ব্রহ্মচর্যের অভ্যাসে মনোবল বৃদ্ধি হয়

0
20

আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইস্‌কন) প্রতিষ্ঠাতা-আচার্য কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ
১৯৬৮ সালের ২৩ মার্চ আমেরিকায় সানফ্রান্সিসকো শহরের স্টো হ্রদের ধারে প্রাতঃভ্রমণকালের প্রদত্ত সংলাপের অংশবিশেষ


শ্রীল প্রভুপাদ : (হ্রদের হাঁসগুলিকে লক্ষ্য করে) তোমরা হাঁসদের মতো থাকতে পার না। তার জন্য তোমাদের যোগ্যতা থাকা চাই। লক্ষ্য করো, ওদের দেহটা ঠিক জলের মধ্যে থাকার উপযোগী করে তৈরি হয়েছে। তাই তোমাকেও তোমার পরিবেশে থাকবার উপযোগী দেহ মন তৈরি করে যোগ্য হয়ে উঠতে হবে। সেটাই আসল কথা …..তেমনি চিন্ময় আকাশে যাঁরা বাস করেন, তাঁদের রয়েছে চিন্ময় শরীর, আর এই জড় জগতে যারা থাকে, তাদের জন্য জড় দেহ। ঐ চিন্ময় জগতে জড় শরীর নিয়ে প্রবেশের কোনও অধিকার নেই। “ঊর্ধ্বং গচ্ছতি সত্ত্বস্থা মধ্যে তিষ্ঠন্তি রাজসাঃ।” যারা অত্যধিক রজোগুণসম্পন্ন, তাদের এই গ্রহতেই বাস করতে হয়। এটাই এই গ্রহমগুলীর স্থিতি। এই পৃথিবীর মতো আরও অন্য অনেক গ্রহ আছে। তবে রজোগুণাশ্রয়ীদের জন্য এই গ্রহটিতে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এখানে সমস্ত জীবেরা, সবাই অত্যন্ত রাজসিকভাবে চলে। আর অধো গচ্ছন্তি তামসাঃ। আরও অনেক গ্রহ আছে, সেগুলি অত্যন্ত অন্ধকারময় গ্রহ, সেগুলি আছে এই পৃথিবী গ্রহের নিচে। আর সেখানে প্রাণীরা সব অন্ধকারে বাস করে। তারা যদিও এই পার্কেই হয়তো রয়েছে, কিন্তু তারা জানে না কোথায় আছে, অন্ধকারে পড়ে আছে। তাদের জ্ঞানের বিকাশ হয়নি। এটা অজ্ঞতার ফলেই হয়েছে। আর যারা কৃষ্ণভাবনাময় হয়ে চলেছে, তারা অন্ধকারেও নেই, রাজসিকতার মাঝেও নেই, আবার সাত্ত্বিক অহঙ্কারের মধ্যেও নেই । তারা চিন্ময় স্তরে রয়েছে। তাই কেউ যদি সুন্দরভাবে কৃষ্ণভাবনা অনুশীলন করে, তা হলে তৎক্ষণাৎ সে কৃষ্ণলোকে চলে যায়। সেটাই করা দরকার। তোমরা সকলে ১৬ মালা হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র জপ করছ তো ? (হাসি)
শারদীয় : প্রথমে করতাম, কিন্ত পরে ফাঁক পড়ে গেছে ।
শ্রীল প্রভুপাদ : না, আমরা এখনও বুঝতে পারছি না কেমন করে ঠিক মতো সময় গুছিয়ে নিতে হবে। কোন দিন আমরা ১৬ মালা জপ করি, আর পর দিন, কি যে হয় জানি না, বোধ হয় বেশি ঘুমিয়ে পড়ি, মানে নিদ্রাটা বেশি হয়ে যাচ্ছে।
শ্রীল প্রভুপাদ : কত ঘন্টা তুমি নিদ্রা যাও?
মালতী : প্রায় ছয় থেকে আট ঘন্টা ।
শ্রীল প্রভুপাদ : ও তো খুব বেশি নয়। ষোল মালা জপ করেতে তো মাত্র দুই ঘন্টা সময় লাগে । দুই ঘন্টা কি তার কিছু বেশি, আর কত?
মালতী : দুই ঘন্টাতেই হয়ে যায় ৷
শ্রীল প্রভুপাদ : তাহলে চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে তুমি দুটি মাত্র ঘন্টা কৃষ্ণের জন্য দিচ্ছ। তাই না?
ভক্ত : আট ঘন্টা নিদ্রা কি খারাপ?
শ্রীল প্রভুপাদ : আহার আর নিদ্রা, এটা তো জড় ব্যাধি। আহার, নিদ্রা মৈথুন…… এগুলিকে যত কমানো যায় তত ভাল।
ভক্ত : যদি আপনি ক্লান্ত হন……
শ্রীল প্রভুপাদ : যতক্ষণ না শরীর তাজা মনে হচ্ছে, ততক্ষণ নিদ্রা যেতে পার। কেউ কেউ চার ঘন্টার নিদ্রায় তাজা হয়ে ওঠে। কেউ দশ ঘন্টা নিদ্রা গেলে তাজা বোধ করে।
মালতী : কিন্তু যখন ভক্তি-সেবার কাজ থাকে, তখন নিশ্চয় আমাদের নিদ্রা যাওয়া উচিত নয় ।
শ্রীল প্রভুপাদ : না, নিশ্চয়ই না। ভক্তি-সেবা আগে চাই ৷
মালতী : তা হলে যদি নিদ্ৰা বাদ দিতে হয়, তবুও।
শ্রীল প্রভুপাদ : নিদ্রাও বাদ দিতে হবে, যথার্থ বিধি হল এই যে, যদি ষোল মালা জপ সম্পূর্ণ না হয় তা হলে নিদ্রাও ছাড়তে হবে। নিদ্রার সময় থেকে সময় বার করে নিয়ে ষোল মালা জপ করতে হবে। আসল ব্যাপারটা হল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে, আমরা কৃষ্ণভাবনাময় হয়ে ওঠার দায়িত্ব নিয়েছি। অতএব আমাদের সেই দায়িত্ব কর্তব্য পালনে অতি যত্নবান হতেই হবে। ভক্তকে অতি সতর্কভাবে লক্ষ্য রাখতে হবে কোনও মুহূর্তটা যেন বাজে কাজে, বা কথায় নষ্ট না হয়। অব্যর্থ কালত্বম্ — যতটুকু সময় আমরা শরীরের যত্নে কাজে লাগাই, সেই সময়টাই নষ্ট হয়ে যায়। বদ্ধ জীবেরা কেবলই এইভাবে তাদের সময় নষ্ট করে চলেছে। যে সময়টুকু আমরা কৃষ্ণভাবনার কাজে লাগাই সেইটুকুই যথার্থ সদ্ব্যবহার হচ্ছে।
ভক্ত : কখনও যদি আমরা কম নিদ্রা যাই, তাতে অনেকটা বেশি কৃষ্ণভাবনা অনুশীলন করতে পারব, কিন্তু সেই সাথে তো আমরা খুব ক্লান্ত হয়ে পড়তেও পারি। মানে, সেক্ষেত্রে তো একটা সামঞ্জস্য রাখতে হবে।
শ্রীল প্রভুপাদ : সব কিছু নির্ভর করে অভ্যাসের ওপরে। অভ্যাসযোগযুক্তেন চেতসা নান্যগমিনা –অভ্যাসযোগ মানে ‘যোগ অনুশীলন’। এটা অভ্যাস করতে হবে। তাই বলছি কৃষ্ণভাবনা অনুশীলন অভ্যাসের ওপর নির্ভর করছে। এক ধরনের ভাবনার জগৎ থেকে অন্য এক ধরনের ভাবনার জগতে নিজেকে নিয়ে যাওয়া। তাই তার জন্য দরকার অভ্যাস অনুশীলন। ঠিক যেমন, একটা লোক কয়েক মাইল দৌড়াতে পারে। আমি তো এক মাইলও দৌড়াতে পারি না। ঐ লোকটা অভ্যাস করেছে, তাই পারে। তোমরাও অভ্যাস করো। অভ্যাসের মাধ্যমে সব কিছুই পাওয়া যায়। ..দৃঢ় মনোবল চাই ।
আর এই মনোবল বাড়তে থাকে ব্রহ্মচর্য পালনের মাধ্যমে। তাই ব্রহ্মচর্য পালন করতে বলা হয় দৃঢ় প্রতিজ্ঞা সৃষ্টির জন্যই। ব্রহ্মচারী যা প্রতিজ্ঞা করে, তাই করতে পারে। যারা যৌন জীবনে অত্যন্ত আসক্ত, তারা মনোবল পায় না। তারা মনস্থির করতে পারে না। তারা চঞ্চলমতি হয়। ক্ষণে ক্ষণে সিদ্ধান্ত বদলায় তারা। আজকালকার লোকেরা ব্রহ্মচর্য পালন করে না বলে কোনও এক জায়গায় স্থির হয়ে বসতেও পারে না ।
সুতরাং এই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনে ব্রহ্মচর্যের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে সকলকে। অত্যন্ত মূলবান এই পরামর্শ। কিন্তু এই যুগে পুরোপরি তা মেনে চলা সম্ভব হচ্ছে না । তাই আমাদের পদ্ধতি কেবলই ভগবান শ্রীকৃষ্ণের উদ্দেশ্যে মহামন্ত্রের মাধ্যমে প্রার্থনা জানাতে থাকা।

 

 

জানুয়ারী-মার্চ  ২০১৮ ব্যাক টু গডহেড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here