গ্রহ-নক্ষত্রই কী সব?

0
46

নির্ভুল তত্ত্বসূত্রগুলি শাস্ত্রসম্ভারে এমনই বিজ্ঞজনোচিত পদ্ধতিতে সংকলিত যে, জগতের যে কোনো সংকট মুহূর্তে যথোচিত পথসঙ্কেত পেতে পারি

প্রাণদা দেবী দাসী

আমেরিকার লোকেরা জ্যোতিষতত্ত্ব পছন্দ করেন- প্রায় প্রত্যেকটি সংবাদপত্রেই থাকে রাশিচক্র অনুসারে ‘ভবিষ্যদ্বাণী’- তবে লোকে খুব একটা গুরুত্ব দিয়ে সেগুলি গ্রহণ করে না। তাই যখন তাঁরা শুনলেন যে, আমেরিকার এক রাষ্ট্রপতির সহধর্মিনী নাকি তাঁর স্বামীকে প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করার জন্যে জ্যোতিষতত্ত্ব বিচারে খুবই গুরুত্ব দিচ্ছেন এবং তার ফলে নাকি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের অভিযানে তাঁর গুরুত্ব ক্ষুণ্ণ হতে চলছে, তখন তাঁরা প্রতিবাদ করে ওঠেন-‘এ সব নিয়ে তো খুবই বাড়াবাড়ি করা হচ্ছে!‘
যদিও জ্যোতিষতত্ত্ব খুবই নির্ভরযোগ্য এবং বৈদিক জ্ঞান সম্ভারের মধ্যে সম্পূর্ণ বিশ্বাসযোগ্য একটি শাখা, তাহলেও আধুনিক জ্যোতিষচর্চার যথার্থতা নিঃসন্দেহে বিতর্কিত বলেই মনে হয়। যে-ব্যাপারটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে লক্ষ্য করা যায়, তা হল এই যে, আমেরিকার প্রসিডেন্টের সহধর্মিনী-যাকে বলা হয় ওই-দেশের শ্রেষ্ঠ মাননীয় মহিলা-তিনি পথ নির্দেশের জন্য নিজের অন্তদৃষ্টির মাধ্যমেই এমন এক মহত্তর জ্ঞান সম্পদের দিকে আকৃষ্ট হয়েছেন, যা তাঁর নিজের পথনির্দেশ অপেক্ষা অনেক উচ্চস্তরের বলেই স্বীকৃত। বৈদিক শাস্ত্র অনুসরণ করলে তিনি তো সেই ধরনের মহৎ পথ নির্দেশই লাভ করবেন।
অবশ্য, শাস্ত্রসম্মত নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে পথ নির্দেশ গ্রহণ করার সিদ্ধান্তটি মোটেই বৈপ্লবিক কোনো ধ্যান-ধারণা বলে মনে করা উচিত নয়। আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় তো আমরা নিয়মিতভাবেই উচ্চপর্যায়ের নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে তত্ত্ব সংগ্রহের জন্য আগ্রহ বোধ করি সে হয়তো সামান্য কোনো মেরামতির কাজেও হতে পারে কিংবা বিরাট কোনো প্রকল্পের জন্যেও হতে পারে। ঠিক এই কারণেই তো নানা ধরনের পুঁথিপত্র, গ্রন্থসম্ভার আর বিভিন্ন প্রয়োজনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও রয়েছে সারা জগৎ জুড়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতিও চান নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে সঠিক পথনির্দেশ, আর তাঁর কাছে তো নানা ধরনের তথ্যসূত্র সর্বদাই উপস্থাপিত হচ্ছে। তাহলেও মনে রাখতে হবে যে, রাষ্ট্রপতি কোনো সিদ্ধান্তে ভুল করলে তাঁর পরিণামও হবে ব্যাপক।
আর সেটাই হল খুবই দুষ্কর ব্যাপার। আমরা জানি সকল ক্ষেত্রে নির্ভুল তত্ত্ব সংগ্রহ করা খুবই কঠিন। মানব সভ্যতার বিপুল ইতিহাস পর্যায়ে মহান চিন্তাশীল মনীষী এবং বিজ্ঞানীরাও আমাদের ব্যক্তিত্ব বিকাশ কিংবা আমাদের মন কিভাবে কাজ করে, এমন সব মূলগত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলিতেও অবিসংবাদিত তত্ত্ব নিরূপণ করে উঠতে পারেন নি। আর তাঁরা তো আরও উচ্চ স্তরের সার্বজনীন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলি সম্পর্কেও আমাদের সামনে চরম তত্ত্ব উপস্থাপন করতে পারেন নি-যেমন, আমরা কোথা থেকে এসেছি, কিভাবে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের উৎপত্তি হয়েছে এবং এই মহাবিশ্বজগতের গতিপ্রকৃতির নিয়মবিধিই বা কে রচনা করল, এমনই সব বিষয়ে।
তা হলেও আমরা জানি নির্ভুল তত্ত্ব সংগ্রহের সঠিক সূত্র আছে-আর তা সংগ্রহ করতে হলে কেবল যে উচ্চতর কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্রের শরণাপন্ন হলেই চলবে, তা নয়; আমাদের শরণ নিতে হবে পরম সূত্রের কাছে সেই সূত্র হলেন পরম সৃষ্টিকর্তা, পরম নিয়ন্তা এবং সর্বজ্ঞ সেই পরম পুরুষোত্তম পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ।
পারমার্থিক অলৌকিক তত্ত্ববিজ্ঞানের নির্ভরযোগ্য সূত্র বলতে আমরা যাঁদের মর্যাদা দিয়ে থাকি, সেই বৈদিক শাস্ত্রসম্ভার, মহর্ষিকুল, আচার্যমণ্ডলী সকলেই পরমেশ্বর রূপে যাকে অবিসংবাদিত রূপে স্বীকার করে নিয়েছেন, তিনি হলেন শ্রীকৃষ্ণ। কারণ তিনি অনাদি অনন্ত, তিনি সর্বজ্ঞ এবং তিনি কখনই মায়াধীন হন না। তাঁর দিব্য বাণী শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতা এবং শ্রীমদ্ভাগবতমের মতো বৈদিক শাস্ত্রাদির মধ্যে নিহিত রয়েছে, অতএব সেগুলিই হল সকল তত্ত্ব ও তথ্যের সঠিক সূত্র। শ্রীকৃষ্ণের বাণী থেকে তত্ত্ব সংগ্রহ পরস্পর বিরোধী বিবিধ মন্বান্তর ও মন্থান্তরের, অথবা সবরকমের ভ্রান্ত তথ্যাদির এবং সাধারণভাবে সবরকম বিভ্রান্তিরই অবসান ঘটে, আর তারই ফলে, আমরা পূর্ণ আত্মবিশ্বাস নিয়ে আমাদের নিজেদের জীবনধারা অথবা সমগ্র জাতির জীবনচর্চায় সঠিক পথনির্দেশের গুরুদায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতেও পারি।
জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে উপযোগী সঠিক এবং বাস্তবসম্মত তত্ত্বসূত্রে পরিপূর্ণ এই বৈদিক শাস্ত্রসম্ভার এমনকি কেমন করে একটা জাতিকে পরিচালনা করতে হয়, তাও আছে। যদিও আপনি অথবা কোনো দেশের রাষ্ট্রপতি মহোদয় আপনাদের ব্যক্তিবিশেষের কোনো সমস্যার বিশদ পথনির্দেশ তাতে পাবেন না, তবে নির্ভুল তত্ত্বসূত্রগুলি ঐ শাস্ত্রসম্ভারে এমনই বিজ্ঞজনোচিত পদ্ধতিতে সংকলিত হয়ে আছে, যার সাহায্যে আপনারা এ জগতের যে কোনো ক্ষেত্রে যে কোনো জটিল সমস্যার সঙ্কট মুহূর্তে সুনিশ্চিত পথসঙ্কেত পেতে পারবেন। শুধু প্রয়োজন, আমাদের জীবনে সেই নীতি সূত্রগুলি সতর্কতার সঙ্গে যথাযথভাবে প্রয়োগ করা এবং আমাদের হৃদয় এবং মন বিশুদ্ধ করে তোলা।
সুতরাং, গ্রহ-নক্ষত্রের কাছে সরাসরি কোনো পথসঙ্কেত পাবার চেষ্টায় যদিও কিছুটা ঝুঁকি থাকতে পারে, তাই বলছি-শ্রীকৃষ্ণের ভক্তবৃন্দ, সাধুসন্ন্যাসী এবং বৈদিক শাস্ত্রসম্ভারের মাধ্যমে প্রাপ্ত পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পথ নির্দেশ অনুসরণ করে চললে, আমরা শুধু যে নিরাপদ এবং সঠিক নিশানায় এগুতে পারব তাই নয়, যে কোনো কাজ সঠিক শুভ মুহূর্তে সম্পন্ন করবার সূত্র খুঁজে পাব, সবরকম রাজনৈতিক, সামাজিক এবং পারিবারিক ক্ষেত্রে আমাদের সকল চিন্তাধারা, চলা-বলা, আচার-আচরণও হয়ে উঠবে সুচারু, সুসম্পন্ন, সার্থক ও সুসমন্বিত।
শুধুমাত্র জড়-জাগতিক পথনির্দেশের ওপর নির্ভর না করে, এই ধরনের পারমার্থিক পথনির্দেশের দিকে আত্যন্তিকভাবে নির্ভরশীল হতে পারলে তার পরিণামে পৃথিবীতে যে কোনো রাজনৈতিক দায়-দায়িত্ব পালন করা কিংবা জগতের যে কোনো পরিস্থিতির মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে আমাদের কর্মক্ষমতা বা দক্ষতা এতটুকু হ্রাস পাবে না, একথা দৃঢ়তার সঙ্গে বলা যেতে পারে। কারণ এই সমস্ত বৈদিক পথনির্দেশ অনাদি অনন্তকালের দিব্য দৃষ্টি এবং সুগভীর ব্যাপক অভিজ্ঞতারই সুসংকলিত ফলশ্রুতি। এগুলি যথাযথভাবে অনুসরণ করে চলতে পারলে এই যে দুর্ভাগ্য এবং দুঃখদুর্দশাপূর্ণ জগতে আমরা বাস করছি, এর মধ্যে দিনাতিপাত করলেও, আমাদের সকলের, নিজেদের এবং আশ্রিতদের কল্যাণার্থে, সবরকমের পথনির্দেশ লাভ করে হতে পারব প্রকৃত দৃঢ়ব্রত। তাহলেই আমরা গ্রহ-নক্ষত্রের পথনির্দেশের চেয়ে আরও অনেক অনেক ভাল পথনির্দেশ দিতে পরব সকলকে, যাতে তারা সবাই পারমার্থিক পরম তত্ত্ব সম্বন্ধে আধ্যাত্মিক জগতের দিব্য আনন্দময় নিরাপদ পরিবেশ অভিমুখে নির্ভয়ে এগিয়ে যেতে পারবে।

প্রাণদা দেবী দাসী ১৯৭৬ সালে শ্রীল প্রভুপাদের কাছ থেকে দীক্ষা গ্রহণ করেন। তার পতি নাগরাজ দাস বর্তমানে আন্তর্জাতিক ব্যাক টু গডহেডের সম্পাদনা করছেন। তিনি আলুচুয়াতে এক মন্দির নির্মাণকল্পে অক্লান্ত সেবা করছেন। 


 

এপ্রিল-জুন ২০১৫ ব্যাক টু গডহেড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here