ধর্ম হলো জীবের সহজাত বৃত্তি

0
46

কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের প্রতিষ্ঠাতা-আচার্য কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী শ্রীল
প্রভুপাদ ২২ এপ্রিল ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে হায়দ্রাবাদে শ্রীমদ্ভাগবতের (১/২/৮) প্রবচন থেকে সংকলিত


ধর্মঃ অনুষ্ঠিতঃ পুংসাং বিশ্বাসেন-কথাসু যঃ।
নোৎপাদয়েদ যদি রতিং শ্রম এব হি কেবলম্॥
অনুবাদ: স্বীয় বৃত্তি অনুসারে বর্ণাশ্রম পালনরূপ স্ব-ধর্ম অনুষ্ঠান করার ফলেও যদি পরমেশ্বর ভগবানের মহিমা শ্রবণ-কীর্তনে আসক্তির উদয় না হয়, তা হলে তা বৃথা শ্রম মাত্র। ধর্মকে সাধারণত ইংরেজীতে অনুবাদ করা হয় ‘রিলিজন’ বলে। আমি ইতিমধ্যে এটা বহুবার আলোচনা করেছি। রিলিজনের আভিধানিক অর্থ হলো ‘এক রকমের বিশ্বাস’। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ধর্ম বলতে বোঝায় পেশাগত বৃত্তি, বা তার বৈশিষ্ট্য। ঠিক একটা সাপের মতো। সাপের ধর্ম হলো দংশন করা, মারাত্মক দংশন। সেটাই তার ধর্ম, পেশাগত বৃত্তি। প্রত্যেকেরই আছে….. ঠিক এই মাইকের মতো, এটার কাজ শব্দকে বিবর্ধিত করা। এটাই তো মাইকের ধর্ম বা কাজ। এই মাইক যদি শব্দকে বিবর্ধিত না করে, তবে এটা নিরর্থক। সুতরাং যা কিছুই নাও না কেন, তার বৈশিষ্ট্য আছে। ধর্মের মানে তাই। ধর্ম কোন কৃত্রিম বিশ্বাস নয়। বিশ্বাসের পরিবর্তন করতে পার, কিন্তু তোমার পেশাগত বৃত্তির পরিবর্তন করতে পার না। জীবের পেশাগত বৃত্তি কি? জীব এখন স্থূল ও সূক্ষ্ম এই দুই প্রকার দেহের ভেতর আবদ্ধ। অতএব, জীব যখন দেহগত জীবন বোধে অবস্থিত, তখন তার ধর্ম হলো ফলপ্রদ কার্যাবলী বা ইন্দ্রিয় সন্তুষ্টি। জীব যখন তার মানসিক স্তরে বিরাজিত থাকে, তখন তার পেশাগত বৃত্তি মানসিক কল্পনা। আর যখন সে তার মূল আধ্যাত্মিক স্তরে বিরাজিত থাকে, তখন তার পেশাগত বৃত্তি কৃষ্ণসেবা। এই হলো তিনটি অবস্থা: কর্ম, জ্ঞান, ভক্তি ক্রম বিবর্ধন। কারণ, পারমার্থিক জ্ঞানও ক্রমশ বিবর্ধিত হয়। নির্বিশেষ ব্রহ্ম, অন্তর্যামী পরমাত্মা এবং ষড় ঐশ্বর্যপূর্ণ ভগবান-এই হচ্ছে আত্মোপলব্ধির বিভিন্ন বা চিন্ময় উন্নতি। কর্ম, জ্ঞানযোগ ও ভক্তিযোগ অর্থ ভক্তিযোগের প্রারম্ভিক স্তর। অতএব ভগবদ্্গীতায় (৬/৪৭) বলা হয়েছে-

যোগিনামপি সর্বেষাং মদ্গতেনান্তরাত্মনা।
শ্রদ্ধাবান্ ভজতে যো মাং স মে যুক্ততমো মতঃ॥

বিভিন্ন রকমের যোগী আছে। কিন্তু তিনিই হলেন প্রথম শ্রেণীর যোগী যিনি মদ্্গতেনান্তরাত্মা। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, “যিনি সর্বদা আমাকে ভাবেন”, শ্রদ্ধাবান, শ্রদ্ধা, প্রেম ও বিশ্বাসের সঙ্গে আমার ভজনা করেন, তিনিই প্রথম শ্রেণীর যোগী। সুতরাং, শুধু কৃষ্ণের চিন্তা ও ভজন। ভজনের বিভিন্ন পদ্ধতি আছে। কৃষ্ণকথা শ্রবণও ভজন, ঠিক যেমন তুমি কৃষ্ণকথা শুনছো। আমি বলছি, তুমি শুনছো। তেমনি আবার যখন কথন-শ্রবণ শেষ হয়ে যাবে, তখনও তুমি কৃষ্ণচিন্তা করবে। অথবা, হরেকৃষ্ণ মন্ত্র জপ করেও তুমি কৃষ্ণভাবনা করতে পার। কৃষ্ণ যেহেতু পরমপুরুষ, তাই এইসব বিভিন্ন পদ্ধতিও একই রকম। কীর্তন ও শ্রবণ, বা মন্দিরে স্মরণ ও অর্চনের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। শ্রবণং কীর্তনং বিষ্ণোঃ স্মরণং পাদ-সেবনম্, অর্চনম্। মন্দিরে পূজা করাকেই অর্চনম্ বলে। বন্দনং, প্রার্থনার দ্বারা বন্দনা করা। খ্রিস্টানেরা, মুসলমানেরা প্রার্থনা করেন। নিশ্চয়ই সেই প্রার্থনা কোন পরমেশ্বর ভগবানের কাছে নয়। তারা প্রার্থনা করে কোন নৈর্ব্যক্তিক বৈশিষ্ট্য বা কিছু ধারণার কাছে। কিন্তু সেই প্রার্থনাও ভক্তির বিভিন্ন পদ্ধতির একটি। যে ব্যক্তি ভগবানের প্রাধান্য বা পরমেশ্বর ভগবানকে স্বীকার করেছে তার অর্চন পদ্ধতিকে ভক্তিযোগের শ্রেণীভুক্ত বলে বিবেচনা করা হয়েছে। ভক্তিযোগ পদ্ধতি দ্বারা যত বেশি বিশুদ্ধ হবে, তত বেশি তুমি প্রকৃত স্তরে পৌঁছাতে পারবে। এটা এখানে বলা হয়েছে যে, ধর্মঃ স্বনুষ্ঠিতঃ পুংসাম্-যে রকমেরই ধর্ম হোক, কোন ক্ষতি নেই। প্রকৃতপক্ষে; বৈশিষ্ট্যপূর্ণ পেশাগত বৃত্তিই হলো ধর্ম। বৈশিষ্ট্য হলো এই যে, ভগবান হলেন মহান পুরুষ আর আমরা তার অধীন। এটাই হলো বেদের অনুশাসন। নিত্যো নিত্যানাং চেতনশ্চেতনানাম্ একো যো বহুনাং বিদধাতি কামান্। আমাদের সেই একবচনকে বুঝতে হবে। ভগবান এক, নিত্য, শাশ্বত, চেতন, জীবন্ত। তিনি নিত্য ও জীব। কিন্তু তিনি হলেন মুখ্য, প্রধান জীব। তিনি নিত্যো নিত্যানাং চেতনানাম্। আমরা হলাম বহু জীবগণ। কিন্তু তিনি এক। কেন? এই দুই নিত্য ও চেতনের মধ্যে পার্থক্য কি? ভগবান নিষ্প্রাণ পাথর নন। ভগবান হলেন তোমার আমার মতো জীব সত্তা। কিন্তু প্রধান জীব সত্তা, একজন। আমাদের যেমন নেতা আছে। শত সহস্র অনুগামী থাকলেও নেতা মাত্র একজন। তুমি যে কোন ধর্মবিশ্বাসী হতে পার কিন্তু তোমাকে একজন নেতা গ্রহণ ই করতে হবে। তুমি যে দর্শনই অনুসরণ কর না কেন, তাতে কিছু এসে যায় না। নেতা তোমাকে গ্রহণ করতেই হবে। আর কৃষ্ণ হলেন সেই পরম নেতা, নেতার নেতা।
একথা ভগবদ্্গীতায় আছে। মত্তঃ পরতরং নান্যৎ কিঞ্চিদস্তি ধনঞ্জয়ঃ। নেতারা আছে, দেবতারা আছে। দেবতা মানে নিয়ামক। সর্বদাই একজন নিয়ামক আছে। দেবতা অনেক আছে। যে কেউ দেবতা, কারণ সে যে কোনও ভাবে একজন নিয়ামক, একজন নেতাও। কিন্তু আমরা বলতে চাচ্ছি পরম নেতা, পরম নিয়ামক। তিনি হলেন শ্রীকৃষ্ণ, এমন নেতাকেই তোমাদের গ্রহণ করতে হবে। কৃষ্ণ ছাড়া অন্য কেউ পরম নেতা বা পরম নিয়ামক হতে পারে না। প্রত্যেক নেতাই অন্য কোন নেতার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। আর পরম নেতা হলেন শ্রীকৃষ্ণ। কাজেই শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, মত্তঃ পরতরং নান্যৎ…“এরপর আর অন্য কোন উৎকৃষ্টতর কেউ নেই….. ”।

ঈশ্বরঃ পরমঃ কৃষ্ণঃ সচ্চিদানন্দ-বিগ্রহঃ।
অনাদিরাদিগোবিন্দঃ সর্বকারণকারণম্ ॥

বৈদিক সাহিত্যের বক্তব্য এটাই: পরম নিয়ামক, পরম নেতা হলেন শ্রীকৃষ্ণ। সচ্চিদানন্দ বিগ্রহঃ। কৃষ্ণ নিরাকার নন। সচ্চিদানন্দ বিগ্রহঃ, আনন্দময়-রস-বিগ্রহঃ। আনন্দ-চিন্ময়-রস। সেটা এই বিগ্রহ নয়। আমাদের সেটা বুঝতে হবে। বর্তমান মুহূর্তে আমাদের রূপ হলো জড় রূপ, সেটা সৎ-চিৎ-আনন্দময় নয়। সৎ অর্থ শাশ্ব¦ত, চিৎ অর্থ জ্ঞানপূর্ণ আর আনন্দ হলো আনন্দপূর্ণ।


মাসিক চৈতন্য সন্দেশ অক্টবর ২০২২ হতে প্রকাশিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here