বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাসলীলার শ্রোতা ও বক্তারা

0
26

গত সংখ্যায় বর্ণনা করা হয়েছিল রাসলীলার বক্তা শুকদেব গোস্বামী এবং শ্রোতা পরীক্ষিত মহারাজ ও ৬০ হাজার তেজস্বী মুনি ঋষিদের প্রসঙ্গে। রাসলীলার শ্রোতাবর্গরা সবাই ছিলেন উন্নত বুদ্ধিমত্তা ও মেধাসম্পন্ন যারা প্রত্যেকেই এ পুরো বিশ্বব্রহ্মাণ্ড শাসন করার ক্ষমতা রাখেন। তারা সবাই নিজ নিজ কঠোর সাধনার মাধ্যমে উন্নত ভক্তিস্তরে উপনীত হয়েছিলেন। তাহলে তারা কি সবাই নৈমিষারণ্যে শুকদেব গোস্বামীর মুখ থেকে সামান্য তুচ্ছ কাম বিষয়ক আলোচনার জন্য সমবেত হয়েছিলেন? এ কথা নিশ্চয়ই একজন বুদ্ধিমান লোক বিবেচনা করতে পারেন না। এখন আলোচনার বিষয়বস্তু সেসকল রাসলীলার শ্রোতা ও বক্তাদের নিয়ে যারা আজকাল সাধারণ ধর্মপ্রাণ শ্রোতাদেরকে রাসলীলা সম্পর্কে মনগড়া কথা শোনাচ্ছে। আর শ্রোতাদের কথাতো বলাই বাহুল্য। তাদের উভয়েরই নীতি অনেকটা ভেড়া দর্শনের মত । এক ভেড়া যেদিকে গমন করে অন্য ভেড়ারাও সে পথ অবলম্বন করে। ঐ ভেড়াটি যদি গর্তে পড়ে তবে তাকে অনুসরণরত অন্য ভেড়াগুলোও ঐ একই গর্তে পতিত হয়। এবার আসা যাক আধুনিক তরুন-তরুনীদের তথাকথিত প্রেমের কথা। | “তোমার আমার জীবন বীণা এক তারেতে গাঁথা। / তুমি আমার কৃষ্ণ ওগো আমি তোমার | রাঁধা।”

আধুনিক টিনএজাররা অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণভাবে নিজেদের প্রেমকে রাধাকৃষ্ণের সাথে তুলনা করে। তারা বলে, “কৃষ্ণ করলে প্রেম, আমরা করলে কাম… এসব কুরুচিপূর্ণ উক্তি ও ধর্মীয় প্রবক্তাদের জন্য নিম্নে প্রামাণিকভাবে পাঠকদের সামনে দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হল। | শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে গোপীদের প্রেম এবং বর্তমান টিনএজারদের তথাকথিত প্রেম এক নয়। | রাসলীলা ব্যাখ্যার ব্যাপারে শ্রীল প্রভুপাদ খুবই সতর্ক থাকতেন। এমনকি চৈতন্য মহাপ্রভুও | সাবধানতা অবলম্বন করতেন। তিনি রাসলীলা বিষয়ক আলোচনা মুষ্টিমেয় কয়েকজন শিষ্যের সঙ্গেই আলোচনা করতেন। সর্ব সাধারণের জন্য শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু হরিনাম সংকীর্তনের মাধ্যমে ভগবৎ প্রেম বিতরণ করেছেন। | রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলাকে প্রায় সবাই জড়-জাগতিক প্রেমের মতোই ভেবে ভুল করে, সে বিষয়ে শ্রীল প্রভুপাদের একটি গল্প উল্লেখ্য। একবার একটি গোশালায় আগুন লেগেছিল, একটি গাভী তাতে ভয়ে মৃতপ্রায় হয়েছিল। পরে, সেই গাভীটি যখনই লাল রং দেখত তখনই সে ভেবে নিতো, ঐ বুঝি আগুন লেগেছে। তেমনই, সাধারণ নরনারী রাধাকৃষ্ণের ছবি দেখামাত্রই ভেবে নেয় তাঁদের মধ্যে সম্পর্কও | বন্ধু-বান্ধবীর বা স্বামী-স্ত্রীর মতো। দুর্ভাগ্যক্রমে পেশাদারি ভাগবত পাঠকরা ভাগবতের | দশম স্কন্ধের রাধাকৃষ্ণের মাধূর্যলীলা প্রথমেই শুরু করে, এই ভ্রান্ত ধারণাকে আরও বাড়িয়ে দেয়, বাস্তবে হয়তো সেই পাঠক এবং শ্রোতা, তারা কেউই এই বিষয়ে শ্রবণের অধিকারী নয়। ভাগবত পাঠের বিধান হচ্ছে প্রথমে, প্রথম স্কন্ধ থেকে নবম স্কন্ধ পর্যন্ত ভালভাবে পাঠ করতে হবে। তাতে পরমেশ্বর ভগবানের মহত্ত্ব সম্বন্ধে, তাঁর বিরাট রূপ, জড় এবং চিন্ময় শক্তি, মহাজাগতিক সৃষ্টি, অবতার ইত্যাদি সম্বন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। প্রথম | দুই স্কন্ধ পাঠ করা হচ্ছে ভগবানের চরণযুগলের ধ্যান করার মতো, আরও অগ্রগতির মাধ্যমে পাঠক ধীরে ধীরে ভগবানের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ দর্শন করেন, আর অবশেষে তিনি | গোপীদের লীলা সমন্বিত দশম স্কন্ধরূপ ভগবানের মৃদু হাস্য সমন্বিত মুখমণ্ডল দর্শন করেন। গোপীদের প্রেমলীলা যদি জাগতিক হত, তবে নারদ মুনি ও শ্রীল শুকদেব গোস্বামীর মতো মুক্ত ব্রহ্মচারী এবং উদ্ধব ও ব্যাসদেবের মতো মুনি ঋষিরা তার উচ্চ প্রশংসা করতেন না। এই সমস্ত মহান ভক্তরা জাগতিক কামবাসনা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত, রাধাকৃষ্ণের লীলা যদি জাগতিক কোন ব্যাপারই হত, তাহলে তাঁরা কেন এব্যাপারে আকৃষ্ট হবেন? শ্রীমদ্ভাগবত থেকে আমরা জানতে পারি যে, সমস্ত গোপীদেরই চিন্ময় শরীর ছিল। শরৎকালের পূর্ণিমা রজনীতে বৃন্দাবনে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যখন বংশীধ্বনি করেছিলেন, তখন গোপীরা দিব্যদেহে তাঁর নিকট গমন করেছিলেন। এই সমস্ত গোপীদের অনেকেই হচ্ছেন শ্রীকৃষ্ণের নিত্য সঙ্গিনী। শ্রীল প্রভুপাদ লিখেছেন, “যে গোপীরা শ্রীকৃষ্ণকে প্রেমিকরূপে লাভ করার জন্য মনোনিবেশ করেছিলেন, তাঁরা তৎক্ষনাৎ জড়া প্রকৃতির সকাম কর্ম থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত হয়ে জড়া প্রকৃতির ত্রিগুণ সম্ভুত শরীর পরিত্যাগ করেছিলেন” (লীলা পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণ)। শ্রীল বিশ্বনাথ চক্রবর্তী ঠাকুর তাঁর ভগবৎ ভাষ্যে ব্যাখ্যা করেছেন যে, এখানে বর্ণিত “জড় শরীর পরিত্যাগ করার” অর্থ মৃত্যুবরণ করা নয়, বরং সমস্ত জড় কলুষ থেকে মুক্ত হয়ে শুদ্ধ চিনয় শরীর লাভ করা। শ্রীল শুকদেব গোস্বামী যখন শ্রীকৃষ্ণের রাসলীলা বর্ণনা করেন, তখন পরীক্ষিৎ মহারাজ এই শ্লোকে বর্ণিত বিষয়ের মতোই একটি সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “প্রেমিকের কথা চিন্তা করে গোপীরা কীভাবে মুক্ত হলেন। শ্রীল শুকদেব গোস্বামী উত্তর দিয়েছিলেন, শ্রীকৃষ্ণের প্রতি যে কেউ যে কোনভাবে আকৃষ্ট হোক না কেন, তিনি সমস্ত জড় বাসনা থেকে মুক্ত হয়ে যান। কেননা তিনি হচ্ছেন পরম পুরুষ ভগবান, এমনকি শিশুপালের মতো ব্যক্তি যিনি হিংসাবশতঃ শ্রীকৃষ্ণের চিন্তায় মগ্ন হয়েছিলেন, তিনি মুক্তিলাভ করেছিলেন। লীলা পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণ গ্রন্থে শ্রীল প্রভুপাদ ব্যাখ্যা করেছেনঃ “সিদ্ধান্ত হচ্ছে যে কেউ শ্রীকৃষ্ণের সৌন্দর্য্য, গুণাবলী, ঐশ্বর্য, খ্যাতি, বীর্য, বৈরাগ্য অথবা জ্ঞান অথবা এমনকি কাম বাসনা, ক্রোধ, ভয় অথবা স্নেহ বা বন্ধু হিসাবেও, যে কোন ভাবেই তাঁর প্রতি আসক্ত বা আকৃষ্ট হবেন, তাঁর জড় কলুষ থেকে মুক্তি লাভ করা সুনিশ্চিত।” শ্রীকৃষ্ণের প্রতি কাম বাসনার দ্বারা চালিত বা আকৃষ্ট হলেও তিনি জড় কলুষ থেকে মুক্ত হন, তার দৃষ্টান্ত হচ্ছেন ‘কুজা’। কাম বাসনা নিয়েই তিনি শ্রীকৃষ্ণের নিকট গমন করেছিলেন, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণের চরণের সুগন্ধ আঘ্রাণ করেই তিনি কাম বাসনা থেকে মুক্ত হয়েছিলেন। ভাগবতের দশম স্কন্ধে বৃন্দাবনের গোপীরা শ্রীকৃষ্ণের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন “তোমার কাছে স্ত্রী এবং পুরুষের কোন ভেদ নেই, কেননা প্রতিটি | জীবই হচ্ছে তোমার তটস্থা শক্তি বা তোমার প্রকৃতি জাত। প্রকৃতপক্ষে, কেউই পুরুষ বা ভোক্তা নয়, সকলেই তোমার ভোগ্য। তোমার এইরূপে কেবল মানুষেরাই আকৃষ্ট হয় না- গাভী, পশু-পক্ষী এমন কি বৃক্ষ, লতা, গুলা, ফল, ফুল সকলেই মোহিত হয়, আর আমাদের কথা কি বলব?” শুদ্ধ ভক্তিযোগের মধ্যে ইন্দ্রিয় তৃপ্তির কোনও প্রশ্নই নেই। শ্রীকৃষ্ণ এবং গোপীদের প্রেমলীলাকে কেউ কেউ সাধারণ ইন্দ্রিয় তর্পণ বলে মনে করে, কিন্তু এই সমস্ত লীল কামবাসনাযুক্ত নয়, কেননা তাঁর মধ্যে কোনও রূপ জড় কলুষই নেই। শ্রীল রূপ গোস্বামী তাঁর ইতি উদ্ধবাদয়োঽপি এবং ভক্তিরসামৃতসিন্ধু গ্রন্থে লিখেছেন, প্রেমের গোপরামাণাং কা ইতি আগম প্রথাম। বাঞ্ছত জগবৎ-প্রিয়াঃ। “গোপীদের সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণের আচরণকে ভুলক্রমে অনেকেই কামক্রীড়া বলে অভিহিত করলেও, উদ্ধবাদি মহান মুনি ঋষিরা শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে এইরূপ প্রেমলীলা আস্বাদন করার জন্য আকাঙ্খা করে থাকেন।” সেই জন্য শ্রীচৈতন্য চরিতামৃতের প্রণেতা শ্রীল কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী বলেছেন, কাম, প্রেম-দোঁহাকার বিভিন্ন লক্ষণ। / লৌহ আর হেম যৈছে স্বরূপে বিলক্ষণ “লৌহ আর স্বর্ণে যেমন পার্থক্য রয়েছে, তেমনই জাগতিক কাম বাসনা এবং গোপীদের সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণের প্রেমলীলাও পৃথক।” প্রেমলীলার সঙ্গে কোন কোন ক্ষেত্রে জাগতিক কাম বাসনার সাদৃশ্য থাকলেও তাদের মধ্যে পার্থক্য নিম্নরূপঃ আত্মেন্দ্রিয় প্রীতিবাঞ্ছা — তারে বলি, ‘কাম’। কৃষ্ণেন্দ্রিয় প্রীতি-ইচ্ছা ধরে ‘প্রেম’ নাম।। “নিজের ইন্দ্রিয়তৃপ্তির বাসনাকে বলা হয় কাম, আর শ্রীকৃষ্ণের ইন্দ্রিয়ের প্রীতি সাধনের ইচ্ছাকে বলা হয় প্রেম।” শ্রীমদভাগবতের দশম স্কন্ধে বলা হয়েছে, “যদি কেউ অত্যন্ত বিশ্বস্থতা সহকারে বৃন্দাবনের গোপীদের সাথে ভগবানের অপ্রাকৃত 1 লীলার কথা শ্রবণ কিংবা বর্ণনা করেন তবে অচিরেই তিনি ভগবানের শুদ্ধ ভগবত সেবার লাভের যোগ্য হয়ে উঠেন। এভাবে তিনি অবিলম্বে শুদ্ধ ভক্তে পরিণত হবেন – এবং হৃদয়ের রোগ কামকে অচিরেই জয় করতে সমর্থ হবেন।” (১০/৩৩/৩৯)। = পক্ষান্তরে যারা রাস-লীলাকে বিকৃতভাবে অনুকরণকারী তথা ভগবদ বিদ্বেষীদের উদ্দেশ্যে । শ্রীমদভগবদ্গীতায় সাবধান বাণী করা হয়েছে যে, তানহং দ্বিষতঃ ক্রূরান্ সংসারেষু নরাধমান। / ক্ষিপাম্যজস্রম শুভানাসুরীয়ের যোনিষু আসুরীং যোনিমাপন্না মুঢ়া জন্মনি জন্মনি। / মামপ্রাপ্যের কৌন্তেয় ততো যান্ত্যধর্মাং গতিম্ । (১৬-১৯/২০) “সেই বিদ্বেষী, ক্রুর ও নরাধমদের আমি এই সংসারেই অশুভ আসুরী যোনিতে অবিরত নিক্ষেপ করি। হে কৌন্তেয়! জন্মে জন্মে অসুরযোনি প্রাপ্ত হয়ে, সেই মুঢ় ব্যক্তিরা আমাকে লাভ করতে অক্ষম হয়ে তার থেকেও অধম গতি প্রাপ্ত হয়।” সুতরাং সাবধান! শ্রীমদভগবদ্গীতার এই সাবধান বাণী আজকালকার রাসলীলা = বিকৃতিকারী শ্রোতা ও বক্তা দুজনের জন্যই। হরে কৃষ্ণ!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here