বিশ্বাস ও দৃঢ় বিশ্বাস

0
85

আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের প্রতিষ্ঠাতা-আচার্য কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ

প্রকৃত বিশ্বাস এবং দৃঢ় বিশ্বাস কী?

কৃষ্ণের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস হল এই যে, “কৃষ্ণ আমাকে জীবন দিয়েছেন, কৃষ্ণ আমাকে এখানে পাঠিয়েছেন। তাই তিনিই আমার প্রতিপালন করবেন। তাই আমার ক্ষমতা অনুসারে যা কিছু করার আমি করব এবং এভাবে কৃষ্ণ প্রতিপালন করবেন।”
(শ্রীমদ্ভাগবত ১/৫/২২ প্রবচন, ৩ আগষ্ট ১৯৭৪, বৃন্দাবন)
“ভক্তিযোগে সহায়ক পরবর্তী পদটি হচ্ছে নিশ্চয়, দৃঢ়বিশ্বাস। পরমেশ্বরের সেবায় থাকাকালীন ভক্ত যদি হতাশাগ্রস্থ হন তবে তার সেই হতাশা অবশ্যই পরিত্যাগ করতে হবে, আর সেই স্থানটিকে পরম লক্ষ্য, ভগবৎ প্রেম লাভ করার জন্য দৃঢ় বিশ্বাস দিয়ে পূর্ণ করতে হবে,”
(নারদ-ভক্তিসূত্র, শ্লোক ৫, তাৎপর্য)
“শান্ত ও দাস্য রসে নিশ্চয় অপ্রাকৃত গুণাবলী রয়েছে, কিন্তু তার উর্ধ্বে আর একটি বৈশিষ্ট্য অন্তরঙ্গ আসক্তি, পবিত্র নির্গুণ প্রেম রয়েছে। পরমেশ্বর ভগবানে এই প্রেমময় দৃঢ়বিশ্বাস বা অন্তরঙ্গ তাকে পরিভাষায় ‘বিশ্রম্ভ’ বলে।”
(শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর শিক্ষা, প্রথম অধ্যায়, তাৎপর্য)

ভগবানের প্রতি ভক্তদের দৃঢ়বিশ্বাস

ভ.গীতা ১/১৯ এর তাৎপর্য : “ভীষ্মদেব আদি কৌরব-পক্ষের বীরেরা শঙ্খ বাজিয়েছিলেন, তখন পাণ্ডবদের বুক ভয়ে কেঁপে উঠেনি। কিন্তু এই শ্লোকে আমরা দেখছি যে, পাণ্ডবদের শঙ্খনাদে ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের হৃদয় ভয়ে বিদীর্ণ হল। পাণ্ডবদের মনে কোনো ভয় ছিল না, কারণ তাঁরা ছিলেন সদাচারী এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শরণাগত । ভগবানের কাছে যিনি আত্মসমর্পণ করেন, তাঁর মনে কোনো ভয় থাকে না, চরম বিপদেও তিনি থাকেন অবিচলিত।”
“শ্রীল রূপ গোস্বামীর মতে, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর অনুগামী মানুষ জীবন্মুক্ত অর্থাৎ মুক্তাত্মা হয়ে থাকেন। তার ফলে, ভক্ত তাঁর ভবিষ্যতের লক্ষ্য সম্পর্কে উদ্বিগ্ন হন না, কারণ তিনি দৃঢ়নিশ্চিত যে, শ্রীভগবান অনতিবিলম্বে তাঁকে জড়জাগতিক অস্তিত্বের সমুদ্র থেকে উদ্ধার করে নিয়ে যাবেন। শ্রীউপদেশামৃত রচনায় নিশ্চয়াৎ শব্দপ্রয়োগের মাধ্যমেও এই ধরনের দৃঢ়নিশ্চয়তার কথা বলা আছে, যার অর্থ এই যে, ভগবদ্ভক্তি সেবা অনুশীলনের প্রক্রিয়াটি সম্পর্কে দৃঢ় বিশ্বাস বোঝায়।
(শ্রীমদ্ভাগবত ১১/৫/৩৩ তাৎপর্য)
ভগবানের বিশ্বাসযোগ্য সেবক হওয়া “পরম তত্ত্ব, পরমেশ্বর ভগবানের দুর্জ্ঞেয় জ্ঞান হৃদয়ঙ্গম করার রহস্য হচ্ছে ভগবানের অহৈতুকি কৃপা। জড় জগতেও বহু পিতা তার নিজের রহস্য তার প্রিয় পুত্রের কাছে কেবল ব্যক্ত করে থাকে। যাকে সে যোগ্য পুত্র বলে মনে করে তার কাছেই সে তার গোপন তত্ত্ব প্রকাশ করে। সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে জানা যায় কেবল তার কৃপার মাধ্যমেই। তেমনই ভগবানকে জানার ব্যাপারেও অবশ্যই ভগবানের অত্যন্ত প্রিয়পাত্র হতে হয়।”
(শ্রীমদ্ভাগবত ৩/২৯/১৬ তাৎপর্য)

ধৈর্য ও দৃঢ় বিশ্বাস

“শ্রীল রূপ গোস্বামীও প্রতিপন্ন করেছেন যে, গভীর উৎসাহ, ধৈর্য এবং বিশ্বাস সহকারে ভগবদ্ভক্তি সম্পাদন করা উচিত। “আমি যেহেতু ভক্তি সহকারে ভগবানের সেবা করছি তাই কৃষ্ণ অবশ্যই আমাকে স্বীকার করবেন,” এই বিশ্বাস উৎপাদনের জন্য ধৈর্য অত্যন্ত আবশ্যক। সাফল্য লাভের জন্য আবশ্যক কেবল বিধি অনুসারে ভগবানের সেবা সম্পাদন করা।”
(শ্রীমদ্ভাগবত ৩/২৯/১৬ তাৎপর্য)

দৃঢ় বিশ্বাস গড়ে তোলা

“সর্বপ্রথমে সদ্গুরুর কাছ থেকে ভগবদ্ভক্তির বিজ্ঞান শ্রবণ করার মাধ্যমে শ্রদ্ধার উদয় হয়। তারপর যতই সে ভগবদ্ভক্তদের সঙ্গ করে এবং গুরুদেবের নির্দেশ অনুসারে ভগবানের সেবায় নিযুক্ত হয়, ততই তার অনর্থ ও অন্যান্য প্রতিবন্ধকগুলি দূর হয়ে যায়।
(শ্রীচৈতন্য-চরিতামৃত আদি ১/৬০)

“ঐকান্তিক ভক্ত যদি ভগবান অথবা তাঁর অর্চাবিগ্রহের সেবা করেন, তাহলে তাঁর সমস্ত কার্য সফল হবে, কারণ ভগবান তাঁর ঐকান্তিক ভাব অবগত হতে পারেন। এইভাবে ভক্ত যদি পূর্ণ বিশ্বাস সহকারে বিধিপূর্বক ভগবদ্ভক্তি সম্পাদন করতে থাকেন, তাহলে তিনি অবশ্যই সাফল্য লাভ করবেন।”
(শ্রীমদ্ভাগবত ৪/৩০/২৯ তাৎপর্য)
“অতএব, একজন ভক্তের উচিত পূর্ণ শক্তি, সহনশীলতা ও দৃঢ়বিশ্বাস সহকারে ভক্তিমূলক সেবা সম্পাদন করা। তার নির্ধারিত কর্তব্য সম্পাদন করা উচিত, হৃদয়ে পবিত্র হওয়া উচিত এবং ভক্তদের সান্নিধ্যে সেবা করা উচিত। এ ছয়টি গুণ ভক্তকে সফলতার পথে পরিচালিত করবে।”
(ভাগবতের পূর্ণ জ্যোতি, অধ্যায় ৪৩)
অতএব, এই দৃঢ় বিশ্বাস থাকতে হবে যে, “যেহেতু আমি আদর্শ পদ্ধতি অনুসরণ করছি, তাই আমার পারমার্থিক জীবন সত্যিকার অর্থে সিদ্ধ হবেই।” আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস থাকতে হবে। এই হল ব্যাপার। উৎসাহাৎ, প্রথমে উৎসাহ; এরপর ধৈর্য এবং তারপর দৃঢ় বিশ্বাস, নিশ্চয়াৎ।
(ভগবদ্‌গীতা প্রবচন ২/৪৬-৪৭, নিউইয়র্ক, ২৮ মার্চ ১৯৬৬)

ভুলপথে দৃঢ় বিশ্বাস

“পণ্ডিতেরা বলেছেন-মন স্বভাবতই অত্যন্ত চঞ্চল, তাই তার সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করা উচিত নয়। মনের প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করলে, যে কোনো মুহূর্তে তা আমাদের প্রতারণা করতে পারে। দেবাদিদেব মহাদেবও ভগবানের মোহিনী মূর্তি দেখে বিচলিত হয়েছিলেন এবং সৌভরি মুনি যোগসিদ্ধির অতি উন্নতাবস্থা থেকে অধঃপতিত হয়েছিলেন।”
 (শ্রীমদ্ভাগবত ৫/৬/৩ তাৎপর্য )
দৃঢ় বিশ্বাসের বিশ্বাসঘাতকতা যে ব্যক্তি পূর্ণ বিশ্বাসে আশ্রয় গ্রহণকারী মানুষ অথবা পশুর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করে, সে মহাপাপী। যেহেতু বর্তমান সময়ে সরকার এই প্রকার বিশ্বাসঘাতকদের দণ্ড দিচ্ছে না, তাই সমগ্র মানব সমাজ ভয়ঙ্করভাবে কলুষিত হয়ে গেছে।
(শ্রীমদ্ভাগবত ৬/২/৫-৬ তাৎপর্য)

দৃঢ়বিশ্বাসের লক্ষণ

“শ্রদ্ধাবান অর্থাৎ বাস্তব বস্তু নিত্য সত্য পরমার্থ কৃষ্ণে সুদৃঢ় নিশ্চয়াত্মক বিশ্বাস বিশিষ্ট ব্যক্তিই কেবল ভক্তির অধিকারী। ভক্তির মাত্রা অনুসারে উত্তম, মধ্যম এবং কনিষ্ঠ এই তিন প্রকার ভক্ত রয়েছেন।” (শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত মধ্য ২২/৬৪ তাৎপর্য)
“শ্রীঅদ্বৈত আচার্যের শাস্ত্র সিদ্ধান্তে সম্পূর্ণ বিশ্বাস ছিল এবং তাই তিনি সামাজিক প্রথার পরোয়া করেননি। তেমনই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন, একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন যা সামাজিক রীতি নীতির পরোয়া করে না। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ও শ্রীঅদ্বৈত আচার্য প্রভুর পদাঙ্ক অনুসরণ করে, আমরা পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তের মানুষকে ভগবদ্ভক্তে পরিণত করতে পারি এবং যখন সে বৈষ্ণবোচিত আচরণ করার ফলে যথাযথ যোগ্যতা অর্জন করে, তখন তাকে যথার্থ ব্রাহ্মণ বলে স্বীকৃতি দিতে পারি । (চৈ.চ অন্ত্য ৩/২২১ তাৎপর্য)
“ভগবান কখনও পক্ষপাতিত্ব করেন না। সকলেই ভগবানের সন্তান, তাই একজনকে উপেক্ষা করে ভগবান অপর সন্তানকে কীভাবে অনুগ্রহ করবেন? কখনও সম্ভব নয়। কিন্তু মানবকুল বৈষম্যমূলক আচরণ করে। আমরা লিখি, “in God we trust” “আমরা ভগবদ্বিশ্বাসী”। কিন্তু ভগবদ্বিশ্বাসী জীবের সমভাবে কৃপালু ও দয়াপরায়ণ হতে হবে। এটিই ভগবদ্ভাবনা”। (কুন্তিদেবীর শিক্ষা, শ্লোক ১১, তাৎপর্য)
“ভক্ত চিন্তা করেন : অবশ্য রক্ষিবে কৃষ্ণ— শ্রীকৃষ্ণ নিশ্চয় আমাকে রক্ষা করবেন ও শুদ্ধ কৃষ্ণভক্তি লাভে কৃপা করবেন। একেই বলে দৃঢ় নিশ্চয়তা বা দৃঢ় বিশ্বাস।…… যে ভগবৎ সেবা ছাড়া অন্য পথকে অনুসরণ করার প্রয়াস করে, তার চিত্ত-চাঞ্চল্য ব্যতীত অন্য কিছু লাভ হয় না। ভগবৎ সেবাই জীবের জীবন ও প্রাণ। ভগবৎ ভজনই জীবের লক্ষ্য।” (উপদেশামৃত, শ্লোক ৩, তাৎপর্য)

জ্ঞানের মাধ্যমে প্রত্যাবর্তন

বিশ্বাস করাটা খুবই ভাল, কিন্তু ভগবান সম্বন্ধে বিজ্ঞানসম্মত জ্ঞান ছাড়া সেই বিশ্বাস স্থায়ী হবে না। কেউ জানতে পারে যে, তার একজন বাবা রয়েছে, কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত না সে জানছে যে, কে তার বাবা, ততক্ষণ তার জ্ঞান অপূর্ণ থেকে যায় । ভগবান সম্বন্ধীয় সেই বিজ্ঞান শিক্ষার খুবই অভাব ৷
আমেরিকানরা বলছে যে, তারা ভগবানে বিশ্বাসী ( In God we trust)। কিন্তু ভগবৎতত্ত্ব ব্যতীত এই যে বিশ্বাস, তা মিথ্যা ছাড়া আর কিছু নয়। প্রথমে ভগবৎ-তত্ত্ববিজ্ঞানটিতে ঐকান্তিকভাবে গ্রহণ কর। তারপর ভগবানের ওপর তোমার বিশ্বাস তুমি আরোপ কর। তারা জানে না ভগবান কে, কিন্তু আমরা জানি। আমরাই প্রকৃতপক্ষে ভগবানে বিশ্বাস করি।

বিশ্বাস গড়ে তোলার ফল

এই সবই কৃষ্ণের অর্থ । যখন তিনি আমাদের অত্যন্ত আস্থাবান ও বিশ্বাসী হিসেবে দেখেন, তখন খরচ করার জন্য তিনি তাঁর অর্থ প্রদান করেন। শুধু কৃষ্ণের কাছে প্রার্থনা কর যে, তুমি যেন তাঁরই কৃপাই তাঁর প্রতি সুন্দরভাবে সেবা সম্পাদন করতে সমর্থ হও।” (সুভদ্রাকে পত্র, ৮ জুলাই ১৯৬৯, লস্ এঞ্জেলেস্)


ত্রৈমাসিক ব্যাক টু গডহেড, জানুয়ারী – মার্চ ২০১৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here