তথ্যপ্রমাণই বলবে কথা

0
126

ডারউইনের বিবর্তনবাদের ভ্রান্তির বৈজ্ঞানিক প্রমাণ

চৈতন্য চরণ দাস

 

বােতলে জীবন : মিলারের গবেষণা

৯৫৩ সনে যাঁরা মােটামুটি উপলব্ধি স্তরে ছিলেন তাদের কাছে তখনকার একটি সংবাদের আগমন ছিল খুবই আশ্চর্যকর এবং অনেকের কাছে উল্লাসজনক। এটি হল বিজ্ঞানী স্টেইনলি মিলার এবং হ্যারল্ড উরের দ্বারা একটি ফ্লাক্সে জীবনের ভৌতিক কাঠামাে তৈরি করার খবর। বিড়বিড় করে বলা হয়েছিল যে, ভূপ্রকৃতির স্বাভাবিক পরিবেশের মধ্যে দিয়ে একটি ইলেকট্রিক স্ফুলিঙ্গ পাঠানাের মাধ্যমে মিলার এবং উরে সামান্য অ্যামাইনাে এসিড তৈরি করেছিলেন। যেহেতু অ্যামাইনাে এসিড হল জীবনের গঠন একক, তাই মনে হল যেন কৃত্রিমভাবে প্রাণ আবিষ্কার এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। ঠিক এভাবেই বিবর্তনবাদ তত্ত্বের নাটকীয় সত্যতা সম্পর্কে আস্থাবান হওয়া গেল। মনে হল জীবন কোন “অলৌকিক ব্যাপার নয়। জীবন সৃষ্টিতে বাইরের কোনাে কারিগর কিংবা পারমার্থিক বুদ্ধিমত্তার প্রয়ােজন নেই। সঠিক গ্যাসসমূহ মিশিয়ে দাও, বিদ্যুৎ প্রবাহিত কর সেখানে এবং তৎক্ষণাৎ প্রাণ সৃষ্টি হবে। এটি খুবই সাধারণ ঘটনা। কার্ল স্যাগান তাই খুবই দৃঢ়তার সাথে পিবিসি (একটি টেলিভিশন চ্যানেল) তে ভবিষ্যত্বাণী করেছিলেন, “যেসমস্ত গ্রহসমূহ বিলিয়ন বিলিয়ন তারাসমূহকে প্রদক্ষিণ করে ঘুরছে সেগুলাে অবশ্যই জীবসত্তায় পরিপূর্ণ।”

অ্যাপারেটাস এর সম্মুখে স্ট্যানলি মিলার

কিন্তু এখানে সমস্যার সৃষ্টি হল। বিজ্ঞানীরা সেই প্রকৃতির সাহায্য নিয়ে সাধারণ অ্যামাইনাে এসিড তৈরির চেয়ে বেশিদূর এগােতে পারে নি এবং এমনকি প্রােটিন উৎপাদনেও দেখা গেল একটি নয়, দুইটি নয় অসীম দুর্গম ধাপ ও প্রক্রিয়ার সৃষ্টি হতে থাকল।

এটিই হল মিলার-উরে গবেষণা। যার মাধ্যমে ১৯৭০ সালে বিজ্ঞানীরা পরিশেষে মন্তব্য করেন যে, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল মিলার ও উরে কর্তৃক ব্যবহৃত কিছু গ্যাসের মিশ্রণ ছাড়া আর কিছুই নয়। বিজ্ঞানীদের পরিভাষায় হ্রাসপ্রাপ্ত তথা হাইড্রোজেন সমৃদ্ধ বায়ুমণ্ডল, কিংবা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে যে গ্যাসসমূহ রয়েছে তা বহু পূর্বে আগ্নেয়গিরি থেকে উদ্ভূত হয়েছে। বর্তমানে এই বিষয়ে অধিকাংশ ভূবিজ্ঞানীদের ঐক্যমত রয়েছে। কিন্তু মিলার-উরের পরীক্ষায় ন্যায় উপাদান হিসেবে যদি এই সমস্ত গ্যাসসমূহকে ব্যবহার করা হয় এবং সেগুলাে যদি কোনাে কাজে না আসে? অর্থাৎ যদি জীবনের মৌলিক কাঠামাে বা প্রাণ সৃষ্টি না হয়? এবার তাহলে দেখি পাঠ্যগ্রন্থসমূহ এই দ্বন্দ্ব ঝামেলাযুক্ত বিষয়টিকে কিরূপে বিবেচনা করছে? তারা যথাসম্ভব এই বিষয়টিকে উপেক্ষা করছে এবং এখনাে মিলার-উরের পরীক্ষাকে শিক্ষার্থীদের মাঝে উপস্থাপন করে প্রাণের আবিষ্কারের ক্ষেত্রে প্রথম পদক্ষেপের কথা জোড়ালােভাবে উপস্থাপন করছে। সেই সাথে যুক্ত হয়েছে ন্যাশনাল একাডেমি অব সাইন্স’-এর পরিচালক ব্রুস অ্যালবার্টের লিখিত গ্রন্থ ‘মলিকুলার বায়ােলজি অব দ্যা সেল’। এছাড়াও অধিকাংশ পাঠ্যবই শিক্ষার্থীদের জানাচ্ছে যে জীবনের উৎস সন্ধানী গবেষকেরা প্রমাণ পেয়েছেন কিভাবে প্রাণ বা জীবন স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্যাসের মিশ্রণে গঠিত হচ্ছে, কিন্তু তারা শিক্ষার্থীদের এই কথাটি জানায় না যে, বিজ্ঞানীগণ নিজেরাই এখনাে অবগত যে, এই ব্যাখ্যা তাঁদের নিজেদেরকেও সংশয় এবং বিফল প্রচেষ্টার মধ্যে ফেলেছে।

পরিপূর্ণ কাল্পনিকতা : ডারউইনের জীবন বৃক্ষ

ডারউইনের তত্ত্ব দাবি করছে যে, এটি নতুন জীব প্রজাতির উৎপত্তির কারণ প্রদর্শন করছে। কিন্তু বাস্তবিকপক্ষে প্রতিটি প্রজাতির ক্ষেত্রেই তাঁদের প্রথম কোষ প্রসূত হয়েছে সেই প্রাচীন গর্ভ থেকে। এই তত্ত্বের একটি সুবিধা রয়েছে যে, এটি ভবিষ্যত্বাণী করতে পারে, যদি সকল জীবিত প্রজাতি ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়ে একই বা কয়েক পূর্বপুরুষ থেকে এসে থাকে তবে জীবিত প্রজাতির ইতিহাসটি হবে একটি শাখাযুক্ত বৃক্ষের ন্যায়। দুর্ভাগ্যবশত, অফিসিয়ালভাবে ঘােষণা সত্ত্বেও, এই ভবিষ্যত্বাণী বিষয়ক তত্ত্ব গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয়ে ভুল বলে প্রমাণিত হয়েছে। বিভিন্ন প্রাণিদের ফসিল রেকর্ড হতে পাওয়া গেছে যে তারা “ক্যামব্রিয়ান এক্সপ্লোশান” এর সময়কালে একই পূর্বপ্রজাতির মধ্যে থেকে কিছুটা পরিবর্তিত হয়ে না এসে পূর্ণরূপেই একত্রে আবির্ভূত হয়েছিল।

(নােট: প্রত্মতাত্ত্বিক তথ্য মতে ৫৪২ মিলিয়ন বছর আগে বিপুল পরিমাণ প্রজাতির আবির্ভাব সময়কালকে ক্যামব্রিয়ান এক্সপ্লোশান বলা হয়)

ডারউইনের “জীবন বৃক্ষ” (Tree of Life) এর আধুনিক রূপ

ডারউইন এই বিষয়টি জানতেন এবং তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, এই বিষয়টি তাঁর তত্ত্বের সাথে মারাত্মক সাংঘর্ষিক। কিন্তু তিনি তখন ফসিল রেকর্ডের অসম্পূর্ণতাকে দায়ী করলেন এবং ভাবলেন। যে ভবিষ্যতের কোনাে গবেষণা হয়তােবা এই হারিয়ে যাওয়া সংযােগ ফিরিয়ে আনতে পারবে। কিন্তু এর পর দেড়শ শতক অতিক্রান্ত হওয়ার পরও আরাে অধিকতর ফসিল রেকর্ড আবিস্কার হতে থাকায় ডারউইনের তত্ত্বের ভ্রান্তিগত সমস্যা আরাে বহুগুণে বৃদ্ধি পেল। শুরুতে সামান্য কিছু পার্থক্য ছিল, পরে অধিকতর পার্থক্যের সৃষ্টি হয় এবং সর্বাপেক্ষা বড় সমস্যার সৃষ্টি হয় এই তত্ত্বের শুরুতে। তাই কিছু দক্ষ ফসিল গবেষকগণ একে “বিবর্তনের অধঃপতন” বলে বর্ণনা করেছেন এবং তারা বলেছেন যে, এটি ডারউইনের তত্ত্বের ভবিষ্যৎ বাণীকৃত বিষয়কে বিপরীত অবস্থায় উপনীত করেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এখনাে বর্তমান আধুনিক অনেক জীববিজ্ঞান গ্রন্থ ক্যামব্রিয়ান এক্সপ্লোশান’-এর নাম উল্লেখ পর্যন্ত করেননি, এমনকি এটি যে ডারউইনবাদীদের বিবর্তনবাদকে হুমকির মধ্যে ফেলে সেই ধরনের তথ্যও আলােচিত হয়নি। এরপর আসে মলিকুলার বায়ােলজির প্রমাণ। জীববিদগণ ১৯৭০ সালে বিভিন্ন জীব প্রজাতিতে অবস্থিত অণুসমূহের মধ্যে তুলনার মাধ্যমে ডারউইনের জীবন বৃক্ষ শাখার নমুনা পরীক্ষা করা শুরু করেন। যেকোনাে দুইটি ভিন্নতর প্রজাতির মধ্যে যত বেশি অণুর প্রকৃতিগত সাদৃশ্যতা থাকবে, তাদেরকে তত বেশি সম্বন্ধযুক্ত বলে মনে করা হবে। শুরুতে মনে হল যেন এই গবেষণা ডারউইনের তত্ত্বকে সমর্থন করছে, কিন্তু বিজ্ঞানীরা বেশি সংখ্যক অণু নিয়ে তুলনা করতে করতে খুঁজে পেলেন যে, বিভিন্ন অণুসমূহে সাদৃশ্যতার পরিবর্তে দ্বন্দ্বভাবযুক্ত ফলাফল পাওয়া গেছে। একই অণু থেকে সৃষ্ট শাখা বৃক্ষের প্রজাতিসমূহের গঠন, অন্য একটি প্রজাতির অণুর গঠনের সাথে সাংঘর্ষিক। কানাডার একজন অণুরসায়নবিদ ডব্লিউ ফোর্ড ডুলিটল মনে করেন যে, এই সমস্যাটির কখনাে সমাধান হবে না। ১৯৯৯ সালে তিনি লিখেন, “হয়তােবা বিজ্ঞানীরা প্রকৃত বৃক্ষ’ খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়েছেন, কিন্তু তার কারণ এই নয় যে, তাদের প্রক্রিয়াসমূহ পর্যাপ্ত ছিল না, বা তারা ভুল প্রজাতির জিন সনাক্ত করেছিলেন, বরং জীবনের ইতিহাসকে কখনাে বৃক্ষরূপে ব্যক্ত করা যাবে না। শীর্ষপর্যায়ের একজন বিবর্তনবাদী স্টিফেন জে গােল্ড স্বীকার করেছেন, “যে বিবর্তনবাদ বৃক্ষ আমাদের পাঠ্যবইসমূহকে অলংকৃত করেছে, সেখানে শুধুমাত্র শাখার অগ্রভাগ ও গ্রন্থি সম্পর্কিত তথ্য রয়েছে, বাকিগুলাে সবই অনুমান, সেখানে কোনাে যুক্তিসঙ্গত ফসিলের প্রমাণাদি নেই।”

তথাপিও জীববিজ্ঞান বিষয়ক পাঠ্যগ্রন্থসমূহ আমাদেরকে আশ্বস্ত করছে যে, ডারউইনের ‘জীবনবৃক্ষ’ তথ্যপ্রমাণাদির মাধ্যমে সম্পূর্ণরূপে প্রমাণিত বৈজ্ঞানিক বিষয়। কিন্তু প্রকৃত ফসিল এবং অণুগত প্রমাণের মাধ্যমে বিচার করলে আমরা ডারউইন তত্ত্বকে অপ্রমাণিত, কল্পণাপ্রসূত, সত্যকে আড়াল করে রাখা এক তত্ত্ব বলে মনে করতে পারি ।


বিবর্তনবাদের রূপান্তর : বিজ্ঞান না কল্পকাহিনী?

লেখক রুডিয়ার্ড ক্লিপলিং ১৯০২ সালে “জাস্ট সাে স্টোরিস” নামে একটি কল্পকাহিনীতে কিভাবে হাতি পেয়েছিল লম্বা শৃড়, কিভাবে উঠ পেয়েছিল তার কুজ ইত্যাদি কল্পকাহিনী রচনা করে জনপ্রিয় হয়েছিলেন। বিবর্তনবাদীরাও তেমনি কিপলিং এর ন্যায় কল্পকাহিনীকে বিজ্ঞানে রূপান্তরের প্রচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। তার প্রমাণ বিবর্তনবাদীদের নিম্নোক্ত তত্ত্বসমূহ :

১. জলের মাছ খেতে খেতে, সাঁতার কাটতে কাটতে ভালুক হয়ে গেল তিমি!
২. শিম্পাজী থেকে বিশ্বসুন্দরীদের (মানুষ) আবির্ভাব!
৩. গাছের উঁচু ডালের ডগা খেতে খেতে হরিণ হয়ে গেল লম্বা গলার জিরাফ!
৪. একসময় অসীম সাগরে পাখনা মেলে চষে বেড়াত আপনার মৎস্য ঠাকুর দাদা (মৎস্য থেকে পশু, পশু থেকে মানুষ রূপান্তর)!
৫. এক সময় পৃথিবীতে কোনাে প্রাণ ছিল না, হঠাৎ একটি বজ্রপাত আঘাত করল জলে তৎক্ষণাৎ প্রথম প্রাণের সৃষ্টি হল সেই একমাত্র জলজ জীব থেকে বিবর্তনের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ প্রজাতির প্রাণীর উদ্ভব!

চার্লস ডারউইনের স্বীকারােক্তি :

“Not one change of species into another is on record…we cannot prove that a single species has changed into another.” (উৎস : চার্লস ডারউইন, My Life and Letters, vol-1 page 210) উপরের উক্তি ডারউইনের মনে হতে পারে অবিশ্বাস্য। কিন্তু সত্যি! জীবনের শেষ প্রান্তে উপনীত হয়ে
তার একটা চিঠিতে স্বীকারােক্তি করছেন ডারউইন। বাংলা ভাষান্তর : “প্রজাতিসমূহের একটি থেকে
অপরটিতে রূপান্তরের একটি ঘটনাও কোনাে রেকর্ডে নেই ….একটি প্রজাতি যে অপর একটি প্রজাতিতে
পরিণত হয়েছে আমরা তা প্রমাণ করতে পারি না।”
“I am quite conscious that my speculations run quite beyond the bounds of true science.” (উৎস : চার্লস ডারউইন, হাভার্ডের বায়ােলজি, প্রফেসর আশা গ্রে-কে লেখা চিঠি)
“আমি সম্পূর্ণ সচেতন যে, আমার অনুমান-কল্পনাগুলাে প্রকৃত বিজ্ঞানের পরিধি অতিক্রম করে যাচ্ছে,” বলছেন খােদ ডারউইন এবং বিজ্ঞানের আবিস্কারগুলিই ডারউইনীয় কল্পনার অসত্যতা ও অসারত্ব প্রমাণ করবে অচিরেই, ডিসকভার পত্রিকায় মন্তব্য করেছেন, বিজ্ঞানী স্টিফেন জে. গােল্ড : “I can envision observations and experiments that would disprove any evolutionary theory I know.” তবুও বিবর্তনবাদীরা বলে চলেন প্রজাতির ইতিকথা। প্রমাণহীন বিশ্বাসের গল্প।

তথ্যসূত্র : বিজ্ঞান, সনাতন ধর্ম ও বিশ্বসভ্যতা, গােবর্ধন গােপাল দাস 


বিভ্রম বা মায়ার এক নাম হােমােলজি

অধিকাংশ সূচনাগত জীববিদ্যা বিষয়ক পাঠ্যবইয়ে মেরুদণ্ডী প্রাণিদের নিম্নবাহুর হাঁড়ের চিত্র অঙ্কিত করে দেখানাে হয়েছে যে, তাদের হাড়ের গঠনে সাদৃশ্যতা রয়েছে। ডারউইনের পূর্বের জীববিদগণ এই সাদৃশ্য খেয়াল করেন এবং এর নাম দেন হােমােলজি এবং তারা কোনাে প্রজাতির পূর্বতন আদিম রূপের গঠন প্রদর্শন করার জন্য এই বিষয়টি গুরুত্বারােপ করে থাকেন। ‘দি অরিজিন অব স্পিসিস’ গ্রন্থে ডারউইন আবার দ্বিমত পােষণ করে বলেছেন যে হােমােলজির প্রকৃত ব্যাখ্যা হচ্ছে পরিবর্তনের মাধ্যমে বংশদ্ভূত হওয়া বা প্রকাশিত হওয়া এবং তিনি হােমােলজিকে তার তত্ত্বের একটি প্রমাণরূপে গণ্য করেন। ডারউইনের অনুসারীগণ হােমােলজির উপর ভিত্তি করে ফসিলসমূহকে বৃক্ষশাখার ন্যায় শাখাবদ্ধ করেন যাতে মনে হবে যেন এক প্রজাতি থেকে আরেক প্রজাতির আবির্ভাবের মধ্যে সম্বন্ধ রয়েছে। জীববিজ্ঞানী টিম বেরা তাঁর ১৯৯০ সালে প্রকাশিত গ্রন্থ Evolution and the Myth of Creationism গ্রন্থে কিছু ফসিল রেকর্ডের তুলনা করেছেন সারিবদ্ধভাবে মডেল আকারে। তিনি বলেন, “যদি আপনারা ১৯৫৩ এবং ১৯৫৪ সালে ফসিল সারিকে পাশাপাশি পর্যবেক্ষণ করেন এবং তারপর ১৯৫৪ ও ১৯৫৫ সাল ও তৎপরবর্তী মডেল পর্যবেক্ষণ করেন, তখন আপনি দেখবেন যে, বিবর্তন অবশ্যম্ভাবী হয়ে থাকে। কিন্তু বেরা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সুস্পষ্ট দিক বিবেচনা করতে ভুলে গেলেন যে, একটি সারিবদ্ধ ফসিল কাঠামাে কখনাে নতুন কোনাে কাঠামাের জন্ম দেয় না। তারা ঠিক মােটরগাড়ির মত, যার ডিজাইন করেন মােটরগাড়ি নির্মাণ কোম্পানিতে কাজ করা ডিজাইনারগণ, অন্য কথায় বললে একটি বাইরের বুদ্ধিমত্তা দ্বারা ডিজাইন করা হয়। তাই যদিও বেরা বিশ্বাস করেন যে, তিনি ডারউইনের পূর্ব ব্যাখ্যার চেয়ে ডারউইনের বিবর্তনবাদকে বেশি সমর্থন করেন, কিন্তু তিনি অনিচ্ছাকৃতভাবে দেখিয়েছেন যে, ফসিল প্রমাণাদিসমূহ সামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রফেসর ফিলিপ ই. জনসন সন্দেহপূর্ণভাবে এটিকে বলেছেন, “বেরার অন্ধগমন”। বেরার অন্ধগমন থেকে আমরা এই শিক্ষা লাভ করতে পারি যে, হােমােলজির কারণে সম্পর্কিত ডিজাইন বৈজ্ঞানিকভাবে প্রদর্শনের পূর্বে আমাদেরকে একটি বাস্তবসম্মত স্বাভাবিক প্রক্রিয়া নির্দিষ্টভাবে উপস্থাপন করতে হবে। ডারউইনবাদী জীববিজ্ঞানীগণ দুই ধরনের প্রক্রিয়ার প্রস্তাবনা উল্লেখ করেছেন- উন্নয়নের পথ এবং জেনেটিক প্রােগ্রাম।

প্রথমটি মতে সাদৃশ্যতা এসেছে একই ধরনের কোষ এবং ভ্রুণ গঠনের প্রক্রিয়া থেকে এবং দ্বিতীয়টি মতে সাদৃশ্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্য প্রােগ্রাম করা হয়েছে একই ধরনের জীনসমূহ দ্বারা। কিন্তু জীববিজ্ঞানীরা গত একশ বছর যাবৎ অবগত আছেন যে, সাদৃশ্যপূর্ণ গঠনাকৃতি কখনাে একই ধরনের উন্নয়নের পথ দ্বারা সৃষ্ট হয় না এবং তারা ত্রিশ বছর যাবৎ অবগত আছেন যে সাদৃশ্যপূর্ণ গঠনাকৃতি সাদৃশ্যপূর্ণ জীনের দ্বারাও সৃষ্টি হয় না। সুতরাং এখানে কোনাে প্রায়ােগিক প্রদর্শিত প্রক্রিয়া নেই যার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যাবে যে, সাদৃশ্যসমূহ একই ডিজাইন থেকে নাকি একই পূর্ব প্রজাতি থেকে উদ্ভব। কোনাে সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া ছাড়াই আধুনিক ডারউইনবাদীরা খুব সাধারণভাবে হােমােলজির সংজ্ঞা দিয়েছেন এটি বােঝানাের জন্য যে, একই পূর্বতন প্রজাতি থেকে উদ্ভব বলে সাদৃশ্যতা বিদ্যমান রয়েছে।

 

একজন আধুনিক-ডারউইনিজম-এর প্রধান স্থপতি আর্নেস্ট মায়ার এর মতে, “১৮৫৯ সালের পর হােমােলজির শুধুমাত্র একটি সংজ্ঞাই রয়েছে, যা থেকে জীববিজ্ঞান ভিত্তিক অনুভূতির সৃষ্টি হয়। দুইটি জীবসত্তার লক্ষণসমূহ সাদৃশ্যপূর্ণ যখন তারা উভয়েই সম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন একই পূর্বতন প্রজাতি থেকে উৎপন্ন হয়।” এটি হচ্ছে একটি চক্রাকার যুক্তি। ডারউইন বিবর্তনকে তত্ত্বরূপে এবং হােমােলজিকে তাঁর ফলাফলরূপে দেখেছিলেন। কিন্তু আপনি বিবর্তনের প্রমাণরূপে সরাসরি হােমােলজিকে ব্যবহার করতে পারেন না, যদি না আপনি একটি চক্রাকার পন্থা প্রদর্শন না করেন : একই পূর্বপ্রজাতি হওয়ায় সাদৃশ্যতা ব্যাখ্যা করছে সাদৃশ্য পূর্বপ্রজাতিকে। জীববিজ্ঞানের দার্শনিকগণ এক দশক যাবৎ এই পদ্ধতির সমালােচনা করছেন।

১৯৮৫ সালে রােনাল্ড ব্র্যাডি বলেন, “কোনাে একটি অবস্থার সংজ্ঞা ব্যাখ্যার জন্য যখন একটি মনগড়া ব্যাখ্যা তৈরি করা হয়, তখন আমরা শুধুমাত্র আমাদের বৈজ্ঞানিক অনুমানই নয় আমাদের নিজস্ব বিশ্বাসও প্রকাশ করে থাকি। আমাদের ব্যাখ্যা সত্যি-এই বিষয়ের বিশ্বস্ততা নিয়ে আমরা এতই মগ্ন থাকি যে, আমরা যা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছি মাত্র, সেই বিষয়ের মধ্যে দ্বন্দ্বভাব সৃষ্ট হওয়ার বিষয়টি তেমন নজর দিই না। এই ধরনের উদ্ধত উপক্রম নিশ্চয়ই প্রকৃত বিজ্ঞানের ক্ষেত্র থেকে বহু দূরবর্তী।” তাহলে পাঠ্যগ্রন্থসমূহ এই বিতর্ককে কিরূপে দেখছে? পুণরায়, তারা একে উপেক্ষা করছে। বাস্তবিকপক্ষে, তারা ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে এমন এক প্রভাব বিস্তার করে যেন, হােমােলজির সংজ্ঞাই হল সকল প্রজাতিই সেই একই আদিম পূর্বপ্রজাতি থেকে এসেছে এবং তারা প্রাকৃতিক সাদৃশ্যতা বোঝাতে একে একটি প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করে।


 

এক নজরে ডারউইনের বিবর্তনবাদ :

১। পৃথিবীতে প্রথম জীবের আবির্ভাব ঘটে অজৈব জড় পদার্থের রাসায়নিক বিক্রিয়ায়।
২। জীবন একটা অ্যাক্সিডেন্ট : কোনাে উদ্দেশ্য নেই, কোনাে স্রষ্টাও নেই।
৩। প্রথম কোষ থেকে জন্ম হয়েছে অনেক কোষের, এরপর প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রাম ও অভিযােজন করতে করতে উদ্ভব হয়েছে জটিল প্রজাতির।
৪! এইভাবে এক প্রজাতি রূপান্তরিত হয়ে তৈরি হয়েছে অন্যান্য উন্নত প্রজাতির।
৫। সব প্রজাতির জীবদেহের সৃষ্টি হয়েছে ঘটনাচক্রে আপনা থেকে-এর পিছনে কোনাে বুদ্ধিমত্তা নেই, পরিকল্পনা নেই।
৬। জীবন যেহেতু জড়ের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার পরিণতি, তাই ফিজিক্স আর কেমিস্ট্রির নিয়মের দ্বারা জীবনের সব দিকগুলির ব্যাখ্যা দেওয়া যায়।
৭। বিবর্তন অব্যাহত প্রক্রিয়া, এখনও চলছে; তাই সব প্রজাতির রূপান্তর ঘটছে অনবরত। আগামী কয়েক লক্ষ বা কয়েক কোটি বছর পরে বদলে যাবে জীবজগতের সামগ্রিক চেহারা।
প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্ব : “প্রাকৃতিক নির্বাচন হচ্ছে সেই প্রক্রিয়া, যা প্রতিদিন প্রতিক্ষণ সারা পৃথিবীতে জীবদেহে অর্জিত সামান্যতম প্রকরণগুলিকেও (Variation) পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করছে, যেগুলি মন্দ সেগুলিকে বর্জন করছে এবং যেগুলি ভাল, সেগুলিকে যুক্ত করছে।”


পাখি ও ঠোঁট : ডারউইনের পক্ষী মতবাদ

গত শতাব্দীর শুরুতে ডারউইন তাঁর ‘দি অরিজিন অব স্পিসিস গ্রন্থ প্রকাশ করেন। একজন প্রকৃতিবিজ্ঞানী হিসেবে তিনি তার এই কল্পনাপ্রসূত ধারণাসমূহ প্রণয়ন করছিলেন একটি ব্রিটিশ সার্ভে জাহাজ এইচ.এম.এস. বেয়াগল এ। ১৮৩৫ সালে যখন এই জাহাজ গালাপাগােস দ্বীপে পৌছায়, ডারউইন তখন সেখানকার স্থানীয় পশুপাখির নমুনা সংগ্রহ করেন। সেখানে কিছু ছােট পাখির নমুনাও ছিল। যদিও এই সমস্ত ছােট পাখিসমূহ মূলত ডারউইনের বিবর্তনবাদের উন্নয়নে তেমন অবদান রাখার মত নয় কিন্তু তবুও এগুলাে আধুনিক বিবর্তনবাদীদের মনােযােগ আকর্ষণ করেছে প্রাকৃতিক নির্বাচন এর প্রমাণরূপে।

 

১৯৭০ সালে পিটার এবং রােজম্যারি গ্র্যান্ড এবং তাদের সঙ্গিগণ লক্ষ্য করেন যে একটি তীব্র খরার পর একটি পাখির ঠোট ৫ শতাংশ বেড়ে গেছে, কেননা সেই ছােট পাখিটিকে এমন এক স্থানে রাখা হয়েছিল যেখানে শুধুমাত্র শক্তপ্রকোষ্টে আবদ্ধ বীজ খেতে হত। যদিও পরিবর্তনটি খুবই সুনির্দিষ্ট, তবে খুবই ক্ষুদ্র কিন্তু তা সত্ত্বেও কয়েক ডারউইনবাদীরা দাবি করছেন যে এটি ব্যাখ্যা করছে কিভাবে চক্ষুবিশিষ্ট পাখিগণ একই আদিম প্রজাতি থেকে উদ্ভব হয়েছে। ১৯৯৯ সালে ইউ.এস. ন্যাশনাল একাডেমি অব সাইন্স একটি বুকলেট প্রকাশ করে যেখানে ডারউইনের পক্ষীকে অরিজিন অব স্পিসিসের একটি সুনির্দিষ্ট বাধ্যগত উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন। এই বুকলেটে গ্র্যান্টের বিষয়টি উঠে আসে এবং ব্যাখ্যা করা হয় যে, “যদি এভাবে প্রতি ১০ বছরে কোনাে দ্বীপে খরা হয় তবে ২০০ বছর পর একটি নতুন প্রজাতির ঠোটওয়ালা পাখির উদ্ভব হবে।” কিন্তু সেই বুকলেট এটি ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ হয়েছে যে পুনরায় বর্ষাকাল আসার পর কেন সেই পাখিটির ঠোট স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছিল? কেন সেখানে কোনাে বিবর্তন হয় নি? বাস্তবিকপক্ষে বর্তমানে বিভিন্ন ছােট পাখির প্রজাতির উদ্ভব ঘটানাে হচ্ছে কৃত্রিম সংকর প্রক্রিয়া ঘটানাের মাধ্যমে, ডারউইনের প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্বের মাধ্যমে নয়। ডারউইনের পক্ষী তত্ত্ব যাতে বিবর্তনবাদকে সঠিক বলে প্রমাণ করতে পারে, সেইলক্ষ্যে প্রকৃত তথ্যপ্রমাণাদি পশ্চাতে রাখার যে প্রবণতা তা বৈজ্ঞানিক কুপরিচালনার পর্যায়ে পড়ে। হার্ভাড জীববিজ্ঞানী লুইস গুয়েনিন (১৯৯৯ সালে নেচার ম্যাগাজিনে লিখিত) বলেন আমেরিকার নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট আমাদের দিয়েছে, আইন আমাদের *গবেষণার জন্য পাহাড়া দেওয়ার উন্নত উৎস যা দিয়ে বৈজ্ঞানিক অসদাচরণসমূহকে ব্যাখ্যা করা যায়। কিন্তু ১৯৯৮ সালে যখন একটি স্টকের ৫ শতাংশ উন্নতি হয় তখন ঐ স্টকের মালিক তাঁর ক্লায়েন্টকে বলেন যে একটি বিশেষ স্টকের মূল্যে বিশ বছরে দ্বিগুণ হবে, কিন্তু যখন ১৯৯৯ সালে সেই স্টকের মূল্যে ৫ শতাংশ অবনতি ঘটে তখন তাঁকে প্রতারকরূপে অভিযুক্ত করে একে প্রতারণারূপে গণ্য করা হয়। বার্কলির আইনের অধ্যাপক ফিলিপ ই. জনসন ১৯৯৯ সালে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে লিখেন যে, “আমাদের নেতৃত্ব পর্যায়ের বিজ্ঞানীরা যখন কোনাে বিষয়কে প্রমাণ করার জন্য বিকৃতভাবে সাজান এবং একই ধরনের কাজের জন্য যখন একটি স্টক মালিককে জেলে যেতে হয় তবে বুঝুন সেই বিজ্ঞানীরা কতই না পীড়ার মধ্যে রয়েছে।”

এখানে মাইকেল জে. ক্রেমাে কর্তৃক লিখিত ফরবিডেন আর্কিয়ােলজি’ গ্রন্থের আরেকটি উদাহারণ সন্নিবেশিত হল :

অ্যাপম্যান বা কোনম্যান-
জাভা মানুষের উরুর অস্থি

১৮৯২ সালের আগস্ট মাস, ইউজিন ডুবােইস নামক এক ব্যাক্তি মধ্য জাভার ত্রিনীল গ্রামের সন্নিকটে সােলাে নদীর উপকূলে একটি মনুষ্য আকৃতির উরুর অস্থির ফসিল আবিষ্কার করেন। সেই স্থান থেকে ৪৫ ফুট দূরে তিনি একটি মাথার খুলির উপরের অংশ এবং পেষণ দন্ত আবিষ্কার করেন। ডুবােইস ধারণা করলেন যে, মাথার খুলি, দন্ত এবং উরুর অস্থি একই মানুষের। যদিও বাস্তবিকপক্ষে, এই হাঁড়সমূহ পাওয়া গেছে মাথার খুলির স্থান থেকে ৪৫ ফিট দূরে, যেই মাটির স্তরে আরাে শখানেক বিভিন্ন প্রাণির হাঁড় পাওয়া গেছে। তাই এটি বলা অত্যন্ত সন্দেহজনক যে, অস্থি এবং মাথার খুলি উভয়েই একই প্রাণির, এমনকি একই প্রজাতির। ১৮৯৫ সালে ডুবােইস তাঁর খুঁজে পাওয়া নিদর্শনগুলাে “বার্লিন সােসাইটি ফর অ্যানথ্রাপােলজি, ইথােনােলজি এন্ড প্রিহিস্ট্রিতে জমা দেন। এই সংস্থার অধ্যক্ষ ড.ভিরচো ঘােষণা করেন যে সেই উরুর অস্থিটি একজন মানুষের এবং মাথাটি একটি বানরের। ডুবােইস পরবর্তীতে তার মতবাদ পরিবর্তন করে বলেন যে, সেই মাথার খুলিটি বৃহৎ উল্লুকের, যদিও উল্লুক কিন্তু বিবর্তনবাদীদের মতে মানষের কাছাকাছি গােত্রীয় নয়। কিন্তু হারানাে সংযােগ বা মিসিং লিঙ্ক এর ধারণা এখনাে পর্যন্ত ব্যাপকভাবে প্রচারিত ধারণা। (সূত্র ও ফরবিডেন আর্কিয়ােলজি, পৃষ্ঠা ৪৬৪-৪৬৫)

নিছক জল্পনা কল্পনা

মানব উৎপত্তি বিষয়ক বিজ্ঞানীদের জল্পনা কল্পনার ব্যপ্তি কোন পর্যায়ে পৌছে গেছে তার উপলব্ধি করা যাবে একজন শ্রেষ্ঠ প্রত্নতাত্ত্বিকের নিম্নোক্ত বিবৃতি থেকে, “আমি এখন আলােচনা করব মানব বিবর্তনে বৃহৎ নমুনা নিয়ে, এটি একটি উপভােগ্য অনুশীলন যাতে বহু ইচ্ছেমত বিবিধ তথ্য সংযুক্ত করা যায়, এই তথ্যগুলাে যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে মানব উৎপত্তি সম্পর্কে জল্পনা কল্পনা করা যায়, এটি এমন একটি বিষয় যা প্রমাণের জন্য কোনাে সুনির্দিষ্ট ফসিল রেকর্ড নেই। অতএব, কিছু কল্পনা অনুশীলন করার জন্য এটি একটি সুবর্ণ সুযােগ।”
(তথ্যসূত্র : American Anthoropologist, Distinguished Lecture; Hominoid Evolution an Hominoid origins, by David Pilbeam. Vol. 88, No.2 June 1986. p. 295)

 

প্যালিওঅ্যানথ্রোপােলােজিস্ট মিসিয়া লেনডু মতে, মানব উৎপত্তি তত্ত্বসমূহ এখনাে বহু দূরবর্তী অবস্থানে রয়েছে এই রহস্য আবিস্কারে। যেখানে শুধুমাত্র ফসিল রেকর্ডের গবেষণা করে সামান্য কিছু অনুমান করা সম্ভব এবং বাস্তবিকপক্ষে এটি জীবাশ্ম রেকর্ড ব্যখ্যা করার ক্ষেত্রেও একটি বােঝা স্বরূপ- এই বােঝা থেকে অব্যাহতি পাওয়া যাবে যদি এই জীবাশ্মগুলাে বা ফসিলগুলাে অস্তিত্বপূর্ব বর্ণনাগত গঠনকাঠামােতে প্রতিস্থাপন করা যায়।” ১৯৯৬ সালে “আমেরিকান হিস্ট্রি অব ন্যাচারাল হিস্টোরি” এর অধ্যক্ষ ইয়ান টেটারশার স্বীকার করেছেন যে, “প্যালিওঅ্যানথ্রােপােলােজিস্ট বিদ্যায় আমরা যে কাঠামােসমূহ লাভ করি সেগুলােকে প্রকৃত প্রমাণের চেয়ে আমাদের অবচেতন মনের প্রতিক্রিয়ায় গৃহিত উপলব্ধির ভিত্তিতে লাভ করি।” অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির অ্যানথ্রােপলােজিস্ট জেফ্রি ক্লার্ক ১৯৯৭ সালে তার বক্তব্য সম্পর্কে লিখেন, “আমরা বিভিন্ন ধরনের বিকল্প গবেষনার ফলাফল থেকে একটি নির্বাচন করি যা আমাদের পক্ষপাত ও কুসংস্কার অনুযায়ী হয়ে থাকে।” ক্লার্ক উথাপন করেছেন যে, “প্যালিওঅ্যানথ্রােপােলােজি হল একটি কাঠামাে কিন্তু এতে বিজ্ঞানের কোন কণা নেই।” দক্ষ বৈজ্ঞানিকদের এই সকল বিবৃতির মাধ্যমে মানব উৎপত্তি সম্পর্কিত যে গােপনীয় অনিশ্চয়তার ব্যাপার রয়েছে তা কখনােই জীববিজ্ঞানের ছাত্র-ছাত্রী কিংবা সাধারণ মানুষকে জানানাে হয় না। তার পরিবর্তে তাদের এমন এক কাল্পনিক মতবাদ গলাধঃকরণ করানাে হয় যা আদতে মনে হবে যেন বাস্তবিক । এই ধরনের কাল্পনিক মতবাদসমূহকে সাধারণত ব্যাখ্যা করা হয় গুহা মানবের কাল্পনিক অংকিত চিত্র দ্বারা বা অত্যধিক ম্যাকআপ নিয়ে সজ্জিত কোনাে মানব অভিনেতার ছবির মাধ্যমে।

ভুল ব্যাখ্যাকৃত প্রমাণ

এখন চলুন আমরা কিছু প্রচলিত উদাহরণ যেগুলাে বিবর্তনবাদকে সমর্থন করে বলে ধারণা করা হয়, সেগুলাে বিশ্লেষন করব ।

(নিম্নোক্ত বিষয়সমূহ বিবিটি সাইন্স কর্তৃক প্রকাশিত অরিজিন ম্যাগাজিন থেকে নেওয়া হয়েছে)

ডিএনএ এর সাদৃশ্যতা

সাম্প্রতিক বছরসমূহে জিন গবেষকগণ আবিস্কার করেছেন, যে সমস্ত প্রজাতিতে একই রকমের ডিএনএ এবং অন্যান্য প্রােটিনের গঠন কাঠামাে রয়েছে, তাদের আণবিক গঠনও সাদৃশ্যপূর্ণ। তাই যে সমস্ত বিবর্তনবাদীরা প্রজাতিসমূহের মধ্যে শারীরিক গঠনের সাদৃশ্যতা পেয়েছেন এবং বলেছেন তারা সকলেই সেই এক আদিম প্রজাতি থেকে উদ্ভব হয়েছে, তারা এখন জিনগত দিক দিয়েও একই ধরনের সম্বন্ধ পেয়েছেন বলে প্রচার করছেন। কিন্তু এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে এই ধরনের সাদৃশ্যতা কখনােই প্রজাতিসমূহের উৎপত্তি সম্পর্কিত কোনাে সত্যতা নিশ্চিত করতে পারে না এবং একে ডারউইন স্টাইলের বিবর্তনবাদের সাথে প্রামাণিকতা হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। এছাড়াও জিনগত সাদৃশ্যের ব্যাপারটি একটি প্রতারণাও হতে পারে কেননা জিনগত গঠন কাঠামাে খুবই জটিল একটি বিষয়। উদাহরণস্বরূপ কিছু বিবর্তনবাদী বলেন যে যেহেতু মানব জিন এবং শিম্পাঞ্জির জিনের মধ্যে ৯৮.৪% মিল রয়েছে তাই এটি অত্যন্ত সুস্পষ্ট যে এখানে বিবর্তন রয়েছে। একজন নেতৃত্বস্থানীয় জিনােম এবং জেনেটিক গবেষক ডা. বার্নে মাডােক্স চিহ্নিত করেন যে ডিএনএ-এর মধ্যে যে ১.৬% পার্থক্য রয়েছে তা হল ৪ কোটি ৮০ লক্ষ নিউক্লিওটাইডের মধ্যকার পার্থক্য। শুধুমাত্র তিনটি নিউক্লিওটাইডের পার্থক্য থাকলেই প্রাণিগত বিপুল ফারাক দেখা দেয়!

প্রজনন

ডারউইনের সময়কালীন হতে প্রজননের ফলাফলের পার্থক্য নির্ণয়ের মাধ্যমে একে বিবর্তনবাদ তত্ত্বের প্রমাণস্বরূপ গণ্য করানাে হচ্ছে। যদি মানুষ মাত্র কয়েক প্রজন্মে বৃক্ষ এবং প্রাণিদের সুনির্দিষ্ট পরিবর্তনে সক্ষম হয়, তবে কল্পনা করুন লক্ষ লক্ষ বছর নিঃশেষ হওয়ায় কি পরিমাণ পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। তারা এই ধরনের কারণ বর্ণনা করে থাকেন।

কিন্তু প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্বের মাধ্যমে বিবর্তন এবং প্রজননের মাধ্যমে বৃক্ষ ও প্রাণিদের যে পরিবর্তনের প্রবর্তন করানাে হয় তার সবই তুলনাযােগ্য হয় না। প্রজননের মাধ্যমে একটি ইচ্ছাকৃত অভিপ্রায় থাকে যাতে একটি সুনির্দিষ্ট ফলাফল পাওয়া যায় যেমন একটি বড় আপেল, একটি গাভী যা আরাে অধিক দুধ দিতে পারবে; কিন্তু প্রাকৃতিক নিবার্চন তত্ত্বে কোনাে বুদ্ধিমত্তা প্রদর্শক পরিকল্পনা থাকে না।

এছাড়াও, সকল সংগৃহীত উপাত্ত পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে প্রজননের মাধ্যমে পরিবর্তনের ব্যাপারে অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফ্রেঞ্চ প্রাণিবিজ্ঞানী পিরি পি.গ্রাসি তার গ্রন্থ ‘এভুলেশন ইন লিভিং অর্গাজম এ প্রদর্শন করেন যে, “প্রজননের মাধ্যমে জেনেটিক স্টকে যে পরিবর্তন সাধন করা হয় তা প্রজাতির আবির্ভাবকে ক্ষতিগ্রস্ত করে যা প্রকৃত গঠনকাঠামাে এবং কার্যকারিতার ক্ষতির তুলনায় বেশি। কৃত্রিম নির্বাচন পদ্ধতির মাধ্যমে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করা সত্ত্বেও সমগ্র সহস্রাব্দেও কোন নতুন প্রজাতির সৃষ্টি হয় নি….

. ১০ হাজার বছর যাবৎ কুকুর প্রজাতিতে অসংখ্য উপায়ে পরিব্যক্তি বা মিউটেশন, ক্রস প্রজনন এবং প্রাকৃতিক নির্বাচন চললেও তাদের মধ্যে রসায়নগত কিংবা কোষগত গঠনের কোনাে পরিবর্তন সাধন হয় নি। একই বিষয়টি পরিলক্ষিত হয় গৃহপালিত প্রাণিদের ক্ষেত্রেও যেমনঃ ষাঁড় (কমপক্ষে ৪ হাজার বছর পুরাতন প্রজাতি), পাখি (৪ হাজার), ভেড়া (৬ হাজার বছর) ইত্যাদি।”

প্রজনন এর প্রক্রিয়াটি ঠিক একটি রবারের বন্ধনীকে প্রসারিত করার মত। যতই আমরা এটিকে টানবাে, কিছুটা দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পেয়ে হয় এটি ভেঙ্গে যাবে নয়ত পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরে আসবে। উদাহরণস্বরূপ, ১৯ শতকে কিছু গৃহপালিত খরগােশ দূরবর্তী স্থান থেকে অস্ট্রেলিয়ায় নিয়ে আসা হয় যেখানে কোনাে স্থানীয় খরগােশ ছিল না। যখন তাদের মধ্যে কয়েকটি গৃহপালিত পােষা খরগােশ পালিয়ে যেতে সক্ষম হল, তারা তখন প্রকৃতিতে স্বাধীনভাবে নিজেদের মধ্যে প্রজননে সক্ষম হল এবং খুব শীঘ্রই তারা তাদের পূর্বতন স্বভাবও ছাড়িয়ে গেল এবং বন্য খরগােশে পরিণত হল।

অল্প কথায়, কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে হয়তােবা কোনাে প্রজাতিতে ক্ষুদ্র পরিবর্তন আনা যায় (উদাহরণস্বরূপ, সেই জীবের উচ্চতা ছােট, বড় করা), কিন্তু এই পদ্ধতিতে সম্পূর্ণ নতুন জটিল গঠন কাঠামাে বিশিষ্ট ভিন্নতর জীব উৎপন্ন করা সম্ভব নয়। যদি এটি মানুষের চেতনার সর্বাত্মক প্রচেষ্টাতেও সম্ভব হচ্ছে না, তবে কেন আমাদের এটি স্বীকার করতে হবে যে, এটি অন্ধ প্রাকৃতিক উপায়ে যে কোনাে এক সময় হয়তােবা ঘটতে পারে? 

 

ত্রৈমাসিক ব্যাক টু গডহেড, জুলাই -সেপ্টেম্বর ২০১৩

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here