ভক্তিযোগের দ্বারাই প্রকৃত বৈরাগ্যের উদয় হয়

0
22

গোলোক বৃন্দাবনে জীবাত্মারা শ্রীকৃষ্ণকে সখা, গোপ, গোপিকা, পিতা-মাতাদির ভূমিকায় সেবা করছেন। এমন কি গাছপালা, জল, ফুল, ভূমি, গোবৎস এবং গাভীরাও গোলোক বৃন্দাবনে কৃষ্ণসেবায় ব্রতী। আমাদের কাজও এই ভগবৎ-সেবা করা, কিন্তু যে কোন কারণেই হোক আমরা শ্রীকৃষ্ণকে সেবা করতে চাই না। তাই প্রকৃতির ত্রিগুণময়ী মায়ার সেবাকার্যে আমাদের নিয়োগ করা হয়েছে। রাষ্ট্রের আইন অমান্য করলে অপরাধীকে কারারুদ্ধ করা হয় এবং রাষ্ট্রের আইন মানতে বাধ্য করা হয়। ভগবানের অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়ায় শ্রীকৃষ্ণের সেবাই হচ্ছে আমাদের স্বরূপ, আর যে মুহূর্তে আমরা সেবা করতে অস্বীকৃত হই, তৎক্ষণাৎ অবিদ্যারূপী মায়া আমাদের ধরে নিয়ে তাঁর সেবার জন্য আদেশ করে। প্রভু হওয়া আমাদের স্বভাব নয়। এক্ষুনি প্রভু হলেও আমরা সুখী হবো না, কারণ সেই অবস্থাটা কৃত্রিম। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, হাত যদি মনে করে, “আমার কাছে যে মিষ্টিগুলি আছে তা আমি খাবো”, তা হলে হাতের সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবে। হাতের স্বভাব আহার্য মুখে তুলে দেওয়া এবং এইভাবে হাতও তখন পুষ্টিলাভ করে। অন্যথায় সব প্রচেষ্টাই নিষ্ফল হয়। সেই রকম আমরা শ্রীকৃষ্ণের অবিচ্ছেদ্য বিভিন্ন অংশ। তাই, আমাদের কাজ হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণকে তুষ্ট করা। বৈদিক শাস্ত্র থেকে আমরা জানতে পারি যে, এক এবং অদ্বিতীয় হলেও ভগবান বহু অংশে প্রকাশিত হয়েছেন। আমরা শ্রীকৃষ্ণের সেই বহুধা অংশবিশেষ। স্বাংশ হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণের ব্যক্তিগত অংশ-প্রকাশ, আর জীবাত্মা আমরা হচ্ছি তাঁর বিভিন্নাংশ। সে যাই হোক, সকল অংশেরই কর্তব্য হচ্ছে কৃষ্ণসেবা করা। শ্রীচৈতন্য-চরিতামৃতে (আদি ৫/১৪২) এই সত্য ব্যাখ্যা করা হয়েছে-একলা ঈশ^র কৃষ্ণ, আর সব ভৃত্য।আমাদের সকলের প্রবণতা হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে আনন্দ আস্বাদন করা। পূর্বেই বলা হয়েছে, শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন আনন্দময়, এবং আমরা তাঁর অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে আমরাও আনন্দময়। আজ ভিন্ন পরিবেশে আমরা আনন্দ অন্বেষণ করছি। একটু স্বাতন্ত্র থাকায় কৃষ্ণসেবার পরিবর্তে আমরা মায়ার কারাকক্ষে প্রবেশ করে ইন্দ্রিয়ভোগ করতে মনস্থ করেছি। এখন মায়ার সেবা কি উপায়ে ভুলে যাওয়া যায় তাই আমাদের লক্ষ্যণীয়, আর ভক্তিযোগ বা ভগবদ্ভজনই হচ্ছে সেই পন্থা। আমরা শ্রীকৃষ্ণ ছাড়া আর কারও সেবক নই-এই উপলব্ধি হওয়া মাত্র আমরা আত্ম-উপলব্ধি লাভ করি। ভাবপ্রবণতা নয়, আত্ম-তত্ত্বজ্ঞান লাভের মাধ্যমেই আমাদের এই উপলব্ধি অবশ্য হওয়া চাই। অনেক জন্ম ও মৃত্যুর পর কেউ যখন উপলব্ধি করেন যে, বাসুদেবই সবকিছু, তৎক্ষণাৎ তিনি কৃষ্ণচরণে শরণাগত হন। এই হচ্ছে যথার্থ জ্ঞান ও বৈরাগ্য- জড়জ্ঞান ও জড় বস্তু থেকে অনাসক্তি। সম্যক্ কৃষ্ণভজনে ব্রতী ভগবদ্ভক্ত মাত্রই ব্রহ্মভূত-স্তরে অধিষ্ঠিত। এখন আমরা মায়াভূত অর্থাৎ মায়িক স্তরে অবস্থিত। নিজেকে মায়ার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত মনে করে আমরা জড়া প্রকৃতির গুণের প্রভাবে কার্য করে চলেছি। অহং ব্রহ্মাস্মি-আমি চিন্ময়, আমি ব্রহ্ম বস্তু, এই উপলব্ধি হওয়া মাত্রই আমাদের জীবন আনন্দময় হয়ে ওঠে। মায়া কবলিত হয়ে আমরা জড়া প্রকৃতির ঊর্মিমালায় তাড়িত হয়ে চলেছি এবং লক্ষ্যপথে পৌঁছানোর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা আমাদের নেই। শ্রীল সচ্চিদানন্দ ভক্তিবিনোদ ঠাকুর গান গেয়েছেন-মিছে মায়ার বশে, যাচ্ছ ভেসে’ খাচ্ছ হাবুডুবু ভাই। আমরা সাগরের ঊর্মিমালায় তৃণখণ্ডের মতো অসহায় এবং সম্যকভাবে ঊর্মিকবলিত। পরবর্তী জীবনের কথা ভেবে নিরীশ^রবাদীরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়, কারণ তাদের জীবন পাপে পরিপূর্ণ। তাই ভবিষ্যতে পাপের শাস্তির জন্য তারা ভীত। এই সম্পর্কে বাংলায় এক কাহিনীর প্রচলন আছে। একজন ব্যক্তি ভাবছিল,“আমার সারা জীবনই পাপ পঙ্কিল; যমরাজ এসে একদিন আমাকে সমুচিত শাস্তি দান করবে, কিন্তু তাঁকে এড়াবার উপায় কি?” এই চিন্তা করে সে মনস্থ করলো, “আমার শরীর বিষ্ঠালিপ্ত করি, তা হলে যমরাজ আমাকে স্পর্শ করতে পারবে না।” কিন্তু এই কাজ শুধু মূঢ়তা ছাড়া আর কিছুই নয়। আমরা সকলেই মায়া কবলিত, সকলেই মায়াধীন। মায়াকে এড়াবো কি উপায়ে? আমরা জড়া প্রকৃতির রোগের দ্বারা সংক্রমিত হওয়ায় কোন কৃত্রিম উপায়েই আমাদের উদ্ধার নেই। শ্রীকৃষ্ণের চরণে শরণাগতি ছাড়া অন্য কোন উপায় নেই। আমাদের জীবন অত্যন্ত পাপময় হলেও, শ্রীকৃষ্ণ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, তিনি আমাদের রক্ষা করবেন।
আমরা ভক্তিযোগ অনুশীলনে, কৃষ্ণভজনে উন্মুখ হলে, সব রকম অবাঞ্ছিত অভ্যাস বা অনর্থ সবলে ত্যাগ করতে পারি। অতি প্রত্যূষে শয্যা ত্যাগ করে আমাদের কৃষ্ণসেবায় নিয়োজিত হওয়া উচিত। তখন ক্রমে ক্রমে আমরা মায়ার সেবাকে ভুলে যেতে পারবো। ভক্তিযোগের এতই প্রভাব যে, ভক্তি অনুশীলনের সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই মায়ার প্রভাব নিঃশেষ হয়ে যায়। একে বলা হয় ‘বৈরাগ্য’। শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন আদিপুরুষ, আদি আত্মা। শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন সবকিছুর পরম আধার। আর তাই শ্রীকৃষ্ণকে ‘পুরাণ’ বলা হয়। তাঁর চেয়ে বেশি পুরাণ কেউ নেই, অথচ তিনি চিরযৌবন-সম্পন্ন। এই হচ্ছেন ভগবান। তিনি হচ্ছেন আদি, মূল উৎস, সকল কারণের পরম কারণ। তবু আমরা শ্রীকৃষ্ণকে কখনও বৃদ্ধরূপে দেখি না। তিনি সব সময়েই বিশুদ্ধ ও নবযৌবনে পূর্ণ। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন প্রপিতামহ, তবু তাঁকে বিশ বছর বয়সের এক নব্য যুবকের চেয়ে বেশি বলে মনে হয়নি। শ্রীকৃষ্ণ সর্বদাই একজন যুবক বালক। চিন্ময় জগতের বাসিন্দারাও শ্রীকৃষ্ণের মতো দিব্য দেহধারী। শ্রীমদ্ভাগবতে ষষ্ঠ স্কন্ধে অনিন্দ্য সুন্দর দিব্য বেশধারী চতুর্ভূজ বৈকুণ্ঠদূতদের বর্ণনা লিপিবদ্ধ আছে, যাঁরা অজামিলকে ভগবদ্্ধামে নিয়ে যেতে এই পৃথিবীতে এসেছিলেন। বৈকুণ্ঠবাসী জীবগণ চতুর্ভূজ এবং তাঁরা সকলেই নিত্য মুক্ত। দুর্ভাগ্যবশত, এখন আমরা সংসার কারাগারে আবদ্ধ এবং এখন আমরা জড় দেহধারী। এই দেহ কখনও বৃদ্ধের দেহ লাভ করি। কিন্তু আমরা কৃষ্ণভাবনাময় হলে দেহান্তে আর জড় দেহ প্রাপ্ত হবো না। আমরা স্ব-গৃহ ভগবৎ-ধামে ফিরে যাবো এবং নারায়ণ বা শ্রীকৃষ্ণের মতো সুন্দর আদি চিন্ময় দেহ লাভ করবো। ভক্তিযোগ পন্থা- শ্রবণং কীর্তনং বিষ্ণোঃ স্মরণং পাদসেবনং অর্চনম্ অনুশীলনের মাধ্যমে আমাদের কৃষ্ণভক্ত হবার এই সুযোগ গ্রহণ করা উচিত। ভগবদ্ভজনের এক বা সকল (নয়টি) অঙ্গই সাধন করে আমরা আমাদের জীবনকে সাফল্যমণ্ডিত করে তুলতে পারি। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু শ্রবণম্-কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভজনাঙ্গ বলে নির্দেশ করেছেন। আমাদের প্রয়োজন হচ্ছে শুদ্ধ ভক্তের মুখনিঃসৃত হরিকথা শ্রবণ করা, তা হলেই আমাদের জীবন সার্থক হবে।


জানুয়ারি ২০২৩ প্রকাশিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here