রাধারাণীর নাম কেন শ্রীকৃষ্ণের আগে উচ্চারণ করা হয়?

0
99

রাধাবিনোদিনী দাসী: একদা অমর্ত্যধাম গোলক বৃন্দাবনে শ্রীভগবান রত্নসিংহাসনে বসে আছেন এমন সময় হঠাৎ তাঁর হৃদয়ে আকস্মিকভাবে ইচ্ছা জাগে প্রেমলীলা করার। লীলা কাকে বলে? ভগবানের আনন্দময় উচ্ছ্বাসের নাম লীলা। ভক্ত ও ভগবানের মিলন বৈচিত্রের নাম লীলা। যে মুহূর্তে বাসনার উদ্রেক হল সে মুহূর্তেই তাঁর বাম অঙ্গ থেকে আবির্ভূতা হলেন এক অপরূপ স্ত্রী। কোটি চন্দ্রের স্নিগ্ধতা তাঁর সর্বাঙ্গে। গলিত স্বর্ণের থেকেও অধিক উজ্জ্বল বর্ণবিশিষ্টা তিনি। শরতের শত পদ্মের সুষমাকেও পরাজিত করে এমন মুখসৌষ্ঠব, অতুলনীয়া অঙ্গসৌন্দর্য তাঁর।

পীতবর্ণা রত্ন ঘটা, জিনিয়া জানুর ছটা,
যেই হরে তাঁর গর্ব মান।
শরতের পদ্ম যিনি, শ্রীচরণ দুইখানি,
নূপুরের ধ্বনি যার গান ॥
কোটি পূর্ণিমার চান্দ, জিনিয়া নখের ছান্দ,
ঝলমল কিরণ যাহার।
সাত্ত্বিকাদি ভাবগণ, আকুল তাহার মন,
তাতে হয় বিগ্রহ যাহার ॥
যার কটাক্ষ কামশরে, কৃষ্ণে উন্মাদিত করে,
মনাব্ধির তরঙ্গ বাঢ়ায়।
হেন বৃন্দাবনেশ্বরী, তাঁরে বঁন্দো কর যুড়ি,
কৃষ্ণ প্রিয়াগণানন্দ তায় ॥
মহাভাব মাধুরী, যাঁহাতে উদয় করি,
বিহ্বল করয়ে অতিশয়।
অশেষ নায়িকার গুণ, তাঁতে হয় প্রকটন,
অপরূপ চরিত্র আশয় ॥

(শ্রীভাষাচাটু পুষ্পাঞ্জলি)

রত্নসিংহাসনে শ্রীকৃষ্ণের বামপার্শ্বে উপবিষ্টা হলেন তিনি। আবির্ভূতা হয়েই শ্রীকৃষ্ণকে আরাধনা ও পুষ্পচয়ন করবেন বলে উদ্যানের দিকে ধাবমান হলেন। তাই তাঁর নাম হল রাধা। কারণ, ‘রা’ অর্থে ‘আরাধিকা’ আর ‘ধা’ অর্থে ‘ধাবমানা’। এই যে ভগবান এক দেহ থেকে দুই দেহ হলেন, শ্রীল জীব গোস্বামীপাদ এই ঘটনাকে ব্যাখ্যা করলেন ‘চাণক্যবৎ’ বলে। অর্থাৎ মটরের মত। যেমন একটি মটরদানাকে ভিজিয়ে রাখলে সেটি ফুলে যায়। তারপর হাতের সামান্য চাপে তা থেকে দুটি অর্ধাংশ বেড়িয়ে আসে। দুটি অংশই কিন্তু সমান। অথচ শুকনো অবস্থায় বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় ছিল না যে ভিতরে দুটি সমান অর্ধাংশ আছে। ঠিক তেমন “রাধাকৃষ্ণ তত্ত্ব”। কোনো ভেদ নেই তাঁদের মধ্যে। এক আত্মা, দুই দেহ তাঁরা।

রাধাকৃষ্ণ এক আত্মা, দুই দেহ ধরি’।
অন্যোন্যে বিলসে রস আস্বাদন করি ॥

(চৈ. চ. আদি ৪/৫৬)

অধর্মের বিনাশ ঘটিয়ে ধর্ম সংস্থাপন করতে, দুষ্টদের হাত থেকে সাধু ব্যক্তিদের পরিত্রাণ দিতে, দ্বাপর যুগে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিজের গোপবেশ, বেণুকর, নবকিশোর, নটবর যে প্রকৃত স্বরূপ, সেই স্বরূপ ধারণ করেই অবতীর্ণ হয়ে লীলা করলেন ধরিত্রীতে। চিন্ময়ধাম গোলক বৃন্দাবনে তিনি শ্রীমতিরাধাসহ যে প্রেমবিলাস করেন সেই লীলাই মর্ত্যলোকে বা ভৌম বৃন্দাবনে করেন এই কৃষ্ণ অবতারে।

কৃষ্ণের যতেক খেলা, সর্বোত্তম নরলীলা,
নরবপু তাহার স্বরূপ।
গোপবেশ বেণুকর, নবকিশোর নটবর,
নরলীলার হয় অনুরূপ ॥

(চৈ.চ.অন্ত্য)

অতএব লৌকিক জগতের সাধারণ নরনারীর মতো তাঁদের কল্পনা করতে নেই। তাঁদের অবতরণ কেবল নরলীলা বিগ্রহরূপে কেবল। আমাদের মতো পঞ্চভৌতিক উপাদানে তাঁদের শরীর গঠিতও নয়। তাঁরা কামবাসনায় বদ্ধ নন। তাঁদের তনু সচ্চিদানন্দময় (সদ্+চিদ্+আনন্দ)। সদ্ অর্থাৎ পূর্বে ছিলেন এখনও আছেন পরেও থাকবেন। চিদ্ অর্থাৎ যাঁর চেতনা সর্বদা বলবতী থাকবে কোনোদিন কোনোকালে তা লুপ্ত হবার নয়। আর যার ভিতর কেবল আনন্দই আনন্দ, আনন্দ ভিন্ন অপর কিছু নেই তিনি ভগবান। ভগবানের এই আনন্দ অংশের বা হ্লাদিনী শক্তির দ্বারা ভগবান নিজে আনন্দ লাভ করেন ও প্রতিটি জীবকে আনন্দ দান করেন। এখন জগতে যত প্রকার আনন্দ আছে সকলের প্রধান হল প্রেম যা দ্বারা ভগবদ্ মাধুরী আস্বাদন করা যায়। প্রেমের সার বস্তু হল ভাব। আর ভাবেরও সার বস্তু হল মহাভাব। এই মহাভাবের মূর্তিমন্ত রূপ হলেন শ্রীমতি রাধা ঠাকুরাণী।

প্রেমের পরমসার মহাভাব জানি।
সেই মহাভাবরূপা শ্রী শ্রী রাধাঠাকুরাণী ॥

(চৈ.চ. আদি)

মহাভাব কি? যেমন আখের বীজ থেকে আখ হয় তারপর তা থেকে ক্রমে রস, রস থেকে গুড়, গুড় থেকে খণ্ডসার, খণ্ডসার থেকে শর্করা, শর্করা থেকে সিতা, সিতা থেকে মিশ্রি, মিশ্রি থেকে ওলা হয় তেমনি প্রেম কতগুলো ধাপ পেড়িয়ে পরিণত হয় মহাভাবে। সেগুলি কি কি? প্রেম, স্নেহ, মান, প্রণয়, রাগ, অনুরাগ, ভাব, মহাভাব। প্রেম কাকে বলে? “অনন্যমমতা বিষ্ণৌ মমতা প্রেমসঙ্গতা”- একমাত্র ভগবানেই মমতা অর্থাৎ হৃদয়ের যাবতীয় ভালো লাগা, ভালোবাসা, আকর্ষণ, আসক্তি শুধুমাত্র শ্রীভগবান কৃষ্ণের জন্য হয় তখন সেই মনোবৃত্তির নাম প্রেম। আর জগতের এই যে এত সব সম্পর্ক তা সেই ভগবৎ প্রেমের আভাস বা প্রেমাভাস। প্রেম একমাত্র ভগবানের সঙ্গেই সম্ভব।

রাধা-পূর্ণশক্তি, কৃষ্ণ-পূর্ণশক্তিমান।
দুই বস্তু ভেদ নাই শাস্ত্র পরমান ॥

(চৈ. চ.আদি ৪/৯৬)

শ্রীমতি রাধারাণী হচ্ছেন পূর্ণশক্তি এবং শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন পূর্ণ শক্তিমান। তাঁদের দুজনের মধ্যে কোন ভেদ নেই, এই কথা শাস্ত্র প্রমাণিত হয়েছে। রাধা ও কৃষ্ণে তাই কোন ভেদ নেই। লীলারস পুষ্টির জন্য দুটি দেহ ধারণ।
এমন যে রাধা ঠাকুরাণী ধরিত্রী মাঝে তাঁর অবতরণ বৈবস্বতীয় সপ্তম মন্বন্তরের অষ্টাবিংশতি চতুর্যুগের দ্বাপরের শেষে। বিশাখা নক্ষত্র যোগে, ভাদ্রমাসের শুক্লপক্ষের অষ্টমী তিথিতে মধ্যাহ্ন কালে। অভিজিৎ যোগের শুভক্ষণে রাজা বৃষভানুর পত্নী রাণী কীর্তিদার গর্ভ থেকে জন্ম নেন তিনি।
শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন – যে ব্যক্তি ‘রা’ উচ্চারণ করে আমি ব্যগ্র হয়ে তাকে উত্তম ভক্তি প্রদান করি। পরে যখন ‘ধা’ উচ্চারণ করে তখন আমি তার মুখ থেকে রাধানাম শ্রবণের লোভে তার কাছে চলে যাই। যে ব্যক্তি ষোড়শ উপাচারসহ নিত্য আমার আরাধনা করে তাতে আমি যত না প্রীত হই তার থেকে বেশি সন্তুষ্ট হই রাধানাম উচ্চারণ করলে। (ব্রঃ বৈঃ কৃঃ জঃ ১৫/৭০-৭২)
“রাধা-কৃষ্ণ। প্রথমে রাধার নাম কেন? রাধারাণীর চেয়ে শ্রেষ্ঠতর ভক্ত কেউ নেই। যখন রাধার নাম উচ্চারিত হয় তখন কৃষ্ণ অধিকতর আনন্দিত হন। সেটিই পদ্ধতি। যদি ভগবানের সম্মুখে আমরা ভক্তদের চরিত্র, তাদের গুণকীর্তন করি, সরাসরি স্বয়ং তাঁর মহিমা কীর্তনের চেয়েও ভগবান বেশি সন্তুষ্ট হন।”

(শ্রীল প্রভুপাদ হাওয়াই মার্চ ২৪, ১৯৬৯ প্রবচন)

সরাসরি কৃষ্ণের নাম উচ্চারণ থেকে তার ভক্তের মহিমা কীর্তন করলে তখন ভগবান আরো বেশি সন্তুষ্ট হন। ভগবানের মূখ্য নাম রয়েছে সেগুলো হলো: রোহিনী নন্দন, যশোদা নন্দন, গোবিন্দ ও গোপীনাথ। এইভাবে যখন কৃষ্ণকে তার ভক্তদের সাথে সম্পর্কিত করে কোনো নাম দ্বারা সম্বোধিত করা হয় তখন ভগবান আরো বেশি সন্তুষ্ট হন।
এজন্য ভগবানের শক্তি রাধারাণী, সীতাদেবী ও লক্ষ্মীদেবী। রাধারাণী সেই মূল আদি শক্তি (হ্লাদিনী শক্তি)। তাঁর প্রকাশ সীতাদেবী ও লক্ষ্মীদেবী। সুতরাং তার শক্তিকে যখন আমরা আগে সম্বোধন করি তখন ভগবান আরো বেশি সন্তুষ্ট হন। এইভাবে (অহম্ ভক্ত পরাধীনো) নীতি স্থাপন করেন। অর্থাৎ ভগবান ভক্তের কাছে পরাধীন। তাই আমরা যেন ভগবানের ভক্তের চরণে কোনো অপরাধ না করি। তাদের সন্তুষ্ট করলেই ভগবান সন্তুষ্ট হবে। তাই মহাজন লিখেছেন-

জয় জয় রাধানাম প্রেমতরঙ্গিণী।
প্রেমতরঙ্গিণী নাম সুধাতরঙ্গিণী ॥
জপিতে জপিতে উঠে অমৃতেরও খনি।
বংশীনাদে গান করে ব্রজের নীলমণি ॥

তাই তো অমৃতের খনির আশায় বংশীবদন কৃষ্ণের বংশী কেবল ‘রাধা রাধা’ সুর তোলে। বৃন্দাবনবাসীরা তাই প্রতিটি কথার শুরুতে রাধে রাধে বলে। তারা প্রশংসাও করে রাধার নাম আগে বলে আবার তিরষ্কারও করে রাধার নাম আগে বলে। রাধারাণীর কৃপাতেই কৃষ্ণচরণ প্রাপ্ত হওয়া যায় সহজে।
শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর বলতেন “আমরা গৌড়ীয়, রাধারাণীর ভক্ত। যারা বিষ্ণুভক্ত তাদেরকে বলা হয় ‘বৈষ্ণব’। যারা কৃষ্ণ ভক্ত তাদেরকে বলা হয় ‘কার্ষ্ণ’। সেই রকম যারা রাধারাণীর ভক্ত তাদের বলা হয় ‘গৌড়ীয়’। তিনি আরো বলতেন ‘আমরা আসলে কৃষ্ণের আরাধনা করি না ও কৃষ্ণের ভক্ত নই। আমরা রাধারাণীর ভক্ত। কিন্তু আমরা কেন কৃষ্ণের আরাধনা করি? কৃষ্ণের পূজা করি?
যেহেতু রাধারাণীর সাথে কৃষ্ণের একটা সম্পর্ক আছে, সেজন্য আমরা কৃষ্ণকে আরাধনা করি। কারণ তিনি রাধাকান্ত রূপে অভিহিত। তিনি হচ্ছেন রাধার কান্ত। যদি রাধারাণীর সাথে কৃষ্ণের সম্পর্ক না থাকত তাহলে আমরা কৃষ্ণের সেবা করতাম না।
কলিযুগের মহামন্ত্রেও শ্রীরাধারাণীর নাম ‘হরে’ ভগবানের হ্লাদিনী শক্তি প্রথমে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here