সবার তরে অলৌকিক দুগ্ধ

0
37

সর্বগুণ সম্পন্ন হলেও কি দুধ সর্বজনগ্রাহ্য?

হরেকৃষ্ণ দেবী দাসী

যদি দুগ্ধ আমাদের জন্য অত্যন্ত উপকারী হয়ে থাকে, তবে এটিকে নিয়ে এত বিতর্ক কেন? দুধ নিয়ে বিতর্ক ছিল ১৯৫০ থেকে ১৯৭০ সালের মাঝামাঝি সময়কালে। সেই সময়ে ইন্টারন্যাশনাল রিলিফ এজেন্সিগুলো মিলিয়ন টন উদ্বৃত্ত দুধ বিতরণ করেছিল দেশ-বিদেশে। যারা সেই দুগ্ধ পান করেছিল অধিকাংশেরই অভিযোগ ছিল, তারা গ্যাসের কারণে পেট ব্যাথা, পেশী সংকোচন এবং ডায়রিয়া রোগে আক্রান্ত হয়। তাহলে কি পাউডার দুধগুলো বিষাক্ত ছিল? নাকি এগুলো বিষাক্ত জলের সাথে মিশ্রিত হয়েছিল? না, এই সমস্যা অন্যখানে।

ল্যাকটোজের অসহিষ্ণুতা

১৯৬৫ সালে জন হোপকিনস মেডিক্যাল স্কুলের একদল গবেষক আবিষ্কার করেছিলেন, যে সমস্ত ব্যাক্তি দুধ পান করেছিল তারা ল্যাকটোজ (দুগ্ধে পাওয়া জটিল ধরনের চিনি) হজম করতে পারত না। দুগ্ধে থাকা বৃহৎ এবং জটিল চিনির অণুসমূহ ক্ষুদ্র কণায় না ভাঙ্গা পর্যন্ত এগুলো মানব দেহের ক্ষুদ্রান্ত দিয়ে গমন করতে পারে না। এক্ষেত্রে পরিবহনে সহায়তা করে ল্যাকটোজ এনজাইম। ল্যাকটোজ পাওয়া যায় সকল ধরনের অল্প বয়সী স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে (সিল এবং ওয়ালরুশ ছাড়া), কিন্তু যখনই স্তন্যপায়ী প্রাণীদের বয়স বাড়তে থাকে, তখন অধিকাংশ ল্যাকটোজ সরবরাহ করার ক্ষমতা হারাতে থাকে এবং তারা ল্যাকটোজ অসহিষ্ণু হয়ে পড়ে।
গবেষকগণ আবিষ্কার করেছেন, যদি কোন প্রৌঢ় মানুষ ঠাণ্ডা দুধ হজম করতে পারে, তবে সেটি হবে খুবই ব্যতিক্রমধর্মী। ল্যাকটোজ সহ্য ক্ষমতা সম্পন্ন অধিকাংশ প্রৌঢ় জনগণের বসবাস রয়েছে উত্তর ইউরোপে। কয়েকজন নৃতত্ত্ববিদ অনুমান করেছেন যে, ল্যাকটোজ সহ্য ক্ষমতার সেই অদ্ভুত গুণাগুণ না থাকলে ইউরোপিয়ানরা ক্যালসিয়ামের অভাবে মৃত্যুবরণ করতো। ল্যাকটোজ সহ্য ক্ষমতা এবং হালকা চামড়া (যেটি সূর্যালোক থেকে ভিটামিন ডি শোষণে সহায়তা করে) হল শারীরিক অভিযোজন ক্ষমতা যেটি উত্তর ইউরোপিয়ানদের অস্তিত্ব রক্ষার্থে সহায়তা করেছে।
যে সমস্ত ব্যক্তি এই ধারণার বশবর্তী তারা এর উপসংহারে বলছেন যে, হালকা চামড়া এবং দুধ পান শুধুমাত্র একই সাথেই হতে পারে। তারা বলছেন যে, উত্তর ইউরোপিয়ানরা ছাড়া অন্যান্য জেনেটিক ব্যাকগ্রাউন্ডের মানুষের দুগ্ধ পান করার কোন কারণ নেই।

বিভিন্ন সংস্কৃতিতে দুগ্ধ

আফ্রিকার নিগ্রো জাতীয় মানুষ যেমন মাসাই অথবা প্রাচীন হিব্রু জনগণ গভীরভাবে সন্ধান করত এমন এক স্থানের যেখানে দুগ্ধ এবং মধু পাওয়া যেত। এছাড়া বহু প্রাচীন কাল থেকে ভারতীয় সংস্কৃতিতে দুগ্ধ পানের সংস্কৃতি বিরাজমান। এছাড়াও আফ্রিকা, মধ্য ইউরোপ এবং দক্ষিণ এশিয়ার বহু প্রাচীন সংস্কৃতিতে দুগ্ধ পানের রীতি প্রচলিত ছিল।
আমেরিকার ন্যাশনাল ডেইরি কাউন্সিল মতে ল্যাকটোজ কম পরিমাণে থাকায় পনির তেমন ক্ষতির কারণ হয় না। এছাড়াও বহু ল্যাকটোজ সহ্য ক্ষমতা হারানো মানুষ দুগ্ধজাত বিভিন্ন দ্রব্য গ্রহণ করতে পারেন যেমন মিল্ক শেইক এবং আইসক্রিম। এগুলো অত্যন্ত ধীরভাবে হজম হয়, যার কারণে চিনি ভাঙ্গতে যথেষ্ট সময় লাগে পাকস্থলীর। এছাড়াও দধি সহজে হজম হয় কেননা এতে নিজস্ব এনজাইম থাকে যা ল্যাকটোজ হজম এবং চিনির কণা ভাঙ্গতে সহায়তা করে।
তাই উত্তর-পূর্ব ইউরোপের বাইরে দুগ্ধ পান করার উপায়টি নিহিত আছে তাদের দুগ্ধজাত দ্রব্য তৈরির প্রণালীতে।
“দুধ একটি অলৌকিক খাদ্য, কারণ তাতে মানব দেহের প্রয়োজনীয় সব ক’টি ভিটামিন রয়েছে। ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির প্রগতি হয় তখনই, যখন মানুষ সত্ত্ব গুণে বিকশিত হওয়ার শিক্ষালাভ করে এবং সেই জন্য দুধ, ফল এবং শস্যজাত খাদ্যের প্রয়োজনীয়তা সব চেয়ে অধিক।”
যদি কেউ এক কাপ দুধ দুই দিনের জন্য কোথাও রেখে দেয় তবে ব্যাকটেরিয়া আক্রমণ করবে এবং এগুলো নষ্ট হবে। তাই পৃথিবীর বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ বিভিন্ন উপায়ে ব্যাকটেরিয়া মুক্ত করে দুধ সংরক্ষণের বিভিন্ন উপায় উদ্ভাবন করেছেন। প্রধানত চার প্রকারের ব্যবহার পদ্ধতি রয়েছে: দুধ গরম করা, দুধের গঠন পরিবর্তন করা (দধি এবং মাখন তৈরিতে ব্যবহৃত উপায়), বিভিন্ন সংস্কৃতির অংশ হিসেবে বিভিন্ন উপাদানের সংমিশ্রণ করা, ৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট উষ্ণতায় ঠাণ্ডা করা (আধুনিক ডেইরি সমূহে তৈরি হয়)।
প্রাচীনকালে উত্তর ইউরোপিয়ানরা দুধকে ঠাণ্ডা করে সংরক্ষণ করতে পারতো। এছাড়া শত বছর আগে আমেরিকান ফার্ম হাউস প্রতিষ্ঠানের দুধ সংরক্ষণের জন্য স্প্রিংহাউস ছিল। কিন্তু উষ্ণ জলবায়ু সম্পন্ন দেশের মানুষের জন্য এই পদ্ধতি উপযোগী নয়। তাই আফ্রিকান এবং ভূমধ্যসাগরীয় মানুষ এবং ভারতীয়রা দধি বানিয়ে কিংবা দুধ গরম করে সংরক্ষণ কিংবা ব্যবহার করত। কিন্তু এই সকল দুগ্ধজাত দ্রব্যদি ডেইরী কাউন্সিল মতে ল্যাকটোজ হজমহীন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সমস্যার উপদ্রবকারী হিসেবে চিহ্নিত।
আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যা প্রাচীন ঐতিহ্যপন্থী হর্ড ডেইরিম্যান ম্যাগাজিনের একটি প্রবন্ধে উল্লেখিত হয়েছে যে, ৫০ মিলিয়ন আমেরিকান জনগণ ল্যাকটোজ সহ্য ক্ষমতাহীন, কিন্তু বিভিন্ন দ্রব্যদি ব্যবহারের মাধ্যমে তারা দুধের উপকার লাভ করতে পারেন। যেমন আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যায় তৈরিকৃত দ্রব্য ল্যাকটেইড এবং ল্যক-ট্রেস। এগুলো দধির মতোই নিজস্ব এনজাইমের সাহায্যে দুধের চিনি কণা ভাঙ্গতে সহায়তা করে যাতে যে কেউ এই সকল দুগ্ধজাত দ্রব্য গ্রহণ করতে পারে।

দুগ্ধ প্রয়োজন কাদের?

দুধে সমস্ত প্রকারের গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান বিদ্যমান, যেমন : প্রোটিন, ক্যালসিয়াম এবং ভিটামিন বি। যদিও আমাদের দেহ অন্য কোনো উৎস থেকে প্রোটিন এবং ক্যালসিয়াম লাভ করতে পারে, কিন্তু কিছু বিশেষ বি ভিটামিন লাভের জন্য আমাদের দেহ সম্পূর্ণরূপে দুধের ওপর নির্ভরশীল।
নিরামিষ খাদ্য তালিকায়, দুগ্ধ ভিটামিন বি-১২ (কোবালামিন) প্রদানের মাধ্যমে দেহ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অধিকাংশ প্রাণীর দেহের পাকস্থলীতে ক্ষুদ্র অঙ্গ রয়েছে যা বি-১২ সরবরাহ করে, কিন্তু মানবদেহে তা হয় না। প্রাকৃতিকভাবে বি-১২ লাভের একমাত্র উপায় হল দুধ কিংবা মাংস। আমাদের দেহে ভিটামিন বি-১২ প্রয়োজন সঠিকভাবে লোহিত রক্তকোষ গঠনের জন্য। এর অভাব লক্ষণীয়ভাবে ক্ষতিকারক এবং রক্তস্বল্পতার কারণ।
কেউ যদি পারমার্থিক বিজ্ঞান যথার্থভাবে উপলব্ধি করতে চায়, তবে এক্ষেত্রে ভিটামিন বি ১২ এর সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে, কেননা ভিটামিন বি-১২ মস্তিষ্ক কোষসহ সমগ্র স্নায়ুতন্ত্রের সঠিক কর্মক্ষমতা উন্নয়নে সহায়তা করে। ভিটামিন বি-১২ এর স্বল্পতার কারণে ক্ষতির লক্ষণ উপলব্ধি করতে হয়তোবা ৫ থেকে ১০ বছর সময় লাগতে পারে, কিন্তু এটি ধীরে ধীরে “ধৰ্য্যহীনতা, স্মৃতিভ্রম, অতিমেজাজী, মনোবৈকল্য এবং পরিশেষে মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
শ্রীল প্রভুপাদ দুগ্ধ পানের গুরুত্ব সম্পর্কে বলেছেন : “মানব শরীরের পূর্ণ বিকাশের জন্য গাভীই হচ্ছে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ পশু। যে কোনো খাদ্যদ্রব্যের দ্বারা শরীর ধারণ করা যায়, কিন্তু মানব মস্তিষ্কের সূক্ষ্মতর তন্তুগুলি বিকাশ করার জন্য গাভীর দুধ বিশেষভাবে আবশ্যক, যার ফলে মানুষের দিব্যজ্ঞান উপলব্ধি করার ক্ষমতা লাভ হয়।” (শ্রীমদ্ভাগবত ৩/৫/৭, ভাষ্য)
ভিটামিন বি-১২ হচ্ছে দুধের সমগ্র উপাদানসমূহের মধ্যে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। মানবদেহে স্বল্প পরিমাণ বি-১২ প্রয়োজন এবং উষ্ণ দুধেও এই ভিটামিন অবস্থান করে। দুধ পাস্তুরিত করার পর ৯০ ভাগ বি-১২ ভিটামিন বর্তমান থাকে। এছাড়াও দুধকে দুই থেকে পাঁচ মিনিট ধরে উষ্ণ করার পরও এতে ৭০ শতাংশ বি-১২ বর্তমান থাকে।

দুগ্ধ এবং বৈদিক ঐতিহ্য

এই প্রবন্ধটি তৈরি করার সময় আমি শ্যামসুন্দর মহাজন (শৈমিক ঋষি দাস), সাথে আলোচনা করেছিলাম, যিনি পেনিসেলভেনিয়ার একজন ডাক্তার এবং ইসকন গাভী সুরক্ষা প্রকল্পের সদস্য।
ড. মহাজন আমাকে বলেছেন, “আমি আমেরিকায় ডাক্তারিবিদ্যা অনুশীলন করতে আসার আগে ভারতে ২৪ বছর অতিবাহিত করেছি। কিন্তু এই সময়কালীন আমি কখনো শুনি নি যে কারো ল্যাকটোজ সহ্যহীনতা রয়েছে। কিন্তু কেন আমেরিকানদের ল্যাকটোজ সহ্য ক্ষমতা কম তা বলা কঠিন। হতে পারে এর কোনো জিনগত কারণ রয়েছে, কিন্তু এর পেছনে আর একটি কারণ হচ্ছে এখানে কি উপায়ে দুগ্ধজাত দ্রব্য পান করা হচ্ছে। ভারতে সাধারণত ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করার জন্য দুধ ফুটানো হয় এবং মানুষ চিনি মিশিয়ে উষ্ণ দুধ পান করে। দুধ ফুটানোর কারণে প্রোটিন ভেঙ্গে যায় তাই এটি হজম করা সহজতর হয়। আমেরিকায় দুধ পাস্তুরিত করা হয় কিন্তু উত্তপ্ত করে ফুটানো হয় না। এখানে মানুষ ঠাণ্ডা দুধ পান করে, তাই হয়তোবা বিভিন্ন সমস্যার উপদ্রব হচ্ছে।
শ্রীল প্রভুপাদ ভক্তদের মৃদু উষ্ণ দুধ পান করার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেছিলেন যে, ঠাণ্ডা দুধে এটির সকল পুষ্টিকর উপাদান বিনষ্ট হয়।
এছাড়া আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে পারদর্শী ভাগবত দাস আমাকে আরো কিছু মজার তথ্য প্রদান করেছেন। বিশেষত ১৬ শতকে প্রকাশিত “রাজা টোডারমলের আয়ুর্বেদ সখ্যম” গ্রন্থ। টোডারমল ১৬ শতকে মোঘল সম্রাট আকবরের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ছিলেন। আয়ুর্বেদ মতে, আমি জেনেছি, উষ্ণ দুধ যেটি সরাসরি গাভী থেকে এসেছে সেটি শক্তি বৃদ্ধি এবং হজম প্রক্রিয়া সহজতর করে, কিন্তু ঠাণ্ডা দুধ সন্ধি বাত, গ্রন্থিবাতের কারণ এবং বিষাক্ত গ্যাস (যেটি জন হপকিনস এর গবেষণায় প্রমাণিত) সৃষ্টি করে।
উষ্ণ দুধ মিউকাস নিঃসরণ লাঘব করে এবং দেহে চর্বি জমতে দেয় না। এছাড়া এটি স্নায়ুতন্ত্রের কার্যাবলী স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করে। এজন্য গরম দুধ পান করা বিভিন্ন সংস্কৃতিতে ঘুমানোর পূর্বে বিশ্রামের একটি অঙ্গ হয়ে দাড়িয়েছে। এছাড়া দুধে জাফরান এবং এলাচ যোগ করলে মিউকাস দূরিভূত হয়। পরিশেষে আয়ুর্বেদ মতে দুধে থাকা পাতলা সর শক্তি এবং কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং বাতরোগ ও গ্যাস দূর করে।
সঠিকভাবে তৈরিকৃত দুগ্ধজাত দ্রব্যসমূহ গ্রহণের মাধ্যমে আমাদের শারীরিক এবং পারমার্থিক সীমাহীন কল্যাণ লাভ হতে পারে। তাই সকল সংস্কৃতির মানুষের উচিত দুধের এই আশ্চর্য সকল ক্ষমতার কথা জেনে নিয়মিতভাবে দুধ পান করা। শ্রীল প্রভুপাদ তার ভাষ্য লিখেছেন (শ্রীমদ্ভাগবত ১/১৬/৪) “দুধ একটি অলৌকিক খাদ্য, কারণ তাতে মানব দেহের প্রয়োজনীয় সব ক’টি ভিটামিন রয়েছে। ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির প্রগতি হয় তখনই, যখন মানুষ সত্ত্ব গুণে বিকশিত হওয়ার শিক্ষালাভ করে এবং সেই জন্য দুধ, ফল এবং শস্যজাত খাদ্যের প্রয়োজনীয়তা সব চেয়ে অধিক।”

(হরেকৃষ্ণ দেবী দাসী ১৯৭৮ সন থেকে ইসকনের ভক্ত হিসেবে আছেন। তিনি পেনেসেলভেনিয়ায় গীতা নগরী ফার্মে বহু বছর সেবারত ছিলেন।) 


 

এপ্রিল-জুন ২০১৫ ব্যাক টু গডহেড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here