তিনটি দড়ি আপনাকে বেঁধে রেখেছে

0
121

(পর্ব-১)
কৌন্তেয় দাস


আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় যেন আমরা স্বাধীন কিন্তু প্রকৃত সত্য হল আমরা স্বাধীন নই। কেননা সত্ত্ব, রজঃ ও তমোগুণ নামক প্রকৃতির তিনটি অদৃশ্য দড়ি প্রতিনিয়ত আমাদেরকে বন্দী করে রেখেছে। মানুষের বিভিন্ন কার্যকলাপ প্রকৃতপক্ষে এ ত্রিগুণ দ্বারাই পরিচালিত হচ্ছে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশে প্রকৃতিকে যিনি নিয়ন্ত্রণ করেন সেই দুর্গাদেবী এ তিনটি গুণ সুনিপুণভাবে পরিচালনা করছেন। এ অদৃশ্য গুণগুলোর প্রভাব বা কার্যকলাপ নিয়ে দুই পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের এটি ১ম পর্ব।


প্রত্যেকেই সুখের অনুসন্ধান করছে এবং একটি উত্তম জীবন লাভের প্রয়াস করছে। বৈদিক শাস্ত্র অনুসারে জীবের প্রকৃত স্বরূপ চিন্ময় হলেও সে অস্থায়ী জড় বিষয়ের মাধ্যমে নিত্য সুখ লাভের প্রচেষ্টা করছে যা প্রকৃতপক্ষে অসম্ভব। যেরকম জলবিহীন একটি মাছ। সুখে থাকতে পারে না, তদ্রুপ জীব চিন্ময় স্তরে উপনীত না হলে সুখী হতে পারে না। তাকে অবশ্যই তার স্বাভাবিক প্রকৃত নিত্য পারমার্থিক স্তরে উপনীত হতে হবে।
বৈদিক শাস্ত্রে তিনটি অদৃশ্য শক্তি বা গুণের কথা বলা হয়েছে, যেগুলো জড় সৃষ্টির সবকিছুকে প্রভাবিত করে, সেগুলো হল সত্ত্ব, রজ ও তমোগুণ। এই তিনটি গুণ টিভি পর্দার তিনটি প্রধান রঙের (হলুদ, লাল ও নীল) মতো, যেগুলো খালি চোখে অদৃশ্যমান। কিন্তু এগুলোই সমস্ত ভিন্ন ভিন্ন রঙের সৃষ্টি করে। তদ্রুপ এই তিনটি গুণ এই জড়জগতের সমস্ত বৈচিত্র্যপূর্ণ জিনিস সৃষ্টি করেছে, এ গুণগুলো বিভিন্ন মাত্রায় মিলিত হয়ে কত বৈচিত্র্যের ঘটনা, রুচি এবং ভাবের সৃষ্টি করছে।
এটি উপলব্ধির জন্য সূর্যের আলোকে উচ্চতর চিন্ময় বাস্তবতার সঙ্গে তুলনা করতে পারি এবং নিম্ন জড় বাস্তবতাকে জলের স্তরগুলোর সঙ্গে তুলনা করতে পারি, জলের যে স্তরটি উপরিভাগে রয়েছে সেটি অপেক্ষাকৃত স্বচ্ছ এবং হালকা, সত্ত্বগুনের সঙ্গে তুলনীয়। খানিকটা গভীর ও অন্ধকার স্তরটি হল রজোগুণ এবং সর্বশেষ একেবারে নিম্নভাগ, তলদেশ হল তমোগুণ। যেখানে চিন্ময় জ্ঞানের কোনো আলো প্রবেশ করতে পারে না। যখন শুদ্ধ চেতন আত্মা জড়জগতে পতিত হয় তখন সে এই গুণসমূহের দ্বারা প্রভাবিত হয় এবং ফলশ্রুতিতে জন্ম নেয় নির্দিষ্ট দর্শন ও রুচির স্বভাবতই এই গুণসমূহ প্রায়ই মিশ্রিত হয়ে পড়ে, কেননা আমাদের নিজেদের মধ্যে বিভ্রান্তমূলক বাসনা রয়েছে, যা ভিন্ন ভিন্ন গুণগুলোকে আকর্ষণ করে। এভাবে প্রকৃত বৈদিক তত্ত্ববিদগণ জানেন কিভাবে জড়শক্তিকে উচ্চতর গুণ, সত্ত্বগুণে উন্নীত করা যায় এবং উচ্চতর আদর্শে স্থিত হওয়া যায়। প্রাচীন সমগ্র বৈদিক সভ্যতা সত্ত্বগুণের আদর্শে গড়ে উঠেছিল। তখন মানুষ আভ্যন্তরীণভাবে পারমার্থিক ভাবধারায় উদ্ভাসিত ছিল এবং তাদের চেতনা সত্ত্বগুণে স্থিত ছিল ।
কিন্তু আধুনিক দুর্ভাগ্যবান জড়বাদীরা জড় থেকে শুধুমাত্র দুটি নিম্ন গুণকে পৃথকীভূত করতে পারে, সেগুলো হল রজ ও তমোগুণ, এক্ষেত্রে শুরুতে সত্ত্বগুণের কিছু প্রভাব পরিলক্ষিত হতে পারে। সাধারণত মানুষ সত্ত্বগুণ সম্পর্কে চিন্তা করতে শুরু করে। কিন্তু যখন তারা সম্পূর্ণরূপে তমোগুণের স্তরে নিয়োজিত হয় এবং রজোগুণের শক্তি সত্ত্বগুণের ভাবধারা দ্বারা সহায়তা পায় না, তখন রজোগুণাত্মক শক্তি স্বভাবতই তমোগুণের দিকে স্থানান্তরিত হয়।
এই সম্পর্কে একটি সরল দৃষ্টান্ত দেওয়া যায় : সন্ধ্যায় কেউ সিদ্ধান্ত নিল সে নাইট ক্লাবে (রজোগুণাত্মক) যাবে, সকালে সে তমোগুণের দ্বারা দুর্দশাগ্রস্থ ছিল । এ পরিস্থিতিতে আত্মনিয়ন্ত্রণমূলক স্বাভাবিক বিচারবুদ্ধি (সত্ত্বগুণাত্মক) উপরোক্ত দুটি গুণের প্রভাব বা প্রলোভনকে প্রশমিত বা দূর করতে পারে।
এই সমস্ত কিছুই একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অগ্রসর হয় রজোগুণাত্মক ব্যক্তি (যিনি অ্যালকোহল, ধূমপান, জুয়া ইত্যাদির প্রতি আসক্ত), ঐ গুণের দ্বারা প্রভাবিত হয় এবং তারপর একসময় পরিস্থিতি তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে সে তমোগুণে (স্বাস্থ্যহীন, অর্থহীন, সম্পর্ক বর্জিত ইত্যাদি) নিপতিত হয়। তারপর একসময় সে নিজে নিজে ভাবতে থাকে যে, তাকে এটি থেকে পরিত্রাণের জন্য আরো একনিষ্ঠ হতে হবে, খারাপ অভ্যাসগুলো ও প্রভাব বা উত্তেজনামূলক বেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, এই সমস্ত চিন্তাধারা সত্ত্বগুণাত্মক। কিন্তু এই সমস্ত অনুপ্রেরণাদায়ক ভাবনা সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য স্থায়ী হয় এবং পরবর্তী দিনের নানা পরিস্থিতি আবারও তাকে পূর্বের বদভ্যাসে ফিরে যেতে প্রলোভিত করে।
বর্তমান সমাজের পরিবেশ সত্ত্বগুণাত্মক নয়। এই পরিবেশ মানুষকে রজঃ ও তমোগুণের দিকে পরিচালিত করে। তাই পারমার্থিকভাবে দুর্বল একজন ব্যক্তি নিম্নস্তরের দুঃখ দুর্দশার অভিজ্ঞতা লাভ করে। জড়বাদ এবং পারমার্থিক ভাবধারাহীন ব্যক্তি রজঃ ও তমোগুণের দিকে পরিচালিত হয়। তবে এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের সুযোগ রয়েছে, যদি সমাজ সত্ত্বগুণের ভাবধারায় অধিষ্ঠিত হয় এবং জনগণ যদি এ গুণের স্তর গড়ে উঠতে সহায়তা করে তবে এটি সম্ভব।
কর্পোরেট বিশ্বে এমন ব্যক্তির অনুসন্ধান হয়, যে হবে বদভ্যাস মুক্ত (সত্ত্বগুণে স্থিত), শিক্ষিত, দায়িত্ববান, সংস্কৃতিমনা (এ সমস্ত গুণাবলি সত্ত্বগুণ থেকে উদ্ভূত)।
রজোগুণের বৈশিষ্ট্য হল শক্তি, ব্যবসায়িক প্রতিবন্ধকতা গ্রহণে সক্ষম ( enterpreneurship) এবং এরকম ব্যক্তিরও অনুসন্ধান হয়ে থাকে তবে, রজোগুণের বিপদ হল যদি এটি সত্ত্বগণের সহায়তা না পায়, তবে এটি সহজেই তমোগুণে রূপান্তরিত হবে। আপনি জীবন উপভোগ করে পারেন (রজোগুণাত্মক), কিন্তু সে সাথে আপনাকে এও জানতে হবে কি কি করা যাবে না (সত্ত্বগুণাত্মক), যার মাধ্যমে আপনি তমোগুণে অধঃপতিত হবেন না।
গুণগুলো এমনকি শুধু বাহ্যিকভাবে নয়, আভ্যন্তরীণভাবেও প্রকাশিত হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, একজন ব্যক্তি দেখতে শান্ত ও সংযত চরিত্রের হতে পারে (মনে হয় যেন সে সত্ত্বগুণে স্থিত), কিন্তু ভিতরে তার অত্যন্ত স্বার্থপর মনোভাব (রজোগুণ) থাকতে পারে। এক্ষেত্রে এটি সুস্পষ্ট যে, বাহ্যিক সত্ত্বগুণ আভ্যন্তরীণ রজোগুণের সেবা করছে । কিন্তু আভ্যন্তরীণ সত্ত্বগুণের অভাব যেকোনো সময় রজোগুণ থেকে সত্ত্বগুণের দিকে পরিচালিত করতে পারে যা দুর্দশাপূর্ণ, প্রকৃতির এই গুণগুলো সম্পর্কে সচেতনতা আমাদেরকে প্রকৃতির যেকোনো আচরণ উপলব্ধিতে সহায়তা করে।
এখানে কিছু দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হল যে জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কিভাবে গুণগুলোর প্রভাব কাজ করে।

সময়

ভোর ৪টা থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত সময় হল সত্ত্বগুণাত্মক। ঐ সময়টি পারমার্থিক কার্যকলাপের জন্য উপযুক্ত। সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত সময় হল রজোগুণাত্মক। ঐ সময়কালটি কর্মস্থলে নিয়োজিত হওয়ার জন্য। রাত ১০টা থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত হল তমোগুণাত্মক। ঐ সময়কালটি নিদ্রা বা সম্পূর্ণরূপে স্মৃতিহীন (forgetfulness) হওয়ার জন্য । তাই, বৈদিক শাস্ত্রানুসারে সূর্য উদয়ের পূর্বে ঘুম থেকে উঠা, স্নানকার্য, পারমার্থিক অনুশীলন করার কথা বলা হয়েছে এবং তারপর একজন পারমার্থিকভাবে সমৃদ্ধ ব্যক্তি নিরাপদে তার কর্মজীবন শুরু করতে পারেন। যখন রজোগুণ এবং আরো অন্যান্য গুণের প্রভাব মনকে প্রভাবিত করার ভয় থাকে না। যদি একজন ব্যক্তি দেরীতে ঘুমায় ও দেরীতে ঘুম থেকে উঠে, সত্ত্বগুণাত্মক কার্যকলাপের সময় থাকে না, তখন সে তমোগুণের রাত থেকে রজোগুণাত্মক দিনে পতিত হবে। ফলশ্রুতিতে তার চেতনা সুস্পষ্ট যে, এমন ব্যক্তি রজোগুণ থেকে উত্থিত বিভিন্ন মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করবে। কিন্ত সত্ত্বগুণে স্থিত হলে তা মনকে সমস্ত নেতিবাচক প্রভাব থেকে ভালোভাবে সুরক্ষা প্রদান করে।

গ্রহলোকীয় পদ্ধতি

এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড তিন স্তরের অস্থিত্ব দ্বারা বিভক্ত, উচ্চতর গ্রহলোকগুলো সত্ত্বগুণের অধীনে, যেখানে দেব-দেবীরা ও মহান সাধুরা অবস্থান করেন।
মধ্যস্তরের গ্রহলোকগুলো রজোগুণের অধীন এবং এগুলোতে মানুষ ও এ প্রকারের জীবেরা বসবাস করে থাকে।
নিম্ন গ্রহগুলোতে অসুর প্রকৃতির জীবেরা বসবাস করে, যারা প্রযুক্তিগতভাবে মানুষের চেয়েও শক্তিশালী, কিন্তু পারমার্থিকভাবে উন্নত নয়, তাদেরই আসুরিক সভ্যতার প্রভাবে আমাদের এই পৃথিবী নামক গ্রহটিতে পারমার্থিক প্রগতির স্থলে স্থান করে নিয়েছে প্রযুক্তিগত প্রগতি।
মানব সমাজে অধিকাংশ ক্ষেত্রে রজোগুণের কর্তৃত্ব বেশি, তবে অন্যান্য গুণের প্রভাবও বিদ্যমান এবং যার ফলে ভিন্ন ভিন্ন জীবনধারার উৎপত্তি ঘটে। উদাহরণস্বরূপ যদি এ সমাজে সত্ত্বগুণের প্রভাব প্রচলিত হয় তবে লোকেরা পারমার্থিকভাবে অগ্রসর হয়ে অনৈতিক কার্যকলাপ পরিহার করবে এবং খাদ্যাভাসের ক্ষেত্রে নিরামিষ প্রাধান্য পাবে। তারা তখন পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবান সহনশীল ও দয়াশীল হবে। এক্ষেত্রে আভ্যন্তরীণের চেয়ে বাহ্যিকভাবে রজোগুণে স্থিত হয়ে লোকেরা অন্যেদের ওপর প্রভাব রাখতে পছন্দ করে।
তমোগুণের আধিক্যে মানুষ মন্থর, অলস, দীর্ঘসময় নিদ্রাচ্ছন্ন হওয়া ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হয়ে, কোনো ধরনের উন্নতিতে আগ্রহী হয় না। অজ্ঞতা বা তমোগুণ তাকে অধঃপতিত অবস্থা ও কালক্ষয়ের দিকে বল প্রয়োগ করে। গুণগুলো অদৃশ্য, কিন্তু এর ফলাফলগুলো খুবই স্পষ্ট এবং কারো চেতনা ও আচরণে তার প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, অ্যালকোহল হল তমোগুণাত্মক এবং এটি গ্রহণের ফলে ধ্বংসাত্মক মনোভাবের সৃষ্টি হয়। কোনো এক সুন্দর বোতল থেকে এটি গ্রহণের পরবর্তী অবস্থা থেকে তা পরিলক্ষিত হয় এবং এর মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি ঐ দ্রব্যটি তমোগুণের দ্রব্য।
পক্ষান্তরে সত্ত্বগুণে স্থিত সভ্যতা যন্ত্রের নয় মানুষের প্রগতির জন্য মনোযোগী হবে এবং সবাইকে পারমার্থিক লক্ষ্যের দিকে এগোতে সহায়তা প্রদান করে। পারমার্থিক সংস্কৃতি হল “সরল জীবন ও উচ্চচিন্তা।”

বিভিন্ন পেশার ওপর গুণের প্রভাব

সত্ত্বগুনের আধিক্যে স্থিত ব্যক্তি শিক্ষা প্রদান, কাউন্সিলিং, বিজ্ঞান, গবেষণা এবং পারমার্থিক অনুশীলনের প্রতি অধিক আকর্ষিত হয়। বৈদিক শাস্ত্রানুসারে তাদেরকে ব্রাহ্মণ বলে অবহিত করা হয়েছে যারা চিন্ময় প্রকৃতি সম্পর্কে অবগত।
রজোগুণের প্রভাবে মানুষ বাহ্যিকভাবে অধিক কর্মঠ হয় এবং রাজনীতি ও শাসক শ্রেণির কার্যকলাপের দিকে পরিচালিত হয়। এ সমস্ত লোকদের বলা হয় ক্ষত্রিয় বা সমাজের সুরক্ষা প্রদানকারী। তাদের সহজাত সাংগঠনিক দক্ষতা এবং নেতৃত্বসুলভ গুণাবলী রয়েছে।
রজ ও তমোগুণের দ্বৈত প্রভাবে একজন ব্যক্তি ব্যবসা বাণিজ্যের প্রতি আকর্ষিত হয়। তারা সাধারণত ব্যাংকার ও ব্যবসায়ী হয়ে থাকে। বৈদিক শাস্ত্র অনুসারে তাদেরকে বৈশ্য বলা হয়। এ সমস্ত লোকেরা জানে কিভাবে পুঁজি বৃদ্ধি ও মজুদ করতে হবে।
তমোগুণের প্রভাবে কেউ শ্রমিক শ্রেণিতে অন্তর্ভূক্ত হয়। দক্ষ-অদক্ষ শ্রমিকরা বিভিন্নভাবে সেবা ও বিনোদন প্রদান করে থাকে। এ ধরনের লোকেদের বলা হয় শূদ্র-যারা সবাইকে সেবা করে থাকে।
যাদের পেশা সত্ত্বগুণের, তারা সমাজের প্রতি দায়িত্ববান হয় এবং যাদের পেশা তমোগুণের, তাদের দায়বদ্ধতা কম। এক্ষেত্রে বুঝতে হবে যে, গুণসমূহ দ্বারা কারও বুদ্ধিমাত্রাকে নির্দেশ করে না বরং পেশাগত প্রেক্ষাপটে লোকেদের সাথে আদান প্রদানের প্রকৃতিকে নির্দেশ করে।
সাধারণত ব্রাহ্মণরা মানুষ ও ভগবানের সাথে সম্পর্ক স্থাপনে অবদান রাখে এবং মানব সমাজে উচ্চতর জ্ঞান যারা নির্বাহ করে যেমন-শিক্ষক, পরামর্শদাতা, সমাজের পারমার্থিক ও বুদ্ধিজীবিরা । এভাবে তাদেরকে সমাজের সর্বোচ্চ শ্রেণিভুক্ত বলে বিবেচনা করা হয়।
ক্ষত্রিয় শ্রেণির ব্যক্তিরা শিক্ষা নয়, নিয়ম-কানুন প্রতিষ্ঠা করবে। বৈশ্যরা উৎপাদন ও বাণিজ্য প্রক্রিয়া ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সমাজে ভূমিকা রাখে। শূদ্ররা জড় বিষয় নিয়ে বেশি সময় অতিবাহিত করে, যার কারণে তাদের কর্মকাণ্ডসমূহ তমোগুণের অধীন বলে বিবেচনা করা হয়।
এরকম জাগতিক অসম অবস্থা সত্ত্বেও, সবাই সমানভাবে তাদের মেধা ও কার্যক্ষমতা ভগবানের সেবার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে পারে। জনগণের মধ্যে এ প্রকার পারমার্থিক সমতা ভগবানকেন্দ্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমাজকে স্থিতিশীল ও শ্ৰেণীবৈষম্য থেকে মুক্ত করে।

উদ্ভিদ ও প্রাণীজগতে গুণের প্রভাব

উদাহরণস্বরূপ, সমস্ত উদ্ভিদজগৎ তমোগুণাত্মক, কিন্তু যে সমস্ত উদ্ভিদ উপকারী ফল দেয় তাদের মধ্যে সত্ত্বগুণের সংমিশ্রণ রয়েছে এবং যে সমস্ত উদ্ভিদ ফুল দেয়, কিন্তু কোনো ফল দেয় না, তাদের মধ্যে রজোগুণের সংমিশ্রণ রয়েছে। আর যে সমস্ত উদ্ভিদ ফুল ফল কোনোটিই দেয় না, তারা শুধু তমোগুণ আচ্ছন্ন।
প্রাণীদের মধ্যে গরু হল সত্তগুণের অধিকারী, কারণ তার সবকিছুই মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় ও উপকারী। এমনকি গোবরেও জীবাণুনাশক উপাদান রয়েছে, তাই ভারতবর্ষে গরুকে সবচেয়ে উপকারী ও পবিত্র প্রাণী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
শিকারী প্রাণীরা দেখতে সুন্দর ও আকর্ষণীয় হয়, দ্রুত দৌড়ায় এবং তাদের নিজ এলাকায় প্রভৃত্ব করার প্রবণতা রয়েছে, যাদের রজোগুণের সংমিশ্রণ রয়েছে। মন্থরগতির প্রাণী যেমন বিড়াল, বা কিছু অলস জাতীয় প্রাণীরা তমোগুণের অধীন।

পোশাক-পরিচ্ছদে গুণের প্রভাব

মানব জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আমরা গুণের প্রভাব উপলব্ধি করতে পারি, যেমন মানুষের পোশাক সজ্জা। যারা সত্ত্বগুণে স্থিত তারা সরল, পরিচ্ছন্ন পোশাক পরিধান করে। রজোগুণে স্থিত ব্যক্তিরা উজ্বল, ফ্যাশনধর্মী পোশাক পরিধান করে। তমোগুণের পোশাক হল কদাকার, অপরিচ্ছন্ন, আতঙ্কজনক প্রতীক সম্বলিত ৷

খাদ্যাভাস

এ সম্পর্কে শ্রীমৎ সৎস্বরূপ দাস গোস্বামী একটি সুন্দর প্রতিবেদন লিখেছিলেন যা নিম্নে প্রদত্ত হল:
“আমার গুরুদেব, শ্রীল প্রভুপাদ শিষ্যদের কাছে লেখার শেষে সবসময় লিখতেন “আশা করি সুস্বাস্থ্যে আছ….” যারা প্রিয় তাদের জন্য অবশ্যই সুস্বাস্থ্য কামনা থাকে। কিন্তু সুস্বাস্থ্য বলতে কি বোঝায়? এ সম্পর্কে অনেক ভিন্ন ভিন্ন মতামত রয়েছে।
বছরের পর বছর ধরে, আমেরিকানরা শুনে এসেছে সুষম খাবারের মধ্যে অবশ্যই মাংস থাকতে হবে। আবার জাতীয় অ্যাকাডেমি অব সাইন্স সুপারিশ করে দৈনিক ন্যূনতম হলেও ভিটামিন ও মিনারেল গ্রহণ করা প্রয়োজন। আমেরিকান মেডিকেল এসোসিয়েশন নিরামিষ খাদ্যাভ্যাস সংযুক্ত করছে। যথাযথ স্বাস্থ্যের মাধ্যমে একটি সন্তুষ্টিজনক জীবন লাভ করা সম্ভব, কিন্তু দেহ ও আত্মা সম্পর্কে কারো অবশ্যই প্রকৃত জ্ঞান থাকতে হবে এবং স্বাস্থ্যের উদ্দেশ্য কি এ সম্পর্কে জানতে হবে। বৈদিক শাস্ত্রে এ সম্পর্কিত জ্ঞান প্রদান করা হয়েছে, যার মাধ্যমে স্বাস্থ্য ও সুখের দর্শন দ্বারা উত্থিত বিভ্রান্তি অতিক্রম করা যাবে।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ভগবদ্‌গীতায় ব্যাখ্যা করেছেন, “যদিও স্বরূপে আমরা নিত্য, কিন্তু আমরা অস্থায়ী জড় শরীরে অবস্থান করছি। অজ্ঞতা ও কলুষতার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আমরা এ শরীর গ্রহণ করেছি যার মাধ্যমে রোগ ও দুঃখ দুর্দশা লাভ হয়।”
ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রতি ভক্তিমূলক সেবা নিবেদন করায় জীবনের পরম লক্ষ্য এবং এজন্যে আমাদের সুস্বাস্থ্য বজায় রাখা উচিত। কৃষ্ণভাবনা অনুশীলনের জন্য শরীর ও মন উপযুক্ত রাখাই হল সুস্বাস্থ্যের প্রধান ও পরম উদ্দেশ্য। এই নয় যে, মৈথুন উপভোগ কিংবা আমাদের ব্যবসায়ী প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে জয় লাভ করার জন্য আমাদের স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে হবে। বরং কলুষময় আনন্দ পরিত্যাগ করে, আমাদের উচিত কৃষ্ণের প্রীতি সম্পাদনের উদ্দেশ্যে স্বাস্থ্য ঠিক রাখা।
স্বাস্থ্যের জন্য আবশ্যক সুষম খাবার। এ ধরনের খাদ্য বাছাইয়ের ক্ষেত্রে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন। ভগবদ্‌গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বিভিন্ন ধরনের খাদ্যাভাসের কথা এবং সেগুলোর প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে ব্যক্ত করেছেন।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ব্যাখ্যা করেছেন যে, জড়জগতের সবকিছুই জড়া প্রকৃতির তিন গুণের প্রভাবের অধীন। এই ত্রিগুণ হল- সত্ত্ব, রজ ও তম এবং তাদের প্রতিক্রিয়া থেকে উদ্ভূত হয় বিবিধ রকমের ভাবনা, অনুভূতি ও ইন্দ্রিয়জাত প্রক্রিয়া যা আমরা জড়চেতনার মধ্যে অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারি।
এটি ঠিক তিনটি মৌলিক রঙ হলুদ, লাল ও নীল এর সংমিশ্রণের মতো যা থেকে অন্য বিবিধ রঙের উৎপত্তি ঘটে। তদ্রুপ এ গুণগুলোর সংমিশ্রণে আমরা বিবিধ অভিজ্ঞতা লাভ করি।
শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতায় (১৭/৮) এ শ্রীকৃষ্ণ ব্যাখ্যা করেন, “যে সমস্ত আহার আয়ু, সত্ত্ব, বল, আরোগ্য, সুখ ও প্রীতি বর্ধনকারী এবং রসযুক্ত, স্নিগ্ধ, স্থায়ী ও মনোরম, সেগুলি সাত্ত্বিক লোকদের প্রিয়।” এ জাতীয় সুস্বাদু ও পুষ্টিকার খাবারের মধ্যে রয়েছে শস্য, দুগ্ধপণ্য, ফলমূল ও শাকসবজি। যে সমস্ত খাদ্য অত্যধিক তিক্ত, টক, লবণাক্ত, শুষ্ক বা গরম সেগুলো রজগুণাত্মক। এই খাদ্যগুলো মনকে বিচলিত করে এবং রোগের সৃষ্টি করে। আর যে সমস্ত খাদ্য তিন ঘণ্টার অধিক পূর্বে রান্নাকৃত, স্বাদবিহীন, বাসি দুর্গন্ধযুক্ত (putrid), পঁচা (decomposed) ও অপরিচ্ছন্ন সেগুলো তমোগুণাচ্ছন্ন লোকদের প্রিয়।
এ সম্পর্কিত শ্লোকসমূহের ভাষ্যে, শ্রীল প্রভুপাদ লিখেছেন, “খাদ্যের উদ্দেশ্য হচ্ছে আয়ু বর্ধন করা, মনকে পবিত্র করা এবং শরীরকে শক্তি দান করা। সেটিই হচ্ছে তার একমাত্র উদ্দেশ্য।”
অতএব, আমাদের শুধুমাত্র জিহ্বার সন্তুষ্টির জন্য খাদ্য গ্রহণ করা উচিত নয়; বরং আমাদের উচিত ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রতি সেবা নিবেদনের জন্য জীবনীশক্তি ও বল সঞ্চয়ের জন্য খাদ্য গ্রহণ করা। সুস্বাস্থ্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদক এবং যে সমস্ত খাবার সর্বোচ্চ জীবনীশক্তি প্রদান করে, সেগুলো হল প্রাকৃতিক যেমন, ফল ও শাকসবজি সালাদ হিসেবে বা হালকা তাপে রান্না করা (Lightly streamed) শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশনা অনুসারে খাদ্য গ্রহণ করলে, আমরা খাদ্য গ্রহণের উদ্দেশ্য সর্বোত্তমভাবে ব্যবহার করতে পারি। এক্ষেত্রে অবশ্যই যা কিছু আমরা গ্রহণ করি তা ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে নিবেদন করতে হবে।
শ্রীমদ্ভাগবত (৩/২১/৪৫-৪৭) এ বলা হয়েছে, “সেই পবিত্র স্থানে আদিরাজ স্বায়ম্ভুব মনু তাঁর কন্যাসহ প্রবিষ্ট হয়ে এবং ঋষির নিকট গিয়ে দেখলেন যে, পবিত্র অগ্নিতে আহুতি নিবেদন করে সেই ঋষি তাঁর আশ্রমে উপবিষ্ট রয়েছেন। যদিও তিনি দীর্ঘকাল কঠোর তপস্যা করেছিলেন, তবুও তাঁর দেহ ছিল অত্যন্ত জ্যোতির্ময় এবং তা ক্ষীণ হয়ে পড়েছে, কেননা পরমেশ্বর ভগবান তাঁর প্রতি স্নেহযুক্ত কটাক্ষপাত করেছিলেন, এবং তিনি ভগবানের চন্দ্র-সদৃশ সুমধুর কথামৃত পান করেছিলেন। সেই ঋষির শরীর ছিল দীর্ঘ, নয়ন কমলদলের মতো বিস্তৃত, তাঁর মস্তকে জটাভার এবং পরনে চীর বসন। তাঁর সমীপবর্তী হয়ে স্বয়ম্বুব মনু তাঁকে অশোধিত মণির মতো মলিন দেখতে পেলেন।” লীলাপুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণ গ্রন্থে শ্রীল প্রভুপাদ মানসিক ও দেহের স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে কৃষ্ণভাবনার সুফল বর্ণনা করেন এভাবে :
“আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ ইসকনের শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে। এখানে যোগদানের পূর্বে তারা দেখতে মলিন ছিল, যদিও তারা স্বভাবতই সুন্দর শরীরের অধিকারী ছিল। কিন্তু কৃষ্ণভাবনা সম্পর্কে কোনো তথ্য না পাওয়ায়, তাদেরকে দেখতে অতীব মলীন ও নগণ্য (wretched) মনে হতো। যখন তারা কৃষ্ণভাবনামৃত গ্রহণ করল, তাদের স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটেছে এবং কৃষ্ণভাবনার নিয়মনীতিসমূহ অনুসরণের মাধ্যমে তাদের দেহের দ্যুতি বৃদ্ধি পেয়েছে।”
সুস্বাস্থ্য দেহের স্বাভাবিক অবস্থা, যেরকম কৃষ্ণভাবনা একটি স্বাভাবিক অবস্থা এবং যখন কেউ ভক্তিযোগ অনুশীলন করে তখন তার স্বাস্থ্যের স্বাভাবিকভাবেই উন্নতি ঘটে। হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র জপ এবং পাপপূর্ণ অভ্যাস যেমন – মাংসাহার, নেশা, অবৈধ যৌনসঙ্গ এবং দ্যূতক্রীড়া বর্জনের মাধ্যমে কেউ সুস্বাস্থ্যের অভাবনীয় ফলাফলটি লাভ করতে পারে, যা কোনো তথাকথিত “স্বাস্থ্য কর্মসূচির প্রভাব থেকেও সর্বোত্তম।”

আভ্যন্তরীণ বিশ্বাস

সত্ত্বগুণের লোকেরা ভগবানকে বিশ্বাস করে এবং প্রকৃতির আইনের সাথে একাত্ম হয়ে বসবাস করার চেষ্টা করে। রজোগুণের লোকেরা শুধুমাত্র প্রকৃতি ও সামাজিক সম্পর্কের স্তরে বিদ্যমান আইনসমূহ মেনে চলে, তবে উচ্চতর আইনগুলোকে অবহেলা করে। তমোগুণের লোকেরা শুধুমাত্র অপরাধ জগতের আইনগুলো মেনে চলে। এক্ষেত্রে নৈতিক আইন বিশেষত ভগবানের আইন খুব বেশি প্রয়োগ হয় না।
সবাই কিছু না কিছু আইন অনুসরণ করে, তবে গুণের ওপর নির্ভর করে তারা ভিন্ন ভিন্ন স্তরে এসব গ্রহণ করে থাকে বা উপলব্ধি করে।


 

ত্রৈমাসিক ব্যাক টু গডহেড, অক্টোবর – ডিসেম্বর ২০১৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here