যুদ্ধ কেন হয়?

প্রকাশ: ৩ এপ্রিল ২০২২ | ৭:৩৯ পূর্বাহ্ণ আপডেট: ৩ এপ্রিল ২০২২ | ৭:৩৯ পূর্বাহ্ণ

এই পোস্টটি 201 বার দেখা হয়েছে

যুদ্ধ কেন হয়?

শ্রীল প্রভুপাদ ও তাঁর কিছু শিষ্যের সঙ্গে নিম্নের
কথোপকথনটি সংঘটিত হয়েছিল সান ফ্রান্সিসকোতে

প্রথম শিষ্য : শ্রীল প্রভুপাদ, সম্প্র্রতি এখানে একজন ছাত্র আত্মহত্যা করেছে। এরকম ঘটনা এ দেশে অহরহ ঘটছে।
শ্রীল প্রভুপাদ : কেউ জনসমক্ষে আত্মহত্যা করছেন কেউবা নিরবে। যদি এই মনুষ্য জীবন শুধুমাত্র ইন্দ্রিয় তৃপ্তির মাধ্যমে নষ্ট করা হয় তবে তা আত্মহত্যার সামিল। প্রত্যেকেরই দিব্য জ্ঞানের আলোকে উদ্ভাসিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবুও তারা কুকুর বেড়ালের মতো জীবনযাপন করছে। সেটিই হলো আত্মহত্যা।
দ্বিতীয় শিষ্য : একমাস আগে পত্রিকায় এক খবর বেড়িয়েছিল কিভাবে একজন ছাত্র কংগ্রেস লাইব্রেরীর পুরোনো নথিপত্র ঘেটে পারমাণবিক বোমা বানানোর তথ্য সংগ্রহ করেছিল। তারা মন্তব্য করে যে, তাত্ত্বিকভাবে যে কেউ চাইলে কোনো সুলভ উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করে পারমাণবিক বোমা বানাতে পারে।
শ্রীল প্রভুপাদ : এটিও আত্মহত্যা। পারমাণবিক বোমা যারা তৈরী করছে তারা হয়তো ভাবছে বোমা তৈরীর মাধ্যমে তাদের জীবন সফল হয়ে গেছে। অথচ তারা এটি জানে না যে, কিভাবে তারা মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পাবে। সে যা কিছু করেছে সে সব কিছুই তাকে মৃত্যু থেকে রেহাই দিবে না। তবে এত সব বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের ব্যবহারের মূল্যই বা কি? একটি কুকুরও মরছে, সেও মরছে। এর মধ্যে পার্থক্যটা কোথায়?
প্রথম শিষ্য : ঘটনাক্রমে বৈজ্ঞানিকদের আসল উদ্দেশ্য ছিল এই পারমাণবিক বোমা তৈরীর মাধ্যমে যত শীঘ্রই সম্ভব দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ করা এবং সে সাথে গণহারে মৃত্যু রোধ করা।
শ্রীল প্রভুপাদ : কিভাবে তারা মৃত্যুকে রোধ করবে? তারা জানেই না কিভাবে তা করবে। বরং তারা তা আরো ত্বরান্বিত করবে। এতটুকুই প্রকৃতপক্ষে জন্ম-মৃত্যু-জরা-ব্যাধি এই চারটি হলো প্রকৃত সমস্যা। কোনো বিজ্ঞানী এই সমস্যাগুলোর সমাধান করতে পারে? এই সমস্যাগুলোই প্রকৃত অর্থে ভীতিপ্রদ সমস্যা, কিন্তু কোথায় সেই রসায়ন বিজ্ঞানী কিংবা মনস্তত্ত্ববিদ যারা এগুলো সমাধান করতে পারে?
প্রথম শিষ্য : আজকাল প্রচলিত ধারণা হলো যেহেতু রাশিয়ার ও যুক্তরাষ্ট্রের অনেক পারমাণবিক বোমা রয়েছে তাই তারা সেগুলো পরস্পরের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে ভয় পায়।
শ্রীল প্রভুপাদ : না, তারা অবশ্যই সেগুলো ব্যবহার করবে। এটি প্রকৃতির ব্যবস্থাপনা। এটি জ্যোতিষবিদ্যা, এটি একটি প্রাকৃতিক ব্যবস্থাপনা। এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
প্রথম শিষ্য : একটি কঠিন বিষয় হল যদি তারা পারমাণবিক বোমা ব্যবহার করে তবে সামগ্রিক ধ্বংসযজ্ঞ সাধিত হবে। এজন্যে প্রত্যেকে সেগুলোর ব্যবহার নিয়ে ভীত।
শ্রীল প্রভুপাদ : সামগ্রিক নাকি পার্শ্বিক সেটা আমরা দেখব, কিন্তু এ ধরনের অস্ত্র তারা ব্যবহার করবেই।
যদি বিশ্বনেতারা যুদ্ধকে এড়িয়ে চলতে চায় তবে তাদেরকে তিনটি বিষয় অবশ্যই উপলব্ধি করতে হবে। ভগবান হলেন সবকিছুর নিয়ন্তা, তিনি হলেন সবকিছুর ভোক্তা এবং অসুরেরা বিপরীত আচরণ করে ভাবে যে, “আমিই হলাম নিয়ন্তা, ভোক্তা ও প্রত্যেকের সুহৃদ। কারণ আমিই হলাম ভগবান” এটি আসুরিক প্রবৃত্তি। প্রত্যেকের সুহৃদ হওয়ার ভান করে নিক্সন রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিল। কিন্ত পরে তিনি নিজেকে একজন শত্রু হিসেবে প্রমাণ করলেন। প্রকৃতপক্ষে কৃষ্ণ ব্যতীত কেউ প্রত্যেকের সুহৃদ হতে পারে না।
তৃতীয় শিষ্য : কিন্তু ভগবদ্ভক্ত কি সবার সুহৃদ হতে পারে না?
শ্রীল প্রভুপাদ : হ্যাঁ, কারণ তিনি কৃষ্ণের বার্তা বাহক। যদি কোনো বিশ^জনীন বন্ধু থাকে এবং কেউ যদি তাঁর সম্পর্কে তথ্য দেন তবে তিনিও একজন বিশ^জনীন বন্ধু। কৃষ্ণই হলেন সর্বলোকের সুহৃদ (সুহৃদং সর্ব-ভূতানাং) এবং একজন শুদ্ধ ভক্ত সেই বার্তাটিই সবাইকে প্রদান করেন। অতএব, কৃষ্ণের প্রতিনিধি ব্যতীত অন্য কেউ আপনার বন্ধু বা সুহৃদ হতে পারে না। এ জড় জগতের মনোভাবটি হলো এমন “আমি তোমার শত্রু এবং তুমি আমার শত্রু” এই হলো জগতের ভিত্তি। কিন্তু পারমার্থিক জগৎ এর সম্পূর্ণ বিপরীত “আমি তোমার সুহৃদ ও তুমি আমার সুহৃদ কারণ আমাদের দুজনের সর্বপ্রিয় সুহৃদ হলেন কৃষ্ণ।”
তৃতীয় শিষ্য : যখন আমরা আপনার গ্রন্থ বিতরণ করি, শ্রীল প্রভুপাদ আমরা কি সবাইকে এটি বোঝানোর চেষ্টা করেছি যে, আমরা তাদের প্রকৃত সুহৃদ?
শ্রীল প্রভুপাদ : ও হ্যাঁ। এটিই হল প্রকৃত সুহৃদ হওয়ার লক্ষণ। প্রেরক চৈতন্য মহাপ্রভু বলেছেন, কত নিদ্রা যাও মায়া পিশাচীর কোলে, এনেছি ঔষধী মায়া নাশিবার লাগি হরিনাম মহামন্ত্র লও তুুমি মাগি।
প্রথম শিষ্য : পারমাণবিক যুদ্ধের ভীতি কি কৃষ্ণভাবনা প্রচারকে সহজ করবে?
শ্রীল প্রভুপাদ : এ সম্পর্কে ভীতি সবসময় রয়েছে, অথচ লোকেরা ভয়ে ভীত নয়। নিঃসন্দেহে মৃত্যুভীতি সর্বদা রয়েছে। প্রত্যেকেই মারা যাবে। সেটি হলো প্রকৃত সমস্যা কিন্তু কে তার পরোয়া করে? লোকেরা সমস্যা এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছে কারণ তারা কোনো সমাধান খুঁজে পায় না।

কেন যুদ্ধ বিগ্রহ ও এর সমাধান

“মানুষ যখন তার পদগর্বে অত্যন্ত গর্বিত হয় তখন সে রজ ও তমোগুণের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে, অসংযতভাবে ইন্দ্রিয় সুখভোগের চেষ্টা করে। মানুষের এই প্রবৃত্তিকে এখানে আসুরিক বলে বর্ণনা করা হয়েছে। মানুষ যখন আসুরিক ভাবাপন্ন হয়, তখন নিরীহ পশুদের প্রতি তার কোন রকম দয়া থাকে না। তার ফলে তারা পশুহত্যা করার জন্য বিভিন্ন কসাইখানা খোলে। তাকে বলা হয় “সূনা হিংসা”, অর্থাৎ জীব হত্যা। কলিযুগে রজ ও তমোগুণে প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে সমস্ত মানুষেরাই আসুরিক হয়ে গেছে; তাই পশুমাংস আহার তাদের কাছে অত্যন্ত প্রিয়, এবং সেই উদ্দেশ্যে তারা বিভিন্ন প্রকার কসাইখানা খুলেছে।
এই কলিযুুগে দয়ার বৃত্তি প্রায় লোপ পেয়েছে। তার ফলে মানুষে-মানুষে এবং রাষ্ট্রে-রাষ্ট্রে সর্বদা যুদ্ধবিগ্রহ হচ্ছে। মানুষেরা বোঝে না যে, যেহেতু তারা অবাধে পশুহত্যা করছে, তাই তারাও মহাযুদ্ধে পশুর মতো বলি হবে। পাশ্চাত্য দেশগুলিতে তা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। পাশ্চাত্যের দেশগুলিতে কসাইখানায় অবাধে পশুহত্যা হচ্ছে এবং তার ফলে প্রতি পাঁচ-দশ বছর অন্তর মহাযুদ্ধ হয়, যাতে অসংখ্য মানুষ পশুর থেকেও নিষ্ঠুরভাবে বধ হয়। কখনও কখনও যুদ্ধের সময় সৈনিকেরা তাদের শত্রুদের বন্দীশিবিরে রাখে এবং অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে তাদের হত্যা করে।
এটি হচ্ছে কসাইখানায় অথবা জঙ্গলে অবাধে পশুহত্যা করার প্রতিক্রিয়া। গর্বান্ধ ও আসুরিক মানুষেরা প্রকৃতির নিয়ম অথবা ভগবানের আইন জানে না। তাই তারা কোনো রকম বিবেচনা না করে, অবাধে নিরীহ পশুদের হত্যা করে। কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনে পশুহত্যা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। এই আন্দোলনে সদস্যদের চারটি নিয়ম পালন করার প্রতিজ্ঞা করতে হয়; সেগুলি-পশুহত্যা বর্জন, সব রকম নেশা বর্জন, অবৈধ স্ত্রীসঙ্গ বর্জন এবং জুয়া-পাশা ইত্যাদি খেলা বর্জন। এই চারটি নিয়ম পালন না করলে, এই সংস্থার সদস্যরূপে গ্রহণ করা হয় না। কলিযুগের মানুষদের পাপকর্ম থেকে নিবৃত্ত করার একমাত্র উপায় হচ্ছে এই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন।

(শ্রীল প্রভুপাদকৃত তাৎপর্য শ্রীমদ্ভাগবত ৪/২৬/৫ থেকে উদ্ধৃত)

 

চৈতন্য সন্দেশ এপ্রিল-২০২২ প্রকাশিত
সম্পর্কিত পোস্ট

‘ চৈতন্য সন্দেশ’ হল ইস্‌কন বাংলাদেশের প্রথম ও সর্বাধিক পঠিত সংবাদপত্র। csbtg.org ‘ মাসিক চৈতন্য সন্দেশ’ এর ওয়েবসাইট।
আমাদের উদ্দেশ্য
■ সকল মানুষকে মোহ থেকে বাস্তবতা, জড় থেকে চিন্ময়তা, অনিত্য থেকে নিত্যতার পার্থক্য নির্ণয়ে সহায়তা করা।
■ জড়বাদের দোষগুলি উন্মুক্ত করা।
■ বৈদিক পদ্ধতিতে পারমার্থিক পথ নির্দেশ করা
■ বৈদিক সংস্কৃতির সংরক্ষণ ও প্রচার। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ অনুসারে ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তন করা ।
■ সকল জীবকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ করানো ও তাঁর সেবা করতে সহায়তা করা।
■ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ অনুসারে ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তন করা ।
■ সকল জীবকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ করানো ও তাঁর সেবা করতে সহায়তা করা।