নতুন বছরে নতুন কিছু

0
139

শ্যামানন্দ দাস : ভগবদ্‌গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ দৃঢ় প্রতিজ্ঞার সুফল সম্বন্ধে প্রশংসা করে বলেছেন, ‘যারা বিষয়ের প্রতি দৃঢ় প্রতিজ্ঞার সাথে চলেন তাদের লক্ষ্য এক। হে কুরুদের প্রিয় সন্তান, যারা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ নন তাদের বুদ্ধিমত্ত্বা বহু শাখায় বিভক্ত হয়।’ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বহু শাখায় বিভক্ত বুদ্ধিমত্ত্বার ত্রুটি নির্দেশ করতে গিয়ে এও বলেছেন, ‘স্বল্পজ্ঞান সম্পন্ন মানুষ বেদের আলঙ্করিক শব্দের প্রতি অধিক মাত্রায় আকৃষ্ট হয়, যেখানে বিভিন্ন ঊর্ধ্বলোকে উত্তরণের জন্য বিভিন্ন পূণ্য কর্মের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যার ফলে সুজন্ম, ক্ষমতা ইত্যাদি কিছু লাভ হয় । সমৃদ্ধশালী জীবন এবং ইন্দ্রিয় তৃপ্তি সাধনের কামনায়, তারা বলে এর থেকে অধিক কিছু নেই। যাদের মনে জড়জাগতিক সমৃদ্ধি এবং ইন্দ্রিয় সুখের কামনা অতি তীব্র এবং যারা এই সমস্ত বস্তুর দ্বারা কিংকর্তব্যবিমূঢ়, তাদের নিকটেই পরমেশ্বর ভগবানের প্রতি ভক্তিমূলক দৃঢ় সংকল্প স্থান পায় না।’
আমরা সকলেই আমাদের জীবনের লক্ষ্য পূরণ করতে চাই এবং সেই জন্য আমাদের ঐকান্তিক দৃঢ় প্রতিজ্ঞা থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুবা আমরা আমাদের প্রচেষ্টায় কখনো সফল হতে পারব না। যাতে আমাদের প্রচেষ্টা বিফলে না যায় তার জন্য কি পদ্ধতি এবং কি অভ্যাস আমাদের অবলম্বন করতে হবে? আমাদের প্রচেষ্টায় সফল হওয়ার জন্য কোন সূত্র আছে কি? হ্যাঁ একটি রয়েছে। শ্রীল রূপ গোস্বামী সাফল্যের জন্য একটি সূত্র দিয়েছেন—
শুদ্ধ ভক্তিমূলক সেবা নিবেদনের অনুকূল ছয়টি নীতি আছে ১) উৎসাহী হতে হবে, ২) দৃঢ় বিশ্বাসসহ প্রচেষ্টা, ৩) সহনশীলতা, ৪) অবশ্য পালনীয় রীতি অনুযায়ী কর্ম করা যেমন, শ্রীকৃষ্ণের লীলা শ্রবণ, শ্রীকৃষ্ণের দিব্যনাম জপ এবং শ্রীকৃষ্ণকে স্মরণ, ৫) অভক্তের সঙ্গ পরিত্যাগ করা এবং ৬) পূর্বতন আচার্যদের পদাঙ্ক অনুসরণ করা। এই ছয়টি নীতি সন্দেহাতীতভাবে শুদ্ধ ভক্তিমূলক সেবায় পূর্ণ সাফল্য এনে দেয়। আমরা যদি আমাদের ভক্তি পথে একাত্ম হই তাহলে শ্রীল রূপ গোস্বামী প্রদত্ত এই সূত্রকে অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে অনুসরণ করতে হবে। যদি আমরা আমাদের প্রয়াসে ঐকান্তিক না হই, তাহলে জীবনে নিরন্তর সংগ্রাম করতে থাকব এবং অসহায় ও আশাহত হব।
নতুন বছর নতুনভাবে শুরু করার প্রতিশ্রুতি নিয়ে আসে। সেই জন্য আমাদের মধ্যে অধিকাংশই নতুন বছরে হয় নতুন প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করে অথবা পুরানো প্রতিজ্ঞার উপরে নতুন উৎসাহ নিয়ে কর্ম করতে প্রয়াসী হওয়া। একটি সরল লোককথা কখনো কখনো পারমার্থিক সত্যের প্রতি নির্দেশ করে, উদাহরণ স্বরূপ হিমালয়ের এই কাহিনিটি বর্ণনা করে যে, কিভাবে অন্তিম শয্যায় এক ব্যবসায়ী তার সন্তানের কাছে তিনটি ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন; ক) কখনো রোদ্দেরে তোমার গৃহ হতে দোকানে যাবে না, খ) তোমার দৈনন্দিন খাদ্যে অবশ্যই ভাত থাকবে এবং গ) প্রতি সপ্তাহে একজন নতুন স্ত্রী বিবাহ করবে। পুত্রটি যখন তার পিতাকে কথা দিল যে, সে তার তিনটি ইচ্ছাই পূরণ করবে।
তারপর তার পিতা দেহত্যাগ করলেন। দ্বিতীয় ইচ্ছাটি সর্বাপেক্ষা সহজ ছিল যদিও তার খাদ্য তালিকা ছিল অনাড়ম্বর। তার পিতার প্রথম ইচ্ছা পূরণের জন্য সে তার গৃহ হতে দোকান পর্যন্ত ছাউনী বানিয়ে ফেলল । এই পরিকল্পনাটি ব্যয়সাপেক্ষ ছিল এবং প্রত্যেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত অর্থ এইভাবে ব্যয় করার জন্য তাকে উপহাস করতে লাগল। কিন্তু সে তার লক্ষ্যে অবিচল ছিল, পিতাকে দেওয়া সব 2 প্রতিশ্রুতি সে পূরণ করতে চেয়েছিল।
এই সবগুলির মধ্যে তৃতীয় প্রতিশ্রুতিটি ছিল অত্যন্ত খারাপ। সে অনেক মহিলাকেই প্রস্তাব দিয়েছিল, কিন্তু সব জায়গাতে উপহাসের পাত্রে পরিণত হলো। কোন মহিলাই তাকে মাত্র এক সপ্তাহের জন্য বিবাহে সম্মত হলো না।
মনে হলো সে তার পিতার তৃতীয় ইচ্ছা পূরণে সমর্থ হবে না। একদিন একটি যুবতী মেয়ে তার প্রতি করুণায় তাকে বিবাহ করতে সম্মত হলো এবং সে কর্তব্য মনে করে যে কাজ করছিল, তাকে সেই মেয়ে প্রশংসা করল। লোকে বিস্মিত হলো। মেয়েটির পরিবারের সদস্যরা তাকে এই রকম মৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করার উপদেশ দিল। কিন্তু মেয়েটি দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ছিল এবং ছেলেটি অত্যন্ত নিশ্চিত বোধ করল। তাদের জাঁকজমকপূর্ণ বিবাহ হলো এবং উভয়েই অত্যন্ত সুখী হলো। কিন্তু দিনটি শেষ হতেই ছেলেটি অত্যন্ত দুঃখিত হলো এবং সপ্তম দিনে তার দুঃখ চরম সীমায় পৌঁছাল। তার স্ত্রী একটুও বিচলিত হয়নি।
অত্যন্ত শান্তভাবে তার স্ত্রী তার কাছে এই তিনটি ইচ্ছার পশ্চাতে প্রকৃত অর্থ ব্যাখ্যা করল; ‘যখন তোমার পিতা তোমাকে বলেছিলেন, তোমার গৃহ হতে রৌদ্রের মধ্যে তোমাকে দোকানে না যেতে, তিনি এই অর্থে বলেননি যে, তুমি তোমার গৃহ হতে দোকান পর্যন্ত ছাউনী বানাও। তিনি প্রকৃতপক্ষে বলতে চেয়েছিলেন যে, খুব ভোরে তোমার কার্য শুরু করে সূর্যান্তের পরে ফিরে আসা উচিত।
যখন তিনি তোমায় শুধু ভাত খেতে বলেছিলেন তিনি এই অর্থে বলেছিলেন যে, তোমার খাদ্য তালিকায় কখনো আড়ম্বর রেখো না। তৃতীয় ইচ্ছাতে তোমার পিতা কখনো বলেননি যে, একটি মহিলাকে শুধুমাত্র একটি সপ্তাহের জন্য বিবাহ করতে। তিনি প্রকৃতপক্ষে বলেছিলেন, সর্বদা তোমার স্ত্রীর সঙ্গে প্রেমপূর্ণ ব্যবহার করবে। যদি তুমি সর্বদা তাকে একই রকম ভালবাসা প্রদান কর যেমন তুমি বিবাহের সময় করেছিলে তবেই প্রতি সপ্তাহেই সে নববিবাহিতা পত্নীর মতো থাকবে।’ আমরাও যখন শ্রীকৃষ্ণের নিকট থাকি প্রতিবারই আমাদের এই নতুন অনুভব হয়। পবিত্র বেদ তাঁকে ‘নিত্য-নব নবায়মান’ অথবা ‘যিনি সর্বদা নবীন এবং সতেজ’ রূপে বর্ণনা করেছেন। শ্রীল প্রভুপাদ ভক্তদের আশ্বাস দিয়েছেন যে, আমাদের প্রতিদিনই নতুন বছর কারণ শ্রীকৃষ্ণের লীলা বিলাস নিত্য এবং সর্বদা নবীন।
সকল শুদ্ধ ভক্তই শ্রীকৃষ্ণের সৌন্দর্যকে ‘নিত্য নবীন’ রূপে বর্ণনা করেছেন। এখানে এইরূপ বর্ণনার একটি ছোট্ট উদাহরণ দেওয়া হলো, ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে সর্বোত্তম যোগীরা অর্চনা করেন। তিনি নন্দনন্দন। তিনি ব্রজবাসীদের মনের ভয় নিবারণ করেন, তাঁর ভঙ্গীমা মনোমুগ্ধকর। যখন তিনি বংশীবাদনরত অবস্থায় বিচরণ করেন তখন তাঁকে অত্যন্ত আকর্ষণীয় দেখায়। এই অপরূপ ভঙ্গিমায় তিনি সমগ্র জগতকে মোহিত করে রাখেন। তাঁর গাত্রবর্ণ নবজলধর মেঘের ন্যায়, তাঁর শির বৃহৎ শিখি পুচ্ছ দ্বারা ভূষিত। তাঁর ললাটের চন্দন তিলক অতিশয় আকর্ষণীয়। তিনি উজ্জ্বল পীতবর্ণের বসন পরিধান করেন, তিনি কমনীয় সদাহাস্যময় বদনে দণ্ডায়মান। যদি আপনি হৃদয় আপনার শ্রীকৃষ্ণকে পুনঃ স্থাপন করেন তাহলে আপনার জীবনের প্রতিমুহূর্তই আনন্দময় হয়ে উঠবে। সুতরাং প্রতিদিন মহামন্ত্র জপের মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণকে আপনার হৃদয়ে অবস্থান করতে আমন্ত্রণ করুন-‘হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে, হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে’-এই হোক আপনার নতুন বৎসরের প্রতিজ্ঞা এবং নতুন বছরের প্রতিটি দিনকে নতুনভাবে অনুভব করুন। হরেকৃষ্ণ !


 

চৈতন্য সন্দেশ জানুয়ারি-২০১৭ প্রকাশিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here