চট্টগ্রামে ইস্কন রথযাত্রার ইতিকথা

0
99

পরমেশ্বর ভগবান শ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা আজ থেকে বহু বৎসর পূর্ব হতে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে পালিত হয়ে আসছে। ভারতবর্ষ ছাড়িয়ে বিশ্বব্যাপি রথযাত্রার সূচনা হয় ইসকনের প্রতিষ্ঠাতা আচার্য্য এ.সি. ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদের মাধ্যমে। তিনিই প্রথম সমগ্র বিশ্ববাসীর সামনে এই জগন্নাথদেবের রথযাত্রার মাহাত্ম্য তুলে ধরেছিলেন। তখন থেকেই এই রথযাত্রা সারাবিশ্বে প্রায় প্রতিদিনই কোন না কোন মুহুর্তে পালিত হয়ে আসছে। যদিও বাংলাদেশে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা এই রথযাত্রা পালন করে আসছে প্রায় বহু বৎসর যাবৎ। কিন্তু তাদের অনেকেই পরমেশ্বর ভগবান শ্রীজগন্নাথদেবের রথযাত্রার ইতিকথা বা মাহাত্ম্য জানেন না। বাংলাদেশে ইস্কনের প্রথম রথযাত্রা আজ হতে সাত বছর পূর্বে পুস্তরীক ধামে অনুষ্ঠিত হয়। চট্টগ্রামে ইসকনের ভক্ত শ্রীমান দীনবন্ধু দাস প্রভু, ভগবৎ ধামবাসী শ্রীহরি প্রভু লীলারাজ প্রভু এই রথযাত্রার উদ্যোগ নেন। সেই সময় বাঁশের কঞ্চি দিয়ে তৈরী একটি ছোট রথে করে শ্রীজগন্নাথের রথযাত্রা পালন করা হতো। পরবর্তীতে তারা চট্টগ্রাম শহরেই একটি বড় রথযাত্রার পরিকল্পনা করেন। তাই পরম দয়ালু ভক্ত বৎসল ভগবান শ্রী জগন্নাথদেব ভক্তদের অভিলাষ বুঝতে পেরে নিজেই পুরীধাম থেকে স্বয়ং চট্টগ্রামে এসে উপস্থিত হন। নারায়ণগঞ্জের লক্ষ্মণ পোদ্দার নামের এক ধনাঢ্য ব্যবসায়ী চট্টগ্রাম রাধামাধব মন্দিরের জন্য জগন্নাথদেবের বিগ্রহ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। চট্টগ্রাম মন্দিরের ভক্তরা ও লক্ষণ প্রভু ভারতে তীর্থ ভ্রমণে গেলে পুরীধামের জগন্নাথের এক পাত্তাকে (উল্লেখ্য পুরীধামের জগন্নাথের সেবকদের পান্ডা বলে ডাকা হয়) জগন্নাথের বিগ্রহ তৈরী করার জন্য অনুরোধ করা হয়। সেই পান্ডা জগন্নাথের বিগ্রহ তৈরী করার জন্য ২৪-২৫ দিন সময় লাগবে বলে জানান। পরবর্তীতে লক্ষণ প্রভু ও ভক্তরা যথাসময়ে ঐ পান্ডার সাথে দেখা করলে তিনি বলেন ‘এখনো জগন্নাথের বিগ্রহ তৈরী হয়নি।’ তখন ভক্তরা খুবই হতাশ হলেন কেননা তাদের এরপরের দিনই বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা হতে হবে। একপর্যায়ে শ্রীহরি প্রভু সহ অন্যান্য ভক্তরা পান্ডাকে অনুরোধ করেন যে, তার গৃহে সেবিত জগন্নাথের বিগ্রহকে তাদের দেওয়ার জন্য। কিন্তু পান্ডা বিগ্রহ দিতে অসম্মতি প্রকাশ করলে লক্ষণ প্রভু বলেন- এ বিগ্রহ স্বয়ং রাধারাণীর বাপের দেশে যাবে যেখানে পুন্ডরীক বিধ্যানিধি, বাসুদেব ও মুদুন্দ দত্ত, লোচন দাস ঠাকুরের মত মহান ভগবৎ ভক্তরা জন্মিয়েছে। এই কথা শোনার পর পাত্তা সানন্দে তার সেবিত বিগ্রহ দিতে রাজি হলেন। কিন্তু রাধা রানীর পিতার জন্মস্থানের কথা শুনে তিনি বললেন যে, “আমি জানি। জগন্নাথদেব সেখানে অত্যন্ত যত্নের সহিত সেবিত হবেন।” অত্যন্ত অবিশ্বাস্য ও অলৌকিকভাবে ঐ পান্ডা জগন্নাথের উক্ত বিগ্রহ দিতে রাজী হলেন। এতে সমস্ত ভক্তরা অপ্রাকৃত আনন্দে উদ্ভাসিত হলেন। উল্লেখ্য,

পান্ডার সেবিত এই জগন্নাথদেবকে প্রতিবছর পুরীর জগন্নাথদেবের সাথে পরিক্রমায় অংশ গ্রহণ করতেন এবং নির্দিষ্ট দিন যাবৎ পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের শ্রীজগন্নাথদেবের মূল বিগ্রহের সাথে একই বেদীতে অবস্থান করে পান্ডাদের সেবা গ্রহণ করতেন। এরপর শ্রীজগন্নাথদেব পুনরায় সেই পান্ডার গৃহে সেবা পাওয়ার অভিলাষে প্রত্যাগমন করতেন। পুরী থেকে চট্টগ্রামের নন্দনকাননে জগন্নাথের বিগ্রহ আসার পর শ্রীল জয়পতাকা স্বামী গুরু মহারাজ উক্ত বিগ্রহের অচন ক্রিয়াদি সম্পাদনের মাধ্যমে চট্টগ্রামে ভগবান জগন্নাথদেবকে প্রতিষ্ঠিত করেন। পরবর্তীতে এক ধনাঢ্য জুয়েলারী ব্যবসায়ী রমনী মোহন বসাক একটি বড় ফোল্ডিং রথ প্রদান করেন এবং ২০০৫ সালে ইসকনের উদ্যোগে চট্টগ্রামে সর্ব প্রথম বড় ধরনের যাত্রা পালিত হয়। প্রবর্ত্তক মন্দির প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর জগন্নাথের বিগ্রহ নন্দনকানন থেকে প্রবর্ত্তকে নিয়ে আসা হয়। জগন্নাথদেব আসার পর প্রবর্তকে জগন্নাথের কৃপায় মন্দিরের অনেক উন্নয়ন সাধিত হয়। যেখানে পূর্বে প্রায়ই অন্নহীন, বিদ্যুৎহীন ও আর্থিক অভাব অনটনের মধ্য দিয়ে ভক্তদের দিন কাটত সেখানে যেদিন থেকে জগন্নাথদেব প্রবর্ত্তক মন্দিরে উপস্থিত হন, সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত ভক্তদের এই ধরনের কোন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়নি। কেননা শাস্ত্রে উল্লেখ রয়েছে জগন্নাথদের যেখানে থাকেন সেখানে ভক্তদের কোন কিছুরই অভাব হয় না। এভাবে ভগবান তাঁর ভক্তদের কৃপা করে থাকেন। জয় জগন্নাথ, জয় বলদেব, জয় সুভদ্রা। হরেকৃষ্ণ।

প্রবর্তক শ্রীকৃষ্ণ মন্দিরের সেবিত শ্রীজগন্নাথদেবের অপ্রাকৃত লীলা

এসব লীলা কথা সধারণত প্রকাশ করা হয় না। তবুও ভগবানের প্রতি অকৃত্রিম ভক্তি, বিশ্বাস ও ভালোবাসা জন্মানোর জন্য আপনাদের সম্মুখে সামান্য তুলে ধরা হলো।

প্রথম লীলা : ভগবান জগন্নাথদেব যখন প্রথম চট্টগ্রামে আসেন তখন সেখানে কোন পূজারী ছিলেন না এবং ভগবানের সেবার নিয়ামকানুন কারো জানা ছিল না। কিন্তু জগন্নাথদেবের অলৌকিকতায় বৃন্দাবন থেকে সুধা গৌর কৃষ্ণ দাস নামে এক প্রভু কোন ধরণের পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়ায় চট্টগ্রামে জগন্নাথদেবের সেবার জন্য চলে আসেন এবং জগন্নাথদেবের সেবার বিধি চালু করেন।

দ্বিতীয় লীলা : চট্টগ্রামের প্রবর্তক মন্দিরের সেবিত ভগবান জগন্নাথদেবের পূজারী শচীনন্দন প্রভু একবার মায়াপুরে ১ মাসের জন্য পরিক্রমায় গিয়েছিলেন। দুই সপ্তাহ পর তিনি স্বপ্নে দেখেন যে, উনি যখন প্রসাদ খেতে পেতে যাচ্ছেন তখন জগন্নাথদের লম্বা একটি হাত দিয়ে বাধা দিচ্ছে, তখন তিনি বুঝতে পাড়লেন যে, জগন্নাথদেবের সেবায় কোন ত্রুটি হচ্ছে। তৎক্ষণাৎ শচিনন্দন প্রভু পরিক্রমা সমাপ্ত রেখে চট্টগ্রামে ফিরে এসে ভগবানের সেবাই নিযুক্ত হন।

তৃতীয় লীলা : এক বার জরুরী ভিত্তিতে ভগবান জগন্নাথ, বলদেব ও সুভদ্রাদেবীর পোশাক প্রস্তুত করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিল। তখন পূজারী প্রভু চিন্তিত হয়ে পড়লেন কারণ ভগবানের পোশাক কেবলমাত্র ভক্তরায় শুদ্ধভাবে তৈরি করতে পারেন। কিন্তু তখন মন্দিরে তেমন কোন ভক্তই ছিলেন না। পূজারী শচীনন্দন প্রভু ভগবান জগন্নাথদেবের কাছে এই সমস্যা সমাধানের জন্য প্রার্থনা জানান। অন্যদিকে তখন ভগবানের পোশাক নির্মানকারী মধুসূদন প্রভু মায়াপুরে ছিলেন। সেখানে অকিঞ্চন কৃষ্ণ দাস প্রভুর মদুসূধন প্রভুর সাথে অনেকটা অবিশ্বাস্যভাবে দেখা হয় এবং তিনি বলেন “চট্টগ্রামে ভগবানের পোশাক বানানোর মত কোন ভক্ত নাই, আপনি চট্টগ্রাম চলে যান।” তখন তিনি বুঝতে পারলেন যে, জগন্নাথদেব তাকে সেবার জন্য ডাকছেন। তাই তিনি কোন ধরনের পরিকল্পনা ছাড়ায় চট্টগ্রামে চলে এলেন এবং ভগবানের দিব্য পোশাক প্রস্তুত বানাতে শুরু করলেন এভাবে ভক্তদের হৃদয়ে ভগবান জগন্নাথদেব প্রতি নিয়ত অপ্রাকৃত লীলা বিলাস করে চলেছেন। প্রবৰ্ত্তক শ্রীকৃষ্ণ মন্দিরে অবস্থিত ভগবান জগন্নাথদেবের দিব্য লীলাবিলাসগুলো মহিমাময়। তাই ভগবান জগন্নাথদেবের বিগ্রহ দর্শনে আপনারা আজই চলে আসুন মন্দিরে।


চৈতন্য সন্দেশ জুলাই ২০০৮ প্রকাশিত

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here