শ্রীল জয়পতাকা স্বামী গুরু মহারাজের উপস্থিতিতে প্রবর্তক শ্রীকৃষ্ণ মন্দির ও সিলেট যুগলটিলা মন্দিরে বিগ্রহগণের প্রাণ প্রতিষ্ঠা উৎসব (পর্ব-০১)

0
31
৩৫ বছরের কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচার কার্যক্রমের সাফল্য স্বরূপ
চট্টগ্রামে শ্রীশ্রী রাধাকুঞ্জবিহারী, ললিতা বিশাখা ও শ্রীশ্রী গৌর নিতাই বিগ্রহের প্রাণ প্রতিষ্ঠা মহোৎসব।

কমললোচন গৌরাঙ্গ দাস ও অনাদি রঘুনাথ দাস


ইস্‌কনের প্রতিষ্ঠাতা আচার্য শ্রীল ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ বিশ্বের বড় বড় শহরে রাধাকৃষ্ণের মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং মানুষের মাঝে কৃষ্ণ ভক্তির উন্মেষ ঘটিয়েছেন। জগদ্‌গুরু শ্রীল প্রভুপাদের অভিলাষ পূরণার্থে ইস্‌কনের বর্তমান আচার্যবৃন্দ এই মন্দির নির্মাণ প্রকল্পে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। শ্রীশ্রী প্রবর্তক নতুন মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তুর স্থাপন করেন ২৩ জানুয়ারি ২০০৭ সালে শ্রীল প্রভুপাদের কৃপাধন্য শিষ্য শ্রীল জয়পতাকা স্বামী মহারাজ।
শ্রীমান স্বতন্ত্র গৌরাঙ্গ দাস ব্রহ্মচারী প্রভুর তথ্য সহযোগিতায় জানা যায়, এই মন্দিরে শ্রীশ্রী রাধাকুঞ্জবিহারী, ললিতা বিশাখা ও শ্রীশ্রী গৌর নিতাই বিগ্রহের প্রাণ প্রতিষ্ঠা মহোৎসব পরমারাধ্য গুরুদেব শ্রীশ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী গুরু মহারাজের উপস্থিতিতে ৩-৫ আগস্ট ২০২২ খ্রিস্টাব্দ ইস্‌কন গুরুবর্গ, জিবিসি, প্রভুপাদ শিষ্য, সন্ন্যাসীবর্গ ও সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবৃন্দ ও হাজারো ভক্তবৃন্দের মিলনমেলায় আনন্দমূখর পরিবেশে উদ্‌যাপিত হয়েছে। চট্টগ্রামে বৈদিক স্থাপত্যশৈলী ও দৃষ্টিনন্দন কারুকার্যে নির্মিত রাজস্থানী মার্বেলে তৈরি এ শ্রীমন্দির বাংলাদেশের মানুষের কাছে একটি দর্শনীয় স্থান হিসেবে গুরুত্ব পেয়েছে যা বিশ্বে বাংলাদেশের ও শ্রী মতিলাল রায় মহোদয় কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত প্রবর্তক সংঘের সুনাম বৃদ্ধি করছে।
একটি ভবিষ্যদ্বাণী: ২০০৩ সালে দানবীর মৃদুল কান্তি দে মহোদয় (প্রবর্তক সংঘ কর্তৃপক্ষের অন্যতম সদস্য) শ্রীমান শ্রীহরি প্রভুকে (সাবেক ইস্‌কন অধ্যক্ষ) তৎকালীন প্রবর্তক শ্রীকৃষ্ণ মন্দিরের কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। প্রবর্তক সংঘ কর্তৃপক্ষ ২০০৫ সালে একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে ইস্‌কনকে অনেক ভূমি ব্যবহারের জন্য দান করে। ২০০৭ সালে ২৩ জানুয়ারি শ্রীল জয়পতাকা স্বামী গুরুমহারাজ এই ভূমিতে মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন এবং সেখানে প্রয়াত দানবীর মৃদুল কান্তি দে, বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী, শ্রীমান চারুচন্দ্র প্রভু ও শ্রীমান লীলারাজ গৌর দাস ব্রহ্মচারী প্রভুসহ উপস্থিত ছিলেন। ২০০৮ সালে সাফারি প্রোগ্রামে গুরুমহারাজ ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, “চট্টগ্রামে যেভাবে আমাদের ভক্তগোষ্ঠী বৃদ্ধি পাচ্ছে আমাদের একটি বিশাল মন্দির প্রয়োজন। যাকে কেন্দ্র করে ভক্তগোষ্ঠী ও সনাতনী সম্প্রদায় সকলে একটি সুন্দর আধ্যাত্মিক জীবন লাভ করবে এবং পারমার্থিক জীবন অতিবাহিত করতে পারবে”। এই ব্যাপারে শ্রীমৎ প্রভাবিষ্ণু স্বামী ও শ্রীল ভক্তিচারু স্বামী মহারাজ সহ আরো অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। শ্রীমান লীলারাজ গৌর দাস ব্রহ্মচারী এই মন্দিরের নির্মাণ যজ্ঞে গুরুমহারাজকে প্রভুত সহায়তা করেন।

অক্ষয় তৃতীয়াতে শুভ উদ্বোধন

শ্রীমান নাড়ু গোপাল প্রভুর নেতৃস্থানীয় ভূমিকায় ২০২১ সালের অক্ষয় তৃতীয়ায় এই মন্দিরের শুভ উদ্বোধন হয়। ২০২২ সালের ঝুলন পূর্ণিমায় ৩, ৪ এবং ৫ আগস্ট শ্রীমন্দিরের বিগ্রহের প্রাণ-প্রতিষ্ঠা মহোৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এরই ভিত্তিতে এর নির্দেশনায় দক্ষিণ ভারত থেকে স্বনামধন্য পূজারীরা এসে বিবিধ মাঙ্গলিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেন।
৩ আগস্ট শ্রীল জয়পতাকা স্বামী গুরুমহারাজ সহস্রাধিক ভক্তের উপস্থিতিতে প্রবর্তক শ্রীকৃষ্ণ মন্দিরে শুভ পদার্পণ করেন। ঐদিন সকালে আচার্য্যানুজ্ঞা, বিশ্বক্শ্যাম পূজা, যজ্ঞসেবা প্রবেশ, মহাঘট স্থাপন, দাতাগোষ্ঠীর সংকল্প যজ্ঞ সম্পন্ন হয়।
৪ আগস্ট শ্রীল জয়পতাকা স্বামী গুরুমহারাজ, শ্রীমৎ ভক্তিপুরুষোত্তম স্বামী, শ্রীমৎ ভক্তিবিজয় ভাগবত স্বামী, শ্রীমান নাড়ু গোপাল প্রভু, শ্রীমৎ ভক্তি অদ্বৈত নবদ্বীপ স্বামী মহারাজ, শ্রীমান চারুচন্দ্র প্রভু, শ্রীমান জগৎগুরু গৌরাঙ্গ প্রভু, শ্রীমান চিন্ময় কৃষ্ণ প্রভুসহ নেতৃস্থানীয় ইস্‌কন ভক্তদের উপস্থিতিতে শ্রীশ্রী রাধাকুঞ্জবিহারী ও ললিতা বিশাখা, শ্রীশ্রী গৌর-নিতাই বিগ্রহের নেত্র উন্মীলন উৎসবের মধ্য দিয়ে ভক্তরা বহুল আকাঙ্খিত বিগ্রহসমূহের দর্শন লাভ করে।
৫ আগস্ট সকাল ৬ ঘটিকায় জাগরণ সেবার পরপরই শুরু হয় বিগ্রহের ন্যাসহোম। বিগ্রহের প্রতিটি অঙ্গে বিভিন্ন দেবতাদের স্থাপন করা হয়েছিল যজ্ঞের মাধ্যমে। সে সময় বিশেষ করে শ্রীল জয়পতাকা স্বামী গুরুমহারাজ থেকে শুরু করে উপরোক্ত মহারাজবৃন্দ এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন মন্দিরের অধ্যক্ষবৃন্দ এবং যাজ্ঞিক ব্রাহ্মণেরা উপস্থিত ছিলেন। “ন্যসহোম” অনুষ্ঠানে ব্রাহ্মণেরা যজ্ঞে আহুতি প্রদান করেছিলেন। সেসাথে বিভিন্ন মন্ত্র উচ্চারণ করে শ্রী বিগ্রহের বিভিন্ন অঙ্গ স্পর্শ করে বিভিন্ন দেবতাদের স্থাপন করা হয়েছিল। এই “ন্যাসহোম” অনুষ্ঠানের পর মহা অভিষেক অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল এবং সে মহা অভিষেক অনুষ্ঠানে পরম আরাধ্য গুরু মহারাজ পৌরহিত্য করেছিলেন এবং গুরুমহারাজ মহা অভিষেকের প্রতিটি মাঙ্গলিক দ্রব্য স্পর্শ করার পর মহারাজ এবং ব্রাহ্মণরা সেই সমস্ত দ্রব্যদি দিয়ে শ্রীবিগ্রহগণকে অভিষেক করেছিলেন।
এইভাবে যথাযথ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যে এই মহা অভিষেক সুসম্পন্ন হওয়ার পর গুরু মহারাজ প্রতিটি বিগ্রহে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে উল্লেখ্য যে, শ্রীশ্রী বাসুদেব দত্ত ও মুকুন্দ দত্তের পুত জন্মভূমি পটিয়াস্থ ছনহরা ধামের শ্রীশ্রী গৌর-নিতাই বিগ্রহেরও প্রবর্তক শ্রীকৃষ্ণ মন্দিরে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। গুরুমহারাজ ছনহরা ধামের বিগ্রহগনের নাম দেন “নিত্যানন্দ রায় নিমাই গৌরহরি”। এরপর তিনি প্রবর্তক শ্রীকৃষ্ণ মন্দির গৌর-নিতাই বিগ্রহগনের নামকরণ করেন “দয়াল নিতাই গৌরাঙ্গ রায়”। এরপর তিনি রাধা-কৃষ্ণের নামকরণ করেন শ্রীশ্রী রাধা কুঞ্জবিহারী ও ললিতা-বিশাখা। অনুষ্ঠান শেষে গুরুমহারাজ ভক্তদের উদ্দেশ্যে প্রবচন দেন।
বিকেল ৪ টায় বিগ্রহের প্রথম দর্শন হলো এবং গুরুমহারাজ ৫ টার দিকে সবার উদ্দেশ্যে প্রবচন দিলেন। এরপর তিনি নন্দনকানন শ্রীশ্রী রাধামাধব মন্দির ও শ্রীশ্রী গৌর-নিতাই আশ্রম দর্শনে যান। সে দর্শন সম্বন্ধে ঝধিসর অ্যাপে লিখেছেন গুরু মহারাজ, “ইস্‌কন প্রবর্তক শ্রীকৃষ্ণ মন্দির থেকে ইস্‌কন নন্দনকাননের দূরত্ব ২০ মিনিটের পথ। তাই এখানে আমি গতকাল সন্ধ্যায় এসেছিলাম, শ্রীশ্রী গৌর নিতাই বিগ্রহগণের দর্শন লাভ করেছি এবং অনেক ভক্তের সাথে সাক্ষাৎ করেছি। এটিই বাংলাদেশের প্রথম স্থান যেখানে ইস্‌কন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমাকে এখানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল এবং আমি এখান থেকেই বাংলাদেশে কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচার শুরু করেছি। এখন অনেক ভক্তবৃন্দসহ তাদের একটি বড় মন্দির রয়েছে। তারা কলেজে অনেক প্রচার করে থাকেন। এখানে ২০০ জনেরও বেশি ভক্ত এবং ১০০ জনেরও বেশি ব্রহ্মচারী অবস্থান করছে।”
বিগ্রহগণের অভিষেক অনুষ্ঠানে আগত হাজার হাজার ভক্তদের জন্য প্রতিদিন সকাল, দুপুর এবং রাত্রে তিন দিন ধরে বিনামূল্যে অন্নপ্রসাদ বিতরণ হয়।
প্রায় ৩৫ জনের টিম রন্ধন যজ্ঞে সহযোগিতা করেছিল। গুরুমহারাজ ও তাদের সকলকে আশীর্বাদ ও উপহার প্রদান করেন। এইভাবে বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা উৎসব গুরু মহারাজের দিব্য উপস্থিতিতে এবং ভক্তদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় সফল হয়েছিল এবং বিভিন্ন মন্দির বিশেষ করে শ্রী পুণ্ডরীক ধাম, নন্দনকানন শ্রীশ্রী রাধামাধব মন্দির, কুমিল্লা মন্দিরসহ বিভিন্ন মন্দিরের ভক্তরা স্বশরীরে উপস্থিত থেকে বিভিন্ন সেবা যজ্ঞে অংশগ্রহণ করে এই মহাযজ্ঞ সুসম্পন্নে আন্তরিক সহযোগিতা করেছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here