দূর্গা পূজায় কেন লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ?

0
29

শ্রী পতিত উদ্ধারণ গৌর দাস ব্রহ্মচারী

আমরা বাঙ্গালিরা মা দূর্গাকে যেভাবে দেখতে অভ্যস্ত তা হলোদশভুজা, মহিষাসুর বধে উদ্যতা, সিংহবাহিনী, ডান লক্ষ্মী ও গণেশ এবং বাম সরস্বতী ও কার্তিক। আমরা দেবীকে মহিষাসুরমর্দিনীরূপে পূজা করি। উত্তর ভারতে দেবী দূর্গা অবশ্য এই যুদ্ধংদেহী মূর্তিতে পূজিতা হন না। সেখানে দেবী অষ্টভুজা, অস্ত্রশস্ত্র সমন্বিতা হয়ে ও শান্তভাবে প্রসন্নবদনে সিংহ বা বাঘের পিঠে বসে আছেন এবং এক হাত আশীর্বাদ মুদ্রায় রেখেছেন ভক্তদের উদ্দেশ্যে। আবার দক্ষিণভারতে সাধারণত চতুর্ভুজা, পদ্মাসনে উপবিষ্টা রূপে তিনি পূজিতা হন। তবে রূপ যা-ই হোক না কেন, তিনি সর্বরূপেই ভক্তদের কল্যাণকারিণী।লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে যে, দেবীদূর্গার ডান যে ধনদাত্রী লক্ষ্মী এবং বাম জ্ঞানদাত্রী সরস্বতী দণ্ডায়মান, তাঁরা মা দূর্গার দুই কন্যা। বৈদিকশাস্ত্র অনুসারে, তাঁরা পরমেশ্বর ভগবানের আদি শক্তিরই ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ। সৃষ্টি-পালন-সংহারকার্যে আদি শক্তি তিনরূপ হয়েছিলেন,

 

তৃষ্টয়ৈব ধার্যতে সর্বং ত্বয়তৈং সৃজ্যতে জগৎ।
ত্বয়ৈতৎ পাল্যতে দেহি ত্বমৎস্যন্তে চ সর্বদা।
বিসৃষ্টি সৃষ্টিরূপা বা ত্বং স্থিতিরূপ পালনেঃ

(মা. পু. ৮১/৫৬-৫৭)

সৃষ্টিকার্যে ব্রহ্মার জ্ঞানশক্তিরূপে মহাসরস্বতী, পালনকার্যে বিষ্ণুর পালনকারিণী শক্তিরূপে মহালক্ষ্মী এবং সংহারকার্যে শিবের প্রলয়কারিণী শক্তিরূপে মহাকালী, যিনি দূর্গা থেকে অভিন্ন। আবার, ভগবানের চিৎ-শক্তির ছায়াস্বরূপা এই বহিরঙ্গা মায়াশক্তি ত্রিগুণময়ী। মার্কণ্ডেয় পুরাণের অন্তর্গত প্রাধানিক রহস্যে মেধস ঋষি বলছেন, সেই ত্রিগুণময়ী দেবীর তামসিক, রাজসিক, সাত্ত্বিক এই ত্রিবিধা মূর্তি, ত্রিগুণা তামসী দেবী সাত্ত্বিকই যা ত্রিধাদিতা। সত্ত্বগুণে সরস্বতী, রজোগুণে লক্ষ্মী এবং তমোগুণে দেবীকালী। উল্লেখ্য যে, যেহেতু ভগবানের চিচ্ছক্তি নির্গুণা অর্থাৎ ত্রিগুণের অতীত।

সুতরাং, ত্রিগুণময়ীরূপে দেবী দূর্গার সঙ্গে যে লক্ষ্মী ও সরস্বতী পূজিতা হন, তাঁরা অবশ্যই নির্গুণা বা গুণাতীতা চিচ্ছক্তি নন। অতএব, ত্রিগুণময়ীরূপে পূজিতা এই দূর্গা, লক্ষ্মী এবং সরস্বতী হলেন ভগবানের চিচ্ছক্তি বা স্বরূপশক্তির ছায়াস্বরূপা এবং জড়জগতের অধিষ্ঠাত্রী। অর্থাৎ, দেবী দূর্গা ভগবান শ্রীবিষ্ণুর স্বরূপশক্তি মহালক্ষ্মীর প্রকাশ। তাইতো তার মন্ত্রে নারায়ণী, বৈষ্ণবী শব্দের পুনঃ পুনঃ ব্যবহার। দূর্গাপূজার আবশ্যকীয় অঙ্গ হলো শালগ্রামশিলা বা নারায়ণশিলার অর্চনা। নারায়ণশিলা পূজা না করে ব্রাহ্মণগণ দুর্গাপূজা করেন না। মায়ের নামে সিদ্ধিদাতা বিঘ্নহর্তা গণেশ এবং ডানে শৌর্য বীর্যের প্রতীক দেবসেনা কার্তিক। গভীরভাবে লক্ষ্য করলে বোঝা যাবে এই চারজন দেবতা যেন সমাজের চার বর্ণের প্রতীক। সমাজের চারবর্ণ হলো বুদ্ধিজীবি-ব্রাহ্মণ, শাসকশ্রেণি-ক্ষত্রিয়, বৃত্তিজীবি-বৈশ্য এবং শ্রমজীবি-শূদ্র। সরস্বতী বুদ্ধি ও জ্ঞানের অধিষ্ঠাত্রী ও সত্ত্বগুণস্বরূপিণী। তাই ব্রাহ্মণগণের প্রতীক। বীরত্ব ও তেজের প্রতীক কার্তিকেয় ক্ষত্রিয় শক্তির প্রতিনিধিত্ব করছেন। দেবী লক্ষ্মী, শস্য, সমৃদ্ধি ও ধনসম্পদের অধিষ্ঠাত্রী যা বৈশ্যদের সম্পাদিত কৃষিকাজ ও ব্যবসার মাধ্যমে পূর্ণ হয়। আর গণপতি গণেশ যেন গণদেবতা যিনি শ্রমিকশ্রেণিকে বা শূদ্রদের কর্মদক্ষতা প্রদান করছেন। চারটি বর্ণেরই গুরুত্ব আছে শরীরে মাথার যেমন প্রয়োজন তেমনি পায়েরও প্রয়োজন। সবগুলো অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ঠিকমতো কাজ করলে তবেই শরীর সুস্থ থাকবে। বেদে দেবী দুর্গা বলেছেন- ‘অহং রাষ্ট্রী‘-এই চারবর্ণ সঠিকভাবে কাজ করলেই রাষ্ট্র উন্নত হয়। দেবীর পদতলে মহিষাসুর শূলবিদ্ধ অবস্থায় আছে। দেবীর বাহন সিংহ অসুরকে চেপে ধরে আছে। পশুরাজ সিংহটি আমাদের মনের প্রতীক। যদি আমরা আমাদের পশুরাজ সিংহরূপী মনের উপর ধর্মরূপী দেবীকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারি, তবে তিনি আমাদের মনের অসুররূপী আসুরিক প্রবৃত্তিগুলোকে শূলাঘাতে বিনষ্ট করবেন।

দূর্গাদেবী প্রসঙ্গে বেদে কী বলা হয়েছে?

বর্তমানযুগে একদল অতিপণ্ডিতের আবির্ভাব হয়েছে, যারা বেদকে ঢাল বানিয়ে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি ও নিজমত প্রতিষ্ঠা করতে সকল প্রকার ছলচাতুরির আশ্রয় নিচ্ছেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বর্তমান হিন্দুসমাজে বেদ তো দূরের ব্যাপার, গীতা, ভাগবতাদি গ্রন্থও অধিকাংশ লোক জানার চেষ্টা করে না। ফলে তাদের খুব সহজে বিভ্রান্ত করে নিজমতে দীক্ষিত করা খুব সহজ। এই শ্রেণির লোকেরা বেদকে কেন্দ্র করে নানারকম অপপ্রচার, অর্ধসত্য, অর্ধশ্লোক ও বিকৃত অর্থ করার মাধ্যমে বেদে মূর্তিপূজা নিষেধ, ঈশ্বর সাকার নন বা দূর্গা দেবীর অস্তিত্ব বেদে নেই, এমন কিছু উদ্ভট সিদ্ধান্ত প্রচার করে থাকেন। এখন আমরা দেখবো বেদে কি আসলেই দূর্গাদেবীর কথা উল্লেখ নেই এবং দূর্গাপূজার মতো মহাপূজা হঠাৎ করেই মাটি ফুঁড়ে বের হয়েছে?
কৃষ্ণ যজুর্বেদে অন্তর্গত তৈত্তিরীয় আরণ্যকে বলা হয়েছে,

তাং অগ্নিবর্ণাং তপসা জ্বলন্তীং বৈরোচনীং কর্মফলেষু জুষ্টাম,
দুর্গাং দেবীং শরণমহং প্রপদ্যে সুতরসি তরমে নমঃ।

(তৈত্তিরীয় আরণ্যক ১০/২)

-অগ্নিবর্ণা তপ প্রদীপ্তা সূর্য (বা অগ্নিস্বরূপিণী) যিনি কর্মফলের প্রার্থিতা নন, সেই দূর্গাদেবীর আমি শরণাপন্ন হই, হে সুন্দররূপে, ত্রাণকারিণী, তোমাকে নমস্কার।
ঋগ্বেদে দেবীসুক্ত যা দূর্গাপূজায় চণ্ডীপাঠের পূর্বে পাঠ করার বিধি আছে, সেখানে দেবীকে পরমা প্রকৃতি, নির্বিকারা ও জগতের ধাত্রীরূপে বর্ণিত আছে। সমস্ত দেবতার তেজ হতে দেবীদূর্গার আবির্ভাবের পর দেবীদূর্গা দেবতাদের ঋগ্‌মন্ত্রে নিজের পরিচয় দিলেন বলে দেবী পুরাণে উল্লেখিত আছে; আর সেই ঋগ্‌মন্ত্রই হলো ঋগ্বেদের দেবীসুক্ত। এছাড়া বেদের রাত্রিসুক্তে কালী, শ্রীসুক্তে লক্ষ্মী এবং বাণীসুক্তে সরস্বতীর বন্দনা করা হয়েছে।
প্রকৃতপক্ষে, বেদ দেবতাদের মহিমা এবং তাদের শক্তি বর্ণনার উপর গুরুত্ব দিয়েছে, আর পুরাণে তাদের বিস্তারিত রূপ ও পূজাপদ্ধতি বর্ণিত হয়েছে। আর বেদকে স্বীকার করলে পুরাণকেও স্বীকার করতে হবে। কারণ, বেদ এবং বেদান্ত নিজেই পুরাণকে স্বীকার করেছে। যেমন: ছান্দোগ্য উপনিষদ বলছে, ‘ইতিহাস পুরাণং পঞ্চমো বেদানাং…‘ (ছান্দোগ্য উপনিষদ ৭/১/২, ৩ ও ৭/২/১) অর্থাৎ, ইতিহাস ও পুরাণসমূহ হলো পঞ্চম বেদ। আবার, অথর্ববেদ বলছে ‘ইতিহাসস্য চ বৈ পুরাণস্য চ…..চ‘। যেহেতু বেদ পুরাণকে শাস্ত্র বলে স্বীকার করেছে, তাই পুরাণ মতেই দেবী দূর্গার রূপ ও পূজাপদ্ধতি প্রণীত হয়েছে।
যাহোক, আবারো আমরা বৈদিক ধারায় ফিরে আসি। শুক্ল যজুর্বেদের বাজসনেয়ী সংহিতায় অম্বিকাদেবীর সাংখ্যায়ন গৃহ্যসূত্রে ভদ্রকালীর, কেনোপনিষদ্ দেবী উমার কথা পাই। দেবী দূর্গারই অপর নাম। যাজ্ঞিকা উপনিষদে দূর্গার গায়ত্রী আছে- ‘কাত্যায়নায় বিদ্মহে কন্যাকুমারীং ধীমহি তন্নো দুর্গি প্রচোদয়াৎ।’ এখানে দূর্গা সম্বোধনপদে দুর্গি হয়েছে। এতে কাত্যায়নী বা কন্যাকুমারী দুর্গার অপর নাম তা সকলেই জানে। এছাড়া গোপাল তাপনী উপনিষদ, নারায়ণ উপনিষদ ইত্যাদি বৈদিক গ্রন্থে দূর্গার উল্লেখ আছে।

দূর্গাদেবীর কাছে কী প্রার্থনা করা উচিত?

ইতোপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে যে, সাধারণত মানুষ জড়জাগতিক লাভের আশায় দেবদেবীর কাছে ধন, জন, যশ, রূপ ইত্যাদি ক্ষণস্থায়ী বিষয় প্রার্থনা করে। কিন্তু সুবুদ্ধিমান ব্যক্তি বা বৈষ্ণবগণ কোনো জাগতিক লাভালাভের জন্য মায়ের আরাধনা করেন না। তারা কেবল তাঁর সন্তুষ্টিবিধানই কামনা করে তাঁর কাছে ভগবদ্ভক্তিই প্রার্থনা করেন। ভগবানের কাছে কী প্রার্থনা করা উচিত তা আমাদের শেখাতে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু শিক্ষাষ্টকমে বলেছেন-
“হে জগদীশ, আমি ধন, জন বা সুন্দরী রমণী কামনা করি না; আমি কেবল এই কামনা করি, যেন জন্মে জন্মে তোমাতেই আমার অহৈতুকী ভক্তি হোক।” ব্রজবালিকারা দেবীদূর্গার কাছে প্রার্থনা করেছিলেন (শ্রীমদ্ভাগবত-১০/২২/৪)

কাত্যায়নি মহামায়ে মহাযোগিন্যধীশ্বরি।
নন্দগোপসূতং দেবি পতিং মে করুতে নমঃ।
ইতি মন্ত্রং জপত্তাস্তাঃ পূজাং চক্র কুমারিকাঃ ॥

-“হে দেবী কাত্যায়নী, হে ভগবানের মহাশক্তি, হে মহা যোগশক্তিধারিণী এবং শক্তিশালিনী নিয়ন্তা, অনুগ্রহ করে নন্দপুত্র শ্রীকৃষ্ণকে আমার পতি করে দিন।
আমি আপনাকে আমার প্রণাম নিবেদন করি। এই মন্ত্র জপ করতে করতে কুমারী কন্যাগণের প্রত্যেকে তাঁর পূজা করছিলেন। অর্থাৎ ব্রজগোপিকাগণ পরমেশ্বর ভগবানকে প্রাপ্ত হওয়ার জন্যই দূর্গাদেবীর নিকট প্রার্থনা করেছিলেন।”
শাস্ত্রানুসারে, দেবীদূর্গা কৃষ্ণভক্তিপ্রদায়িনী (ব্র.বৈ.পুরাণ, প্রকৃতিখণ্ড ৩৯/৫১)। তাই ভগবদ্ভক্তগণ দূর্গাদেবীর কাছে ধন, জন, যশ ও রূপের প্রার্থনা করলেও বিষয়কামীর মতো জাগতিক ঐশ্বর্য বৃদ্ধির জন্য নয়। তাঁরা প্রার্থনা করেন- “হে জগজ্জননী দূর্গে, আমায় কৃষ্ণপ্রেমধন প্রদান করো, আমায় কৃষ্ণভক্তজনের সঙ্গ প্রদান করো, আমায় কৃষ্ণভক্তির যশ প্রদান করো এবং চিন্ময় জগতে কৃষ্ণদাসত্বরূপ নিত্যস্বরূপ প্রদান করো।” সুতরাং, পরমেশ্বর ভগবানের প্রতি যেন আমাদের আসক্তি ও ভক্তি লাভ হয়, দূর্গাদেবীর কাছে সেই প্রার্থনাই সকলের করা উচিত।


সূত্র: ‘দুর্গতিনাশিনী দুর্গা’ গ্রন্থ হতে সংকলিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here