বেদই আপনার জ্যোতিষী

0
107

প্রতিষ্ঠাতার প্রবচন

জ্যোতিষশাস্ত্রের মাধ্যমে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত ব্যক্ত করা যায়। এজন্যেই বৈদিক শাস্ত্রকে অবলম্বন করতে হবে। জড় জাগতিক তথাকথিত মতবাদ বা আদর্শ আমাদের জীবনের সমস্যার সমাধান করতে পারে না। কিন্তু বৈদিক শাস্ত্রের নির্দেশ অনুসরণ করলে সমস্ত সমস্যার সমাধান হবে। শ্রী চৈতন্য চরিতামৃতের কতিপয় শ্লোকের আলোকে শ্রীল প্রভুপাদ ১৯৬৬ সালে নভেম্বর মাসে নিউইয়র্কে এক প্রবচন প্রদান করেন। নিম্নোক্ত প্রতিবেদনটি তারই বঙ্গানুবাদ।

(চৈতন্য চরিতামৃত মধ্যখণ্ডের বিংশতি অধ্যায় থেকে নিম্নলিখিত শ্লোকগুলি সংগৃহীত)

ইহাতে দৃষ্টান্ত—যৈছে দরিদ্রের ঘরে।
‘সর্বজ্ঞ’ আসি’ দুঃখ দেখি’ পুছয়ে তাহারে ॥ ১২৭

‘তুমি কেনে দুঃখী, তোমার আছে পিতৃধন।
তোমারে না কহিল, অন্যত্র ছাড়িল জীবন ॥” ১২৮

সর্বজ্ঞের বাক্যে করে ধনের উদ্দেশে।
ঐছে বেদ-পুরাণ জীবে ‘কৃষ্ণ’ উপদেশে ॥ ১২৯

একজন দরিদ্র লোক জ্যোতিষীকে জিজ্ঞাসা করল, “হ্যাঁ আপনি যা বলছেন তা ঠিক। আমি এটাও শুনেছি যে, আমার বাবা খুব ধনী ব্যক্তি এবং তিনি আমার জন্য কিছু টাকা রেখে গেছেন, কিন্তু তিনি কোথায় রেখেছেন, আমি খুঁজে পাচ্ছি না। আপনি কি দয়া করে আমাকে তা খুঁজে বের করতে সাহায্য করতে পারেন?” তাই জ্যোতিষী…একজন প্রকৃত জ্যোতিষীকে সর্বজ্ঞ বলা হয় যিনি অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ জানেন। একজন প্রকৃত জ্যোতিষী আপনাকে অতীত ও বর্তমান জীবন সম্পর্কে বলতে পারেন, এমনকি তিনি আপনার ভবিষ্যত জীবন সম্পর্কেও বলতে পারবেন।
ভারতে জ্যোতিষ একটি পদ্ধতি আছে, যাকে বলা হয় ভৃগুসংহিতা। কেউ যদি এই ভৃগুসংহিতা বিজ্ঞানে দক্ষ হন, তিনি তৎক্ষণাৎ আপনি পূর্বজন্মে কি ছিলেন, বর্তমান জীবনে কি রকম কর্ম করছেন এবং আপনার পরবর্তী জীবন কি হবে তা বলে দিতে পারবেন। অতএব, জ্যোতিষ শাস্ত্রের পূর্ণতা ভৃগুসংহিতাতে বিদ্যমান এবং যারা তা জানেন তাদের বলা হয় সর্বজ্ঞ।
পুরোনো ভারতীয় ঐতিহ্য অনুসারে, সন্তান জন্মদানের পূর্বে গর্ভাধান সংস্কার করা হয় এবং সন্তানের জন্ম হওয়ার পরেও একজন বিশেষজ্ঞ জ্যোতিষীর মাধ্যমে জাতকর্ম নামে একটি সংস্কার অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। তিনি শিশুর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বলেন।

শ্রীমদ্ভাগবতে বর্ণিত আছে, যখন মহারাজ পরীক্ষিৎ জন্মগ্রহণ করেন, তখন তার পিতা ও পিতামহ জীবিত ছিলেন না। আপনারা জানেন, তিনি যখন মাতৃগর্ভে ছিলেন তখন তার পিতার বয়স মাত্র ষোল বছর। তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে মারা যান। যখন সন্তানের (পরীক্ষিৎ) জন্ম হয় তখন তার পিতামহ অর্জুন এবং তাঁর (অর্জুন) বড় ভাই এই শিশু ভবিষ্যতে কেমন হবে তা জানতে খুব বেশি উদ্বিগ্ন ছিলেন। কারণ, তাঁরা জানতে চেয়েছিলেন, এই সন্তান তাদের বংশের যোগ্য হবে কিনা? তাই সবকিছু বলা হয়েছিল বিস্তারিতভাবে যা শ্রীমদ্ভাগবতে বর্ণিত হয়েছে, যা হল “এ ছেলেটি এরকম হবে, ওরকম হবে,” এবং এটা অত্যস্ত দুর্ভাগ্যজনক যে, সে তার জীবনের শেষ প্রান্তে অবশ্যই একটি ব্রাহ্মণ দ্বারা অভিশপ্ত হয়ে সর্প দংশনে মারা যাবে। এটা অবশ্যই দুর্ভাগ্যজনক।
মহারাজ পরীক্ষিৎ খুব বৃদ্ধ ছিলেন না, কিন্তু তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, “আমাকে সর্প দংশনে মৃত্যুবরণ করতে হবে, তাহলে এখনই আমার সকল রাজদায়িত্ব হতে নিজেকে মুক্ত করা উচিত।” তিনি তৎক্ষণাৎ পুত্রের হাতে রাজ্যভার অর্পণ করে গঙ্গাতীরে উপস্থিত হলেন, কোনো জল-অন্ন গ্রহণ না করে দৃঢ় হয়ে আসন গ্রহণ করলেন সাত দিনের জন্য এবং প্রামাণিক উৎস শ্রীশুকদেব গোস্বামীর কাছ থেকে শ্রীমদ্ভাগবত শ্রবণ করলেন। সাত দিন পর একটি সর্প দংশন করলে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
তাই, জ্যোতির্বিদ্যা বাস্তব এবং এখনো পর্যন্ত তা দারুন কার্যকর। শ্রীমদ্ভাগবত লিপিবদ্ধ হয় প্রায় ৫ হাজার বছর পূর্বে। তাতে বর্ণিত আছে যে, কলিযুগের প্রারম্ভে বুদ্ধ অবতার আসবেন। ‘ভবিষ্যতি’ – মানে আবির্ভূত হবেন। এভাবেই শাস্ত্র, জ্যোতির্গণনা সত্য হয়ে আসছে।
চৈতন্য মহাপ্রভু বলেছেন যে, বেদই হচ্ছে আমাদের জ্যোতির্বিদ্যা। আমাদের নির্দেশনা দানের জন্য শাস্ত্রই হচ্ছে আমাদের জ্যোতিষ। যা আমাদের অতীত ও ভবিষ্যত জানে। তাই আমাদের অবশ্যই শাস্ত্রের সাথে পরামর্শ করতে হবে। জ্যোতিষী দরিদ্র লোকটিকে বলছেন,

‘এই স্থানে আছে ধন’-যদি দক্ষিণে খুদিবে
‘ভীমরুল-বরুলি’ উঠিবে, ধন না পাইবে।
                                                    চৈ.চ. (মধা)-২০/১৩২

জ্যোতিষী বলছেন, “এটা আলংকরিক বা আনুষ্ঠানিক। যদি আপনি কিছু ধর্মীয় রীতি-নীতির দ্বারা পরম সত্যকে খুঁজতে চান, তাহলে তা হবে আনুষ্ঠানিক অধিকাংশ লোকই কিছু নির্দিষ্ট বিশ্বাস ও রীতিতে আসক্ত। তারা মনে করে এগুলোই সবকিছু।

বেদবাদরতৌ পার্থ নান্যদ অস্ত্রেতি বাদিনঃ

এ প্রসঙ্গে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু (একজন জ্যোতিষী হিসেবে) বলছেন, “যদি তোমরা ধর্মীয় রীতিগুলোই অনুসরণ কর, তাহলে তা হবে আনুষ্ঠানিক।” আমরা নিজেদের পরম পিতা লাভ করেছি, তিনি সমস্ত সম্পদ ঐশ্বর্যের অধিকারী। প্রতিটি ধর্ম ও শাস্ত্রেই কিছু রীতিসিদ্ধ নিয়মকানুনের কথা বলা হয়েছে। যদি আমরা ঐগুলোতেই আকঁড়ে থাকি, তাহলে কেবল ধর্মানুভবতার ফাঁদে আটকে থাকবো, কোনো প্রগতি হবে না।
সংস্কৃত ‘দক্ষিণ’ মানে দক্ষিণ দিক এবং ‘দক্ষিণা মানে হল পুরোহিতকে তাঁর পূজার্চনার জন্য কিছু প্রদান। তাই এখানে দক্ষিণা শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। যদি দক্ষিণার লোভে ধর্মীয় রীতি-নীতি অনুসরণ কর তাহলে ভীমরুল, বরুলি উঠিবে, ধন না পাইবে।
কিছু বিষাক্ত পোঁকা আছে যেগুলো কামড় দেবে, আপনি আর পিতার রেখে যাওয়া সম্পদ মাটি খুঁড়ে বের করতে সক্ষম হবেন না। আর এই বিষাক্ত পোকা হল দক্ষিণার লোভে ধর্মীয় রীতি অনুসরণ করা, শুধুমাত্র ব্যবসার জন্য। এসকল শুদ্ধ রীতির অনুসরণ আপনাকে সঠিক বস্তুটি দেবে না, তাদের সেই ক্ষমতাও নেই। আর এটাই বর্তমানে চলছে।
আপনি যদি ধর্মীয় রীতি-সংস্কার দ্বারা পরম সত্যকে খুঁজতে যান তাহলে আপনি কিছু বিষাক্ত পোকা দ্বারা আক্রান্ত হবেন, আপনার সম্পদ অন্বেষণের কাজটি ব্যর্থ হবে।

‘পশ্চিমে’ খুদিবে, তাহা ‘যক্ষ’ এক হয়।
সে বিঘ্ন করিবে, ধনে হাত না পড়য়।

চৈ.চ. (মধ্য)-২০/১৩৩

পশ্চিমে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের মতবাদ – সর্বেশ্বরবাদ, মনোধর্ম, অদ্বৈতবাদ, নিরীশ্বর/ নির্বিশেষবাদ, অজ্ঞেয়বাদ (যে মতবাদ প্রচার করে যে, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তু ব্যতিত আর কিছু সম্বন্ধে জানা সম্ভব নয়) প্রভৃতি। অসংখ্য মতবাদ রয়েছে। যদি আপনারা এই মতবাদগুলো অনুসরণ করেন, তাহলে পরম সত্য সম্পর্কে কোনো তথ্য পাবেন না। একটি দর্শন আছে ‘কর্ম মীমাংসা’ যার বক্তব্য হচ্ছে, “ভগবানের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের কোনো আবশ্যকতা নেই। ভগবান সর্বেশ্বর, এটি স্বীকৃত, তাই তিনি আমাদের সৎকর্মের ফল প্রদান করতে বাধ্য।” যদি আপনি সৎভাবে কর্ম করেন, তাহলে আপনাকে কিছু নীতি অনুসরণ করতে হবে। আপনি যদি এ সব নীতিকে আঁকড়ে থাকেন, তাহলে আপনি অহঙ্কারের ফাঁদে আটকা পরবেন। আপনি ভাববেন, “ও! আমি অত্যন্ত নীতিপরায়ণ। আমি মিথ্যা বলি না, চুরি করি না। প্রতিবেশীদের সাথে ভালো আচরণ করি। তাই আমার পরম পিতার অনুসন্ধানের প্রয়োজন নেই। আমি বেশ আছি।” এর মানে হচ্ছে আপনি শুষ্ক (জড়) ভাবে নীতিসমূহ অনুসরণ করছেন। এভাবে যদি আপনি কিছু শুষ্ক ধর্মীয় রীতিনীতিকে আঁকড়ে থাকেন, তাহলে আপনার পরম সত্যের সান্নিধ্যে পৌঁছানোর কোনো আশাই নেই। জড়স্তরের শাস্ত্র পন্থা, শুঙ্ক জল্পনা কল্পনাকারী এবং জাগতিক নীতিবাদীরা কখনো পরম সত্যকে জানতে পারে না। মহারাজ যুধিষ্ঠির একজন কঠোর ন্যায়পরায়ণ ছিলেন। তাঁকে ধর্মের আট নীতির রাজা ধর্মরাজ বলে সম্বোধন করা হতো। শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং তাকে বলেছিলেন, “আপনি দ্রোণাচার্যকে একটি মিথ্যা কথা বলুন। বলুন যে, (দ্রোণ) পুত্র অশথামা যুদ্ধে নিহত হয়েছেন। আপনার পুত্র এখন মৃত।” কিন্তু যুধিষ্ঠির মহারাজ বলছেন, আমি কী করে মিথ্যা বলব? আমি জীবনে কখনো মিথ্যা বলিনি।” যুধিষ্ঠির মহারাজ ছিলেন শুষ্ক (জড়) আদর্শবাদী। তিনি ভাবছিলেন না যে, “পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আমাকে আদেশ করছেন বলতে”। তিনি তার সেই শুষ্ক (জড়) নীতিসমূহ লঙ্ঘন করতে পারেননি, তাই শ্রীকৃষ্ণের ভক্তও হতে পারেন নি।
তিনি কৃষ্ণের আদেশকে পরম হিসেবে গ্রহণ করেননি। অর্জুন শুরুতে যুদ্ধ করতে ও তাঁর আত্মীয় স্বজনকে হত্যা করতে ইতস্তত করছিল। কিন্তু যখন অর্জুন বুঝতে পারলেন যে, “কৃষ্ণ যুদ্ধ করতে চান” তখন তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, “, আমি যুদ্ধ করবো।” এই হল কৃষ্ণভাবনাময়।
অতএব এটিই হল আদর্শ। আমরা বিশেষ ধরনের প্রথার সঙ্গে যুক্ত হই এবং বিশ্বাস অনুসারে নির্দিষ্ট প্রথা অনুসরণ করি। এভাবে আপনি এর সাথে যুক্ত থাকলে কোনো উন্নতি করতে পারবেন না। আপনি যদি এই বাদ, ঐ বাদ, গদৰ্ভবাদ চালিয়ে যান তখন আপনি পরম লক্ষ্যকে জানতে সমর্থ হবেন না এবং যনি আপনি জাগতিক নীতিবাদী হন, তখনো আপনি সমর্থ হবেন না। আপনাকে এই সমস্ত জাগতিক নীতি আদর্শকে চিন্ময়ত্ব প্রদান করতে হবে। তখনই যথাযথভাবে কৃষ্ণভাবনাময় হওয়া সম্ভব হবে অতএব, নীতি আদর্শ লঙ্ঘন করা নয়, পক্ষান্তরে যেই মাত্র আপনি সত্যিকার অর্থে কৃষ্ণভাবনাময় হন, তখন আপনি সবকিছুই হবেন। দার্শনিক, প্রথাবাদী, সত্যিকারের নীতিবাদী।
নৈতিকতার আদর্শ কী? আপনি কি ব্যাখ্যা করতে পারেন? নৈতিকতার আদর্শ হল ‘পরম’ অর্থাৎ উচ্চতর কিছুকে মেনে চলা। যেমন-রাষ্ট্রের আইন হচ্ছে, যদি আপনি কাউকে হত্যা করেন, তখন আপনাকে ফাঁসি দেওয়া হবে। কারণ সেটি অনৈতিক। কিন্তু যখন সেই রাষ্ট্র নির্দেশ দেয়, যদি তুমি এ শত্রুকে হত্যা কর কিংবা শত শত শত্রুদের হত্যা কর তখন তোমাকে স্বর্ণপদক দেওয়া হবে। তাই যদি আপনি চৌর্যবৃত্তি এবং হত্যা কার্যে নিযুক্ত হন কিন্তু রাষ্ট্রের নির্দেশ অনুসরণ না করেন, তবে আপনাকে অত্যাচারী বা বিশ্বাসঘাতক হিসেবে সম্বোধন করা হবে। তাই আমাদের বাস্তবিক অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে দেখি যে, পরম বা উচ্চতর কোনো কিছুর আদেশ মান্য করাটাই হল নৈতিকতা এবং সেটি নৈতিকতার আদর্শ বলে বিবেচিত হয়, তবে যিনি পরমেশ্বর ভগবান তাঁকে মান্য করাটা কী নৈতিকতা নয়? এই হল আদর্শ নৈতিকতা। তাই যদি আপনি জাগতিক তথাকথিত আদর্শে যুক্ত হন, তখন সেটি নৈতিকতা বলে বিবেচিত হবে না। তাই জ্যোতিষী দরিদ্র ব্যক্তিটিকে উপদেশ দেয়:

পূর্বদিকে তাতে মাটি অল্প খুদিতে।
ধনের ঝারি পড়িবেক তোমার হাতেতে ॥

(চৈ.চ.(মধ্য)-২০/১৩৫)

যদি আপনি কৃষ্ণভাবনার প্রক্রিয়া স্বরূপ ভক্তিমূলক সেবা গ্রহণ করেন, তবে সামান্যতম
প্রচেষ্টাও আপনাকে সম্পদের ভাণ্ডার প্রদান করবে।
স্বল্পমপাস্য ধর্মস্য ত্রায়তে মহতো ভয়াৎ ॥ (গীতা ২/৪০)

“ভক্তিযোগের অনুশীলন কখনও ব্যর্থ হয় না এবং তার কোনও ক্ষয় নেই। তার স্বল্প অনুষ্ঠানও অনুষ্ঠাতাকে সংসাররূপ মহাভয় থেকে পরিত্রাণ করে।”
যদি আপনি ভগবানকে সত্যিকার অর্থেই চান, তবে আপনাকে এই পন্থা অনুসরণ করতে হবে। সেই প্রক্রিয়াটি হল কৃষ্ণভাবনা, পরমেশ্বর ভগবানের প্রতি প্রেমময়ী অপ্রাকৃত সেবা। এভাবে আপনি সফল হবেন। এমনকি যদি এই পন্থার সামান্যও আপনি সম্পন্ন করেন, তবে আপনি তৎক্ষণাৎ এর সংস্পর্শে চলে আসবেন। অন্তত এর মাধ্যমে আপনি অবগত হতে পারবেন যে, “আচ্ছা, এখানেই সেই গুপ্ত বাক্সটি, যেখানে সম্পদ রয়েছে। এখন সেটি খোল এবং উপভোগ কর। তৎক্ষণাৎ আপনি তথ্য পাবেন, “এখানেই সেই বস্তুটি।” অতএব এই হল পন্থা।

ঐছে শাস্ত্রে কহে, কর্ম, জ্ঞান, যোগ তাজি’।

এখানে, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এই পদ্ধতি ব্যাখ্যা করেছেন। বিভিন্ন প্রকার প্রদ্ধতি রয়েছে প্রথাগত, দর্শন, ধ্যানগত, নীতিগত এই সমস্ত পদ্ধতি শাস্ত্র কহে। প্রকৃত বৈদিক নির্দেশ…. এরকম, বেদ কী? বেদ মানে হল ভগবানের কথা শাস্ত্র মানে ভগবানের কথা। ভগবান বলেন, “এখানে আলোক হোক, এখানে সৃষ্টি হোক।”
এই কথাগুলোই হল শাস্ত্র, এখন যিনি তা গ্রহণ করেন….যেরকম শব্দ একটি নির্দিষ্ট স্থান থেকে প্রবাহিত হয় এবং যিনি তা গ্রহণ করেন, এর মাধ্যমে ব্যক্তিটি তথ্য লাভ করেন। তদ্রুপ, বেদ পরমেশ্বরের ভগবানের কাছ থেকে শব্দ আকারে নির্গত হয় এবং সেই শব্দ ধারণ করার জন্য যোগ্য ব্যক্তি প্রয়োজন, যেমন ব্রহ্মা। তিনি সেটি ধারণ করেন এবং ধারণ করার পর রচনা বা শ্রবণ করানোর মাধ্যমে তা বিতরণ করেন, এই হল শাস্ত্র পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ভগবদগীতা বলছেন, এটি অবশ্যই বেদ। এটিই প্রকৃত বেদ। সর্ব-উপনিষদ। গীতা মাহাত্ম্যে বলা হয়েছে, “এই ভগবদগীতা হল সমস্ত বেদের সার। এটিই হল বেদান্ত। শুধুমাত্র তা অধ্যয়নের মাধ্যমে কেউ ভগবৎ বিজ্ঞানে বিজ্ঞ হয়ে উঠেন। অতএব, শাস্ত্র কহে। সমস্ত শাস্ত্রের সার হিসেবে ভগবান ভগবদ্‌গীতায় বলছেন:-

সর্বধর্মান পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ।
অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ।।

(শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-১৮/৬৬)

“সর্ব প্রকার ধর্ম পরিত্যাগ করে কেবল আমার শরণাগত হও। আমি তোমাকে সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত করব। তুমি শোক করো না।”
অতএব ‘সবকিছু ত্যাগ করা’ অর্থ এই যে, বিভিন্ন পন্থা রয়েছে প্রথাগত পন্থা, বিভিন্ন ধর্মীয় পন্থা, দার্শনিক পন্থা, ধ্যান এবং আরো যা কিছু রয়েছে “সর্ব পরিত্যাগ করে কেবল কৃষ্ণ শরণ গ্রহণ কর।” তাই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এই বিষয়টি জোর দিয়েছেন যে, ঐছে শাস্ত্র কহে-কর্ম, জ্ঞান, যোগ, ত্যাজী কর্ম মানে নৈতিক আদর্শের ওপর ভিত্তি করে সাধারণ কার্যকলাপ, এই হলো কর্ম। যার অর্থ আপনাকে জীবন ধারণ করতে হবে, তাই কর্ম করতে হবে।
অতএব এমনভাবে কর্ম করতে হবে যাতে আপনি সেই কর্মে জড়িয়ে না যান। যেরকম একজন সব্যবসায়ী ব্যক্তি, তিনি আইনানুসারে কর্ম করেন। তিনি কারো কাছ থেকে জোরপূর্বক কোনো কিছু আদায় করেন না এবং তিনি সরকারকে সঠিকভাবে আয়কর দিয়ে থাকেন। এভাবে সবকিছু তিনি সুন্দরভাবে সম্পাদন করেন। এটিকে বলা হয় কর্ম। আপনাকে জীবন ধারণ করতে হবে। কর্ম ছাড়া আপনি জীবন ধারণ করতে পারেন না। কিন্তু আপনাকে এমনভাবে কর্ম করতে যাতে আপনি সেই কর্ম বন্ধনে জড়িয়ে না যান। একেই কর্ম বলা হয়। আপনি কিছু রুটির টুকরো পেতে পারেন, খেতে পারেন, পান করতে পারেন এবং এভাবে জীবনকে উপভোগ করতে পারেন এবং কুকুর বেড়ালের মত মৃত্যুবরণ করতে পারেন এবং তখন আপনি আপনার ভাল বা মন্দ কর্মের ফলাফল ভোগ করবেন। এই হলো কর্ম। কিন্তু এরকম জড়জাগতিক তথাকথিত কর্ম আপনার মনুষ্য জীবনের সমাধান নয়।
এটি সাধারণ, এর পরবর্তী স্তর হল এই কর্মেরও উর্দ্ধে। এই ধরনের লোকদের একটি শ্রেণি রয়েছে, তারা হলেন চিন্তাবিদ। তারা ভাবে “জীবনের সমাধান কী এটি? তাদের কিছু হলো শুষ্ক চিন্তাবিদ, তাদের কোনো জ্ঞানই নেই, তারা শুধু ভাবতে থাকে। তারা উচ্চতর প্রতিনিধি থেকে জ্ঞানের উৎস পায় না। তারা শুধু তাদের নিজেদের মতামত সৃষ্টি করে। এ সমস্ত চিন্তাবিদ ছাড়া যারা প্রকৃত চিন্তাবিদ তাদেরকে বলা হয় জ্ঞানী। এই জ্ঞানীদের মতে, এই কর্মপন্থা জীবনের সমাধান করতে পারে না। তারা কিছু দার্শনিক তত্ত্ব প্রদান করে থাকে যে, “এই হল জীবনের সমাধান।” এই সমস্ত ব্যক্তিকে বলা হয় জ্ঞানী। অন্যরা হলো যোগী এবং এ প্রকার ব্যক্তিরা ধ্যান করে। তারা কী ধ্যান করে? তারা মিথ্যা মিথ্যা ধ্যান করে না, সমস্ত ইন্দ্রিয়, আত্মা ও পরমাত্মার ওপর মনোনিবেশ করে। তাই তাদের প্রচেষ্টা হলো হৃদয়ের অভ্যন্তরে অবস্থানরত পরমাত্মার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা। এটিকে যোগ পদ্ধতি বলা হয়। অতএব, কৃষ্ণভাবনার মাধ্যমে এ সমস্ত যোগপদ্ধতির আয়ত্ত করা যাবে। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুও নিশ্চিত করেছেন যে,

ঐছে শাস্ত্রে কহে,-কর্ম, জ্ঞান, যোগ ত্যজি’।
‘ভক্ত্যে ‘কৃষ্ণ বশ হয়, ভক্ত্যে তাঁরে ভজি ॥

যদি আপনি ভগবান কৃষ্ণকে লাভ করতে চান তবে ঐ সমস্ত তথাকথিত পন্থা অনুসরণের অপচেষ্টা বাদ দিয়ে পরমেশ্বরের প্রতি ভক্তিমূলক সেবা ও কৃষ্ণভাবনা অনুসরণ করার চেষ্টা করতে হবে। আপনার একনিষ্ঠ সেবা ও ভালোবাসার মাধ্যমে ভগবান প্রসন্ন হলে তিনি নিজেকে আপনার কাছে প্রকাশ করবেন। অর্জুন যেরকম পরমেশ্বর ভগবান কর্তৃক নির্দেশ প্রাপ্ত হয়েছিলেন। ভগবান অর্জুনকে বলেন, “আমার প্রিয় অর্জুন, আমি তোমাকে সবচেয়ে গোপনীয় জ্ঞানের কথা ব্যক্ত করছি।” তাই, যখন আমরা অর্জুনের মতো কৃষ্ণের সঙ্গে বন্ধুভাবাপন্ন হবো তখন কৃষ্ণ নিজেকে প্রকাশ করবেন। অতএব, যদি আপনি প্রকৃতই ভগবানের সাথে হারানো সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করতে চান, তবে আপনাকে এই কৃষ্ণভাবনা অবলম্বন করতে হবে, আর কিছু নয়। আপনাদের অনেক ধন্যবাদ। 


 

ত্রৈমাসিক ব্যাক টু গডহেড, এপ্রিল -জুন ২০১৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here