যেই কৃষ্ণ সেই জগন্নাথ

0
86

গৌর গোবিন্দ স্বামী : দ্বারকার কৃষ্ণের ষোল হাজারের অধিক পত্নী ছিলেন এবং তিনি প্রত্যেক রাণীর প্রাসাদে সমভাব একই সময়ে উপস্থিত থাকতেন। কৃষ্ণ প্রায়ই রাত্রিতে ঘুমের ঘোরে এক পাগলের মত প্রলাপ করতে করতে রাধে রাধে রাধে’ বলে ক্রন্দন করতে থাকেন। যদিও তাঁর পত্নীরা অতি সযত্নে সেবা করতেন, তথাপি তিনি সুখী ছিলেন না। স্বপ্নের ঘোরে কৃষ্ণ গোপী, গোপী, গোপী, রাধে রাধে’ বলে ক্রন্দন করতেন। রাণীরা তা শুনলে আশ্চর্য হতেন ‘কেন?’ “আমরা আমাদের প্রিয়তম প্রভুকে সকল প্রকার সুখ প্রদান করছি, আমরা কত সযত্নে তাঁর সেবা করছি, কিন্তু তথাপি তিনি কেন রাধে রাধে, গোপী, গোপী বলে ক্রন্দন করছেন? সেই গোপীরা কারা? সেই রাধা বা কে?

তাঁরা কিছু বুঝতে পারেন না, কারণ তাঁরা হচ্ছেন ঐশ্বর্যময়ী। তাঁরা মাধুর্যলীলা, ব্রজলীলায় প্রবেশ করতে পারেন না। এমনকি লক্ষ্মীদেবীও ব্রজ লীলায় প্রবেশ করবার মানসে এবং রাসনৃত্যে অংশগ্রহণ করবার সঙ্কল্পে বিল্ববনে হাজার হাজার বছর তপস্যা করেছিলেন। কিন্তু কৃষ্ণ প্রশ্ন করেছিলেন, “তুমি কেন এত কঠোর তপস্যা করছ। তোমার আকাঙ্ক্ষা কি?” প্রত্যুত্তরে লক্ষ্মীদেবী বললেন, “আমার বড় অভিলাষ ব্রজে প্রবেশ করে রাসলীলায় অংশগ্রহণ করা।”

শ্রীকৃষ্ণ বললেন, “না, তা সম্ভব নয়। অন্য কিছু চাও।”

লক্ষ্মীদেবী মাধুর্যময়ী লীলায় প্রবেশ করতে পারলেন না, কারণ তিনি ঐশ্বর্যময়ী। তাই লক্ষ্মীদেবী পুনর্বার বললেন, “হে নাথ। আমি কি করব? যদি আমি রাসলীলায় অংশগ্রহণ করতে না পারলাম, তাহলে আমাকে আপনার বক্ষঃস্থলে এক স্বর্ণরেখার ন্যায় অবস্থান করার অনুমতি প্রদান করুন।” তখন শ্রীকৃষ্ণ উত্তর করলেন, “আচ্ছা, তা-ই হবে।” এটাই অনুমোদিত হল। তাই সেই অনুজ্ঞায় লক্ষ্মীদেবী এক স্বর্ণরেখারূপে শ্রীকৃষ্ণের বক্ষঃস্থলে অবস্থান করতে লাগলেন; কিন্তু তিনি ব্রজ-লীলায় প্রবেশ করতে পারলেন না।

মাধুর্যময় লীলায় প্রবেশ করতে অসমর্থ হয়ে একদিন রাণীরা রোহিণী মাতাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “প্রায় সময় আমরা শুনেছি কৃষ্ণ রাত্রিতে ঘুমের ঘোরে রাধে রাধে রাধে, গোপী, গোপী বলে ক্রন্দন করছেন। মাতা, তা কি? আপনি সে সম্বন্ধে কিছু আলোকপাত করবেন কি?

রোহিণী মাতা বললেন, তোমরা তা বুঝতে পারবে না। এটি হচ্ছে কৃষ্ণের ব্রজলীলা, মাধুর্যলীলা। তবে তোমাদের কৌতূহল-জনক সন্দেহ দূর করার জন্য আমি তা বলব। তবে তা অত্যন্ত মাদকতাযুক্ত ও অতীব আকর্ষণীয়। এমনকি কৃষ্ণ ও বলরাম এতে আকৃষ্ট হয়ে পড়বে। তারা যেখানে যাক না কেন তারা এটি শ্রবণ করার জন্য আকৃষ্ট হবে। তাই এটি হচ্ছে আমার আশঙ্কা। আমি আমার যথাসাধ্য সামর্থ্যানুযায়ী এ সম্বন্ধে বলতে চেষ্টা করব, কিন্তু এটি এতই মধুর ও আকর্ষণীয় যে কৃষ্ণ-বলরাম যেখানে থাকুক না কেন, তারা এখানে দৌড়ে আসবেই। তখন আমি আর কিছু বলতে সমর্থ হব না এবং সবকিছু সমাপ্ত হয়ে যাবে।”

তাই কৃষ্ণের সকল রাণীরা দ্বারকায় একট বড় হলঘরে একত্রিত হলেন। আশঙ্কাযুক্ত হয়ে রোহিণীমাতা বললেন, “তাদেরকে ভিতরে প্রবেশ করতে না দেওয়ার জন্য তোমাদের মধ্যে একজন দ্বারদেশে থাকা উচিত। কৃষ্ণ-বলরাম যেই আসবে তখন সে আমাকে সতর্ক করে দেবে, আমি তখন বলা বন্ধ করে দিব। নচেৎ সবকিছু ভিন্নরুপ ধারণ করবে। এই ব্রজলীলা কাহিনী এত অমৃতময় যে কৃষ্ণ-বলরাম যেখানেই থাকুক না কেন এটি তাদেরকে আকর্ষণ করে নিয়ে আসবে।”

শেষে তাঁরা স্থির করলেন যে, সুভদ্রা দ্বারেতে থাকবে। সুভদ্রা দ্বারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে উভয় দিকে হস্ত প্রসারিত করে ভিতরে প্রবেশ অবরোধ করলেন। তারপর রোহিণীমাতা ব্রজলীলা কাহিনী বলতে শুরু করলেন এবং সকলে আবিষ্ট চিত্তে শুনতে লাগলেন। যদিও সুভদ্রা দ্বারেতে দণ্ডায়মান ছিলেন তথাপি এই ব্রজলীলা কাহিনী শোনার জন্য কান পেতে রেখেছিলেন। তাই তিনি নিজেকে সম্পূর্ণ বিস্তৃত হয়ে দিব্য ভাবাবিষ্ট হয়ে পড়লেন।তারপর তাঁর দিব্য ভাবাবিষ্ট রূপ প্রকটিত হল, চক্ষু বিস্ফোরিত এবং হস্তপদ সঙ্কুচিত হয়ে শরীরের মধ্যে প্রবেশ করল।

ইতোমধ্যে কৃষ্ণ-বলরাম সেখানে এসে উপস্থিত হয়ে গেলেন। সুভদ্রার উভয় পাশে দাঁড়িয়ে তাঁরাও ভিতরের কথা শুনতে লাগলেন। “ওঃ, রোহিণী মাতা ব্রজ-লীলা কাহিনী বর্ণনা করছেন। তখন তাঁরাও সম্পূর্ণ ভাবাবিষ্ট হয়ে নিজেদেরকে বিস্মৃত হলেন। তাঁদের চক্ষু বিস্ফোরিত হয়ে গেল। হস্ত-পদ সঙ্কুচিত হয়ে কূর্মের মতন শরীরের মধ্যে প্রবেশ করে গেল। বর্তমান এই তিনটি রূপ দ্বারেতে দণ্ডায়মান শ্রীশ্রী জগন্নাথ, বলদেব ও সুভদ্রা।

এমন সময় নারদমুনি এসে পৌঁছে গেছেন। দূর থেকে তিনি দেখতে পেলেন এই অতি মনোরম মহাভাব-প্রকাশ মূর্তি। যেই তিনি নিকটে এলেন অমনি তাঁরা তাঁদের সেই ভাব সংবরণ করে নিয়ে স্বাভাবিকরূপে ফিরে এলেন। কিন্তু নারদ মুনি বললেন, “হে প্রভু! আমি এটি দেখে ফেলেছি, তাই আমার এই প্রার্থনা, আপনার এই মহাভাব প্রকাশ এক নির্দিষ্ট স্থানে প্রকাশিত হোক। পৃথিবীর সকল মানুষ আপনার সেই দিব্য মনোরম রূপ দর্শন করুক এবং ঐ রূপে আপনাকে পূজা করুক।”

কৃষ্ণের প্রিয়ভক্ত যা ইচ্ছা করেন, কৃষ্ণ তা মঞ্জুর করেন, “তথাস্তু”। এজন্যে কৃষ্ণ সেই মহাভাব প্রকাশ শ্রীশ্রীজগন্নাথ, বলদেব ও সুভদ্রা রূপে জগন্নাথ পুরীতে আবির্ভূত হলেন। কানাই খুন্টিয়া তাঁর ‘মহাভাব প্রকাশ’ গ্রন্থে এটি বর্ণনা করেছেন । সেই প্রাচীন বৈষ্ণব সাহিত্য আজকাল সহজলভ্য নয়। এটি অতি বিরল এবং বর্তমান কেবল অল্প কিছু তালপত্র পুঁথি অবশিষ্ট দেখতে পাওয়া যায়।
হরেকৃষ্ণ

মাসিক চৈতন্য সন্দেশ, জুন-২০১২ ইং সালে প্রকাশিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here