ন্যায়

0
64

সাধারণ কিছু ন্যায় সূত্র, যেগুলো প্রাত্যহিক পরিলক্ষনের ওপর ভিত্তি করে প্রদান করে মহান সব দার্শনিক অন্তদর্শন।

বংশীবিহারী দাস

ইস্‌কন প্রতিষ্ঠাতা ও আচার্য শ্রীল প্রভুপাদ তার প্রবচন বা কথোপকথন ও রচনায় অনেকবার সংস্কৃত ন্যায় সূত্রের কথা উল্লেখ করেন। এই সূত্রসমূহ অনেকটা প্রবাদ বাক্যের মত এবং এগুলোর মাধ্যমে প্রচলিত সত্যগুলো প্রকাশিত হয়। সঠিক প্রসঙ্গে যথাযথ ন্যায় সূত্র উদ্ধৃত করার মাধ্যমে খুব কার্যকরীভাবে কোন একটি বিষয়কে ব্যাখ্যা করা যায়।১. কূপ-মণ্ডুক ন্যায়: কূপ ব্যাঙের যুক্তি “কূপ ব্যাঙের” যুক্তিটি প্রদর্শন করে যে, ব্যাঙ একটি নির্দিষ্ট গণ্ডি ও পরিবেশে বসবাস করে, সে একটি বিশাল মহাসমুদ্রের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ কল্পনা করতে পারে না। এরকম একটি ব্যাঙকে যদি এরকম বিশাল দৈর্ঘ্য-প্রস্থের মহাসমুদ্র সম্পর্কে বলা হয়, তবে প্রথমেই সে এরকম একটি মহাসাগর যে থাকতে পারে সেটি বিশ্বাস করতে চাইবে না। যদি তাকে আংশিক ধারণাও দেওয়া হলে সে তার পেট ফুলিয়ে এর পরিমাপ কল্পনা করতে শুরু করে। ফলে ব্যাঙের সেই ছোট্ট পেট ফুলে ফেটে যায় এবং ব্যাঙটিও প্রকৃত সেই মহাসাগরের অভিজ্ঞতা ছাড়াই মৃত্যুবরণ করে।
তদ্রুপ, জাগতিক বিজ্ঞানীরাও ব্যাঙের ন্যায় মস্তিষ্ক ও তথাকথিত বৈজ্ঞানিক প্রগতি দ্বারা পরিমাপ করে ভগবানের অপরিমেয় শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করতে চায়, কিন্তু পরিশেষে ঐ ব্যাঙের মত অসফল হয়ে মৃত্যুবরণ করে।
মাঝে মাঝে একজন জাগতিক ক্ষমতাশালী ব্যক্তিকে প্রকৃত ভগবানের সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে ভগবান বা ভগবানের অবতার হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এই প্রকার ভগবান হওয়ার প্রচেষ্টা বাড়তে বাড়তে বড় জোর ব্রহ্মা পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে, যিনি হলেন এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের সর্বোচ্চ জীব এবং জাগতিক বিজ্ঞানীদের অকল্পনীয় তার আয়ুষ্কাল রয়েছে। শ্রীমদ্ভগব গীতা (৮/১৭) থেকে আমরা তথ্য পাই যে, ব্রহ্মার একদিন ও রাত হল আমাদের গ্রহের সময়ানুসারে কয়েকশত সহস্র বছর। এই সুদীর্ঘ আয়ুষ্কাল সম্পর্কে ‘কূপের ব্যাঙ’ বিশ্বাস করতে পারে না, কিন্তু যে সব ব্যক্তি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা প্রদত্ত সত্য সম্পর্কে উপলব্ধি করতে পারে, তারা এই বৈচিত্রময় বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের যিনি সৃষ্টিকর্তা সেই মহান ব্যক্তির অস্তিত্বকে গ্রহণ করে।
২. রজ্জু-সর্প-ন্যায়: রজ্জু ও সর্পের যুক্তি: একটির পরিবর্তে অন্য একটিকে গ্রহণ করাকে বলা হয় মায়া বা মোহ। যেমন, একটি রজ্জু বা দড়িকে সর্প হিসেবে গ্রহণ করাটি হল মোহময়, কিন্তু এক্ষেত্রে রজ্জুটি মিথ্যে নয়। বরং, কিভাবে সে এটিকে গ্রহণ করে সেটিই হল মোহময়। অতএব, এই জড়া শক্তির প্রকাশকে ভগবানের শক্তি থেকে পৃথক এই প্রকার ভ্রান্ত ধারণা হল মোহময়, আবার সেটি মিথ্যেও নয়। এই প্রকার মোহ বা মায়া ভীতির সঞ্চার করে ঠিকই কিন্তু বৈদিক শাস্ত্রের জ্ঞানের মাধ্যমে আমরা নিজেদেরকে সম্পূর্ণরূপে ভীতিহীন করতে পারি।
৩. অন্ধ-পঙ্গু-ন্যায়: অন্ধ ও পঙ্গুর যুক্তি শ্রীল প্রভুপাদ প্রায়ই বলতেন যে, কিভাবে আমেরিকা প্রকৃত জাতিসংঘ সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়েছে। “আমি আমেরিকান শিক্ষার্থীদের এই ‘অন্ধ-পঙ্গু ন্যায়’ দর্শনটি সম্পর্কে বলেছি। একজন পঙ্গু ও অন্ধ ব্যক্তি কোনো কিছু একা অর্জন করতে অসমর্থ। কিন্তু যদি অন্ধ লোকটি পঙ্গু লোকটিকে তার কাঁধে তুলে নেয়, তখন পঙ্গু ব্যক্তিটি তার চোখ দিয়ে বন্ধু লোকটিকে পথ নির্দেশনা প্রদান করতে পারে। এতএব, আমেরিকা আমাদের অর্থ সরবরাহ করুক এবং আমরা তখন তাদেরকে সংস্কৃতি সম্পর্কে আমাদের দিক-নির্দেশনা প্রদান করব। তখনই প্রকৃত জাতিসংঘ গঠিত হবে।
৪. কাক-তালীয় ন্যায়: তাল বৃক্ষের ওপর কাকের যুক্তি: এই যুক্তিটি হল কিভাবে ছিদ্রান্বেষী ও মনোগত জল্পনা কল্পনাবাদীরা নিরর্থক পরিচয় নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করে সময় অপচয় করে। এক সময় এক কাক উড়ে এসে একটি তাল বৃক্ষে বসেছিল। যেইমাত্র কাকটি বসল তখনই একটি তাল ভূপতিত হল। কিছু লোক দেখতে পেয়ে বলল, কাকটি বৃক্ষের ওপর বসায় তালটি ভূপতিত হল, অন্যরা বলল তালটি এমনিতেই পড়ত, তালটি পড়ার সময়ই কাকটি এসে বসেছিল।তদ্রুপ, বহু লোক জড় জগতে জীবের পতিত হওয়ার প্রকৃত কারণ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করে। কেউ কেউ হতবাক হয়ে বলে জীব হয়ত বৈকুণ্ঠলোক বা ব্রহ্মজ্যোতি থেকে পতিত হতে পারে। এই সমস্ত আলোচনা নিছক। প্রকৃত আলোচনার বিষয় হলো কিভাবে আমরা চিন্ময় জগতে ফিরে যেতে পারি?
৫. শাখা-চন্দ্র-ন্যায়: বৃক্ষের শাখা ও চন্দ্রের যুক্তি যদিও চন্দ্রকে মনে হয় যেন বৃক্ষের শাখার মধ্যে অবস্থান করছে, প্রকতৃপক্ষে এটি অনেক দূরেই অবস্থিত। তদ্রুপ ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অবতারগণ এই জড় জগতের নয়, তারা ভগবানের অহৈতুকী কৃপার মাধ্যমে দৃশ্যমান বা প্রকটিত হন। আমাদের এটি ভাবা উচিত নয় যে, তারা এই জগতের। যেরকম ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ভগবদ্‌গীতায় (৯/১১) ব্যক্ত করেছেন:

অবজানন্তি মাং মৃঢ়া মানুষীং তনুমাশ্রিতম্ ।
পরং ভাবমজানত্তো মম ভূতমহেশ্বরম্ ৷৷

অনুবাদ: আমি যখন মনুষ্যরূপে অবতীর্ণ হই, তখন মূর্খেরা আমাকে অবজ্ঞা করে। তারা আমার পরম ভাব সম্বন্ধে অবগত নয় এবং তারা আমাকে সর্বভূতের মহেশ্বর বলে জানে না। এই সম্পর্কিত আরেকটি ব্যাখ্যা: একজন শিক্ষক তার শিক্ষার্থীকে একটি বৃক্ষের কিছু শাখা দেখাচ্ছিল। লক্ষ্যটি হল মূলত বৃক্ষ শাখার মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থী যেন উদীয়মান সূর্যকে দেখতে পায় এক্ষেত্রে প্রথমটি একটি সাধারণ দৃষ্টান্ত, এরপর দ্বিতীয়টিতে একটি কঠিন দৃশ্যপট সম্পর্কে ব্যাখ্যা করা হয় ।
৬. তণ্ডুল-বৃশ্চিক-ন্যায়: চাল ও বৃশ্চিকেরই যুক্তি মাঝে মাঝে দেখা যায়, চালের স্তূপ থেকে বৃশ্চিক উঠে আসছে। মূর্খ লোকগণ এটি দেখে মনে করে, ‘চাল থেকেই বোধহয় বৃশ্চিকের জন্ম। কিন্তু প্রকৃত কারণ সেটি নয়। বৃশ্চিক চালের স্তূপে ডিম পাড়ে এবং চালের গাঁজন প্রক্রিয়ার জন্য নবজাতক বৃশ্চিক জন্ম নেয়। তাই, প্রকৃতপক্ষে চাল বৃশ্চিকের জন্ম দেয় না, বরং এটি আসে কিছু রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। মূর্খ বিজ্ঞানীরা বিবর্তন মতবাদ পেশ করে বলে যে, মানুষ বানর থেকে এসেছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কোন বানর মানুষ উৎপাদন করে না। কেউ কোনদিন তা দেখেও নি। তবুও তারা এই তত্ত্বটি পেশ করে, কিন্তু মূল ব্যাপারটি তা নয়।
৭. গড্ডালিকা-প্রবাহ-ন্যায়: এই যুক্তিটি প্রদর্শন করে যে, সাধারণ জনতারা নেতাদের অনুসরণ করার প্রবণতা রয়েছে। ঠিক ভেড়ার পালের প্রত্যেক ভেড়া সামনের ভেড়াটিকে অনুসরণ করে। যদি সামনের ভেড়াটি গর্তে পড়ে তখন পিছনের ভেড়াগুলোও গর্তে পড়ে। আজকের সমাজও একই অবস্থায় রয়েছে। রাজনীতিবিদ, চলচ্চিত্র অভিনেতা, ক্রীড়াবিদ ও ব্যবসায়ীগণ সমাজকে পরিচালিত করছে এবং সমস্ত জনগণ তাদের কার্যকলাপের অনুসরণ করছে। নেতাদের কোন মূল্যবোধ বা নীতি নেই এবং তারা সমগ্র সমাজকে নারকীয়ভাবে পরিচালিত করছে।
৮. অজগলস্তনের ন্যায়: ছাগলের গলদেশে স্তনের যুক্তি ছাগলের গলায় স্তনের মত দেখে মনে হয় যেন এর থেকে দুধ পাওয়া যাবে, কিন্তু সেখান থেকে দুধ পাওয়ার চেষ্টাটি মূর্খতা। তদ্রুপ পরমেশ্বর ভগবান যে সর্ব কারণের পরম কারণ এটি ভুলে কোন উপাদান থেকে কোনো সৃজনশীল শক্তি প্রত্যাশা করা উচিত নয়। এটি হল ‘অজ-গল স্তন-ন্যায়। আমাদের অবশ্যই পরম পুরুষের শক্তির প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে, যিনি প্রকৃতিকে গর্ভবতী করে। কেননা, ভগবান যখন ধ্যান মগ্ন হয়ে শায়িত থাকে, তখন জড়া শক্তি তৎক্ষণাৎ অনন্ত বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করে, যেগুলোর প্রত্যেকটিতে ভগবান শায়িত থাকেন এবং এভাবে সমস্ত গ্রহগুলো ও আরো বিভিন্ন উপকরণগুলো তৎক্ষণাৎ ভগবানের ইচ্ছাতে সৃষ্টি হয়।
৯. অর্ধ্ব কুক্কুটী-ন্যায়: অর্ধ মুরগি যুক্ত এক ব্যক্তির একটি মুরগি প্রতিদিন স্বর্ণের ডিম দিত। মূৰ্খ ব্যক্তিটি ভাবত, “এটি অত্যন্ত লাভজনক, কিন্তু মুরগিটিকে খাওয়ানো ব্যয় বহুল। এর চেয়ে ভালো হয়। মুরগিটির মাথা কেটে ফেলি এবং তখন এর খাওয়ার খরচ বেঁচে যাবে। তখন আমি কোনো বিনিয়োগ ছাড়াই ডিম পাব।” তদ্রুপ নির্বিশেষবাদীরা শাস্ত্রকে এভাবে গ্রহণ করে। তারা মনে করে, ও এটি ভালো নয়, এটি উপকারও নয় আমরা শাস্ত্র থেকে এই অংশটি বাদ দিব। যেমন, যখন কৃষ্ণ বলেন, “আমাকে সর্বত্র দর্শন করা উচিত” তখন মূর্খ মায়াবাদীরা ভাবে এটি অত্যন্ত গ্রহণ যোগ্য। কিন্তু যখন কৃষ্ণ বলে “সবকিছু পরিত্যাগ করে আমার শরণাগত হও।” তখন তারা তাতে দ্বিমত পোষণ করেন। তারা নিজেদের সুবিধা মত শাস্ত্রের দিক নির্দেশনা গ্রহণ করে আবার প্রত্যাখান করে। কিন্তু আচার্যগণ এভাবে শাস্ত্রের দিক-নির্দেশনা বিকৃত করেন না।
যখন কৃষ্ণ ভগবদ্গীতায় বলেন তখন অর্জুন বলেছিলেন “তুমি যাই বল আমি তাই গ্রহণ করব।”
লেখক পরিচিতি: বংশীবিহারী দাস ব্যাক টু গডহেড হিন্দি এডিশনের একজন সম্পাদক।


 

জানুয়ারী-মার্চ ২০১৭ ব্যাক টু গডহেড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here