনে করেছে? এই সেদিনও, আমরা ছাত্ররা তাঁর সঙ্গে বসে পড়েছি আর এখন সে আমাদের শাস্তি দেবার অধিকারী হয়েছে? পাগলের মতো সারা রাত কীর্তন না করে দেবতাদের কাছে অপরাধী হয়েছে। তাঁরা বৃষ্টি প্রত্যাহার করে নেবেন, খরা হবে এবং তার জন্য আমরা সকলেই মরতে চলেছি। তাকে শেষ করে ফেলা উচিত। আমরা তাকে শাস্তি দেব। আমরা তাকে মারব।”
সেই সময় শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু নিত্যানন্দ প্রভুকে বললেন, “আমরা এই জগতকে উদ্ধার করতে এসেছি, কিন্তু এখন আমাদের উপস্থিতিতে তা ধ্বংস হচ্ছে। তাই, যেহেতু তারা আমাকে তাদের মতো একজন সাধারণ মানুষরূপে গৃহস্থ রূপে দর্শন করছে, আমি আমার মস্তক মুণ্ডন করে একজন ভিক্ষুক রূপে, একজন সন্ন্যাসীরূপে আমার জীবন অতিবাহিত করব। তখন তারা আমাকে প্রণাম করবে এবং উদ্ধার লাভ করবে।”
নবদ্বীপের সকল নিরীহ ও পুণ্যশীল মানুষেরাই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সংকীর্তন আন্দোলনে যোগদান করছিলেন। তাঁর সন্ন্যাস গ্রহণের অন্যতম কারণ হল কোনো না কোনোভাবে যারা তাঁকে ও অন্যান্য বৈষ্ণবদের নিন্দা করছে সেই ঈর্ষাপরায়ণ মানুষদের উদ্ধার করা। কিন্তু পরে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বিদুরের মতোই তাদের সেই স্থানে ফিরে এসেছিলেন যারা একদিন তাঁকে অপমান করেছিল। বিদুরের মতো শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুও নবদ্বীপ ত্যাগ করে পরে সেখানে ফিরে এসেছিলেন যাকে তারা ঘৃণা করেছিল এবং যারা তাঁকে বিনাশের চেষ্টা করেছিল তাদের কৃপা প্রদানের জন্য। বৈষ্ণবের কৃপার বিষয়ে শ্রীল প্রভুপাদ বলেছেন “প্ররোচনামূলক অবস্থার মধ্যেও সহ্য করার ক্ষমতার দ্বারাই কারো মহত্ব নির্ণীত হয় ৷” যেহেতু এই জগতে দুঃখ-দুর্দশা অপ্রতিরোধ্য এবং এই ধরনের প্ররোচনামূলক অবস্থা প্রত্যেকের কাছেই আসবে। তাই আমাদের কৃষ্ণের প্রতি ঐকান্তিকতা নির্ণীত হবে তখন আমাদের হৃদয় কতখানি কৃষ্ণের প্রতি উন্মুখ, তার দ্বারা শ্রীল প্রভুপাদ বললেন, “তোমাদের কোনো যোগ্যতাই নেই।” সেসাথে বিনীতভাবে তিনি বললেন, “আমি তোমাদের যোগ্যতা তৈরি করেছি।” তিনি কত ভাবে না আমাদের সহ্য করেছেন, কত ভাবে না আমাদের ক্ষমা করেছেন আর প্রকৃতপক্ষে শ্রীল প্রভুপাদের সেই সহনশীলতাই সর্বদা আমাদের একমাত্র যোগ্যতা ছিল এবং ভবিষ্যতেও থাকবে যা আমাদের নিজ আলয় ভগবদ্ধামে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে।

 

 

ত্রৈমাসিক ব্যাক টু গডহেড, অক্টোবর – ডিসেম্বর ২০১৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here