মহিমাময় দামোদর মাস

0
26

১৭ অক্টোবর থেকে ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত এক মাস হলো কার্তিক মাস বা দামোদর মাস। শাস্ত্রানুসারে এ বিশেষ মাসটি অনেক মহিমাপূর্ণ।

শ্রীমৎ ভক্তিপুরুষোত্তম স্বামী


কার্তিক তর্ক মাস বা দামোদর মাস অত্যন্ত পবিত্রতম একটি মাস। তাই এইসময় আরও অধিকভাবে ভগবানের প্রতি মনোযোগী হওয়ার জন্য মহাত্মাগণ নির্দেশ প্রদান করেছেন। শাস্ত্রে কার্তিক মাসে ভগবানের উদ্দেশ্যে ব্রত পালনের অনেক মহিমা বর্ণিত হয়েছে। নিম্নোক্ত প্রতিবেদনে পদ্মপুরাণে বর্ণিত কার্তিক মাসের শ্রেষ্ঠতা, শঙ্খাসুর বধ, বেদ উদ্ধার এবং ‘তীর্থরাজ’ মহিমা কাহিনি বর্ণনা করা হবে ।
একদিন শ্রীকৃষ্ণের অন্যতমা মহিষী সত্যভামা শ্রীকৃষ্ণকে জিজ্ঞাসা করলেন- “হে দেবদেবেশ্বর, তিথির মধ্যে একাদশী এবং সমস্ত মাসের মধ্যে কার্তিক মাস আপনার এত প্রিয় কেন? দয়া করে এর কারণ বর্ণনা করুন।’
পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই প্রশ্নের উত্তরে বললেন— হ্যাঁ, তুমি আজ সত্যিই একটি মঙ্গলময় প্রশ্ন উত্থাপন করেছ। পূর্বকালে মহারাজ পৃথু ও দেবর্ষি নারদকে এই একই প্রশ্ন করেছিলেন। সে সময় দেবর্ষি নারদ তাঁকে কার্তিক মাসের শ্রেষ্ঠতা সম্বন্ধে যে কারণ বর্ণনা করেছিলেন, আমি তা বলছি । একাগ্রচিত্তে শ্রবণ কর।
দেবর্ষি নারদ বললেন— পূর্বকালে শঙ্খ নামে এক অসুর ছিল। সে এতটাই পরাক্রান্ত ও বলশালী ছিল যে, ত্রিলোক জয় করতে সমর্থ ছিল। এই শঙ্খাসুর ছিল সমুদ্রের পুত্র। এই বলশালী অসুর সমস্ত দেবতাকে পরাস্ত করে তাদের স্বর্গ থেকে বিতাড়িত করেছিল এবং ইন্দ্র ও অন্যান্য লোকপালের অধিকার কেড়ে নিয়েছিল। দেবতারা মেরু পর্বতের দুর্গম গুহায় অতি সন্তর্পণে দিনযাপন করতে লাগলেন, তবু শত্রুর অধিনতা স্বীকার করলেন না। তখন সেই শঙ্খাসুর চিন্তা করল যে, ‘দেবতারা নিশ্চয় বেদমন্ত্রের শক্তির প্রভাবে বলশালী হয়ে উঠছে। একথা আমি বুঝতে পারছি। তাই আমি বেদকে অপহরণ করব আর তার ফলে সমস্ত দেবতারা তখন শক্তিহীন হয়ে পড়বে।’
এই কথা চিন্তা করে শঙ্খাসুর বেদকে অপহরণ করে নিয়ে এল। দেবতারা তখন ব্রহ্মার কাছে গিয়ে উপায় প্রার্থনা করলে ব্রহ্মা পূজার উপকরণাদি ও দেবতাদের সঙ্গে নিয়ে বৈকুণ্ঠলোকে বিষ্ণুর কাছে গমন করলেন। বিষ্ণু তখন নিদ্রামগ্ন ছিলেন। দেবতারা সুমধুর বাদ্য গীতাদি পরিবেশন করলেন ভগবান বিষ্ণুর নিদ্রাভঙ্গের জন্য । অবশেষে দেবতাদের স্তবগীতি ও ভক্তিতে সন্তুষ্ট হয়ে ভগবান জাগরিত হলেন। তখন তাঁকে সহস্র সূর্যের ন্যায় দীপ্তিমান দেখাচ্ছিল। দেবতাগণ সেই সময় ষোড়শ উপাচারে ভগবানের পূজা করে ভগবানের শ্রীপাদপদ্মের বন্দনা করলেন এবং তাদের প্রার্থনা নিবেদন করলেন। দেবতাদের বন্দনায় সন্তুষ্ট হয়ে ভগবান লক্ষ্মীপতি তাঁদের আশ্বাস প্রদান করে বললেন- “দেবতাগণ, তোমাদের সুমধুর মঙ্গলময় বাদ্য গীতাদি কর্মে আমি প্রীত হয়েছি। আমি তাই তোমাদের মনোবাসনা পূর্ণ করব এবং বর প্রদান করব। কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষে ‘প্রবোধনী’ একাদশীর দিন যে ব্যক্তি এক প্রহর রাত বাকী থাকতে ঐ সময় থেকে বাদ্যগীতাদি মঙ্গলময় অনুষ্ঠান দ্বারা আমার আরাধনা করে আমার প্রসন্নতা বিধান করে সে অবশ্যই আমার কাছে ফিরে আসবে। শঙ্খাসুর দ্বারা অপহৃত হয়ে বেদ এখন জলমধ্যে রয়েছে। আমি সমুদ্রপুত্র শঙ্খকে বধ করে অচিরেই বেদকে আনয়ন করছি। আজ থেকে সর্বদা প্রতিবৎসর কার্তিকমাসে মন্ত্র, ধ্যান, যজ্ঞরূপ বেদ জলমধ্যে বিশ্রাম করবেন। এমনকি আমিও আজ থেকে একমাস জলমধ্যে অবস্থান করব। তোমরাও মুনি ঋষিদের সঙ্গে নিয়ে আমার অনুগমণ কর। এই কার্তিক মাসের পবিত্র সময়ে যে ব্রাহ্মণ প্রাতঃস্নান করে এবং শাস্ত্রবিধি অনুসারে জীবনভর কার্তিকব্রত পালন করতে থাকে সেই শ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণ তোমাদেরও সম্মানীয়। তোমরা আমাকে একাদশীতে জাগরিত করেছ তাই এই তিথি আমার অত্যন্ত প্রীতিবর্ধক। কার্তিক মাস এবং একাদশী তিথি- এই দুই ব্রত যে মানুষ শ্রদ্ধা সহকারে পালন করে সে আমার সান্নিধ্য লাভে সমর্থ। এর সমান দ্বিতীয় কোন সাধন প্রণালী নেই।” এই কথা বলে ভগবান বিষ্ণু ক্ষুদ্র মৎস্যরূপ ধারণ করে বিন্ধ্যপর্বত নিবাসী কশ্যপ মুনির অঙ্গুলীমধ্যে পতিত হলেন। কশ্যপ মুনি সেই ছোট্ট মৎস্যটিকে করুণাভরে তাঁর কমণ্ডলুর মধ্যে রাখলেন। কিন্তু দেখা গেল কমণ্ডলুর মধ্যে সেই মৎস্যটির স্থান সঙ্কুলান হচ্ছে না। তখন তিনি সেই মৎসকে একটি কুয়োর মধ্যে রাখলেন। কিন্তু কুয়োর আয়তনের তুলনায়ও মৎস্যটি বড় হয়ে গেল, তাই সেখানেও তাঁর সুবিধামত জায়গা হল না। এরপর কশ্যপ মুনি সেই মৎস্যটিকে পুকুরে রাখলেন। কিন্তু সেই পুকুরেও তাঁর স্থান সঙ্কুলান না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত কশ্যপ মুনি মৎস্যটিকে সমুদ্রে ছেড়ে দিয়ে এলেন। সমুদ্রের মধ্যেও মৎস্যটি ক্রমশঃ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হতে হতে বিশাল রূপ ধারণ করলেন। এরপর সেই মৎস্যরূপী ভগবান বিষ্ণু শঙ্খাসুরকে বধ করে শঙ্খটিকে হাতে নিয়ে বদরীবনে গেলেন। সেখানে সকল ঋষিদের ভগবান এই আদেশ প্রদান করলেন-“হে মহর্ষিগণ, জলভ্যন্তরস্থ বেদশাস্ত্রের খোঁজ করে এবং সমস্ত প্রকার রহস্য অনুসন্ধান করে অতি শীঘ্র আমার কাছে নিয়ে আসুন। ততক্ষণ পর্যন্ত আমি দেবতাদের সঙ্গে প্রয়াগে অবস্থান করছি।”
এইভাবে ভগবানের আদেশ প্রাপ্ত হয়ে অমিত তেজসম্পন্ন এবং শক্তিমান সমস্ত মুনিগণ বেদমন্ত্রসমূহের উদ্ধার করলেন। যে ঋষি বেদের যে সমস্ত বিশেষ মন্ত্র উপলব্ধি করতে সক্ষম হলেন তিনিই সেই বিভাগের প্রধান বলে গণ্য হলেন। তারপর সমস্ত মুনিগণ একত্রিত হয়ে প্রয়োগে গেলেন যেখানে ব্রহ্মার সঙ্গে ভগবান বিষ্ণু অবস্থান করছিলেন এবং বেদসমূহ তাঁকে অর্পণ করলেন। ভগবান তখন সেই বেদ ব্রহ্মাকে দান করলেন। বেদ প্রাপ্ত হয়ে ব্রহ্মা অত্যন্ত আনন্দিত হলেন এবং তিনি দেবতা ও ঋষিদের নিয়ে প্রয়োগে অশ্বমেধ যজ্ঞ অনুষ্ঠান শুরু করলেন। যজ্ঞ শেষে দেবতা, গন্ধর্ব, যক্ষ, কিন্নর প্রভৃতি সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত করে ভগবান বিষ্ণুর উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করতে লাগলেন- “হে প্রভু, হে জগন্নাথ, দয়া করে আমাদের নিবেদন শ্রবণ করুন। আমাদের জন্য এখন অত্যন্ত আনন্দ তথা সুখের সময়, তাই এবার আমাদের বর প্রদান করুন। হে রমাপতি, এই স্থানে ব্রহ্মাজী অপহৃত বেদকে পুণরায় প্রাপ্ত হয়েছেন এবং আমরাও আপনার কৃপায় যজ্ঞভাগ প্রাপ্ত হয়েছি। তাই এই স্থান পৃথিবীর মধ্যে সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ এবং পুণ্যবর্ধক। শুধুমাত্র এমন নয় যে, আপনার কৃপায় এই স্থান ভোগ ও মোক্ষ প্রদায়ী। এই স্থান এমনই পুণ্যদায়ক ও পবিত্র যে, ব্রহ্মহত্যা আদি পাপও শুদ্ধ করতে পারে। এই স্থানে যেন প্রদত্ত সমস্তকিছুই অক্ষয় হয় এই বর প্রদান করুন।”
ভগবান বিষ্ণু বললেন-“দেবতাগণ, তোমরা যা কিছু বললে তাতে আমারও সম্মতি আছে। এখন থেকে তোমাদের ইচ্ছা পূর্ণ হল। এই স্থান আজ থেকে ‘ব্রহ্মক্ষেত্র’ নামে পরিচিত হলো। সূর্যবংশজাত রাজা ভগীরথ এইস্থানে গঙ্গা আনয়ন করবেন এবং সূর্যকন্যা যমুনাও এখানে গঙ্গার সাথে মিলিত হবে। ব্রহ্মাসহ তোমরা সকল দেবতারাও আমার সঙ্গে এখানে অবস্থান করেছে। তাই আজ থেকে এই স্থান ‘তীর্থরাজ নামেও বিখ্যাত হবে। এই স্থানে যা কিছু দান, ব্রত, হোম, তপ, পূজা ইত্যাদি করা হবে সেইসব কর্ম অক্ষয় ফল প্রদানকারী তথা আমার ধাম প্রাপ্তকারী হবে। সাতজন্ম ব্রহ্মহত্যা আদি পাপ এই তীর্থ দর্শন মাত্রই বিনষ্ট নয়। যে ব্যক্তি এই ধামে মৃত্যুবরণ করে, সে আমাতেই প্রবেশ করে, তার আর পুনর্জন্ম হয় না। যে এই স্থানে তার পিতৃ পুরুষগণের শ্রাদ্ধ আদি কর্ম করে, সেই পিতৃপুরুষগণ সবাই আমার লোকে গমন করে। এই স্থান সকল যুগের মানুষের জন্য মহান পুণ্যতা তথা উত্তম ফল প্রদানকারী। সূর্যের মকর রাশিতে অবস্থান কালে যে ব্যক্তি এই স্থানে প্রাতঃস্নান করে, তার জন্য এই স্থান পাপনাশক। মাঘ মাসে মকর রাশিতে সূর্যের অবস্থানকালে প্রাতঃস্নানকারী মানুষকে দর্শন মাত্রেই সমস্ত প্রকার পাপ দূরীভুত হয়, ঠিক যেমন সূর্যোদয়ের ফলে অন্ধকার দূর হয়। মাঘমাসে যখন সূর্য মকর রাশিতে অবস্থান করে, সেই সময় এই স্থানে প্রাতঃস্নান করার পর আমি সেই মনুষ্যকে ক্রমশ সালোক্য, সামীপ্য এবং সারূপ্য – এই তিন প্রকার মুক্তি প্রদান করি। মুণিগণ আমার কথা সকলে বিশেষভাবে শ্রবণ করুন। যদিও আমি সর্বত্র বিরাজমান তথাপি বদরীবনে আমি সর্বদা বিশেষভাবে অবস্থান করছি। অন্যত্র দশ বৎসর তপস্যা করলে যে বিশেষ ফল প্রাপ্ত হওয়া যায় এই স্থানে একদিনের তপস্যাতেই তোমরা সেই ফল প্রাপ্ত হতে সক্ষম হবে। যে শ্রেষ্ঠ মানব, এই স্থান দর্শন করে, সে সর্বদা জীবন্মুক্ত, তার শরীরে কোন পাপ থাকবে না।” পরমেশ্বর ভগবান বিষ্ণু এই কথা বলে ব্রহ্মাকে সঙ্গে নিয়ে অন্তর্হিত হলেন আর ইন্দ্র ও অন্যান্য দেবতাগণও নিজ নিজ অংশকে এই স্থানে রেখে স্বরূপে অন্তর্ধান করলেন। এইভাবে নারদমুনি কথিত কাহিনি শ্রীকৃষ্ণ সত্যভামার প্রশ্নের উত্তরে বর্ণনা করলেন। যিনি এই কাহিনি শুদ্ধ চিত্তে শ্রবণ করেন বা করান, তিনি অবশ্যই তীর্থরাজ প্রয়াগ ও বদরীবন যাত্রার ফল লাভ করেন।


 

অক্টোবর – ডিসেম্বর ২০১৬ ব্যাক টু গডহেড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here