মহা বিপদ সংকেত!!!

0
68

বিপদে মোরে রক্ষা কর, এ নহে মোর প্রার্থনা বিপদে আমি না করি যেন ভয়….
রবী ঠাকুরের শ্রীভগবানের উদ্দেশ্যে নিবেদিত এই অতি পরিচিত প্রার্থনামূলক স্তুতির মাধ্যমে আমরা সহজেই অনুধাবন করতে পারি যে, বিপদ আমাদের জীবনের একটি অপরিহার্য অংশ। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায়ও ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এটি প্রতিপন্ন করেছেন যে, দুঃখালয়ম্ অশাশ্বতম অর্থাৎ এ জগৎ হল দুঃখের কারাগার। এক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রার্থনা করেছেন যেন বিপদে ভয় না করে সাহসিকতার সাথে বিপদের সাথে লড়তে পারি। কিন্তু কেউ কি একবারও ভেবে দেখেছেন কেন বিপদ আসে আমাদের জীবনে? এর কি কারণ থাকতে পারে? বিপদের সাথে লড়ার চেয়ে বরঞ্চ একজন বুদ্ধিমান ব্যক্তির নিজেকে এসব প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা উচিত।
এটিই হচ্ছে বেদের প্রথম নির্দেশ ‘অথাতো ব্রহ্ম জিজ্ঞাসাঃ’। ভগবদ্‌গীতায় ভগবান এই বিপদসংকুল জড় জগৎকে এক ভয়ংকর স্থান বলে স্বীকার করেছেন । বিপদসংকুল এই স্থানের প্রকৃতি সম্পর্কে অজ্ঞতার জন্য স্বল্প বুদ্ধিমান ব্যক্তিরা ঐ বিপদগুলির সঙ্গে সামঞ্জস্য করে নানা পরিকল্পনা করে। সম্পূর্ণ নিরাপদ, আনন্দপূর্ণ ভগবদ্ধাম সম্বন্ধে তাদের কোন জ্ঞান নেই। তাই অবশ্যম্ভাবী জড় জাগতিক বিপর্যয়ে ধীর ও অচঞ্চল থাকাই বিবেকবান ব্যক্তির কর্তব্য। সব রকম অপরিহার্য দুঃখক্লেশ সহ্য করে পরমার্থ সাধনে অগ্রসর হওয়া উচিত। কারণ সেটিই হচ্ছে মানব জীবনের উদ্দেশ্য । চেতন আত্মা সকল জড় বিপর্যয়ের অতীত, তাই, তথাকথিত বিপদগুলিকে মিথ্যা বলা হয়। স্বপ্নাবিষ্ট হয়ে একটি লোক দেখতে পারে যে বাঘ তাকে উদরস্থ করছে এবং বিপন্ন হয়ে সে আর্তনাদ করে উঠতে পারে। বস্তুত সেখানে বাঘও নেই, কোনও যন্ত্রণাও নেই; এটি একটি শুধু স্বপ্ন মাত্র। ঠিক সেই রকম, জীবনের সব বিপর্যয়গুলিকেই স্বপ্ন আখ্যা দেওয়া যায় । ভগবদজ্ঞানের মাধ্যমে কোন ভাগ্যবান ভগবানের সঙ্গে যুক্ত হলে, তার জীবন স্বার্থক হয়ে উঠে । প্রকৃতপক্ষে এই তথাকথিত বিপদগুলো বিপদগুলো আসে আমাদের পূর্ব জীবনের বিভিন্ন পাপ কর্মের কারণে, বিবিধ কর্ম প্রতিক্রিয়ার দরুন এই বিপদগুলোর সম্মুখীন হতে হয়। পদ্ম পুরাণে বলা হয়েছে, পাপকর্মের ফল চার রকমের হয়। অপ্রারব্ধ, কূট, বীজ এবং অংকুর। যে পাপের ফল ভোগ হতে চলেছে, তাকে বলা হয় অংকুরোদগম । হৃদয়ে বীজরূপে যে পাপের ফল রয়েছে, তাকে বলা হয় বীজ। বীজের উন্মুখতাকে বলা হয় অপ্রারব্ধ। পদ্ম-পুরাণের এই বর্ণনা থেকে বোঝা যায় যে, জড় কলুষ অত্যন্ত সূক্ষ্ম। এর সূচনা ফলন, পরিণাম এবং দুঃখরূপে তার ফলভোগ-এই সবই একটি বিশাল শৃঙ্খলের অন্তর্ভূক্ত। কারও যখন রোগ হয়, সাধারণত সেই রোগের কারণ নির্ণয় করা খুবই কঠিন। তার শুরু কোথায় এবং কিভাবে তা বর্ধিত হচ্ছে তা বোঝা খুবই দুষ্কর। কিন্তু রোগের ক্লেশ অকস্মাৎ প্রকাশ হয় না, তার সময় লাগে। তাই আপনার জীবনেও এসব রোগের প্রকাশস্বরূপ যে কোন ভয়াবহ বিপদ যে আসতে পারে সেটিই পদ্মপুরাণে ভবিষ্যৎবাণী করা হয়েছে। এই জড় জগৎ হচ্ছে বিপদসংকুল (পদং পদং যদ্ বিপদাম্) যেমন, সমুদ্রের মাঝখানে মজবুত জাহাজের আরোহী হলেও সেই স্থান নিরাপদ নয়। কারণ গভীর সমুদ্রে যে কোন রকম বিপর্যয় ঘটতে পারে। টাইটানিক জাহাজও নিরাপদ ছিল কিন্তু তার প্রথম সমুদ্রযাত্রায় জাহাজটি ডুবে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে। সুতরাং বিপদ ঘটবেই কেন না আমরা বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছি। এই জড় জগৎটি বিপর্যয়কর। এইজন্য যত শীঘ্র সম্ভব এই বিপদ সমুদ্র অতিক্রম করাই এখন আমাদের কর্তব্য। জাহাজ যতই মজবুত হোক না, যতক্ষণ আমরা সমুদ্রের মধ্যে রয়েছি, আমাদের অবস্থা অত্যন্ত বিপজ্জনক। এটি খাঁটি সত্য কথা। কিন্তু সমুদ্র তরঙ্গে আমাদের সেটিই কর্তব্য হওয়া উচিত। কৃষ্ণভাবনার এই সুন্দর পথটি অনুসরণের মাধ্যমেই এই বিপদসংকুল স্থান পরিত্যাগ করতে পারি । এইজন্য অবশ্যই হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র অত্যন্ত যত্নশীল হয়ে জপ ও কীর্তন করা বাঞ্ছনীয়। শ্রীমদ্ভাগবতে শ্রীল শুকদেব গোস্বামী এই বিষয়ে ব্যক্ত করেছেন,

তস্মাৎ সঙ্কীর্তনং বিষ্ণোর্জগন্মঙ্গলমং হসাম।
মহতামপি কৌরব্য বিদ্ধ্যৈকান্তিকনিস্কৃতম্ ॥
(৬/৩/৩১)

“হে কুরুরাজ, হরিনাম সংকীর্তন মহাপাপের ফলকেও নির্মূল করতে পারে। তাই হরিনাম সংকীর্তনই হচ্ছে জগতের সবচেয়ে মঙ্গলময় অনুষ্ঠান। অনুগ্রহ করে তা হৃদয়ঙ্গম করুন যাতে অন্যেরাও তা নিষ্ঠাভরে গ্রহন করে।”
তাই পূর্বে যে চার রকমের পাপকর্মের ফল ভোগ করার কথা বলা হয়েছে তা হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র জপ কীর্তনের মাধ্যমে অতি সহজেই দূর করা যায়। যখন হৃদয় থেকে এ সমস্ত পাপ রাশি বিদূরিত হবে তখন তথাকথিত বিপদ যেগুলো আপনার জন্য অপেক্ষা করছে তা অবলীলায় ভয়ে পালিয়ে যাবে। এ কথাই সমস্ত বৈদিক শাস্ত্রে প্রতিপন্ন করা হয়েছে। এক্ষেত্রে পাঠকদের হয়ত প্রশ্ন জাগতে পারে, তাহলে কি যেসব বৈষ্ণব সাধুগণ এ কৃষ্ণভানামৃতের তথা হরিনামের আশ্রয় নিয়েছে তাদের কি বিপদ আসে না? হ্যাঁ অবশ্যই আসে। এই প্রশ্নটি ভীষ্মদেবও ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, পাণ্ডবরা যারা কিনা তোমার ভক্ত তাদের কেন দ্রৌপদীর বস্ত্র হরণ, আগুনে দগ্ধীভূত করার ফাঁদ, নরঘাতক রাক্ষস দ্বারা পীড়ন, বিষময় পিষ্টক দেয়া ছাড়াও বিবিধ বিপদের সম্মুখীন হতে হল? এই প্রশ্নের উত্তর ব্যক্ত করার জন্য দ্রৌপদী বস্ত্র হরণ একটি উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত । প্রথমে দ্রৌপদী বস্ত্রকে দৃঢ়ভাবে ধরে রাখতে চেষ্টা করেন। কিন্তু তিনি অসহায়। তিনি স্ত্রীলোক ছাড়া আর কী? কৌরবরা তাকে বিবসনা করতে প্রয়াসী। তাই তিনি ক্রন্দন করে কৃষ্ণের কাছে প্রার্থনা করেন “হে কৃষ্ণ, আমার মান রক্ষা কর।” কিন্তু বস্ত্রাংশ দৃঢ়ভাবে ধরে তিনিও নিজ মান রক্ষার চেষ্টা করেন। তারপর দ্রৌপদী ভাবলেন, “এভাবে আমার মান রক্ষা করা অসম্ভব”, তাই তিনি বস্ত্র ছেড়ে দিয়ে দুই বাহু তুলে প্রার্থনা করেন, “কৃষ্ণ, তোমার ইচ্ছা হলে আমার মান রক্ষা করতে পার”, এভাবে ভগবান তার প্রার্থনায় সাড়া দেন।
তাই, নিজেকে রক্ষা করার চেয়ে কৃষ্ণের উপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত “কৃষ্ণ, তুমি আমাকে রক্ষা করলে ভাল হয়, অন্যথায় আমাকে বিনাশ কর। তোমার যেমন ইচ্ছা তাই কর।” তাই ভগবদ্ভক্তরা এই বিপদসমূহকে ভগবানের কৃপা হিসেবে নেন। কেননা এই বিপদ নন্দনকানন শ্রীকৃষ্ণকে স্মরণ করার সুযোগ দেয়। যদিও বৈষ্ণবদের জন্য মাঝে মাঝে আগত এ বিপদগুলো তাদের বিচলিত করতে পারে না। পাণ্ডবদের মাতা কুন্তিদেবী তাই কৃষ্ণের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করেছিলেন,

বিপদঃ সন্তু তাঃ শশ্বত্তত্র তত্র জগদ্গুরো ।
ভবতো দর্শনং যৎ স্যাদপুনর্ভবদর্শনম্ ॥
ভাঃ (১/৮/২৫)

“আমি কামনা করি যে, ঐ বিপর্যয় বারবার আমাদের জীবনে ঘটুক, যাতে আমরা বারবার তোমার দর্শন লাভের সৌভাগ্য অর্জন করি। কারণ তোমার দর্শন প্রাপ্তির অর্থ আমাদের আর পুনর্জন্ম গ্রহণ করতে হবে না।”
তাই যথাশীঘ্রই সম্ভব এই কৃষ্ণভাবনামৃতের আশ্রয় গ্রহণ করুন তা না হলে বিপদের করাল গ্রাস থেকে মুক্ত হওয়া সম্ভব নয়। ইস্‌কন প্রতিষ্ঠাতা ও আচার্য্য শ্রীল প্রভুপাদ বলেছিলেন, হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র জপ করুন এবং সুখী হউন। তখন তথাকথিত বিপদসমূহ আপনার জন্য জয়ের কারণ হবে না বরঞ্চ এগুলো অপরিসীম কৃষ্ণ আনন্দ প্রদান করবে। হরে কৃষ্ণ।


 

চৈতন্য সন্দেশ ফেব্রুয়ারি-২০০৯ প্রকাশিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here