শ্রীল প্রভুপাদের জলদূত যাত্রার ৫০ বছর ও দু’টি গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড

0
47

কলকাতার নেতাজী ইনডোর স্টেডিয়ামে সমবেত হয়েছিল ১০০ টিরও বেশী দেশের ভক্তবৃন্দ। গত ১৩-১৬ আগস্ট কলকাতায় এই উৎসবকে ঘিরে আয়োজিত বিভিন্ন অনুষ্ঠান মালার তথ্য বিবরণী নিয়ে নিম্নোক্ত প্রতিবেদন লিখেছেন

সর্বাত্মা দাস


শ্রীল প্রভুপাদের আমেরিকা যাত্রার পটভূমি
১৩ আগস্ট, ১৯৬৫

‘জলদূত’ হচ্ছে সিন্ধিয়া স্টিম নেভিগেশন কোম্পানির একটি মালবাহী জাহাজ, কিন্তু তাতে একটি যাত্রী কেবিন আছে। ১৯৬৫ সালে আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে কলকাতা থেকে নিউইয়র্ক যাবার সময়ে সেই কেবিনটিতে যাত্রী ছিলেন শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী, খাতায় তাঁর বয়স লেখা ছিল ৬৯ বছর, এবং ‘ভাতা সমেত একটি কমপ্লিমেন্টারি টিকিটে’ তিনি আমেরিকা যাচ্ছিলেন।
‘জলদূতের নেতৃত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন অরুণ পাণ্ডিয়া, তাঁর সহধর্মিনীও সেই জাহাজে ছিলেন। ১৩ আগস্ট, শুক্রবার সকাল ৯টায় জাহাজ ছাড়ল। তাঁর ডায়েরিতে প্রভুপাদ লিখেছেন, “কেবিনটি বেশ আরামদায়ক, সুমতি মোরারজীকে এই সমস্ত বন্দোবস্ত করতে অনুপ্রাণিত করার জন্য শ্রীকৃষ্ণকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আমি বেশ আরামেই আছি।” কিন্তু ১৪ তারিখে তিনি তাঁর ডায়েরিতে লিখলেন : “সামুদ্রিক পীড়ায় ভুগছি, মাথা ঘুরছে, বমি হচ্ছে বঙ্গোপসাগরে প্রবল বৃষ্টি হচ্ছে। শরীর আরও খারাপ।”
১৯ তারিখে জাহাজ যখন শ্রীলংকার কলম্বো শহরে পৌঁছল, প্রভুপাদ তখন সামুদ্রিক পীড়া থেকে কিছুটা স্বস্তিবোধ করলেন। জাহাজের ক্যাপ্টেন তাঁকে সঙ্গ করে তীরভূমিতে নিয়ে গেলেন, এবং তিনি গাড়িতে করে কলম্বো শহরটি ঘুরে বেড়ালেন। তারপর জাহাজ ভারতের পশ্চিম উপকূলে, কোচিনের দিকে যাত্রা শুরু করল। সেই বছর শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব তিথি ‘জন্মাষ্টমী’ ছিল আগস্ট মাসের ২০ তারিখে। এই সুযোগ নিয়ে প্রভুপাদ জাহাজের নাবিকদের কাছে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের তত্ত্বদর্শন শোনালেন এবং পরে তাঁর নিজের হাতে রান্না করা প্রসাদ বিতরণ করলেন। ২১ আগস্ট ছিল তাঁর সত্তরতম জন্মদিবস। অনাড়ম্বরে তা সমুদ্রের বুকে উদযাপিত হল। সেই দিনই জাহাজ কোচিনে পৌছল এবং বম্বে থেকে সমুদ্রপথে পাঠানো প্রভুপাদ অনুদিত ‘শ্রীমদ্ভাগবত গ্রন্থ-বোঝাই তিনটি ট্রাঙ্ক জাহাজে তুলে নেওয়া হল।
২৩ তারিখের মধ্যেই জাহাজ লোহিত সাগরে এসে পড়ল। সেখানে প্রভুপাদকে অনেক অসুবিধা ভোগ করতে হয়েছিল। তিনি ব্যক্তিগত ডায়েরিতে লিখেছেন : “বৃষ্টি, সামুদ্রিক পীড়া, মাথাঘোরা, মাথাব্যাথা, অরুচি, বমি,”—তাঁর এই অসুস্থতার কোনো উপশম হলো না। তাঁর বুকের ব্যাথাটা এতই প্রবল হয়ে উঠেছিল যে, তিনি মনে করেছিলেন যে-কোনো মুহূর্তেই মৃত্যু ঘটতে পারে। দু’দিনে তাঁর দু’বার ‘হার্ট-অ্যাটাক্’ হয়। কিন্তু তাঁর মনে হয়েছিল, আবার যদি এই রকম একটি ‘অ্যাটাক্’ হয়, তা হলে তিনি আর তা কাটিয়ে উঠতে পারবেন না।
দ্বিতীয় রাত্রে প্রভুপাদ স্বপ্নে দেখেন যে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ একটি নৌকা বাইছেন এবং তিনি তাঁকে অভয় দিয়ে তাঁর কাছে আসতে বলছেন। প্রভুপাদ উপলব্ধি করলেন যে, স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে রক্ষা করছেন এবং সেই যাত্রায় আর ‘হার্ট-অ্যাটাক্’ হয়নি।
১ সেপ্টেম্বর ‘জলদূত’ সুয়েজ খালে প্রবেশ করল এবং ২ সেপ্টেম্বর পোর্ট সৈয়দে নোঙর ফেলল। ক্যাপ্টেনের সঙ্গে সেই দিন তিনি শহরে বেড়াতে গিয়েছিলেন এবং সেই শহরটি তাঁর খুব ভাল লেগেছিল। ৬ তারিখের মধ্যেই তাঁর অসুখ অনেকটা সেরে উঠল এবং দু’সপ্তাহের মধ্যেই আবার তিনি আগের মতো নিজের হাতে চচ্চড়ি ও পুরি রান্না করে নিয়মিত আহার করতে লাগলেন। তিনি ডায়েরিতে লিখেছিলেন যে, শরীরের শক্তি আস্তে আস্তে ফিরে আসছে।
শুক্রবার, ১০ সেপ্টেম্বর আজ জাহাজ খুব সাবলীল গতিতে চলছে, আমি আগের চেয়ে অনেকটা ভাল বোধ করছি। কিন্তু আমি শ্রীবৃন্দাবনের বিরহ অনুভব করছি, আর অনুভব করছি আমার প্রাণনাথ শ্রীগোবিন্দ, গোপীনাথ, রাধা দামোদরের বিরহ। তবু এই অবস্থায় আমার একমাত্র সান্ত্বনা হচ্ছে শ্রীচৈতন্য চরিতামৃত, যা অধ্যয়নে আমি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর লীলামৃতের আস্বাদন পাই। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ অনুসারে আমার গুরুদেব শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের আদেশ শিরোধার্য করে আমি ভারতভূমি ত্যাগ করেছি। আমার কোনো যোগ্যতা নেই, কিন্তু আমার পরমারাধ্য গুরুদেবের আদেশ পালন করার জন্যই আমি এই দুঃসাহসিক কাজে ব্রতী হয়েছি। বৃন্দাবন থেকে বহু দূরে, কেবল তাঁদের কৃপার ওপর আমি সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে আছি।
১৯৬৫ সালের ‘জলদূতের’ সেই যাত্রা ছিল এক ধীর ও শান্ত জলযাত্রা। সেই সম্বন্ধে জাহাজের ক্যাপ্টেন বলেছেন যে, তাঁর পুরো কর্মজীবনে জাহাজকে এত শান্ত এবং ধীরভাবে আটলান্টিক মহাসাগর পার হতে দেখেননি। তার উত্তরে প্রভুপাদ বলেছিলেন যে, সেই শান্ত ধীরভাব শ্রীকৃষ্ণেরই করুণার নিদর্শন এবং শ্রীমতী পাণ্ডিয়া প্রভুপাদকে অনুরোধ করেন, ফেরার সময়ও তিনি যেন তাঁদের সঙ্গে আসেন, যাতে তাঁরা আবার এই রকম শান্তভাবে আটলান্টিক পার হতে পারেন। প্রভুপাদ তাঁর ডায়েরিতে লিখেছেন : “আটলান্টিক যদি তার স্বাভাবিক রূপ ধারণ করতো, তাহলে হয়তো আর বেঁচে থাকতাম না। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণই ছিলেন জাহাজটির কাণ্ডারি।”

আমেরিকার বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও কংগ্রেস নারী তুলসী গাবার্ডের বার্তানমস্তে, জয় শ্রীকৃষ্ণ। যখন আমাকে এরকম একটি সবচেয়ে পবিত্র উদযাপনে আপনাদের সকলের সাথে যোগদানের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হল, আমি তৎক্ষণাৎ বিনম্রতা ও মহা আনন্দের অনুভূতিতে উদ্ভাসিত হই। আমি এ সুযোগ লাভ করে সৌভাগ্যবতী এবং সম্মানিত অনুভব করছি এবং এজন্যে আমার হৃদয়ের গভীর থেকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করি। যদিও আমার প্রিয় প্রপিতামহ গুরুদেব শ্রীল এ. সি. ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদের উদ্দেশ্যে প্রশংসাবাণী নিবেদন করাই আমার এ প্রচেষ্টা, একটি শিশু কর্তৃক সূর্যের কাছে একটি ক্ষুদ্র টর্চলাইট নিবেদনের মতোই। তাঁর অপার কৃপায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আমাকে তা করার জন্য অনুমোদন করেছেন আমার নিজের শিক্ষার বা নৈতিক উন্নতি সাধনের জন্য। আমার সমগ্র জীবন জুড়ে আমিও আপনাদের সবার মতোই বিশ্বাসপূর্ণ, চ্যালেঞ্জিং বা ভীতিপূর্ণ পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছি। কিন্তু এসব পরিস্থিতিতে আমার মহাসৌভাগ্য যে, আমি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নামের আশ্রয় গ্রহণের মাধ্যমে আভ্যন্তরীণ শান্তি ও পারমার্থিক সুখ লাভ করেছি। প্রকৃতপক্ষে শুধুমাত্র ভগবানের পবিত্র নাম ‘জয় শ্রীকৃষ্ণ’ উচ্চারণের মাধ্যমে আমার অধর যে সুমিষ্টতার আস্বাদন করে তা অতুলনীয় এবং সেসাথে আমার হৃদয় আনন্দে উদ্বেলিত হয়। কিন্তু এটি সত্য যে, যদি শ্রীমৎ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদের করুনা না হতো, আমি কখনো শ্রীকৃষ্ণের পবিত্র নামের এই পরম সম্পদ অর্জন করতে পারতাম না। শ্রীল রূপ গোস্বামী বলেন, “একজন ব্যক্তি যখন অন্যের দুঃখদুর্দশা সহ্য করতে অসমর্থ হয় তখন তাকে বলে অনুকম্পাময় বা করুণাময়। এরকম অনুকম্পা যেটি শ্রীল প্রভুপাদ প্রদর্শন করেছিলেন এমন কিছু লাভের প্রচেষ্ঠায় যা ছিল অত্যন্ত নির্ভীক ও দুঃসাহসিক সেটি হলো মহাপ্রভুর বাণী ও পবিত্র হরিনাম সমস্ত মানব জাতির কাছে প্রচার করা।”
শ্রীল প্রভুপাদ আমাদের সবার প্রতি এই অনুকম্পা অনুভব করেছিলেন তার একটি দৃষ্টান্ত আমরা দেখতে পাই একটি পদ্যে যেটি তিনি রচনা করেছিলেন তাঁর গুরুদেব শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে। তিনি লিখেছিলেন, “জীবগণ অজ্ঞানতা ও মোহের ভারী শৃঙ্খল দ্বারা নিজেদের শৃঙ্খলিত করেছে এবং যেহেতু তারা জড় অস্তিত্বের বিশাল মহাসমুদ্রে সাঁতার কাটে শান্তির তীরে পৌছানোর এক প্রমত্ত উদ্যোগ বা প্রচেষ্টা গ্রহণ করে, তাই তাদের বিনাশ ঘটে। এই দুর্দশার তীর আমার হৃদয়কে বিদীর্ণ করে যেরকম আপনাকে ব্যথিত করে, শ্রীল প্রভুপাদ, যিনি ভ্রান্ত মানবতার দুর্দশা দর্শন করে একইরকমভাবে দুর্দশা অনুভব করেন।”
জড় দুঃখ-দুর্দশার মহাসমুদ্র অতিক্রম করতে আমাদেরকে সহায়তা করার জন্য তাঁর অপরিসীম অনুকম্পাস্বরূপ শ্রীল ভক্তিবেদান্ত স্বামী ভারত ও আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়েছিলেন এক দীর্ঘ ও প্রতিকূল সমুদ্রযাত্রা। তিনি ইতোমধ্যেই বেশ বৃদ্ধ ছিলেন এবং সেসাথে তাঁর স্বাস্থ্যও ভালো ছিল না, তবুও তার সেই অনুকম্পা যেকোনোভাবে হোক সেই ভ্রমণ শুরু করার পথে তাকে পরিচালিত করেছিল। সেই ভ্রমণের সময় তিনি দু’বার হাট অ্যাটাক করেন, তবুও সমস্ত পরিস্থিতিতে তিনি তাঁর গুরুদেব ও ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন।
আমরা যারা শ্রীল এ. সি. ভক্তিবেদান্ত স্বামীর পারমার্থিক সন্তান এবং প্রপৌত্র রয়েছি তারা সবাই অনাথ হিসেবে থাকতাম যদি তাঁর অনুকম্পা ও কৃপা না থাকত। আমার গুরুদেব শ্রীল সিদ্ধ স্বরুপানন্দ পরমহংস বলেছিলেন, “ওহ্! আমরা শ্রীল প্রভুপাদের প্রতি কৃতজ্ঞতার যে ঋণ সেটি কখনো পরিশোধ করতে পারব না। আমরা সবাই শ্রীল প্রভুপাদের কাছে ঋণী। কিন্তু আমরা সেটি করতে পারি, যদি আমরা তাকে সন্তুষ্ট করতে পারি, সর্বদা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পবিত্র নামের শরণ গ্রহণের মাধ্যমে। শ্রীকৃষ্ণের পবিত্র নামের শরণ গ্রহনের মাধ্যমে আমরাও হয়তো কৃষ্ণের প্রিয় হতে পারব। যে জীবনটি করুণা ও অন্যের প্রতি ভালবাসার দ্বারা উদ্ভাসিত থাকবে।”
আমার প্রিয় বন্ধুগণ, এইভাবে আমাদের অধরপৃষ্ঠে ও হৃদয়ের গভীরে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মধুর নামের মাধ্যমে, আমরা শ্রীল প্রভুপাদের আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশ্বে যাত্রার অপ্রাকৃত প্রকৃতি ও মহিমা সবার মাঝে সর্বদা সঞ্চার করতে সমর্থ হবো।
অতএব, এই ঐতিহাসিক দিনে শ্রীল ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদের কৃপাশীর্বাদ লাভের প্রার্থনার জন্য এ সুযোগটি গ্রহণ করা উচিত, যাতে করে আমরাও ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রতি ভালোবাসার অমৃত আস্বাদন করতে পারি এবং সেসাথে আমরা যেন অনুকম্পাবশত নিজেদের জীবনকে অন্যের জাগতিক ও পারমার্থিক কল্যাণ সাধন করতে পারি।
আবারও আমি সবাইকে ধন্যবাদ জানাই আমাকে এই সুযোগটি প্রদান করার জন্য। জয় শ্রীকৃষ্ণ! জয় শ্রীল ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ।

কলকাতা ছেড়ে পঁয়ত্রিশ দিন ভ্রমণের পর, ‘জলদূত’ ১৯৬৫, ১৭ সেপ্টেম্বর ভোর ৫.৩০ মিনিটে বোস্টন কমনওয়েলথ জেটিতে পৌছল। নিউইয়র্ক শহরের দিকে অগ্রসর হওয়ার পূর্বে জাহাজটি বোস্টনে কিছু সময় থেমেছিল।

কলকাতায় প্রভুপাদের আমেরিকা যাত্রার ৫০ বছর পূর্তি উৎসব

শ্রীল প্রভুপাদের আমেরিকা যাত্রার ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে কলকাতায় উদযাপিত হয়ে গেল বিশাল একটি অনুষ্ঠান। গত ১৩ থেকে ১৬ আগস্ট আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে ১২৫ দেশের ভক্তবৃন্দ এবং অনেক বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও ভিআইপিগণ, যা উপস্থিত ৩৫,০০০ মানুষকে আকৃষ্ট করে। এই অনুষ্ঠান অনলাইনেও লক্ষ লক্ষ ভক্ত উপভোগ করে। সবাই এই উৎসবে সমবেত হয়েছিলেন এক মহান পারমার্থিক গুরু শ্রীল প্রভুপাদের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা প্রদর্শনের জন্য।
তিনি পাশ্চাত্য দেশে গমন করেছিলেন, সম্পদ অন্বেষনের জন্য নয় যেটি অধিকাংশ অভিবাসী স্বপ্ন দেখে থাকে। তিনি গমন করেছিলেন তাঁর গুরুদেব শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের অনুরোধে ভগবৎপ্রেমের বার্তা পশ্চিমা বিশ্বে প্রচার করার জন্য।
শ্রীল প্রভুপাদের পশ্চিমা বিশ্বে কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচারের অনবদ্য সাফল্যকে স্মরণ করে গত ১৩ আগস্ট কলকাতার নেতাজী ইনডোর স্টেডিয়ামের সিলিং এ শোভা পাচ্ছিল ১২৫টি দেশের পতাকা। ১৩ আগস্টের ঐ দিনেই শ্রীল প্রভুপাদ কলকাতা থেকে আমেরিকার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছিলেন। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ইস্কন ভক্তবৃন্দসহ স্থানীয় দর্শকরা তাই এ উৎসবটি উপভোগের জন্য জড়ো হতে থাকে। ভোর থেকেই ১০০টি বাস ব্যস্ত হয়ে পড়ে দর্শকদের উৎসব অঙ্গনে আনয়নের জন্য।
সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১ টার মধ্যে পুরো স্টেডিয়ামে সমবেত হয় ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে আগত ভক্তবৃন্দ ও শুভানুধ্যায়ীরা। ঐ বিশেষ দিনে স্টেডিয়ামের ১৫ হাজার আসন সংখ্যার বিপরীতে আরো বাড়তি ৩ হাজার মানুষ সমবেত হয়। এই বাড়তি দর্শকরা উপায়ান্তর না দেখে সিঁড়িতে, মেঝেতে বসে অনুষ্ঠান উপভোগ করে।
পুরো অনুষ্ঠান জুড়ে শ্রীল প্রভুপাদের মহিমা ও তাঁর অর্জনগাঁথা সম্পর্কে আলোচিত হয়
শ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী, শ্রীমৎ ভক্তিচারু স্বামী, শ্রীমৎ রাধানাথ স্বামী ও শ্রীমৎ ভক্তিপুরুষোত্তম স্বামী আলোকপাত করেন যে, কিভাবে শ্রীল প্রভুপাদ আমাদের জন্য কঠোর তপস্যার মধ্য দিয়ে গমন করেছিলেন।
ইতোমধ্যে শ্রীল প্রভুপাদের পুত্র বৃন্দাবন চন্দ্র দে, তথ্যমতে তিনি হলেন একমাত্র জীবিত ব্যক্তি যিনি শ্রীল প্রভুপাদের আমেরিকা যাত্রার সময় উপস্থিত ছিলেন। তিনি স্মরণ করেন কিভাবে শ্রীল প্রভুপাদ তার ভগ্নি (প্রভুপাদের কন্যা) ভক্তিলতার কাছ থেকে নারকেলের লাড্ডু ভর্তি একটি পাত্র নিয়ে কলকাতার খিদিরপুর ডক থেকে বিদায় নিয়েছিলেন।
তিনি আরো স্মরণ করেন যে, শ্রীল প্রভুপাদ এতটা ত্যাগী ছিলেন যে, এমনকি যাওয়ার কিছু সময় পূর্বে তিনি তাকে চল্লিশ রুপি অর্থ দিয়েছিলেন।”
প্রভুপাদ তাঁর সন্তানের কাছে তাঁর পরিবারের জন্য শুভ কামনা করেছিলেন এবং অনুরোধ করেছিলেন তাঁর নিরাপদ ভ্রমণের জন্য প্রার্থনা করতে। তারপর যখন যাত্রার সময় জাহাজের ঘণ্টা বেজে উঠল, বৃন্দাবন চন্দ অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন এবং তার পিতার উদ্দেশ্যে অবনত প্রণতি নিবেদন করেন।
অনুষ্ঠানের সকালের কর্মসূচীতে ছিল ভজন কীর্তন। ভজন পরিবেশন করেন মায়াপুর চন্দ্র, কীর্তন পরিবেশন করেন শ্রীমৎ লোকনাথ স্বামী এবং শ্রীল প্রভুপাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন স্বরূপ একটি সঙ্গীত পরিবেশন করেন মায়াপুর আন্তর্জাতিক বিদ্যালয়ের ছোট ছোট মেয়েরা। শ্রীল প্রভুপাদের শৈশব থেকে শুরু করে জলদূত জাহাজে চড়ে তাঁর সেই ভ্রমণ কাহিনি অবলম্বনে ৫০ মিনিটের একটি দশাবতার নৃত্য প্রদর্শন করেন ইন্ডিয়া’স গট টেলেন্ট বিজয়ী দল প্রিন্স ড্যান্স গ্রুপ।
বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত শ্রীল প্রভুপাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন স্থানীয় কলকাতাবাসী।

শ্রীল প্রভুপাদের পশ্চিমা বিশ্বে গমন ধর্মান্তরিত করার উদ্দেশ্য নয়
শ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী

উপস্থিত মাননীয় গভর্নর এবং আরো যারা বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত রয়েছেন তাদের উদ্দেশ্যে আমার শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। এই বছরটি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর বৃন্দাবন পরিদর্শনের ৫০০ বছর পূর্তি উৎসব। কেন্দ্ৰীয় সরকার এটি উদযাপন করছে। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু সমগ্র ভারত জুড়ে প্রচার করতেন। কিন্তু তিনি তাঁর ভক্তদের মধ্যে কেউ একজনকে পাঠান সারা বিশ্বে কৃষ্ণভাবনার বার্তা প্রচার করার জন্য। এর উল্লেখ রয়েছে বিভিন্ন পুরাণে এবং সেসাথে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে নিয়ে রচিত গ্রন্থাবলীতে। বিশেষত চৈতন্যমঙ্গল গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে যে, “নারদ মুনি চিন্ময় জগতে পরিদর্শনের জন্য গিয়েছিলেন এবং সেখানে গিয়ে তিনি এ উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করেন যে এ রকম জড়বাদী যুগ, কলিযুগের লোকেরা কিভাবে মুক্তি লাভ করবে? শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলেন, আমি স্বয়ং কলিযুগে অবতরণ করব এবং পবিত্র হরিনাম সংকীর্তন প্রচার করব। আমি সমগ্র ভারত জুড়ে প্রচার করব এবং ৫০০ বছর পর আমি আমার সেনাপতি ভক্তকে প্রেরণ করব সমগ্র বিশ্বে প্রচার করার জন্য।
অতএব, যেরকমটি ভক্তিচারু মহারাজ উল্লেখ করেছেন যে, শ্রীল এ. সি. ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদের পশ্চিমা বিশ্বে গমনের ব্যাপারটি আচমকা কোনো ঘটনা নয়। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর আবির্ভাবের ৫০০ বছর পর, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সেই অমিয় ভবিষ্যতবাণী ‘পৃথিবীতে আছে যত নগরাদি গ্রাম, সর্বত্র প্রচার হবে মোর নাম পূর্ণ করতে এ ঘটনাটি ঘটেছিল।
এই ঘটনা প্রদর্শন করে যে, কিভাবে একজন ভারতীয় ব্যক্তি সেখানে গমন করেন, আর সমগ্র বিশ্বের সমগ্র ইতিহাস বদলে দিতে পারে। প্রভুপাদ যখন আমেরিকানদের সাথে সাক্ষাৎ করছিলেন, প্রভুপাদ তাদের বলেছিলেন, ‘তোমরা আমেরিকান নও, রাশিয়ান নও কিংবা চাইনিজ নও এবং আমিও ভারতীয় নই। কারণ আমরা এই শরীর নই। আমরা হলাম প্রকৃতপক্ষে চিন্ময় আত্মা । শ্রীকৃষ্ণের নিত্য অবিচ্ছেদ্য অংশ।”
প্রথমদিকে লোকেদের প্রতিক্রিয়া ছিল, “আমরা কি আমেরিকান নই? এর মানে কি?” কিন্তু পরবর্তীতে তারা বিষয়টি উপলব্ধি করতে পেরেছিল। যেরকম ভাবে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় আমাদের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে যে, আমরা সবাই ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নিত্য-চিন্ময় জ্যোতি, ভগবানের নিত্য অবিচ্ছেদ্য অংশ।
এভাবে শ্রীল প্রভুপাদ ভগবদগীতার বিজ্ঞান লোকেদের কাছে পদ্ধতিগতভাবে প্রচার করেছিলেন। তিনি তাদের ভক্তিযোগের আদর্শ ও নববিধা ভক্তি সম্পর্কে শিক্ষা দিয়েছিলেন।
‘যৌগ’ মানে হল ‘যোগ সাধন করা’। বিভিন্ন ধরনের যৌগপদ্ধতি রয়েছে-জ্ঞানযোগ, ধ্যানযোগ, অষ্টাঙ্গযোগ ও ভক্তিযোগ। এদের মধ্যে ভক্তিযোগ হল সবচেয়ে আবেগপূর্ণ ও ভক্তিপূর্ণ যোগ। আমরা নিজেদের আবেগ ও ভক্তিকে ব্যবহার করি ভগবানের কথা চিন্তা করার উদ্দেশ্যে। অতএব, এটি হল একটি পারমার্থিক প্রক্রিয়া। যে কোনো ধর্মের যে কোনো ব্যক্তি ভক্তিযোগের এই আদর্শ অনুশীলন করতে পারে। অতএব, শ্রীল প্রভুপাদ পশ্চিমা বিশ্বে গমন করেছিলেন লোকেদের ধর্মান্তরিত করার উদ্দেশ্যে নয়। ভক্তিযোগের স্নাতকোত্তর শিক্ষা প্রদানের উদ্দেশ্যে তিনি সেখানে গমন করেছিলেন। যখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়, “আপনার এখানে আগমনের উদ্দেশ্য কী?” তখন তিনি উত্তর দেন, “আমার সরল একটি উদ্দেশ্য রয়েছে। আমি লোকেদের চিন্তা-চেতনার দিকে পরিবর্তন সাধন করতে চাই। সেটি হয়তো সবচেয়ে কঠিন কার্য। আমরা সবাই ভাবছি যে, আমরা হলাম এ শরীর এবং এখানে এমন কেউ একজন এসে বলছেন “না, আপনারা এ শরীর নন, আপনারা হলেন চিন্ময় আত্মা।”
প্রকৃতপক্ষে, প্রভুপাদ লোকেদের চিন্তা-চেতনার দিক পরিবর্তন সাধন করেছিলেন এবং আমাদের মিশন হল এই কার্যটি সম্পূর্ণ করা। নিজেকে পরমেশ্বর ভগবানের সেবকের সেবক চিহ্নিত করার মাধ্যমে সমগ্র বিশ্বে প্রকৃত শান্তি অর্জিত হবে। এজন্যে, শ্রীল প্রভুপাদ ৫০ বছর পূর্বে কোনো অর্থ বা সহায়তা ছাড়াই কলকাতা থেকে পাশ্চাত্যের উদ্দেশ্যে গমন করেন। আমি তাঁর শ্রীপাদপদ্মে আশ্রয় গ্রহণ করতে পেরে মহাসৌভাগ্যবান অনুভব করছি এবং আমি খুবই খুশি যে, এ উৎসবের ব্যবস্থাপকদের যারা প্রভুপাদের আমেরিকা যাত্রার ৫০ বছর পূর্তির এ বিশাল উৎসবটি ব্যবস্থাপনা করার জন্য সেবা প্রদান করেছেন। আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ। (১৩ আগস্ট, নেহেরু স্টেডিয়ামে প্রদানরত প্রবচন)

উপস্থিত বিশেষ অতিথি পশ্চিমবঙ্গের গভর্নর শ্রী কেশরী নাথ ত্রিপতি শ্রীল প্রভুপাদের প্রতি প্রশংসাসূচক বক্তৃতা প্রদান করেন এবং এরপর বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ কিরণ বেদী বক্তৃতা প্রদান করেন এবং উৎসব অঙ্গন থেকেই তার ৫.১ মিলিয়ন টুইটার অনুসারীদের উদ্দেশ্যে টুইট করেন, “কলকাতায় অত্যন্ত পবিত্র দিবস ইস্‌কন উদযাপন করছে প্রভুপাদের যাত্রার ৫০তম বর্ষপূর্তি এবং এই ইভেন্টকে বলছি “শক্তি, একতা ও ভক্তির” ইভেন্ট।
আমেরিকান কংগ্রেস নারী তুলসী গাবার্ড একজন কৃষ্ণভক্ত, ভিডিওর মাধ্যমে একটি সংক্ষিপ্ত বক্তব্য প্রদান করেন। তিনি শ্রীল রূপ গোস্বামীর উদ্ধৃতি প্রদান করেন বলেন, “যিনি অন্যের দুঃখ সহ্য করতে অসমর্থ তাকে করুণাময় বলা হয়। এটি সেই করুনা যা শ্রীল প্রভুপাদকে এমন কিছু করতে পরিচালিত করেছিল যা ছিল অত্যন্ত নির্ভীকময় ও দুঃসাহসিক। তিনি তা করেছিলেন সমগ্র মানব জাতির উদ্দেশ্যে ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর বাণী ও পবিত্র নাম প্রচারের উদ্দেশ্যে।” তিনি আরো উল্লেখ করেন, “আমরা সবাই অনাথ হয়ে যেতাম যদি তাঁর করুণা ও কৃপা আমাদের ওপর বর্ষিত না হতো।”
ইতোমধ্যে ১০৬টি ভিন্ন ভিন্ন দেশের ভক্ত প্রতিনিধিরা একত্রে সমবেত হয়ে শ্রীল প্রভুপাদের প্রণাম মন্ত্র ও হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র জপের সময় পদ্মাসনে উপবিষ্ট হয়ে যোগ অনুশীলন করেন, যা সবচেয়ে বেশি দেশের সম্মেলনে যোগ শিক্ষার একটি বিশ্বরেকর্ড।
১০৫টি দেশের ভক্ত প্রতিনিধি কর্তৃক শ্রীল প্রভুপাদের বন্দনাসূচক বাংলা গীত শ্রীগুরু চরণ পদ্ম গাওয়ার মাধ্যমে আরেকটি নতুন বিশ্ব রেকর্ড গড়েন। ঐ সময় উপস্থিত ছিলেন গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডের বিচারক প্রবীন প্যাটেল, যিনি অফিসিয়ালি এই রেকর্ডগুলো নিশ্চিত করে ইসকনকে সনদপত্র প্রদানের মাধ্যমে পুরস্কৃত করেন।
পরবর্তীতে সন্ধ্যায় বিশেষ নজরকাড়া ভাস্কর্য দু’টি উন্মোচত হয় যেগুলোর নকশা করেন রাশিয়ান ভক্ত মদন মোহন দাস এবং তৈরি করেন ইউক্রেনিয়ান শিল্পী ভোলোডিমির জারাবেল। ভাস্কর্যটি ব্রোঞ্জের তৈরি এবং দু’ভাগে বিভক্ত ছিল। একটি অংশে তুলে জাহাজে আরোহন করছেন, এটি বর্তমানে ইস্‌কন কলকাতাতে রাখা হয়েছে।

শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু সমস্ত মহিমা গচ্ছিত রেখেছিলেন তাঁর এক অন্তরঙ্গ ভক্তের জন্য
শ্রীমৎ ভক্তিচারু স্বামী

সর্বকালের মধ্যে কলিযুগ নামে পরিচিত এই বিশেষ যুগটি সবচেয়ে অধপতিত। এই যুগে যখন অধর্ম যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, যেরকম ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, যদা যদা হি ধর্মস্য… সৃজাম্যহম্ (যখনই ধর্মের অধঃপতন হয় এবং অধর্মের অভ্যুত্থান হয়, তখন আমি নিজেকে প্রকাশ করে অবতীর্ণ হই) (গীতা-৪/৭)
অতএব, এই যুগে ধর্ম পুনঃস্থাপনের উদ্দেশ্যে শ্রীকৃষ্ণ অবতরণ করেন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুরূপে। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু রূপে প্রকাশ করে শ্রীকৃষ্ণ সবচেয়ে সুন্দর একটি উপহার সমগ্র বিশ্বের উদ্দেশ্যে প্রদান করেছেন। যেটিকে বলা হয় সংকীর্তন যজ্ঞ। শ্রীমদ্ভাগবতে উল্লেখ করা হয়েছে, কলের্দোষনিধে রাজন্নস্তি হোকো মহান্ গুণঃ (দোষের নিধি এই কলিযুগে একটি মহৎ গুণ আছে। কলিযুগে ভগবানের নাম কীর্তনের প্রভাবেই জীব জড় জগতের বন্ধন থেকে মুক্তি লাভ করেন) (ভা.১২/৩/৫১)। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর উপহারটি এত সুন্দর যে, এটি কাউকে শুধু চিদাকাশে প্রত্যাগমন করান না, বরং চিদাকাশের সর্বোচ্চ লোকে প্রত্যাগমন করান। যেটি ‘গোলক বৃন্দাবন’ নামে পরিচিত। কলিযুগের মানুষদের গোলক বৃন্দাবনে ফিরিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু অবতরণ করেন এবং এই সংকীর্তন যজ্ঞের শুভ সূচনা করেন।
এই সংকীর্তন যজ্ঞ হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র শ্রীশ্রী রাধাকৃষ্ণের সর্বোচ্চ অন্তরঙ্গ লীলাবিলাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হওয়ার অপূর্ব সুযোগ প্রদান করে। পরমেশ্বর ভগবানের এই উপহারটি ইতোপূর্বে কখনো বিতরিত হয়নি। পূর্বে কৃষ্ণ বহু অবতারে অবতরণ করেছিলেন এবং অগণিত জীবদের উদ্ধার করেন, কিন্তু কৃষ্ণ কখনো এই বর প্রদান করেননি, তাই এই উপহারটিকে বিবেচনা করা হয়। ‘অনর্পিত’ হিসেবে, যেটি ইতোপূর্বে কখনো প্রদান করা হয়নি এবং সেই উপহারটি হল কৃষ্ণপ্রেম বৃন্দাবনে যেটি কৃষ্ণ ব্রজগোপীকাদের সঙ্গে মাধুর্য হ্রসে সিক্ত হয়ে সবচেয়ে অন্তরঙ্গ সম্পর্কের মধ্য দিয়ে প্রদর্শন করেছিলেন। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এটি বিতরণ করেছিলেন শুধু ভারতবর্ষে। কিন্তু তিনি ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন যে, সমগ্র জগতে প্রতিটি নগরাদি গ্রামে এই নাম প্রচারিত হবে। পৃথিবীতে আছে যত নগরাদি গ্রাম, সর্বত্র প্রচার হবে মোর নাম।’ এই ভবিষ্যৎবাণীটি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু করেছিলেন ৫০০ বছর পূর্বে এবং ৪৬০ বছর পূর্বে সেটি কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী লিপিবদ্ধ করেন। এই ভবিষ্যৎবাণীটি এমন একটি সময়ে করা হয়েছিল যখন লোকেরা নগরাদি গ্রাম তো নয়ই সারাবিশ্বে কতটা মহাদেশ ছিল তাও জানত না। ঐ কলম্বাস মাত্রই আমেরিকা আবিষ্কার করেছিল। মানুষ আফ্রিকা সম্পর্কে অবগত ছিল না। সে সময়ে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এই ভবিষ্যৎবাণীটি করেছিলেন। পরমেশ্বর ভগবানের বাণী কখনো বিফলে যায় না। তিনি যা বলেন তা বাস্তবে রূপান্তরিত হয় এবং সম্প্রতি আমরা দর্শন করেছি যে কিভাবে সেই অবিশ্বাস্য ভবিষ্যৎবাণী বাস্তবে রূপান্তরিত হয়েছে। কল্পনারও অতীত পন্থায় এ কার্যটি আশ্চর্যভাবে সাধিত হয়েছে।
একজন ৭০ বছরের বৃদ্ধ কৃষ্ণভক্ত আমেরিকা গমন করেন একটি কার্গো জাহাজে চড়ে এবং তিনি যাত্রা শুরু করেন কলকাতার খিদিরপুর ডক থেকে। ১৯৬৫ সালের এই দিনে, ১৩ আগস্ট, শুক্রবার তিনি এই সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়েছিলেন। সেটি কোনো যাত্রীবাহী জাহাজ ছিল না। কার্গো জাহাজ ছিল। যেটি, সাধারণত এক বন্দর থেকে আরেক বন্দরে, এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে মালামাল আনা নেওয়া করে থাকে।
আমেরিকা গমনের একটি ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য শ্রীল প্রভুপাদ সিন্ডিয়া স্টীমশিপের মালিক সুমতি মোরারজীকে অনুরোধ করেছিলেন। যদিও প্রথমদিকে তিনি চরমভাবে প্রভুপাদের এই অনুরোধে পক্ষে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু পরিশেষে শ্রীল প্রভুপাদের পুনঃ পুনঃ অনুরোধের দরুন রাজী হলেন।
আমেরিকায় শ্রীল প্রভুপাদের সঙ্গে কোনো লোকের পরিচয় ছিল না। গোপাল আগরওয়াল নামে একজন ব্যক্তি সেখানে ছিলেন, তিনি প্রকৃতপক্ষে প্রভুপাদের ভিসা স্পন্সর করেছিলেন। শুধুমাত্র তার যোগাযোগ মাধ্যমটি প্রভুপাদের ছিল এবং তিনি তাকে পত্র লিখে জানান যে, কখন তিনি আমেরিকায় পৌঁছবেন। সৌভাগ্যবান গোপাল আগারওয়াল শ্রীল প্রভুপাদকে নিউ ইয়র্কে বরণ করার জন্য কিছু ট্রাভেল এজেন্সির ব্যবস্থা করেছিলেন নিউইয়র্কে শ্রীল প্রভুপাদকে বরণ করার জন্য এবং পেনসিলভিয়ায় বাটলারের উদ্দেশ্যে একটি বাস ভ্রমণেরও ব্যবস্থা করেছিলেন, যেখানে তিনি থাকতেন।
শ্রীল প্রভুপাদ সেখানে যে শুধু কাউকে চিনতেন না তা নয়, তার কাছে উল্লেখযোগ্য কোনো অর্থই ছিল না। বৈদেশিক কোনো মুদ্রাও ছিল না। ছিল মাত্র ৪০ রুপী অর্থ, আমেরিকাতে সে সময় যার কোনো মূল্যই ছিল না।
এভাবেই ১৯৬৫ সালে ৭০ বছর বয়সে শ্রীল প্রভুপাদ আমেরিকায় গমন করেন। এবং এক বিশাল সংগ্রামের পর শ্রীল প্রভুপাদ তার প্রতি আকর্ষিত হাতেগোনা কিছু তরুন-তরুণীদের নিয়ে একটি সংস্থা স্থাপন করেন যেটির নাম হল আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইস্‌কন)। এটি ছিল আরেকটি আশ্চর্যকর ঘটনা যে, ১৯৬৬ সালে তিনি এটি শুরু করেছিলেন, নিউ ইয়র্কের লোয়ার ইস্ট সাইডের ছোট্ট একটি দোকান ঘরে। কিন্তু তিনি সেই সংস্থাটির নামকরণ করেছিলেন আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ হিসেবে। একবার ভাবুন, তিনি যেখানে অবস্থান করছিলেন, সেটি ছিল ছোট্ট একটি দোকান ঘর, সেখানেই তিনি রেজিস্ট্রার করছিলেন এবং এটিকে নাম দিয়েছিলেন, ‘আন্তর্জাতিক সোসাইটি’ হিসেবে।
যে উকিল এর রেজিস্ট্রার করছিলেন, তিনি তেমন কিছু মনে করেননি, কিন্তু ‘কৃষ্ণভাবনাময়’ এ শব্দটি গ্রহণ করতে তার আপত্তি ছিল। তাই তিনি উপদেশ দিলেন, অনুগ্রহ করে এটির নামকরণ ‘ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর কৃষ্ণ কনশাসনেস’ না দিয়ে ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর গড় কনশাসনেস’ দিলে উত্তম হয়। কেননা মানুষ জানে না কৃষ্ণ কে? এমনকি সেসময়ের শ্রীল প্রভুপাদের অনুসারীগণও এর সঙ্গে একমত প্রকাশ করেছিল। “স্বামীজি, উত্তম হয় যদি এর নামকরণ ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর গড কনশাসনেস” কিন্তু প্রভুপাদ বললেন, “না, আমি এখানে এসেছি সবাইকে এটি উপলব্ধি করাতে যে, শ্রীকৃষ্ণই হলেন ভগবান। লোকেরা ভগবান সম্পর্কে কথা বলে, কিন্তু ভগবানকে এ সম্পর্কে তাদের উপলব্ধি নেই।” অবশেষে এ সংঘের নাম তিনি তাই দিয়েছিলেন, আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইস্‌কন) এবং শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সেই ভবিষ্যৎবাণী পূরণের সেটিই ছিল শুভ সূচনা যে, পৃথিবীতে আছে যত নগরাদি গ্রাম, সর্বত্র প্রচার হবে মোর নাম। এগার বছরের সংক্ষিপ্ত পরিসরে শ্রীল প্রভুপাদ সারা বিশ্বে এ সংঘের প্রচার কার্যক্রম শুধু প্রসারই করেননি, সে সাথে তিনি বিশ্বের প্রধান প্রধান শহরে প্রতিষ্ঠা করছেন ১০৮টি মন্দির।
এভাবে আমরা দেখতে পাই, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু সেই ভবিষ্যৎবাণীটি পূরণ করার জন্য সমস্ত মহিমা গচ্ছিত রেখেছিলেন তাঁরই অন্তরঙ্গ এক ভক্তের জন্য, তিনি হলেন, কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ । যত সময় গড়াবে আমরা দর্শন করব যে, যে সংস্থাটি শ্রীল প্রভুপাদ প্রতিষ্ঠা করে গেছেন, সেই আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন) সেই ভবিষ্যৎবাণী পরিপূর্ণভাবে সফল করার জন্য বিশ্বের সমস্ত নগরাদি গ্রামে প্রসার ঘটে চলেছে। আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ। সমস্ত মহিমা শ্রীল প্রভুপাদের। (১৩ আগস্ট, নেহেরু স্টেডিয়ামে প্রদানরত প্রবচন)

পরবর্তীতে এটি খিদিরপুর ডকের নিকটে একটি পার্কে স্থলাভিষিক্ত করা হবে। অন্য অংশটি প্রদর্শন করছে কিভাবে শ্রীল প্রভুপাদ বোস্টনে জাহাজ থেকে অবতরণ করছেন, এই অংশটি স্থলাভিষিক্ত করা হবে বোস্টন পোতাশ্রয়ের (Harbar) নিকটস্থ একটি পাবলিক পার্কে।
সন্ধ্যার অপর অংশটিতে জয়পতাকা স্বামী রচিত “যদি প্রভুপাদ না হইত ভজনটি পরিবেশন করেন একলব্য দাস ও এক ঝাঁক নৃত্যশিল্পী ও গায়ক এবং কলকাতার বিভিন্ন বিদ্যালয়ের ৬৫০ জন শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে ‘গোপীনাথ’ ভজনের তালে তালে একটি ‘ফ্লাশ মব নৃত্য’ প্রদর্শন করেন। আর এই সর্বশেষ পরিবেশনের মাধ্যমে ১৩ আগষ্টের অনুষ্ঠানমালার সমাপ্তি ঘটে।
১৪ আগস্ট, শ্রীল প্রভুপাদের স্মৃতিবিজড়িত প্রধান প্রধান পবিত্র স্থানসমূহ দর্শনের জন্য বেরিয়ে পড়েন শত শত ভক্তদের একটি দল। দলটিতে অংশগ্রহণ করে ১২৫টি দেশের ইস্‌কনের প্রতিনিধিবর্গ। তাদের অনেকেরই অনেক দশক ধরে ইস্‌কনের সদস্য কিন্তু ভারত ভ্রমণ করেননি। কিন্তু এবার সেই অপেক্ষার পরিসমাপ্তি ঘটল।
যে সমস্ত স্থান তারা পরিদর্শন করেন সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হল ১ উল্টা ডাঙা জাংশন রোড যেখানে প্রভুপাদ প্রথমবার তাঁর গুরুদেবের সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন, বার বাজারে রাধা গোবিন্দজী মন্দির যেখানে শ্রীল প্রভুপাদ পাঁচ বছর বয়সে তার নিজের উদ্যোগে রথযাত্রা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছিল; ১৫১ মহাত্মা গান্ধী রোড যেখানে তিনি বেড়ে উঠেছিলেন এবং টালিগঞ্জ রোডের একটি স্থান যেখানে প্রভুপাদ ১৮৯৬ সালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।
পরিশেষে ভক্তরা খিদিরপুর ডক পরিদর্শন করে যেখান থেকে শ্রীল প্রভুপাদ পঞ্চাশ বছর পূর্বে আমেরিকার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছিলেন। এই ভ্রমণের ব্যবস্থাপক ও ইস্‌কন কলকাতার ম্যানেজার রাধারমন দাস বলেন, “এই স্থানে এসে ভক্তরা সবাই প্রণতি নিবেদন করে এবং খুবই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
১৫ আগস্ট ভারতের স্বাধীনতা দিবসে ৬০০ জন ভক্তের একটি দল ইস্‌কন কলকাতা থেকে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল পর্যন্ত রাস্তায় রাস্তায় হরিনাম সংকীর্তন করেন। সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১.৩০ মিনিট পর্যন্ত সংকীর্তন অবিরতভাবে চলতে থাকে। উল্লেখ্য, এই হরিনাম সংকীর্তন অনুষ্ঠানে ১২৫টি দেশের প্রতিনিধি ভক্তবৃন্দের হাতে শোভা পাচ্ছিল ১২৫টি দেশের পতাকা। উল্লেখ্য এই অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখতে রাস্তার দুধারে অগণিত মানুষের ভিড় চোখে পড়ে।
১৪, ১৫ এবং ১৬ আগস্ট সন্ধ্যাগুলোতে ভক্তরা ইস্‌কন কলকাতায় সমবেত হন সাংস্কৃতিক কর্মসূচির জন্য এবং সেসাথে জ্যেষ্ঠ ভক্তদের মুখ থেকে শ্রীল প্রভুপাদের জীবনচরিত কথা শ্রবণ করার জন্য।
উৎসবের সামগ্রিক পরিবেশটি ভালোবাসা ও ভক্তিতে মুখরিত হয়ে উঠে। রাধারমন বলেন, “যখন ভক্তরা সবাই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে তাদের নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরে যাচ্ছিল তখন শ্রীল প্রভুপাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বরূপ সবাই আবেগাপ্লুত হয়ে অশ্রুসিক্ত হয়েছিল।”
কলকাতায় শ্রীল প্রভুপাদের আমেরিকা যাত্রার এ উদযাপনটি অবশ্যই সারাবিশ্বে ইস্‌কনের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে উদযাপনের একটি সূচনা মাত্র, যেটি ২০১৬ সালের ১৩ জুলাই পর্যন্ত বছর জুড়ে বিভিন্ন ইভেন্টের মাধ্যমে চলতে থাকবে। উল্লেখ্য, ১৩ জুলাই এই তারিখে ১৯৬৬ সালে এই সংস্থাটির অফিসিয়াল রেজিস্ট্রেশন হয়।
শ্রীমান রাধারমন দাস বলেন, “ইস্‌কনে আমরা জানি যে, আমরা সবাই শ্রীল প্রভুপাদের কৃপাতে রক্ষা পেয়েছি। তাই আমরা যে সৌভাগ্য লাভ করেছি তা অন্যদের সাথে বিনিময় করার জন্যই এই সমস্ত ইভেন্ট অনুষ্ঠিত হয়েছে।”


 

অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০১৫ ব্যাক টু গডহেড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here