পূর্ব-পশ্চিমের মিলন

0
113

সুপ্রাচীন রথযাত্রা বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহরের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায়

ধ্রুব মহারাজ দাস

শ্রীজগন্নাথদেবের রথযাত্রা একটি সুপ্রসিদ্ধ ও ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান। প্রতি বছর আষাঢ় মাসের শুক্লা দ্বিতীয়ায় এই মহােৎসব উদযাপিত হয়। জগন্নাথ পুরী ধামে এই সময়ে লক্ষ লক্ষ ভক্তের সমাবেশ হয় রথের রজ্জু টানার উদ্দেশ্যে।

শ্রীপদ্মপুরাণে রথযাত্রার মাহাত্ম্য বর্ণনা করে বলা হয়েছে।

আষাঢ়স্য দ্বিতীয়ায়াং রথং কুর্যাদৃবিশেষতঃ।

আষাঢ়শুক্লৈকাদশ্যাং জপ-হােম-মহােৎসবম্ ॥

রথস্থিতং ব্রজন্তং তং মহাদেবী মহােৎসবে।

যে পশ্যন্তি মুদা ভ্যক্ত্যা বাসস্তেষাং হরেঃ-পদে ॥

অর্থাৎ, “আষাঢ় মাসের শুক্লা দ্বিতীয়াতে জগন্নাথদেবের রথযাত্রা অনুষ্ঠান করে শুক্লা একাদশীর দিন পুনর্যাত্রা (উল্টোরথ) করতে হবে। এই সময় জপ ও হােমাদি অনুষ্ঠান করা বিধেয়। রথযাত্রার সময় যারা শ্রীভগবানকে রথারুঢ় অবস্থায় দর্শন করেন, তাঁদের বিষ্ণুলােকে বাস হয়ে থাকে।

রথের দিনে প্রভু জগন্নাথদেব রত্ন সিংহাসন ছেড়ে নেমে আসেন সাধারণ-মানুষের মাঝে, তার অহৈতুকী কৃপা বিতরণের উদ্দেশ্যে। ঐ পবিত্র দিনটিতে শ্রীজগন্নাথদেবকে সকলেই স্পর্শ করতে পারেন। সেই সময় কোনাে জাতপাতের ভেদাভেদ থাকে না। এই বিশেষ দিনটিতে যে কোনাে বর্ণ ও ধর্মের মানুষ শ্রীজগন্নাথদেবকে দর্শন করে ও রথের রজ্জু আকর্ষণ করে নিজেকে ধন্য করতে পারেন।

পুরীধামের শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের রথ তৈরি করার জন্য মাঘ মাসের বসন্ত পঞ্চমী থেকে কাঠ সংগ্রহ করা শুরু হয়। সেই রথের কাঠ আনা হয় দশপল্লী জেলা রণপুর জঙ্গল থেকে। প্রতি বছর শুভ অক্ষয় তৃতীয়া তিথি উপলক্ষে শুরু হয়ে যায় নতুন রথের নির্মাণকার্য।

শ্রীশ্রী জগন্নাথদেব, শ্রীশ্রী বলরাম এবং শ্রীমতী সুভদ্রাদেবীর তিনটি বিগ্রহের জন্য পৃথকভাবে তিনটি রথ তৈরি করা হয়।

শ্রীবিগ্রহগণ রথে অধিষ্ঠিত হবার পরে স্থানীয় গজপতিরাজ স্বয়ং এসে সােনার মার্জনী দিয়ে রথ পরিস্কার করেন। একে বলে ‘ছেরাপহরা’। রথ মার্জন হয়ে গেলে শ্রীবিগ্রহগণকে নানারকম বস্ত্র এবং অলঙ্কারে সুসজ্জিত করে বিবিধ উপাচারে পূজা করা হয়। পূজা সমাপনে শ্রীসুভদ্রা, শ্রীবলদেব এবং শ্রীজগন্নাথের রথ টানা শুরু হয়।

রথের সামনে বিশেষ বিশেষ সংকীর্তন মণ্ডলী নৃত্য কীর্তন করতে থাকেন। পুরীর শ্রীমন্দির থেকে গুন্ডিচার মাঝ পথে ‘বলগন্ডি’ স্থানে রথ এলে তিন বিগ্রহের ক্লান্তি বিনােদনের জন্য পঞ্চামৃত এবং সুগন্ধি জল দিয়ে আয়নায় অভিষেক করানাে হয়, সর্বাঙ্গে চন্দন ও কাপুর লেপন করা হয়, সুশােভন চামর দিয়ে ব্যঞ্জন করা হয় এবং সুমধুর সুশীতল মিষ্টান্ন, ফলমূল ইত্যাদি অর্পণ করা হয়। একে ‘বলগন্ডিভোগ’ বলে।

একাদশী তিথিতে স্বর্ণালঙ্কার ভূষণে শ্রীশ্রী জগন্নাথ দেবের ‘রাজবেশ’ হয়। দ্বাদশীতে শ্রীজগন্নাথের ‘নীলাদ্রি উৎসব’ বা শ্রীমন্দিরে বিজয়ােৎসব হয়। তখন লক্ষ্মীদেবী অভিমান বশত শ্রীমন্দিরের দ্বার বন্ধ করে রাখেন। তখন লক্ষ্মীদেবীর প্রতিনিধি রূপে ‘মাহারী দেবদাসীর সঙ্গে জগন্নাথের প্রতিনিধি ভক্ত নেতার কিছুক্ষণ বচসা হয়। শ্রীশ্রীজগন্নাথদেব তাতে পরাজিত হলে দ্বার খােলা হয় এবং ‘বন্দাপনা হয়ে শ্রীবিগ্রহ রত্নসিংহাসনে বিজয় করেন। সুপ্রাচীনকাল থেকেই এইভাবে পুরীধামে এই রথােৎসব চলে আসছে।

শ্রীল প্রভুপাদের বাসনা

নিউইয়র্ক রথযাত্রায় ভারতীয়দের একাংশ

শ্রীমন্ মহাপ্রভু এবং তার অনুগত ভক্তমণ্ডলীর পক্ষে রথােৎসব এক মহা আনন্দের ব্যাপার। আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের প্রতিষ্ঠাতা ও আচার্য শ্রীল এ.সি. ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ পুরীধামের জগন্নাথের রথযাত্রাকে নিয়ে আসেন পাশ্চাত্যে। পাশ্চাত্যের ভক্তরা জগন্নাথ ও তাঁর রথযাত্রার মহিমা সম্পর্কে শ্রীল প্রভুপাদের কৃপায় অবগত হন। পরে ভক্তরা নিজ নিজ দেশে রথযাত্রা প্রথা শুরু করেন।

রথে উপবিষ্ট সুভদ্রা মহারানি ও শ্রীল প্রভুপাদ

শ্রীল প্রভুপাদ হাজার হাজার অনুসারীদের হৃদয়ে কৃষ্ণভক্তির বীজ বপন করেছিলেন। তিনি দশ বছরে চৌদ্দবার ক্লান্তিহীনভাবে সারা বিশ্ব ভ্রমণ করেন, কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচার করেন এবং প্রাচীন বেদের শিক্ষানুসারে ভগবান আরাধনা পদ্ধতি সম্পর্কে দিক নির্দেশনা দেন। সানফ্রান্সিস্কোতে ইস্কনের প্রথম রথযাত্রা উৎসব অনুষ্ঠিত হওয়ার পর এটি জনগণের মাঝে এমন জনপ্রিয়তা লাভ করে যে, শহরের মেয়র ঐদিনটিকে অফিসিয়াল রথযাত্রা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। ১৯৭৩ সালে লন্ডনের একটি দৈনিক পত্রিকা সেই রথযাত্রার ভূয়সী প্রশংসা করে।

ওয়াশিংটংস্কয়ার পাকে একদল উচ্ছসিত ভক্ত

১৯৭৬ সালে শ্রীল প্রভুপাদ পুনরায় নিউইয়র্ক শহরে আসেন। প্রথমবার যখন তিনি নিউইয়র্ক আসেন তখন ট্রাঙ্ক ভর্তি কিছু গ্রন্থ এবং কিছু ভারতীয় রুপী ছিল মাত্র। আর এখন তিনি যেন বিজয়ীর বেশে নিউইয়র্ক পদার্পণ করলেন। তিনি এখন পারমার্থিক গুরুদেব এবং তাঁর রয়েছে সারাবিশ্বে অগণিত অনুসারী। ডাউনটাউন ম্যানহাটনে ৫৫নং পশ্চিম স্ট্রিটে ১২ তলা বিশিষ্ট তার একটি বিশাল দালান রয়েছে, যেটি নিউইয়র্কে ইসকনের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ভক্তিবেদান্ত বুক ট্রাস্ট তৎকালীন সময়ে ৩৩টিরও বেশি ভাষায় গ্রন্থ প্রকাশ করে এবং প্রতিটি মহাদেশেই এখন ভগবান জগন্নাথদেব পূজিত হয়।

এ ফোয়ারার চারপাশে ফেস্টিভ্যাল অব ইন্ডিয়া সহ আরো বিভিন্ন প্রদর্শনী মঞ্চ

শ্রীল প্রভুপাদ এবার নিউইয়র্কে রথযাত্রা উৎসবের আয়ােজন দেখতে চান। এজন্যে আরাে একবার তার নিবেদিত শিষ্য জয়ানন্দ দাস নিজেকে উৎসর্গ করেন। জয়ানন্দের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় প্রথমবারের মত সানফ্রান্সিসকোতে রথযাত্রা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তবে দুর্ভাগ্য এই যে, তিনি লিউকেমিয়া নামে এক দূরারােগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হন তবুও ঐ অবস্থায় তিনি রথ তৈরির জন্য অর্থ সংগ্রহ শুরু করলেন। তিনটি সুবিশাল রথ তৈরি হবে, যা পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত অ্যাভিনিউ ফিফথ অ্যাভিনিউতে চলবে।

নিউইয়র্ক ভক্তরা যখন শ্রীল প্রভুপাদের এই বাসনার কথা শুনলেন, তখন সমগ্র মন্দির যেন একীভূত হয়ে তা সফল করার কাজে নেমে পড়ল। তােষণ কৃষ্ণ দাস নামে এক ভক্ত ১৯৬৮ সালে সানফ্রান্সিসকোর রথযাত্রার সময় ইস্কনে যােগ দেন। তিনি এখন শহরের উর্ধ্বস্তনদের ধারস্থ, যেন তারা নিউইয়র্কে এ রথযাত্রা উদযাপনের অনুমতি দেন। মিডটাউন সাউথ পুলিশ স্টেশন তাকে জবাব দেয় ফিফথ অ্যাভিনিউতে নতুন কোনাে শােভাযাত্রা আয়ােজন করা যাবে না। ১৯৬২ সাল থেকে এ শহরের উর্ধ্বতন ব্যবসায়ীরা ও স্থানীয় প্রভাবশালী বাসিন্দাদের কারণে এই অ্যাভিনিউতে নতুন কোনাে শােভাযাত্রার অনুমতি দেওয়া হয়নি। তথাপিও হাল ছাড়ার পাত্র নন তােষণ কৃষ্ণ দাস। তিনি একটি লিখিত দরখাস্ত পেশ করেন এবং তাতে লেখা ছিল, হরেকৃষ্ণ আন্দোলনের ইচ্ছা তিনটি হস্ত চালিত রথ সহকারে ফিফথ অ্যাভিনিউতে শােভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে।

অলৌকিক সই!

সপ্তাহ খানেক পর, তােষণ একটি সুসংবাদ পেল। শহর কর্মকর্তারা নাকি বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করে দেখছেন এবং খুব সম্ভবত তারা ইস্কনকে রথযাত্রা আয়ােজনের অনুমতি দেবেন। এদিকে জয়ানন্দ এবং তাকে সহায়তাকারী দলটি পুরাতন পেন স্টেশন রেলরােড ইয়ার্ডে রথ তৈরির সরঞ্জাম জড়ো করছেন এবং সুবিশাল রথ তৈরির কাজ শুরু করে দিয়েছেন।

কীর্তনরত শ্রীমৎ ভক্তিভৃঙ্গ গোবিন্দ স্বামী ও শ্রীমৎ ইন্দ্রদুম্ন্য স্বামী (ডানে)

রথযাত্রার আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। তোষণ কৃষ্ণ তার সর্বশেষ কাগজপত্র সই করার জন্য পুলিশ স্টেশনে গেলেন। যখন কাগজগুলাে সেখানকার সেক্রেটারির কাছে হস্তান্তর করা হল, সেক্রেটারি সব দেখে খুব মনােযােগ সহকারে সেগুলাে পর্যবেক্ষন করলেন। সব দেখে তিনি বললেন, পুলিশ প্রধান কখনােই এগুলাে সই করবেন না। ফিফথ অ্যাভিনিউতে নতুন কোনাে শােভাযাত্রার অনুমতি দেয়ার বিপক্ষে অধ্যাদেশ জারি আছে।

তােষণ জানে ইতােমধ্যে নিউইয়র্কে রথযাত্রা উৎসবে অংশগ্রহণের জন্য শত শত ভক্ত জড়াে হয়েছে। সেসব ভক্তরা এটাও জানে যে, শ্রীল প্রভুপাদ বাসনা করেছেন ফিফথ অ্যাভিনিউতে রথযাত্রা উৎসব অনুষ্ঠিত হবে। এত সব কিছুর পর তােষণ যখন সেক্রেটারির ভাষ্য শুনল, তার সেটি মেনে নিতে খুব কষ্ট হল। তিনি তখন কি করবে বুঝে উঠার পুর্বেই লাফিয়ে উঠে সরাসরি পুলিশ প্রধানের অফিস অভিমুখে দৌড়াতে লাগলেন। তােষন পূর্বেই আঁচ করতে পেরেছিলেন যে, সেক্রেটারি তাঁকে পুলিশ প্রধানের অফিসে প্রবেশের অনুমতি দিবেন না। এজন্যে ছােটখাটো হট্টগােল শুরু হল। আর তা শুনেই বেরিয়ে আসলেন পুলিশ প্রধান। তিনি তখন একেবারে তােষনের সামনেই।

দর্শনার্থীরা কৃষ্ণপ্রসাদ আস্বাদনে ব্যস্ত

কিন্তু ঐ অবস্থায় তিনি কোনাে সহিংসতা সৃষ্টি না করে বরং কিছুটা উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করলেন। পুলিশ প্রধান তখন তােষনকে তার অফিসে আসার জন্য বললেন। ভিতরে প্রবেশ করে দরখাস্তের কাগজপত্রগুলাে তাকে দেখালে, তিনি সেগুলাে গভীরভাবে পর্যবেক্ষন করতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পর তিনি তােষনের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। রীতিমত অবাক করে তিনি ঘােষণা দিলেন, “আমি সত্যিই জানি না কেন আমি এগুলো সই করছি!”এটি সত্যিই অলৌকিক ছিল!

অবশেষে অপ্রাকৃত রথযাত্রা

ইতােমধ্যে পুরাতন পেন স্টেশনে রথ তৈরির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ভক্তরা দিন রাত কঠোর পরিশ্রম করেছে, রথগুলাে তৈরির জন্য। টন টন ধাতু, কাঠ ও রঙ্গীন কাপড় দিয়ে তিনটি ৫০ ফুট উঁচু রথ তৈরি করা হয়। জয়ানন্দ তার বন্ধু কেশব দাসকে এক চিঠিতে রথযাত্রা উৎসবের শেষ সন্ধ্যা সম্পর্কে লিখেছিলেন :
“যে কোনাে ভাবে হােক আমার পরম সৌভাগ্য হয়েছিল নিউইয়র্ক রথযাত্রায় সেবা করার। এটি সত্যিই এক দুর্লভ সুযােগ ছিল। প্রভুপাদ আসছেন, ম্যানহাটনে অবশেষে প্রথম শ্রেণির কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং তােষণ কৃষ্ণ দাস যে কোনাে প্রকারে এ রথযাত্রা আয়ােজনের জন্য সবুজ সংকেত পেল। জাম্ববান এখানে আছেন এবং আমাদের সাথে কয়েকজন ছেলে এ রথগুলাে তৈরির জন্য কঠোর পরিশ্রম করে। আমি প্রার্থনা করছিলাম, রথ তৈরি যেন সঠিক সময়ে শেষ হয়। তােমার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হবে যে, কিভাবে এর অনেকগুলো ইভেন্ট সফলতার সাথে সম্পাদিত হয়। উৎসবের পূর্বের রাতে রবিবার, ৫টা-৬টার দিকে, আমরা বলরামের চূড়া বসাচ্ছিলাম। চূড়া বসানাের পরে এক দমকা হাওয়ায় চূড়াটি উল্টে পড়ে যায়, পুরাে গঠনটি তখন ক্ষতিগ্রস্থ হয় এবং নলগুলাে ঘুরে নড়বড়ে হয়ে যায়। এমনিতেই দুটি রথের কাজ অনেক বাকি, তার উপর এ পরিস্থিতিতে বলরামের রথকে কিভাবে আমরা আবার পরিশুদ্ধ করে পূর্বের রূপ দিতে পারি? কিন্তু দুইজন ভক্ত খুবই দক্ষ নির্মাণকারী ছিলেন, তারা দৃঢ়ভাবে রথটিকে পূর্বের দৃঢ়ভাবে রথটিকে পূর্বের অবস্থানে নিয়ে আসেন। সারা রাত ধরে তারা কাজ করে এবং কৃষ্ণের কৃপায় অবশেষে তিনটি রথই ফিফথ অ্যাভিনিউর রাস্তায় বের হয়।”

জন্মান্তরবাদ প্রদর্শনী

তিনি আরাে লিখেন, “রথযাত্রা উদযাপনের জন্য নিউইয়র্কের মত স্থান আর কোথাও নেই। শােভাযাত্রাটি ছিল চমৎকার। এমনকি যখন আমরা রথ টানার পর উৎসব শেষে সন্ধ্যায় পুনরায় সেই নির্মাণ স্থানে ফিরে আসি, তখন লােকেরা তাদের নিজ নিজ অ্যাপার্টমেন্ট ও মদের দোকান থেকে বেরিয়ে আসে এবং আচমকা হরে কৃষ্ণ কীর্তন করতে থাকে। আমি তখন অনুভব করি নিউইয়র্কের এ উৎসবটি আমার এতদিনের কৃষ্ণভাবনামৃতের পরিধিকালের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ”।

রথযাত্রা শােভাযাত্রাটি শুরু হয় ফিফথ অ্যাভিনিউর গ্র্যান্ড আর্মি প্লাজা থেকে। যুবকরা ধূর্তি ফতুয়া, যুবতীরা শাড়ী পরিধান করে, বহু ভারতীয় নিউইয়র্কবাসী তখন অংশগ্রহণ করেন। শত শত সাধারণ মানুষ এ অদ্ভুত সুন্দর বিশাল রথের দড়ি টেনে রথকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যান।

ফেস্টিভ্যাল অব ইন্ডিয়ার মঞ্চ

চারপাশে স্নিগ্ধ শান্ত প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্য দিয়ে শােভাযাত্রাটি অতিবাহিত হচ্ছিল, সেইসাথে ছিল শত শত হরিনাম কীর্তনরত ও নৃত্যরত ভক্ত এবং হাজার হাজার উৎসুক জনতা। যে রাস্তা দিয়ে রথ চলছিল তাতে পঞ্চাশটি ব্লক রয়েছে, ওয়াশিংটন স্কয়ার পার্কের পথে এটি পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা।” ৩৪নং স্ট্রীটে শ্রীল প্রভুপাদ শােভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করেন। যখন তিনি সুভদ্রার রথের সামনে আসলেন ভক্তরা তাকে ঘিরে ধরলেন, পুলিশ এবং

অনুষ্ঠানে উপস্থিত শ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী

অন্য দর্শনার্থীরা তাতে অবাক হয়ে দেখছিলেন ভগবান জগন্নাথের এই প্রিয় প্রতিনিধিকে। তিনি সেই রথে ওঠে বসলেন। তাঁকে সবাই দর্শন করছিলেন। নিউইয়র্ক শহরে শ্রীল প্রভুপাদের দশ বছরের অক্লান্ত প্রচারের এটি ছিল একটি রাজকীয় ও যথাযথ ফসল। যখন তিনি প্রথম এখানে আসেন তাঁর কোনাে অর্থ ছিল না, থাকার জায়গা ছিল না, কৃষ্ণকথা বলার জন্য লােক সমাগমের কোনাে স্থান ছিল না। এখন তিনি রথযাত্রা উৎসবের মাধ্যমে ফিফথ অ্যাভিনিউতে জগন্নাথের রথ পরিচালনা করছেন। সে সাথে ছিল তার রাধাগােবিন্দ বিগ্রহও। ১৯৬৫ সালে তিনি ছিলেন একা, কিন্তু এখন এখানে তার সঙ্গী ছয় শতাধিক শিষ্য, তারা সবাই হরিনাম কীর্তনের অপ্রাকৃত আনন্দে মেতে আছে। লক্ষ লক্ষ পতিত আত্মাদের তিনি এভাবে উদ্ধার করেছেন। যখন শােভাযাত্রা ওয়াশিংটন স্কয়ার পার্কে পৌছে, তখন সেখানে অগণিত লোকের ভীড়। সেখানে অস্থায়ী একটি মঞ্চ স্থাপন করা হয়েছে এবং শ্রীল প্রভুপাদ সেখানে একটি সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন। সন্ধ্যায় এই শােভাযাত্রা ও উৎসব সম্পর্কে প্রধান টিভি স্টেশনগুলাে ফলাও করে প্রচার

করে এবং পরদিন সকালে বিভিন্ন সংবাদপত্রে বিভিন্ন ছবি সহকারে প্রবন্ধ ছাপানাে হয়। প্রভুপাদ নিউইয়র্ক ড্যালি নিউজ এর একটি লেখা বেশ পছন্দ করেছিলেন, তাতে একটি ছবির নিচে লেখা ছিল, “ফিফথ অ্যাভিনিউ, যেখানে পূর্ব-পশ্চিমের সঙ্গে মিলিত হয়েছে।” এভাবে সমগ্র শােভাযাত্রাটি অত্যন্ত সফল হয়েছিল।

রথযাত্রার বর্তমান ছবি

নিউইয়র্কের রথযাত্রা এখন আরাে উন্নত। এখন শুধু রথযাত্রার মধ্যেই সীমিত নয় তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নানা আয়ােজন। এরমধ্যে অন্যতম হল Festival of India, যেখানে ভারতীয় সংস্কৃতি প্রদর্শন করা হয়। ওয়াশিংটন স্কয়ার পার্কে ভারতীয় পারমার্থিক ও সংস্কৃতির নিদর্শন স্বরূপ আয়ােজিত হয়ে থাকে একটি ট্রাভেলিং মেলা, মঞ্চ প্রদর্শনী, বিভিন্ন ধরনের পারমার্থিক প্রদর্শনী, প্রদর্শনী সম্বলিত বুথ, বাজার স্টাইলের আউটডাের মার্কেট ইত্যাদি। Festival of Indiaতে বিখ্যাত ওডিসি নৃত্য, বৈদিক নাটক ও বৈদিক ভজন-কীর্তনসহ নানা প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। দর্শনার্থীদের জন্য বিভিন্ন ধরনের সুস্বাদু কৃষ্ণপ্রসাদের সুব্যবস্থা করা হয়-অন্ন, সবজি, হালুয়া, শরবত ইত্যাদি। ইসকন নিউইয়র্ক হাজার হাজার মানুষের মাঝে ঐ দিন প্রসাদ বিতরণ করে।

 ভগবান জগন্নাথের রথের সম্মুখে ঝাড়ু দেয়অর প্রথা পুরী থেকে শুরু। যেটি এই   রথযাত্রায় প্রদশিত হয়।

ইসকন ভক্ত চৈতন্যানন্দ দাস বলছিলেন, “স্থানীয় দায়িত্বরত পুলিশ অফিসাররা এ রথযাত্রা সম্পর্কে বলেন, এ রথযাত্রার দিন হল তাদের দায়িত্ব পালনের প্রিয় তারা বলে, এ উৎসবের মত আর অন্য কোনো উৎসব তারা দেখেনি, যেখানে প্রত্যেকে এত সুন্দরভাবে। পরস্পরকে সহযােগীতা করে ও একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।

গত বছর ৯ জুন অনুষ্ঠিত রথযাত্রায় অংশগ্রহণ করে ইসকনের অনেক সন্ন্যাসী, যাদের মধ্যে ছিলেন, শ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী মহারাজ, শ্রীমৎ রাধানাথ স্বামী মহারাজ, শ্রীমৎ ইন্দ্রদ্যুম্ন স্বামী মহারাজ, শ্রীমৎ ভক্তিভৃঙ্গ গােবিন্দ স্বামী মহারাজ। গৌরবাণী নামে ইসকনের বিখ্যাত সঙ্গীত দলের অনেক সদস্য সেখানে উপস্থিত ছিলেন, যার মহামন্ত্র কীর্তনে সহযােগিতা করেন। গত বছরের Festival of India তে

মহারাজদের উপস্থিতি দর্শনার্থীদের কাছে, অধিক দিব্য আনন্দের সঞ্চার করে। বিশ্বখ্যাত কীর্তনশিল্পী মাধব দাস ও মহারাজদের সুমধুর কীর্তন পুরাে উৎসব অঙ্গনে উপস্থিত দর্শনার্থীদের আনন্দের জোয়ারে ভাসিয়ে দেয়। সবাই কীর্তনের তালে তালে উদ্ধণ্ড নৃত্য করতে থাকে।

চিন্ময় ভাবাবেগে শ্রীমৎ রাধানাথ স্বামী

১৯৭৬ সালে এ. সি. ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ নিউইয়র্কে প্রথম এ রথযাত্রা প্রবর্তনের পর থেকে ৩৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে এ উৎসবটি ভক্তরা আয়ােজন করে আসছে। যেখানে এ রথযাত্রা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়, সেটি বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত শহরের সবচেয়ে বিখ্যাত রাস্তা এবং এটি নিউইয়র্ক শহর কর্তৃক অনুমােদিত মাত্র ১৫টি শােভাযাত্রার মধ্যে অন্যতম “ঐতিহ্যবাহী বার্ষিক ফিফথ অ্যাভিনিউ শােভাযাত্রা।” তাই এ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে হাজার হাজার পতিত জীবদেরকে অপ্রাকৃত দর্শন দান করেন পতিতপাবন ভগবান জগন্নাথ। ভারতের পুরীতেই একসময় তাঁর রথযাত্রা উৎসব অনুষ্ঠিত হতাে। কিন্তু শ্রীল প্রভুপাদ সেই রথযাত্রা পুরী থেকে বিস্তৃত করেন প্রায় সারা বিশ্বে, যেমনটি এই নিউইয়র্ক শহরেও। পূর্ব- পশ্চিমের এ এক অপূর্ব মিলন। 

 
 
ত্রৈমাসিক ব্যাক টু গডহেড, জুলাই -সেপ্টেম্বর ২০১৩

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here