শুদ্ধভক্তের করুণা

0
46

তিনি কৃপা করে যে আমাদের মতো কত অজ্ঞ দিশাহীনকে মায়ার হাত থেকে উদ্ধার করে কৃষ্ণের আশ্রয় প্রদান করেছেন, তার ইয়ত্তা নেই।

শ্রীমৎ প্রহ্লাদানন্দ স্বামী

শ্রীল প্রভুপাদের কাছে দীক্ষা গ্রহণের জন্য আমি সরাসরি চিঠি দিয়ে শ্রীল প্রভুপাদের কাছে আবেদন জানিয়েছিলাম। পরে শ্রীল প্রভুপাদের তৎকালীন সচিব দেবানন্দ প্রভুর কাছে আমি শুনেছিলাম যে আমার চিঠি পেয়ে শ্রীল প্রভুপাদ বলেছিলেন, “এই ছেলেটাকে আমি কিভাবে দীক্ষা দেব? এর তো কোনো সুপারিশপত্র নেই।” যেহেতু চিঠি দেবার পরও আমি টেলিফোনে সচিব দেবানন্দ প্রভুর সঙ্গে কথা বলেছিলাম, তাই দেবানন্দ প্রভু শ্রীল প্রভুপাদের কথার উত্তরে বলেছিলেন, “আজ্ঞে, অল্পক্ষণ আগে আমি ওর সঙ্গে কথা বলেছি। আমার মনে হয় ছেলেটি বেশ ভাল ভক্ত।” শ্রীল প্রভুপাদ বললেন, “ও তাহলে তুমি ওর জন্য সুপারিশ করছ।” দেবানন্দ প্রভু বললেন, “না, না, আমি তো ওকে চিনিই না। আমি কিভাবে সুপারিশ করব? আমি কেবল ওর সঙ্গে কথা বলেছি।” শ্রীল প্রভুপাদ বলেলেন, “তুমি যদি মনে করো যে, ছেলেটা ভাল, তাহলে আমি ওকে দীক্ষা দেব।”
দীক্ষার আগে আমি একদিন প্রহ্লাদ মহারাজের একটি চিত্র দেখতে দেখতে ভাবছিলাম, “প্রহ্লাদ নামটি বেশ সুন্দর।” অলৌকিকভাবেই দীক্ষার সময় শ্রীল প্রভুপাদ আমার নাম দিলেন “প্রহ্লাদানন্দ।” এরকম একটি ঘটনা আরেকবারও ঘটেছিল। একবার আমি বেশ বিচলিত হয়েছিলাম এবং যৌগিক ধ্যান বিষয়ক চিন্তায় মগ্ন হয় পড়তাম। একদিন শ্রীল প্রভুপাদ আমাকে দেখতে পেয়েই বললেন, “আমাদের পদ্ধতি হচ্ছে ভক্তি, ধ্যান নয়।” শ্রীল প্রভুপাদের সেই অনুভূতি শক্তি দর্শন করে আমি বিস্ময়ে অভিভূত হয়েছিলাম ।
একবার আমি শ্রীল প্রভুপাদকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, “শ্রীল প্রভুপাদ, আমার কি প্রসাদ পাওয়ার ক্ষেত্রে সংযত হওয়া উচিত? “শ্রীল প্রভুপাদ মাথা নেড়ে বললেন, “না, তুমি যত খুশী, প্রসাদ পেতে পার।” এরপর তিনি হাত দিয়ে তাঁর গলা দেখিয়ে বললেন, “কিন্তু এই পর্যন্ত ভর্তি করবে না।” ভক্তরা সবাই হেসে উঠল। শ্রীল প্রভুপাদ ছিলেন এমনই রসিক।
শ্রীল প্রভুপাদের প্রচার কার্য ও উত্তর প্রদানও ছিল অত্যন্ত সহজ সরল। প্রবচন দেওয়ার সময়ও তিনি থাকতেন অনুভূতি প্রবণ, শ্রোতাদের মনোভাবের প্রতি তিনি লক্ষ্য রাখতেন। একবার প্রবচন দেওয়ার শেষে শ্রীল প্রভুপাদ চলে যাবেন, এমন সময় একটি যুবতী মেয়ে এসে তাঁকে জিজ্ঞাসা করল, “ধর্ম আর কৃষ্ণভক্তির মধ্যে পার্থক্য কোথায়?” শ্রীল প্রভুপাদ বললেন, “কৃষ্ণভক্তির অর্থ হচ্ছে, আমরা হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে জপ করি।” এ পর্যন্তই তিনি বললেন। তাঁর উত্তর আমি হৃদয়ঙ্গম করলাম যে, প্রচার করতে গেলে যে, কোনো ব্যক্তি সম্বন্ধে যে পূর্ণ বিশ্লেষণ করতে হবে বা কারোকে আক্রমণ করতে হবে তা নয়। সংক্ষেপে সরলভাবে উত্তর প্রদান করেও কার্যকরী হওয়া যায়।
ডঃ রাও নামে একজন ভারতীয় শ্রীল প্রভুপাদের কাছে আসতেন। যদিও তিনি ছেলেন মায়াবাদী, কিন্তু তিনি চেয়েছিলেন, ভক্তরা যেন তাঁর শহরে একটি কেন্দ্র খোলেন। রূপানুগ সেই কেন্দ্র খুলেছিল। কিন্তু ডঃ রাওকে শ্রীল প্রভুপাদ খুব সাধারণভাবে বোঝাতেন। শ্রীল প্রভুপাদ বলতেন, “তোমার পিতা কে, জানতে হলে তুমি কাকে জিজ্ঞাসা করবে? তোমাকে মায়ের কাছে থেকে সেটি জানতে হবে। তোমার বাবার পরিচয় সম্বন্ধে তোমার মা সব থেকে ভাল জানেন।” ডঃ রাও তা মানলেন না। তাই প্রভুপাদ একই দৃষ্টান্ত বার বার পুনরাবৃত্তি করলেন। “তুমি যদি জানতে চাও, তোমার বাবা কে, তাহলে তোমার মায়ের নিকট থেকে জানতে হবে, অর্থাৎ বেদ থেকে।” ডঃ রাও সেই সরল দৃষ্টান্তটি গ্রহণ করলেন না দেখে, শ্রীল প্রভুপাদ আর বেশী এগোলেন না। সেখানেই তিনি থেমে গেলেন। তারপর ডঃ রাও বললেন, “স্বামীজি, আমি ব্যাক টু গডহেডে পত্রিকার জন্য একটি প্রবন্ধ লিখেছি, কিন্তু প্রকাশিত হয়নি।” প্রভুপাদ তাঁর ছোট্ট ঘন্টিটি নিয়ে বাজালেন। প্রদ্যুম্ন ভেতরে এলে শ্রীল প্রভাপাদ তাকে বললেন, “ডঃ রাও ব্যাক টু গডহেড পত্রিকার জন্য একটি প্রবন্ধ লিখেছেন। সেটি যেন অবশ্যই প্রকাশিত হয়।” আমি ভাবলাম, তাঁর প্রবন্ধ অবশ্যই ছাপা হয়? সেটি কী এমন প্রবন্ধ?” তারপর প্রভুপাদ সবাইকে বললেন, “ব্যাক টু গডহেডের জন্য লেখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমি চাই আমার সমস্ত শিষ্যরা যেন ব্যাক টু গডহেডে এর জন্য লেখা দেয়।” তখন থেকে আমি ব্যাক টু গডহেডে লেখার মহিমা উপলব্ধি করতে শিখলাম। আমি ভেবেছিলাম যে, ডঃ রাও এর লেখা কখনোই ছাপা হবে না। কিন্তু ডঃ রাও-এর প্রতি প্রভুপাদ ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু।
একবার শ্রীল প্রভুপাদ বাফেলো বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে, বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সভাকক্ষে প্রচুর ছাত্রদের মাঝে ভাষণ প্রদান করেছিলেন। তারপর তিনি কোনো প্রশ্ন থাকলে জিজ্ঞাসা করতে বললেন। একট ছেলে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “স্বামীজি, আরে বলুন না। আপনি কি সত্যিই সুখী?” শ্রীল প্রভুপাদ তার দিকে আরও গম্ভীরভাবে তাকিয়ে বললেন, “আমি যদি তোমাকে বলি, তুমি কি তা বিশ্বাস করবে?” ছেলেটি উত্তর দিল, “না, না স্বামীজি, বলুন না। আপনি কি সত্যিই সুখী?”
তারপর শ্রীল প্রভুপাদ সুন্দরভাবে মৃদু হেসে বললেন, “হ্যাঁ, আমি খুব সুখী।” ভক্তরা বলে উঠল, “জয়, শ্রীল প্রভুপাদ!” ছেলেটি তখন দেঁতো হাসি বাদ দিয়ে, গভীর চিন্তামগ্ন হয়ে বসে পড়ল। কেবল মৃদু হাস্য দিয়ে শ্রীল প্রভুপাদ মানুষকে পরাস্ত করতে পারতেন।
বাফেলো বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের একটি অনুষ্ঠান হচ্ছিল। শ্রোতাদের মধ্যে থেকে একজন পুরোহিত বললেন, তিনি মৌন ধ্যানাভ্যাস করেছেন। প্রভুপাদ বললেন যে, মৌন ধ্যান এ যুগের জন্য নয় ।
ভাষণের পূর্বে ব্রহ্মানন্দের পরিচয় প্রদান করে প্রভুপাদ বললেন, “এ হচ্ছে ব্রহ্মানন্দ দাস। সে হচ্ছে আমাদের সংস্থার একজন জ্যেষ্ঠ সদস্য, আমার একজন উন্নত শিষ্য।” ভক্তের পরিচিতি প্রদান করে, শ্রীল প্রভুপাদকে প্রশংসা করতে আমি সেই প্রথমবার দেখলাম। তখনকার দিনে এই আন্দোলনে দুই বা তিন বছর থাকলে, তাকেই জ্যেষ্ঠ ভক্ত বলে বিবেচনা করা হতো। আমি দেখলাম যে, সমস্ত ভক্ত এবং শ্রোতাদের সামনেই শ্রীল প্রভুপাদ তাঁর শিষ্যের প্রশংসা করলেন। সেই ব্যাপারটি আমাকে বেশ প্রভাবিত করেছিল।
বাফেলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐ অনুষ্ঠান থেকে ফেরার পথে, একটি গাড়ির পিছনের সীটে প্রভুপাদ বসেছিলেন এবং আমি বসেছিলোম অন্য একটি গাড়ির সামনের সীটে। পাশাপাশি যেতে যেতে যতবারই শ্রীল প্রভুপাদকে দেখি ততবারই আমি প্রণাম জানাচ্ছিলাম। আমার মনে হয়, সেই ভ্রমণের সময় আমি শ্রীল প্রভুপাদকে কয়েকশ বার প্রণাম জানিয়েছিলাম। পরে ব্রহ্মানন্দ প্রভুর সঙ্গে
দেখা হলে, তিনি আমায় জানিয়েছিলেন, “হ্যাঁ, তুমি যখন প্রভুপাদকে প্রণাম জানাচ্ছিলে, তখন তিনি তা লক্ষ্য করে মাথা নাড়াচ্ছিলেন।” শ্রীল প্রভুপাদ ভেবেছিলেন, এতো বড় মজার ব্যাপার।
মন্দিরের কয়েকজন ভক্তের নাম উল্লেখ করে সৎস্বরূপ মহারাজ প্রভুপাদের নিকট তাদের গুণাবলী বর্ণনা করছিলেন। শ্রীল প্রভুপাদ বললেন, “ভক্ত মানে হচ্ছে সর্বোচ্চ স্তরের। যাঁরা ভক্ত, তাঁরাই হচ্ছেন প্রথম শ্রেণীর।” তার অর্থ হচ্ছে, বিভিন্ন ব্যক্তির গুণ বিশ্লেষণ করার পরিবর্তে শ্রীল প্রভুপাদ বললেন, “কেউ যদি ভক্ত হন, তাহলে তিনিই প্রথম শ্রেণীর।”
আমি একবার চিঠি লিখে শ্রীল প্রভুপাদকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, “ভাব থেকে কিভাবে প্রেমে উপনীত হতে হয়?” আসলে আমি তখন বন মহারাজের লেখা ভক্তিরসামৃত সিন্ধু পাঠ করছিলাম। রূপানুগকে শ্রীল প্রভুপাদ বলেছিলেন, আমরা যেন ঐ গ্রন্থের তাৎপর্যই কেবল পাঠ করি, অনুবাদগুলি নয়। তাৎপর্যগুলি ছিল শ্রীল জীব গোস্বামীর অথবা শ্রীল বিশ্বনাথ চক্রবর্তী ঠাকুরের সম্পাদিত। আমার এই গ্রন্থ পাঠ করা রূপানুগ পছন্দ করেনি, তবুও আমি গোপনে গোপনে রাত জেগে পাঠ করছিলাম। আমি ভেবেছিলাম, তাতে করে আমি কিছু বিশেষ ধরনের উপলব্ধি লাভ করতে পারব। অল্প দিনের মধ্যেই আমি বুঝে ফেললাম যে, আমি এখন ভাব স্তরে উপনীত হয়েছি, আর কিছু দিনের মধ্যেই প্রেম স্তরে উপনীত হব, এখন কেবল একটা সময়ের ব্যবধান মাত্র। সেই জন্যই আমি শ্রীল প্রভুপাদকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম যে, ভাব থেকে কীভাবে প্রেম স্তরে উপনীত হওয়া যায়? উত্তরে তিনি পূর্ণ এক পৃষ্ঠা প্রচারের ব্যাপারে লিখেছেন, দেখে আমি তো অবাক। শ্রীল প্রভুপাদ লিখেছেন, “আমি শুনেছি যে, বাফেলোতে তোমরা সবাই প্রচারে গিয়ে, সমগ্র বাফেলো জুড়ে হরিনাম সংকীর্তন করা, ভগবদ্গীতা বিতরণ করা, আর যত বেশী সম্ভব ভগবদ্গীতা সম্বন্ধে প্রচার করো। তোমাদের দেশের ছেলে মেয়েরা সাধারণত ভাল, সেই জন্যই তারা এমন একটি সুন্দর দেশে জন্মগ্রহণ করেছে। এখানে সানফ্রান্সিসকোতেও ঠিক তাই, আমরা এখানে রথযাত্রা করলাম, তাতে প্রায় দশ হাজার ছেলে মেয়ে দিব্য প্রেমে উন্মাদ হয়ে নৃত্য করেছে। আমি শুনেছি যে, দু সপ্তাহের মধ্যে নিউইয়র্কে বিতরণ করছো তিন হাজার ব্যাক টু গডহেড পত্রিকা, আর বাফেলোতে তোমরাও খুব ভালভাবে ব্যাক টু গড়হেড পত্রিকা বিতরণ করছ। এই সেবা তোমরা চালিয়ে যাও, তাহলে তোমাদের জীবনের সাফল্য সুনিশ্চিত। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যেখন দেখবেন যে, তোমরা তাঁর অন্যান্য সন্তানদেরকেও চিন্ময় ধামে ফিরিয়ে আনার জন্য আন্তরিকভাবে কাজ করছ, তখন তিনি তোমাদের ওপর তাঁর সমস্ত করুণা বর্ষণ করবেন। সুনিশ্চিত থাকবে যে, তাঁর সেবা করার জন্য তোমরা যে চেষ্টা চালাচ্ছ, তার জন্য শ্রীকৃষ্ণ কখনো অকৃতজ্ঞ হতে পারেন না।
“এই সমস্ত লোকেরা অসুখী। আমরা কেবল চাই তারা সুখী হোক। আমার মনে হল, শ্রীল প্রভুপাদের সেই দয়াদ্রবাণীই হচ্ছে সমগ্র কৃষ্ণভাবনামৃতের একমাত্র উদ্দেশ্য। আমরা চেষ্টা করছি অসুখী লোকদেরকে সুখী করতে।”
ভাব থেকে কীভাবে প্রেম স্তরে উপনীত হওয়া যাবে? তোমার সেই প্রশ্নের ব্যাপারে বলতে চাই, এই মুহূর্তে এত উন্নত স্তরের প্রশ্ন নিয়ে এতটা বিব্রত হওয়ার প্রয়োজন নেই। অল্প দিনের মধ্যেই আমি ভক্তিরসামৃতসিন্ধু প্রকাশ করব, তাতে এই সমস্তই আলোচনা করা হবে। তোমার চিঠিতে লিখেছ যে, আমাকে পঞ্চাশ ডলার চিঠির সঙ্গে পাঠিয়েছ, আমি কিন্তু তোমার চিঠির সঙ্গে কোনো ডলারই পাইনি। তুমি কি জান, তার কী হল?”
এই চিঠি পেয়ে তৎক্ষণাৎ আমি উপলব্ধি করলাম যে, শ্রীল প্রভুপাদ যথেষ্ট সংবেদনশীল। আমার প্রশ্নের উত্তর সরাসরি না দিয়ে, তিনি অন্যভাবে প্রদান করেছেন। এই ধরনের উত্তর আমি আশা করিনি, তবে আমি যদি সত্যিই উন্নত স্তরের কৃষ্ণভক্তি লাভ করতে চাই, তবে তার উপায় হচ্ছে, প্রচারে গিয়ে, শ্রীল প্রভুপাদের গ্রন্থ বিতরণ করতে হবে, আর রাস্তায় রাস্তায় নগর সংকীর্তন করতে হবে। তার মাধ্যমেই ধীরে ধীরে আমি আমার ঈপ্সিত লক্ষ্যে উপনীত হতে পারব।
আর একবার শ্রীল প্রভুপাদের আগমনে, তাঁকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য ভক্তরা বিমান বন্দরে গিয়ে, একেবারে হুলস্থুল কাণ্ড বাঁধিয়ে ফেলেছিল। বিমান বন্দরের মধ্যে দৌড়ে চিৎকার করে, নেচেগেয়ে, অন্য লোকেদের প্রতি কোনোরূপ ভ্রুক্ষেপ না করে হৈ-হুল্লোড় করেছিল। এই ধরনের ব্যবহার দেখে প্রভুপাদ অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। যা হবার তা তো হল, তারপর আমরা সবাই গেলাম কেশব প্রভুর বাসায়। শ্রীল প্রভুপাদ ওপর তলায় এলে, আমরা তাঁর অভিষেক করলাম। আমি তাঁকে বাতাস করছিলাম, আমার মনে আছে, তিনি কতটা অনুকম্পা পরবশ হয়ে উঠেছিলেন। তিনি বললেন, “এই সমস্ত লোকেরা অসুখী। আমরা কেবল চাই তারা সুখী হোক। আমার মনে হল, শ্রীল প্রভুপাদের সেই দয়াদ্রবাণীই হচ্ছে সমগ্র কৃষ্ণভাবনামৃতের একমাত্র উদ্দেশ্য। আমরা চেষ্টা করছি অসুখী লোকদেরকে সুখী করতে।”
সেই অনুষ্ঠানের পর শ্রীমৎ তমালকৃষ্ণ স্বামী এবং শ্রীমৎ বিষ্ণুজন স্বামী প্রভুপাদের নিকট তাঁদের বার্কলিতে ছাত্রদের মধ্যে প্রচার সম্বন্ধে কয়েকটি ঘটনা বললেন। তাঁরা শ্রীল প্রভুপাদকে বললেন, “আমরা বিনামূল্যে প্রসাদ বিতরণ করছিলাম, তাতে বার্কলির দোকানদাররা ঝামেলা করছিল। ফুটপাতের দোকানদাররা আমাদের প্রতি হিংসা করে পুলিশ প্রধানের নিকট অভিযোগ জানিয়েছে যে, বিনা লাইসেন্সে খাদ্য বিতরণ করে আমরা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছি। তারপর আমরা হাজার হাজার ছাত্রের নিকট থেকে আবেদন পেলাম যে, তারা খাবার চায়। আমরা তখন সেই আবেদন পুলিশ প্রধানকে দেখালাম। আমরা তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, “কোনটি বেশী গুরুত্বপূর্ণ? হাজার হাজার ছাত্রের স্বাক্ষর করা আবেদন, না কয়েকজন দোকানদারের স্বাক্ষর করা আবেদন?” তখন তিনি বললেন, “ঠিক আছে।” দোকানদাররা তারপর ভক্তদেরকে আক্রমণ করেছে, আর তমালকৃষ্ণ মহারাজ আর বিষ্ণুজন মহারাজ ভক্তদেরকে বাঁচিয়েছেন। কয়েক মিনিট চিন্তা করে শ্রীল প্রভুপাদ বললেন, “হ্যাঁ, চৈতন্য মহাপ্রভুর আন্দোলন মানেই, তার জয় অবধারিত।” ভক্তরা বলে উঠল, “জয়, শ্রীল প্রভুপাদ!” রথ নির্মাণে ব্যস্ত জয়ানন্দ প্রভু, ততক্ষণে পিছনের দিকে ঘুমিয়ে পড়েছেন। ভক্তরা তাঁকে জাগিয়ে তুলতে যাচ্ছিল, কিন্তু শ্রীল প্রভুপাদ বললেন, “না, জাগাবে না, তোমরা সবাই মিলে যা করছ, ও তার থেকে বেশী সেবা করছে। তারপর আমরা যখন বেরিয়ে আসব, সেই সময়ে কেউ একজন প্রভুপাদের নিকট বড় একটা পাত্রে করে প্রচুর ফল নিয়ে এল। আমি ভাবলাম, “বাহ্ এখন আমাদের একদফা ভোজ হয়ে যাবে।” শ্রীল প্রভুপাদ সামান্য একটু প্রসাদ নিয়ে, ভক্তদের মধ্যে কিছু বিতরণ করলেন। তিনি আমাকে একটা স্ট্রবেরি দিয়ে বললেন, “রাত্রে খুব বেশী খাবে না।”
আর একটি ঘটনার কথা মনে পড়ছে। এক মাতাজী, রাধাকালাচাঁদজীর বিগ্রহের সমস্ত রং উঠিয়ে ফেলে, পুনরায় রং করতে যাচ্ছে। শ্রীল প্রভুপাদ বললেন, “এ কাজ করতে তোমাকে কে বলেছে?” মাতাজী বলল, “বরদরাজ।” শ্রীল প্রভুপাদ বললেন, “বরদরাজ? কে বরদরাজ?” মাতাজী তখন ভয়ে কাঁপতে শুরু করেছে। শ্রীল প্রভুপাদ বললেন, “আমি তোমার গুরু এবং আমি এখানে বর্তমান। তুমি আমাকে জিজ্ঞাসা করলে না কেন? মাতাজী কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে গেল। তখন আমরা রাধাকালাচাঁদজীর বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করতে পারব কিনা, তাই নিয়ে সংশয় দেখা দিল। তাড়াতাড়ি শুকাবে এমন কিছু রঙ ভক্তরা জোগাড় করে এনে বিগ্রহ রঙ করল, আর শ্রীল প্রভুপাদ তখন তাদের প্রতিষ্ঠা করলেন। আমি ভাবি যে, শ্রীল প্রভুপাদ কত দক্ষতার সাথে প্রত্যেককে পরিচালনা করেছেন। শ্রীল প্রভুপাদ নিজে যজ্ঞানুষ্ঠান করার পর, তিনি বিগ্রহের প্রথম মহাআরতি নিবেদন করলেন। তা দর্শন করে সমগ্র মন্দিরের ভক্তরা আনন্দসাগরে নিমজ্জিত হল। শ্রীশ্রীরাধাকালাচাঁদজী এবং শ্রীল প্রভুপাদের করুণাবর্ষণ প্রভাবে সমগ্র মন্দির প্রাঙ্গণ তখন বৈকুণ্ঠে পরিণত হল ।
একবার গুরুকুলের ছাত্ররা ভগবদ্গীতার শ্লোক পাঠ করছিল। তাদের মধ্যে একজন কৃষ্ণস্মরণম এর স্মৃতিশক্তি ছিল খুব প্রখর। আমি মন্দিরে না থাকলেও, ভগবদগীতার শ্লোক মুখস্থ করছিলাম, কেন না পুরো এক অধ্যায় মুখস্থ বলতে পারলে, পুরো একথালা মহাপ্রসাদ পাওয়া যেত। আমিও গুরুকুলের ছাত্রদের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছিলাম, যাতে আমি একথালা মহাপ্রসাদ লাভ করতে পারি। সেই ছোট্ট বালকটি যখন এতগুলো শ্লোক বলে ফেলল, আমি তখন ভাবলাম, “বাঃ, এতো চমকার! এ বেশ দক্ষতা অর্জন করেছে। প্রভুপাদ তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তাহলে, অনুবাদ বল।” কৃষ্ণস্মরণম বলল, “আমি জানি না।” প্রভুপাদ বললেন, “এটা কোনো কাজের নয়। অনুবাদ অবশ্যই জানতে হবে।” তখন আমি উপলব্ধি করলাম যে, শ্লোকের অর্থ তাহলে আমাকেও জানতে হবে। কেবল মাত্র তোতা পাখির মতো আউড়ে যাওয়াই যথেষ্ট নয়।
সেদিন রাত্রে দূরদর্শনে শ্রীল প্রভুপাদের আগমন দেখানো হচ্ছিল, তাই আমরা সবাই দেখলাম। বিমানবন্দরে শ্রীল প্রভুপাদের আগমন দূরদর্শনের ক্যামেরা রেকর্ড করেছে। পুরুষোত্তম ফিরে এসে বলল যে, ঘুমানোর পূর্বে শ্রীল প্রভুপাদ বললেন, প্রতিদিন রাত্রে শ্রীকৃষ্ণের নিকট আমি প্রার্থনা করি, তিনি যেন কৃপাপূর্বক আমাকে মায়ার হাত থেকে রক্ষা করেন।”
শ্রীল প্রভুপাদ ছিলেন শুদ্ধভক্ত। তিনি কৃপা করে যে আমাদের মতো কত অজ্ঞ দিশাহীনকে মায়ার হাত থেকে উদ্ধার করে কৃষ্ণের আশ্রয় প্রদান করেছেন, তার ইয়ত্তা নেই। শুদ্ধভক্তের করুণা এমনই ।

শ্রীমৎ প্রহ্লাদানন্দ স্বামী ১৯৪৯ সালে নিউইয়র্কের বাফেলোতে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬৯ সালে বাফেলো ইউনিভার্সিটিতে অধ্যয়নকালে শ্রীল প্রভুপাদের সাথে সাক্ষাৎ হলে সে বছরই প্রভুপাদকে গুরুরূপে বরণ করেন। ১৯৮২ সালে তিনি সন্ন্যাস আশ্রম গ্রহণ করেন। ১৯৮৯ সালে বৃন্দাবনের বৈষ্ণব ইনস্টিটিউট ফর হায়ার এডুকেশনের সম্মানিত সদস্য হন। বর্তমানে তিনি জিবিসিতে দায়িত্বরত আছেন। 


 

এপ্রিল-জুন ২০১৫ ব্যাক টু গডহেড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here