জগন্নাথ দেবের প্রকাশ এবং রথযাত্রার বর্তমান প্রেক্ষাপট

0
71

শ্রীজগন্নাথদেবের রথযাত্রা পৃথিবীর প্রাচীনতম পারমার্থিক অনুষ্ঠান যেটি অনাদি-কাল হতে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। প্রতি বছর সাধারণত আষাঢ় মাসের শুক্লা দ্বিতীয়ায় এই মহোৎসব উদযাপিত হয়। এই সময় আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা সকলেই ভগবানের প্রীতি বিধানের উদ্দেশ্যে অত্যন্ত উৎসাহের সহিত নৃত্য-গীতে মেতে উঠেন। শ্রীজগন্নাথদেব হচ্ছেন ভগবানের কৃপাময় রূপের প্রকাশ। রথের দিন প্রভু জগন্নাথদেব রত্ন সিংহাসন ছেড়ে নেমে আসেন সাধারণ মানুষের মাঝে, তার অহৈতুকী কৃপা বিতরনের উদ্দেশ্যে। এই বিশেষ দিনটিতে যে কোন বর্ণ ও ধর্মের মানুষ শ্রীজগন্নাথদেবকে দর্শন করে ও রথের দড়ি টেনে নিজেকে ধন্য করতে পারেন। শ্রীপদ্মপুরাণে রথযাত্রার মাহাত্ম্য বর্ণনা করে বলা হয়েছে “রথযাত্রার সময় যারা শ্রীজগন্নাথকে রথে উপবিষ্ট অবস্থায় দর্শন করেন, তাঁদের বিষ্ণুলোকে বাস হয়ে থাকে। এমনকি, রথের চূড়া দর্শন করেও যে কেউ মুক্তিলাভ করতে পারেন।’ ভক্তদের কৃপা প্রদানের জন্য ভগবান শ্রীজগন্নাথ কিভাবে এই রথযাত্রার প্রবর্তন করেছিলেন সেই চমকপ্রদ লীলা কাহিনী পাঠ করে পাঠকগণ অবশ্যই বিশেষ তৃপ্তি লাভ করবেন। পুরাকালে ইন্দ্রদ্যুম্ন নামে ভগবান শ্রীবিষ্ণু এক মহান ভক্ত মালব প্রদেশ শাসন করতেন। সরাসরি ব্রহ্মা থেকে আগত বংশ পরম্পরায় ইন্দ্রদ্যুম্ন ছিলেন পঁচিশতম পুত্র। ভগবানের সরাসরি দর্শনলাভের জন্য তিনি অত্যন্ত ব্যাকুল হয়েছিলেন। অন্তর্যামী ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ইচ্ছায় মহারাজ, ইন্দ্রদ্যুম্নের রাজসভায় এক শুদ্ধ বৈষ্ণব ভক্ত উপস্থিত হয়ে রাজার কাছে ভগাবান শ্রীনীলমাধবের গুণ মহিমা বর্ণনা করেন। এই কথা বলেই সেই বৈষ্ণব ভক্ত অদৃশ্য হয়ে যান। এই লীলা কথা শোনার পর মহারাজ ইন্দ্রদ্যুম্ন অত্যন্ত উৎকণ্ঠিত চিত্তে শ্রীনীলমাধবের সন্ধান করার জন্য বিভিন্ন ব্রাহ্মণকে বিভিন্ন স্থানে পাঠালেন। বহুদিন ধরে বহুস্থানে সন্ধানের পর যখন ব্রাহ্মণেরা শ্রীনীলমাধবের কোন সন্ধান না পেয়ে ফিরে এলেন, তখনও বিদ্যাপতি নামে একজন নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ ফিরে আসেন নি। পায়ে হেটে দীর্ঘপথ ভ্রমণ করার ফলে বিদ্যাপতি ক্লান্ত হয়ে ‘বিশ্বাবসু ‘ নামক এক শবরের গৃহে আশ্রয় গ্রহণ করেন। অতিথি ব্রাহ্মণকে বিশ্বাবসু যথাযোগ্য সম্মান প্রদর্শন করলেন ও আথিতেয়তার জন্য তাঁর কন্যা ললিতাকে আদেশ দিলেন। অল্প সময়ের মধ্যে তাদের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে উঠল। বিদ্যাপতির রূপ ও গুণে মুগ্ধ হয়ে বিশ্বাবসু ললিতাকে বিদ্যাপতির সঙ্গে বিবাহ দিলেন। বিশ্বাবসুর গৃহে অবস্থান করার সময় বিদ্যাপতি দেখতে পান যে, বিশ্বাবসু প্রতিদিন রাত্রে গৃহে বাইরে গমন করেন এবং মধ্যাহ্নের পরে গৃহে ফিরে আসেন এইসময় তার সমস্ত শরীরে কস্তুরী, কর্পূর ও চন্দনের সৌরভ পাওয়া যেত। এই রহস্য উদ্ঘাটনের লক্ষ্যে বিদ্যাপতি ললিতাকে জিজ্ঞাসা করলে ললিতা জানালেন যে, তাঁর পিতা বিশ্বাবসু প্রত্যেক দিন শ্রীনীলমাধবে সেবা করতে যান।বহু দিন পর অপ্রতাশিতভাবে নীলমাধবের সন্ধান পেয়ে বিদ্যাপতি তাঁর দর্শনের জন্য অত্যন্ত ব্যাকুল হয়ে উঠলেন এবং তাঁকে সেখানে নিয়ে যাওয়ার জন্য বিশ্বাবসুকে বিশেষ অনুরোধ করলেন। কিন্তু বিশ্বাবসু তাতে সম্মত হলেন না। অবশেষে একদিন কন্যার বিশেষ অনুরোধে বিশ্বাবসু বিদ্যাপতির চোখ বেঁধে তাকে নীলমাধবের দর্শনে নিয়ে যান। যাবার সময় ললিতা দেবী স্বামীর বস্ত্রাঞ্চলে কিছু সরিষা দানা বেধে দিয়েছিলেন। পথ চলতে চলতে বিদ্যাপতি সেই দানাগুলি ছড়াতে থাকেন । বিদ্যাপতি যখন শ্রীনীলমাধবের সম্মুখে উপস্থিত হলেন, তখন বিশ্বাবসু তাঁর বাঁধা চোখ খুলে দিলেন। শ্রীনীল-মাধবের নয়নাভিরাম শ্রীবিগ্রহ দর্শন করে বিদ্যাপতি আনন্দে নৃত্য ও গুণকীর্তন করতে লাগলেন। সেই সময় আকাশবানী হল-“বিদ্যাপতি, তুমি যে নীলমাধবের দর্শন পেয়েছ, তা সর্বপ্রথমে মহারাজ ইন্দ্রদ্যুম্নের কাছে প্রকাশ কর।” দৈববানী শুনে বিদ্যাপতি তৎক্ষনাৎ মহারাজ ইন্দ্রদ্যুম্নের কাছে গিয়ে ভগবান শ্রীনীলমাধবের গুণমহিমার কথা প্রকাশ করলেন। শ্রীনীলমাধবকে দর্শন করতে যাওয়ার সময়ে বিদ্যাপতি যে সকল সরিষার দানা নিক্ষেপ করেছিলেন, সেগুলি থেকে ইতিমধ্যে সরিষার গাছ উৎপন্ন হয়েছে। সেই সরিষা গাছগুলি বিদ্যাপতিকে নীলমাধবের মন্দিরের পথ নির্দেশ করতে বিশেষ সাহায্য করেছিল। বিদ্যাপতি ও মহারাজ ইন্দ্রদুম্ন যখন সেখানে উপস্থিত হলেন, তখন তাঁরা দেখলেন যে, নীলমাধবের মূর্তি সেখানে নেই। রাজা নীলমাধবের মূর্তি না দেখতে পেয়ে ভাবলেন, বিশ্বাবসু শ্রীনীলমাধবকে কোন স্থানে লুকিয়ে রেখেছেন। মহারাজ ইন্দ্রদ্যুম্ন শ্রীনীলমাধবের দর্শন না পেয়ে অনশনব্রত অবলম্বন করে প্রাণত্যাগের সংকল্প করলেন। তখন শ্রীজগন্নাথদেব স্বপ্নে তাঁকে বললেন- “তুমি চিন্তা করো না, সমুদ্রের ‘বঙ্কিমুহান’ নামক স্থানে দারুব্রহ্মরূপে ভাসতে ভাসতে আমি উপস্থিত হব।” জগন্নাথদেবের কথামত রাজা কাষ্ঠখন্ডটি প্রাসাদে নিয়ে এলেন। ঐ কাষ্ঠখন্ডগুলি খোদাই করে ভগবানের শ্রীমূর্তি নির্মাণের জন্য শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং শিল্পী বিশ্বকর্মার ছদ্মবেশে আগমন করেন। তিনি তাঁকে একুশ দিন একাকী একটি রুদ্ধদ্বার কক্ষে রেখে দেওয়ার জন্য রাজাকে নির্দেশ দেন। বিশ্বকর্মা তাঁকে সতর্ক করে বলেন যে কেউ যদি একুশ দিন পূর্বে দ্বার উম্মোচন করে, তাহলে শ্রীমূর্তি নির্মাণ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। পনের দিন অতিবাহিত হল এবং ঐ কক্ষ থেকে তখন আর কোনো খোদাইয়ের শব্দ পাওয়া যাচিছল না। মহারাণী গুন্ডিচাদেবী আশংকা করলেন যে বৃদ্ধ ঐ সূত্রধর হয়ত অনশনে ক্লিষ্ট হয়ে কক্ষের মধ্যেই প্রাণত্যাগ করেছেন। তিনি রাজাকে দ্বার উম্মোচন করে তদন্ত করে দেখতে অনুরোধ করলেন। রাজা তাঁর এই প্রস্তাবে অসম্মত হলেন-তিনি সূত্রধরের নির্দেশ অনুসরণ করতে চাইলেন। কিন্তু রাণীর অনুনয়ে শেষ পর্যন্ত তিনি ঐ কক্ষের দরজা খুলে কক্ষে প্রবেশ করলেন। মর্মাহত হয়ে তিনি আবিস্কার করলেন যে সূত্রধর অন্তর্হিত হয়েছেন, আর শ্রীমূর্তিসমূহের নির্মাণ কার্য অসমাপ্ত রয়েছে। রাজা অত্যন্ত শোকাবিষ্ট হলেন। তখন একটি অদৃশ্য দৈববাণী ধ্বনিত হলঃ “দুঃখ কোরো না। যেহেতু তুমি তোমার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করনি আর একুশ দিন পূর্ণ হবার পূর্বেই দ্বারোম্মোচন করেছ, সেজন্য বিগ্রহসমূহ এই রূপেই বিরাজ করবে। তুমি বিগ্রহসমূহের পূজারাধনা আরম্ভ করতে পারো। মূর্তিসমূহ প্রতিষ্ঠার জন্য ব্রহ্মলোক থেকে ব্রহ্মাকে আমন্ত্রণ কর।” আমি এই দারুব্রহ্ম রূপে “শ্রীপুরুষোত্তম” নামে নীলাচলে (পুরী) নিত্য অধিষ্ঠিত আছি। আমার ঐশ্বর্যময়ী সেবায় যদি তোমার কখনও অভিলাষ হয়, তাহলে তুমি স্বর্ণ বা রৌপ্য নির্মিত হস্তপদ আদির দ্বারা আমাকে ভূষিত করতে পার। কিন্তু সেই সঙ্গে এটা জেনে রাখ যে, আমার শ্রীঅঙ্গ যাবতীয় ভূষণের ভূষণস্বরূপ।” “আষাঢ় মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে সুভদ্রা এবং বলরামের সঙ্গে আমাকে রথে আরোহণ করিয়ে নবযাত্রা উৎসব পালন করবে। যেখানে আমি আবির্ভূত হয়েছিলাম এবং যেখানে তোমার সহস্র অশ্বমেধ যজ্ঞের মহাবেদি আছে, সেই গুন্ডিচা মন্দিরে আমাকে তুমি রথযাত্রা সহকারে নিয়ে গেলে বিশেষ আনন্দ পাব।” এতে রাজা অত্যন্ত আনন্দিত হন এবং বিগ্রহটিকে পুরীর বিশাল মন্দিরে ব্রহ্মা কর্তৃক প্রতিষ্ঠা করে যাবতীয় সেবা কার্যের সূচনা করেন। প্রতি বছর তিনি এক বিশাল র্যালীর আয়োজন করতেন এবং তিনটি সুসজ্জিত রথে জগন্নাথ, বলদেব, সুভদ্রা দেবীকে বসিয়ে সারা রাজ্যে ভ্রমন করাতেন। আজ থেকে প্রায় ৫০০ বছর পূর্বে শ্রীমন মহাপ্রভু যিনি স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ হয়ে ও ভক্তভাবে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তিনি রথযাত্রা উৎসবের সময় অপ্রাকৃত আনন্দে সপার্ষদে নৃত্য কীর্তন করতেন। আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা আচার্য শ্রীকৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তি বেদান্ত স্বামী প্রভুপাদের পরিকল্পনায় এই তাৎপর্যপূর্ণ রথযাত্রা মহোৎসব সারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এক নবরূপে প্রচারিত হয়েছে-যার মাধ্যমে জাতিধর্ম নির্বিশেষে আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা অগণিত নরনারী বছরের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্থানে এই রথযাত্রার আয়োজন করে ভগবানের মহিমা স্মরণ করে ধন্য হতে পারছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here