শ্রীনৃসিংহদেবের কোমল হৃদয়

2
43

শ্রীমৎ কদম্ব কানন স্বামী

ভগবান বিশেষভাবে শুধুমাত্র একজন ভক্তের জন্যই নৃসিংহদেবরূপে আবির্ভূত হন। যদিও তিনি সকল ভক্তদের আরাধ্য, কিন্তু বিশেষভাবে বলতে গেলে শুধুমাত্র একজন ভক্তের জন্যেই তিনি আবির্ভূত হন। এই হলো ভগবানের অভিপ্রায়। এই হলো তাঁর আবির্ভাবের অন্যতম কারণ।

আমি যখন মায়াপুরে ছিলাম তখন সিদ্ধান্ত হলো ভগবান নৃসিংহদেবের বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করা হবে এবং আমার ওপর তখন মায়াপুরের সকল নির্মাণ কার্যের দায়িত্ব ছিল। আমার ওপর ভগবান নৃসিংহদেবের সেই মন্দির নির্মানের গুরুদায়িত্ব আসল এবং তখন আমি এই নির্মাণ কার্য দেখাশোনা করছিলাম।
যখন বিগ্রহ এসে উপস্থিত হলো তখন বিগ্রহকে ট্রাক থেকে নামানোর জন্য আমরা ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। বিগ্রহ তখন বালির ওপর শায়িত ছিল। আমরা বালি খনন করে বিগ্রহকে বের করে আনলাম যার ওজন ছিল ৪৫০ কেজি! ক্রেন ছাড়া বিগ্রহকে বের করে আনা কষ্টসাধ্য ছিল! তবুও আমরা তা করেছিলাম । প্রায় ১২ জন ব্যক্তি এটিকে উত্তোলন করে বেদীতে স্থাপন করল। বিগ্রহ আগমনের শুরু থেকে এভাবে বিগ্রহ সেবার অনুমতি পেয়ে আমি অত্যন্ত খুশী ছিলাম। যদিও অনেকে বলেছিল একজন গৃহস্থকে ভগবান নৃসিংহদেবের বেদীতে যাওয়া উচিত নয়, কেননা তিনি তার গৃহস্থ জীবনকে নাশ করে দিবেন। কিন্তু আমি তা ভ্রুক্ষেপ করিনি (হাসি)।
তাই প্রথম থেকে বিগ্রহের সাথে আমার একটি সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, যেটি হলো সেবার সম্পর্ক। এভাবে চলতে লাগল এবং একসময় সময়ের আবর্তে আমার সেই সেবা পরিবর্তন হয়ে বৃন্দাবনের কৃষ্ণবলরাম মন্দিরে সেবা করার সুযোগ পেলাম। সেখানে বহু বছর ধরে শুদ্ধ জীবন যাপনের স্বাদ আস্বাদন করলাম। একসময় কোনো কারণ বশত বুলেট বিদ্ধ হতে হয়েছিল এবং আরো কিছু প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল যা পরিশুদ্ধতার একটি অবস্থা এবং যেটি নৃসিংহদেবের একটি গম্ভীর রূপ। আমি সুস্থ হয়ে মায়াপুরে চলে আসি এবং ভগবান নৃসিংহদেবের সম্মুখে এসে আমি যেন প্রথমবারের মতো ভীত হলাম! আমি তাঁকে দর্শন করে সত্যিই ভয় পেয়েছিলাম।
এভাবে সেই সময় আমিও তাকে দেখে ভয় পেয়েছিলাম। পরবর্তীতে সত্যিকার অর্থে এটা গভীরভাবে বুঝতে সময় লেগেছিল যে প্রকৃতপক্ষে নৃসিংহদেব কত অনুকম্পাপরায়ন। ভগবান শুধুমাত্র তার ভক্তের জন্য আবির্ভূত হন।
আমি ভাবছিলাম, “কৃষ্ণ কি বহু অসুর হত্যা করেনি? কৃষ্ণ কি সকল বৃন্দাবনবাসীর সুরক্ষা বিধান করেন নি? তিনি কি সকল ভক্তের রক্ষক নন? তাহলে কেন আমরা ভগবান নৃসিংহদেবকে অন্যরূপে দর্শন করব? ভগবানের কি বহু অবতার নেই? জয়দেব গোস্বামী আমাদের কাছে “দশবতার স্তোত্রম” প্রদান করেছেন এবং ভগবানের দশটি ভিন্ন ভিন্ন অবতারের বর্ণনা প্রদান করেছেন। ভগবানের অবতারগণ প্রতি ৪ যুগ পর পর পুনরায় আবির্ভূত হন। ভগবদ্‌গীতায় বর্ণিত আছে –

পরিত্রানায় সাধুনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্ ।
ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে ॥

সাধুদের পরিত্রাণ করার জন্য এবং দুষ্কৃতকারীদের বিনাশ করার জন্য এবং ধর্ম সংস্থাপনের জন্য আমি যুগে যুগে অবতীর্ণ হই।
যদিও বৃন্দাবনে কৃষ্ণের নানাবিধ লীলা রয়েছে, পারমার্থিক জগতেও বিভিন্ন লীলাদি রয়েছে, কিন্তু অসুর সংহার সর্বত্র চলছে। তাই আমরা দেখতে পাই যে, শ্রীল প্রভুপাদ নৃসিংহ চতুর্দশীকে বছরের অন্যতম প্রধান উৎসব হিসেবে উল্লেখ করেছেন। নৃসিংহদেব ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রধান অবতার। ভগবান বামনদেবও অসুর সংহারের মাধ্যমে পৃথিবীকে ভারমুক্ত করার জন্য একটি বিশেষ চাতুর্যের অবতারণা করেছিলেন। পরিশেষে ভগবানের কৃপাতে সর্বাবস্থায় পারমার্থিক জ্ঞান সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডে রক্ষিত থাকবে। অন্যান্য অবতারেও ভগবান বৈদিক শাস্ত্রকে রক্ষা করেছিলেন বিশেষত মৎস্য অবতারে। কিন্তু ভগবান বিশেষভাবে শুধুমাত্র একজন ভক্তের জন্যই নৃসিংহদেবরূপে আবির্ভূত হন। যদিও তিনি সকল ভক্তদের আরাধ্য, কিন্তু বিশেষভাবে বলতে গেলে শুধুমাত্র একজন ভক্তের জন্যেই তিনি আবির্ভূত হন। এই হলো ভগবানের অভিপ্রায়। এই হলো তাঁর আবির্ভাবের অন্যতম কারণ। তিনি ব্যক্তিগতভাবেই প্রত্যেক ভক্তদের সাথে আদান প্রদান করেন। তাই জয়দেব গোস্বামী লিখেছেন বহিনৃসিংহো হৃদয়ে নৃসিংহো- ভগবান নৃসিংহদেব বাহ্যিকভাবে আমাদের ওপর সকল আসুরিক আক্রমণ প্রতিহত করছেন এবং অভ্যন্তরে তিনি বিঘ্ন-বিনাশকরূপে অবস্থান গ্রহণ করেন। তিনি আমাদের সকল বাধা দূর করেন। তাই তিনি প্রহ্লাদ মহারাজের সাথে খুবই ব্যক্তিগতভাবে আকর্ষিত এবং সকল ভক্তের সাথেই ব্যক্তিগতভাবে সম্পর্কযুক্ত। ভগবানের সম্পূর্ণ অবয়ব যেমন তার বজ্রের মতো দাঁত, তার নখ এবং তার উগ্র মূর্তি সবকিছুই ভক্তদের প্রতি তার কোমলতাকে প্রকাশ করে কেননা যখনই তার ভক্ত কোনো বিপদের সম্মুখিন হন তখনই তিনি তাকে রক্ষার জন্য ছুটে আসেন। তাই বাহ্যিক ভাবে তার উগ্রমূর্তি মূলত তার হৃদয়ের অভ্যন্তরে প্রতিটি ভক্তের প্রতি যত্ন বিধান এবং স্নেহের অভিব্যক্তি প্রকাশ করে।

ভগবান আমাদের ব্যক্তিগত পথ প্রদর্শন করেন

যখন আমি ভাবছিলাম হয়তোবা ভগবান একটি বুলেটের ব্যবস্থা করেছেন যেটি অত্যন্ত তীব্র এবং কঠোর। ঠিক এরপরই আমি নিজের কঠোরতাকে দেখি কেননা আমি একজন মাথামোটা ও একধুঁয়ে মানুষ, তখন আমার মনে হয় না আমার কোনো কাজ হবে। ভগবান চাইলে নরম হৃদয়ে আমাদের হৃদয় পরিশুদ্ধ করতে পারেন কিংবা কঠোর হয়েও আমাদের হৃদয় পরিশুদ্ধ করতে পারেন, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, তিনি ব্যক্তিগতভাবে আমাদের পথ প্রদর্শন করেন, যে পথটি আমাদের জন্য উপযুক্ত। সকলেই যে সবকিছু সমানভাবে লাভ করছে তা নয়, কেননা যে কেউ তার নিজস্ব প্রকৃতি ও পরিস্থিতি অনুসারে উপযুক্ত পথ লাভ করবে। তাই আমরা কি বিনম্রচিত্তে কৃপা লাভ করছি নাকি কোনো কঠিন উপায়ে কৃপা লাভ করছি তা গুরুত্বপূর্ণ নয় কেননা আমরা অবগত আছি যে, ভগবান নৃসিংহদেব আমাদের সাথে ব্যক্তিগতভাবে সম্পর্কিত আছেন। শুধুমাত্র ভগবানের প্রতি শুদ্ধ ভক্তি লাভের পন্থা আমাদের নিয়ে আসা ছাড়া তার আর কোনো অভিলাষ নেই । তাই এই ভাবে ভগবানের প্রতি আমাদের বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে। কৃষ্ণের প্রতিও এই ধরনের বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে কেননা কৃষ্ণ যখন অসুর নিধন করেন তখন তিনি একজন রক্ষাকর্তারূপে আবির্ভূত । কিন্তু কৃষ্ণ অসুর নিধন করেন খেলার ছলে। ঠিক যেমন তিনি কালীয় নাগের ফণার ওপর নৃত্য করেছিলেন, এভাবে তিনি তার ভগবত্তা প্রদর্শন করেছিলেন। কিন্তু নৃসিংহদেবের পবিত্র ক্রোধ মূলত তার সহানুভূতির প্রকাশ ।
তার এতভিন্ন কোনো ভাব নেই। সৎস্বরূপ মহারাজ বিবিধ গ্রন্থ লিখেছেন, তার একটি গ্রন্থে তিনি প্রশ্ন করেছেন, “আমি কি অসুর নাকি বৈষ্ণব?” যেই প্রশ্নটি গোপনীয়ভাবে আমাদের সকলের হৃদয়ে রয়েছে। হয়তো আমি আশ্চর্য হতে পারি যে, হিরণ্যকশিপুর মতো অসুরত্ত্ব আমার মধ্যে নেই। তাহলে প্রশ্ন হলো ভগবান নৃসিংহদেব আমাদের কোন বিষয়টি অবলোকন করবেন আমাদের হৃদয়ে থাকা ভক্তিভাব? নাকি হিরণ্যকশিপুর ভাব? সুতরাং পুনরায় নৃসিংহদেবের কাছে নিজেদের ভয়ের অবতারণা। যদি আমি অসুর হই তবে কি ভগবান নৃসিংহদেব আমাকে শাস্তি দিবেন? এভাবে আমরা নিজস্ব পরিপ্রেক্ষিতে ভগবানকে উপলব্ধির চেষ্টা করছি। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে যে, পরমেশ্বর ভগবান অত্যন্ত কৃপালু যিনি তার ভক্তের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সেবার কথাও স্মরণে রাখেন। তাই বৈষ্ণবের সামান্যতম সেবাও ভগবানের কাছে অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ ও সার্থক। তাই তিনি আমাদের ভক্তরূপে গ্রহণ করেন। ভগবানের সান্নিধ্য আমাদের মধ্যকার যত অপবিত্রতা দূরে চলে যায়। তিনি সর্বদাই আমাদের সাথে রয়েছেন তাই তাকে ভক্তবৎসল বলা হয়। ভগবান ভক্তকে তার সীমার উর্দ্ধে বিচার করেন না, যদিও একটি সময় ভক্ত কোনো পরিস্থিতি কঠিন বলে মনে করতে পারেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমরা প্রতিনিয়ত ভগবানের কৃপায় পরিশুদ্ধ হচ্ছি এবং পারমার্থিক শক্তি লাভ করছি।

আমাদের সুহৃদ বন্ধু

তাই আমাদের সর্বদা বিশ্বাসী থাকতে হবে যে, ভগবান হলেন আমাদের শ্রেষ্ঠ সুহৃদ। শ্রীল প্রভুপাদ একবার যখন বললেন যে, ভগবান হলেই আমাদের সর্বোৎকৃষ্ট বন্ধু। তখন ভক্তগণ বললেন, “না, শ্রীল প্রভুপাদ, আপনি আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ বন্ধু।” তখন প্রভুপাদ বলেছিলেন, “না, আমিও তোমাদের হতাশ করতে পারি কেননা আমি পূর্ণ নই, আমি সীমিত কিন্তু কৃষ্ণ হলেন অসীম এবং তিনি আমাদের সবকিছু সম্পর্কে অবগত এবং তিনি আমাদের শুভাকাঙ্ক্ষী। তাই ভয়ের কোনো কারণ নেই। ভগবান সবর্দাই আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ বন্ধু থাকবেন এবং তিনিই আমাদের পালন করবেন। আমার অভিলাষ যাতে খুব শীঘ্রই নিত্যভাবে তার পার্ষদত্ত লাভ করতে পারি।
তাই ভগবান নৃসিংহদেবকে ভয় করার মতো কোনো কারণ নেই, বরং আমরা এই ভেবে পরমানন্দ লাভ করতে পারি যে, তিনি আমাদের রক্ষা করছেন। বহিনৃসিংহো হৃদয়ে নৃসিংহো- তিনি বহির্মুখে আমাদের রক্ষা করছেন, তিনি জড় সাগরে পতিত হওয়ার হাত থেকে আমাদের রক্ষা করছেন। তাই আমরা সেই সুরক্ষা লাভের জন্য এই নৃসিংহ চতুর্দশীতে তার কাছে বার বার প্রার্থনা জানাই, তিনি যেন জড় জগতের বন্ধন থেকে আমাদের মুক্ত করে শীঘ্রই ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নিত্যধামে সেবা করার সুযোগ দান করেন।

লেখক পরিচিতিঃ ১৯৭৮ সালে আমস্টারডামে ইস্‌কনের সাথে যুক্ত হন। ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত তিনি বৃন্দাবনে বিভিন্ন প্রজেক্টের ব্যবস্থাপনায় ছিলেন। ১৯৮৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তিনি মায়াপুরের শ্রীল প্রভুপাদের সমাধি মন্দির নির্মাণের সাথে সংশ্লিষ্ট হন। এরপর তিন বছরের জন্য তিনি বৃন্দাবনে মন্দির সভাপতি হিসেবে নিযুক্ত হন এবং পরবর্তী দু’বছর ইউরোপে কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচার কার্যে সময় অতিবাহিত করেন। ১৯৯৭ সালে সন্ন্যাস দীক্ষায় দীক্ষিত হন এবং বর্তমানে ইস্‌কনের একজন দীক্ষাগুরু হিসেবে তিনি সুপরিচিত।


 

এপ্রিল – জুন ২০১৬ ব্যাক টু গডহেড

2 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here