কে বলেছে কৃষ্ণই ভগবান?

0
113
এক ধরনের লোক আছে যারা বলে, ভগবান বলতে কেউ নেই। তারা নাস্তিকবাদ প্রচার করে থাকে। অন্য এক ধরনের লোক বলে, ‘না, ভগবানের অস্তিত্ব রয়েছে, যত দেব-দেবী, মহাপুরুষ রয়েছে সবাই ভগবান ।’ তৃতীয় এক ধরনের ব্যক্তি রয়েছে যারা বলে, ‘না, ভগবান একজনই এবং সেটা হলাম আমিই।’ চতুর্থ ব্যক্তিরা বলেন, ‘প্রত্যেকেই ভগবান।’ এভাবে পৃথিবীতে এক ধরনের বিভ্রান্তি প্রচলিত রয়েছে। ভগবান প্রকৃতপক্ষে কে এই বিষয়টি নিয়ে শ্রীল প্রভুপাদ কারো সাথে সমঝোতা না করে বরং শাস্ত্র থেকে যথাযথভাবে তুলে ধরেছিলেন। নিম্নের প্রতিবেদনে শ্রীল প্রভুপাদ সহ সমস্ত আচার্যদের সিদ্ধান্ত অনুসারে প্রকৃতপক্ষে ভগবান কে এই বিষয়টি তুলে ধরা হলো এবং সেসাথে বিভিন্ন দেব-দেবী, ঋষি, শুদ্ধভক্ত এবং শীর্ষ তিন ব্যক্তি ব্রহ্মা-শিব ও স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণের উক্তি উল্লেখ করা হলো।

অমর নাথ দাস


কৃষ্ণ কি বলেছেন?

ভগবদ্গীতায় কৃষ্ণ (১০/৮) বলেছেন,

অহং সর্বস্য প্রভবো মত্তঃ সর্বং প্রবর্ততে।
ইতি মত্বা ভজন্তে মাং বুধা ভাবসমন্বিতাঃ ॥

“আমি জড় ও চেতন জগতের সব কিছুর উৎস। সব কিছু আমার থেকেই প্রবর্তিত হয়। সেই তত্ত্ব অবগত হয়ে পণ্ডিতগণ শুদ্ধ ভক্তি সহকারে আমার ভজনা করেন।’ গীতার নবম ও অষ্টাদশ অধ্যায়ে কৃষ্ণ বলেছেন, কিভাবে তাঁর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। শ্রীকৃষ্ণ ৯/৩৪ শ্লোকে বলছেন-

মন্মনা ভব মদ্ভক্তো মদ্‌যাজী মাং নমস্কুরু।
মামেবৈষ্যসি যুত্ত্বৈবমাত্মানং মৎপরায়ণঃ ॥

“তোমার মনকে আমার ভাবনায় নিযুক্ত কর, আমার ভক্ত হও, আমাকে প্রণাম কর এবং আমার পূজা কর। এভাবেই মৎপরায়ণ হয়ে সম্পূর্ণরূপে আমাতে অভিনিবিষ্ট হলে, নিঃসন্দেহে তুমি আমাকে লাভ করবে।”
কেন কৃষ্ণ নিজেকে এভাবে উপস্থাপন করছে। এই উত্তরটি খুব সরল। আপনি যদি কোন কোম্পানিতে সেই কোম্পানির কর্মকর্তাদের পৃথকভাবে জিজ্ঞেস করেন আপনিই কি ভাইস প্রেসিডেন্ট? এভাবে সেই কোম্পানির মালিক বা ভাইস প্রেসিডেন্টকে অনুসন্ধান করা নিতান্তই কষ্টসাধ্য। কিন্তু ভাইস প্রেসিডেন্ট স্বয়ং এসে যখন তাঁর ভিজিটিং কার্ড দেখিয়ে বলে আমিই হলাম ভাইস প্রেসিডেন্ট। তখন ব্যাপারটি সহজ হয়ে যায়। তেমনি কৃষ্ণ স্বয়ং তাঁর সম্পর্কে তুলে ধরে আমাদের প্রতি ভগবানকে চেনার পথটি সুগম করেছেন। এজন্য বৈদিক শাস্ত্রকে মাতার সাথে তুলনা করা হয় এবং আর পিতা হলেন পরমেশ্বর ভগবান। আপনি যখন সমগ্র নগর ভ্রমণ করে পিতাকে অন্বেষণ করেন তখন সেটা অনেকটা কঠিন হয়ে যায়। কিন্তু সরাসরি যদি মাতাকে এই বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হয় তখন পিতাকে খুব সহজেই প্রাপ্ত হওয়া যায়। শাস্ত্র বলছেন, এই হলো ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। সমস্ত বৈদিক শাস্ত্রে শুধুমাত্র একজন ব্যক্তিকেই ভগবান বলে সম্বোধন করা হয়েছে এবং ভগবানও স্বয়ং তাঁর সম্পর্কে ব্যক্ত করেছেন। শ্রীকৃষ্ণ আমাদের কল্যাণার্থেই নিজের সম্পর্কে তুলে ধরেছেন।

কৃষ্ণ ও গণেশ

ভারতে বিশেষত মহারাষ্ট্রে গণেশ পূজা বেশ প্রসিদ্ধ। লোকেরা গণেশ চতুর্থী উদযাপন করে থাকেন। মহা আড়ম্বরে মুম্বাই, পুণেতে উৎসবটি উদ্যাপিত হয়। ব্রহ্মসংহিতায় ৫ম অধ্যায়ের ৫০ নং শ্লোকে উল্লেখ রয়েছে-
“গণেশ ত্রিজগতের বিঘ্ন বিনাশ করার উদ্দেশ্যে তখন শক্তিলাভের জন্য যাঁর পাদপদ্ম স্বীয় মস্তকের কুম্ভুযুগলের ওপর নিয়ত ধারণ করেন, সেই আদিপুরুষ গোবিন্দকে আমি ভজনা করি ॥”
ব্রহ্মা এই শ্লোকের মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণের সাথে গণেশকে খুব সুন্দরভাবে যুক্ত করেছেন। গণেশ ত্রিভুবনের সমস্ত জাগতিক ও পারমার্থিক প্রতিবন্ধকতাসমূহ বিনাশ করে। এটিই হলো তার সেবা। এজন্য তাকে বলা হয় ‘বিঘ্নহর্তা’। তিনি আমাদের জীবন চলার পথে সমস্ত বিঘ্ন বিনাশ করেন। এখন প্রশ্ন হলো তিনি বিনাশ করার শক্তিটি কোত্থেকে প্রাপ্ত হলেন? এজন্য ব্রহ্মা এখানে বলছেন, দ্বন্দ্বে প্রণামসময়ে স গণাধিরাজঃ অর্থাৎ, শ্রীগণেশ এই শক্তি প্রাপ্ত হন তাঁর মস্তকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শ্রীপাদপদ্ম ধারণ করার মাধ্যমে। এখানে খুব সুন্দরভাবে প্রকাশ করা হয়েছে কিভাবে গণেশ ভগবানের নির্দেশে কাজ করেন। গণেশ ভগবান নন। তিনি এরকম সম্বোধনে লজ্জিত হন কেননা সেটি তার প্রকৃত পদ নয়। হস্তী মস্তক ধারণ করে অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সহিত তিনি বৈদিক শাস্ত্র লিপিবদ্ধ করেন। এটি আমাদের জীবনের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। যখন আমরা কোনো প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হই কিংবা বিচলিত হই যে, কিভাবে সেবা কার্য করব, তখন আমাদেরকে ভগবানের শ্রীচরণ মস্তকে ধারণ করতে হবে। এই শিক্ষাটি শ্রীগণেশ আমাদের প্রদান করছেন। শ্রীমদ্ভাগবতে (৪/২২/৩৯) পৃথু মহারাজের প্রতি সনৎ কুমারদের উক্তি “ভক্তরা যাঁরা ভগবানের শ্রীপাদপদ্মের পাপড়িস্বরূপ অঙ্গুষ্টির সেবায় সব সময় নিযুক্ত আছেন, তাঁরা খুব সহজেই সকাম কর্মের বন্ধনকে অতিক্রম করতে পারেন। কিন্তু রিক্তমতি অভক্ত জ্ঞানী এবং যোগীরা যদিও তাঁদের ইন্দ্রিয়সুখ ভোগের স্রোতসমূহকে রোধ করতে যত্নশীল, তবুও তাঁরা তা করতে অক্ষম। সুতরাং, বসুদেব তনয় শ্রীকৃষ্ণের সেবায় যুক্ত হোন।” ভগবানের শ্রীপাদপদ্ম মস্তকে ধারণ প্রসঙ্গে শ্রীমদ্ভাগবতে অনেক শ্লোক কীর্তিত হয়েছে। হৃদয়ে, জীবনে, মস্তকে ভগবানের শ্রীপাদপদ্ম ধারণ করে আমরা যেকোনো প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করতে পারি ।
শ্রীব্রহ্মা শ্রীমদ্ভাগবতের ১০/৪০/৫৮ নং শ্লোকে উল্লেখ করছেন, “মহৎ-তত্ত্বের আশ্রয় এবং মুরারি নামে খ্যাত শ্রীভগবানের পদ-পল্লবরূপ নৌকাকে যাঁরা আশ্রয় করেছেন, তাঁদের কাছে এই ভবসাগর গোস্পদের মতো ক্ষুদ্র হয়ে যায়। পরম পদ বৈকুণ্ঠ লাভই তাঁদের লক্ষ্য। পদে পদে বিপদসঙ্কুল এই জড় জগৎ তাঁদের জন্য নয়।”
এই জড় জগৎ দুঃখ দুর্দশার এক মহাসমুদ্র। মহাসমুদ্র মানে হলো অথৈ জলরাশি, অপরিমেয় গভীরতা ও প্রশস্ততা, এক কথায় সুবিশাল। আপনি সেই মহাসমুদ্রে পতিত হয়েছেন এবং সাঁতার কেটে বা ভাসমান অবস্থায় তা অতিক্রম করতে অসমর্থ। আপনি সেই জল রাশির সঙ্গে অবিরত সংগ্রাম করে চলেছেন। কেননা সেখানে রয়েছে প্রবল স্রোত, জীব-জন্তু ইত্যাদি নানাবিধ বিপদ । মহাসমুদ্রের সাথে তুলনা করলে এর জলরাশি হল আমাদের জীবনের দুঃখ-দুর্দশা এবং এর জলজ জীব-জন্তুসমূহ হল জন্ম-মৃত্যু-জরা ও ব্যাধি। কিন্তু ব্রহ্মা বলছেন, যারা ভগবানের শ্রীপাদপদ্ম আশ্রয় করেছেন, তাঁদের কাছে এই ভবসাগর গোস্পদের মতো ক্ষুদ্র হয়ে যায়। শ্রীগণেশ নিজের দৃষ্টান্তের মাধ্যমে শিক্ষা প্রদান করেছেন কিভাবে ভগবৎ নির্দেশ অনুসরণ করতে হয়।

ধর্মস্য তত্ত্বং নিহিতং গুহায়াং
মহাজনো যেন গতঃ স পন্থাঃ
(মহাভারত, বনপর্ব ৩১৩/১১৭)

“তাই ধর্মতত্ত্ব গূঢ়রূপে আচ্ছাদিত হয়ে আছে; অর্থাৎ শাস্ত্র আদি পাঠ করে ধর্মতত্ত্ব পাওয়া কঠিন। সুতরাং, যাঁকে মহাজন বলে সাধুরা স্থির করেছেন, তিনি যে পন্থাকে শাস্ত্রপন্থা বলেছেন, সেই পথেই সকলের অনুগমন করা উচিত।”
ধর্মতত্ত্ব অত্যন্ত গূঢ় এজন্যে আমাদের মহাজনদের পদাঙ্ক অনুসরণ করা উচিত এবং এখানে গণেশ হলো সেরকম একজন মহাজন। তিনি দৃষ্টান্তের মাধ্যমে শিক্ষা প্রদান করছেন কিভাবে সেবা করতে হয়, কিভাবে গর্বে স্ফীত না হয়ে শ্রীভগবানের কৃপার ওপর নির্ভরশীল হতে হয়। একমাত্র ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শ্রীপাদপদ্ম মস্তকে ধারণ করার মাধ্যমেই তা সম্ভব।

ব্রহ্মা কি বলেছেন?

ব্রহ্মা হলেন উপসৃষ্টিকর্তা তিনি হৃদয়াভ্যন্তরে সৃষ্টির সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেন
তেনে ব্রহ্মা হৃদা য আদি কবয়ে। সেই ব্রহ্মা ‘ব্রহ্মসংহিতায়’ পুনঃ পুনঃ বলছেন, “গোবিন্দমাদিপুরুষং তমহং ভজামি ।” এ জন্য শ্রীল প্রভুপাদ প্রতিটি ইস্কন মন্দিরে প্রত্যুষে বিগ্রহের দর্শন আরতির সময় এই শ্লোকগুলি আবৃত্তি করার নির্দেশ দিয়েছেন। অর্থাৎ, গোবিন্দ হলো আদি পুরুষ। এ জগতে অনেক পুরুষ রয়েছে কিন্তু তিনি হলেন আদি পুরুষ। তমহং ভজামি অর্থাৎ এজন্যে আমি তাঁর (শ্রীকৃষ্ণের) ভজনা করি। তিনি ব্রহ্ম সংহিতা শুরু করেছেন ঈশ্বরঃ পরমঃ কৃষ্ণঃ সচ্চিদানন্দবিগ্রহঃ শ্লোকটি দিয়ে। ‘ঈশ্বর’ মানে ‘নিয়ন্তা’। আমরা সবাই ক্ষুদ্র নিয়ন্তা, কিন্তু পরম নিয়ন্তা হলেন শ্রীকৃষ্ণ।


যমদূতদের প্রতি যমরাজের উপদেশ :

যমরাজ বললেন-হে দূতগণ, তোমরা আমাকেই সর্বশ্রেষ্ঠ বলে মনে কর, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমি তা নই। আমার ঊর্ধ্বে এবং ইন্দ্র, চন্দ্র আদি সমস্ত দেবতাদের ঊর্ধ্বে একজন পরম ঈশ্বর ও নিয়ন্তা রয়েছেন ব্রহ্মা, বিষ্ণু এবং শিব, যাঁরা এই ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি, স্থিতি এবং বিনাশের অধ্যক্ষ, তাঁরা তাঁরই অংশ। বস্ত্রে সূত্রের মতো এই বিশ্ব তাতে ওতপ্রোতভাবে অবস্থিত। বলদ যেমন নাসিকা সংলগ্ন রজ্জুর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, সমগ্র জগৎও তেমনই তাঁর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। (ভাগবত-৬/৩/১২)


সচ্চিদানন্দবিগ্রহ, তিনি নিত্য, জ্ঞানময় ও আনন্দময়। রস বৈ সঃ অর্থাৎ পরমেশ্বর ভগবানই হচ্ছেন সমস্ত দিব্য রসের উৎস। অনাদিরাদির্গোবিন্দঃ সর্বকারণকারণম্। তিনি এজগতের সবকিছুর উৎস। এই উক্তিগুলো বলেছেন একজন সৃষ্টিকর্তা।

দেবাদিদেব শিব কি বলেছেন?
আরাধনানাং সর্বেষাং বিষ্ণোরারাধনং পরম।

মহাদেব পার্বতীকে বললেন, “হে দেবী! অন্যান্য দেবতার আরাধনা অপেক্ষা বিষ্ণুর (কৃষ্ণের) আরাধনা শ্রেষ্ঠ…।” (পদ্ম পুরাণ) এখানে বিষ্ণু এবং কৃষ্ণের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।

শ্রীকৃষ্ণ ও দেবী দুর্গা

ব্রহ্মসংহিতায় আরেকজন মহান ব্যক্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি হলেন জড় জগৎ রূপ দূর্গের অধিষ্ঠাত্রী দেবী দূর্গা। দুর্গা শব্দের সংস্কৃতে ‘গ’ শব্দের অর্থ ‘গমন করা’ এবং ‘দূ’ শব্দের ‘না’। অর্থাৎ ‘দূর্গ’ শব্দের অর্থ হলো ‘গমন করা যায় না’ বা ‘কারাগার’। এটি এমন একটি স্থান যেখানে কারোরই গমন করা উচিত নয়; অথবা যদি কেউ সেই স্থানে গমন করে তবে তার জন্য সেখান থেকে বের হওয়া অত্যন্ত দূরুহ। এজন্যে এ জড় জগৎকে আখ্যায়িত করা হয়েছে ‘দূর্গ’ বা ‘কারাগার’ হিসেবে। যেখানে বন্ধনকৃত শিকলগুলো হলো মৈথুন চরিতার্থ করার বাসনা, স্থুল বা সূক্ষ্মভাবে মৈথুন বাসনা। স্থূলভাবে মৈথুন হলো শারীরিক প্রবৃত্তি এবং সূক্ষ্মভাবে মৈথুন হলো পূজা, লাভ, প্রতিষ্ঠা, মিথ্যা অহঙ্কার যেটি অত্যন্ত গভীর। বাহ্যিকভাবে আমরা সেই শিকলগুলো দেখতে পাই না। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই প্রকার বাসনাগুলো আমাদেরকে নিবিড়ভাবে আবদ্ধ করে রেখেছে। এক্ষেত্রে একটি কারাগারে একজন কারারক্ষী রয়েছে। তেমনি এই জগৎ রূপ দূর্গের রক্ষক হলেন দুর্গা। তিনি এই কারাগারটি পরিচালনা করছেন। এজন্য ব্রহ্মসংহিতায় উক্ত হয়েছে, সৃষ্টিস্থিতি প্রলয় সাধনশক্তিরেকা, তিনি হচ্ছেন ভগবানের বহিরঙ্গা শক্তি। যেরকম গণেশ প্রতিবন্ধকতা অতিক্রমের জন্য ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পাদপদ্ম ধারণ করে সেবা প্রদান করে থাকেন, তেমনি দুর্গা দেবী সেবা করেন সৃষ্টি, স্থিতি (প্রতিপালন) ও প্রলয় (বিনাশ) সাধনের মাধ্যমে। শক্তিরেকা, অর্থাৎ তিনি হলেন এই জড় জগৎ রূপ কারাগারের কারারক্ষী। তিনি জড় জগতের সবকিছু সাধিত করছেন। কিন্তু তিনি কি স্বাধীনভাবে সবকিছু করেন? ব্রহ্মসংহিতা (৫/৪৪) বলছে ‘না’। ইচ্ছানুরূপমপি যস্য চ চেষ্টতে সা তিনি যাহার ইচ্ছানুরূপ চেষ্টা করেন। কে সেই ব্যক্তি? ব্রহ্মা বলছেন, গোবিন্দম্ বা শ্ৰীকৃষ্ণ । এগুলোই হলো শাস্ত্রের অকাট্য প্রমাণ, কারো মনগড়া নয়। এই শ্লোকগুলি স্বয়ং ব্রহ্মা কীর্তন করেছেন। যার রয়েছে চারটি মস্তক। চারটি মস্তিষ্ক এবং চতুর্মুখে চতুর্বেদ কীর্তন করেন। তার শাস্ত্র সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খ জ্ঞান রয়েছে। তিনি বলছেন না যে, দুর্গা কোনো কার্য করেন না। পক্ষান্তরে তিনি বলছেন, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ইচ্ছানুসারে চেষ্টা করেন, আমি সেই আদি পুরুষ গোবিন্দকে ভজনা করি।

সূত গোস্বামী কি বলেছেন?

শ্রীমদ্ভাগবতের ১২ স্কন্ধের ১৩ অধ্যায়ের ১নং শ্লোকে সূত গোস্বামী বলেছেন-
“যাঁকে ব্রহ্মা, বরুণ, ইন্দ্র, রুদ্র ও মরুতগণ দিব্য স্তুতির মাধ্যমে এবং উপনিষদ, পদক্রম ও বেদাঙ্গসহ বেদধ্বনি উচ্চারণের মাধ্যমে স্তব নিবেদন করেন, সামবেদের কীর্তনকারীগণ যাঁর সম্বন্ধে কীর্তন করেন, সিদ্ধযোগীগণ ধ্যানাবস্থিত তদ্‌গত চিত্তে যাঁকে দর্শন করেন, দেবতা এবং অসুরগণ যাঁর অন্ত খুঁজে পান না, সেই পরমেশ্বর ভগবানকে আমি আমার বিনম্র প্রণতি নিবেদন করছি।”
তিনি বলেছেন, পাঁচ জন শক্তিশালী দেবতা ব্রহ্মা (সৃষ্টির দেবতা), বরুণ (বায়ুদেবতা), ইন্দ্ৰ (জলদেবতা), রুদ্র (ধ্বংসদেবতা) ও মরুৎসহ (পালনকর্তা) আরো অন্যান্য দেবতা ‘স্তুন্বন্তি দিব্যৈঃ স্তবৈ’ স্তব নিবেদনের মাধ্যমে ভগবানের গুণমহিমা কীর্তন করছেন। এখানে স্তব এবং স্তোত্রের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। যেমন, মুকুন্দ মালা স্তোত্র, এখানে স্তোত্র মানে কবিতা বা গুণমহিমা। কিন্তু রূপ গোস্বামীর রচনাবলীকে বলা হয় স্তবমালা। রঘুনাথ দাস গোস্বামীর রচনাবলীকে বলা হয় স্তবাবলী। এখানে স্তব এবং স্তোত্র শব্দ দুটি এসেছে ‘স্তু’ থেকে। কিন্তু এখানে স্তোত্র হলো পূর্বতন আচার্যদের বাণীসমূহ পুনঃর্ব্যক্ত করা। অপরদিকে স্তব হলো আচার্যদের হৃদয় থেকে স্বতস্ফূর্তভাবে উৎসারিত দিব্য শব্দসম্ভার । তারা পরিকল্পনা করে কোনো কিছু রচনা করেন না বরং স্বাভাবিকভাবে হৃদয় থেকে উৎসারিত হয়ে রচনা করা হয়। এখানে এ সমস্ত ব্যক্তি স্তুন্বন্তি দিব্যৈঃ স্তবৈ- হৃদয় থেকে তৎক্ষণাৎ ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অপ্রাকৃত গুণমহিমা কীর্তন করছেন। এজন্য তারা বেদের সহায়তা নিচ্ছেন র্বেদৈঃসাঙ্গপদক্রমোপনিষদৈর্গায়ন্তি, তারা উপনিষদকেও ব্যবহার করে স্বতস্ফূর্তভাবে ভগবানের অপ্রাকৃত গুণাবলী কীর্তন করছেন। যং সামগা সামবেদের প্রতিটি শব্দ ভগবান শ্রীকৃষ্ণের গুণমহিমা কীর্তন করছে এবং সামবেদ হলো অন্যান্য বেদের চেয়ে বিশেষ কিছু। কেননা শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, “বেদনাং সামবেদেষু-আমি হলাম সমগ্র বেদের মধ্যে সামবেদ।” এটি বলেই ক্ষান্ত হননি শুকদেব গোস্বামী। তিনি আরো বলেছেন,

ধ্যানাবস্থিততদ্‌গতেন মনসা পশ্যন্তি যং যোগিনো ।

সিদ্ধযোগীগণ লক্ষ লক্ষ বছর ধ্যানাবস্থিত হয়ে হৃদয়াভ্যন্তরে যাকে তাঁরা দর্শন করে তিনি হলেন এই বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের মালিক পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। এরপর সূত গোস্বামী বলছেন, যস্যান্তং ন বিদুঃ সুরাসুরগণা। দেব-দেবী, অসুর, কিন্নর, কিম্পুরুষ, যক্ষগণ, সিদ্ধগণ, চারণগণ, বিদ্যাধরগণ ইত্যাদি বিভিন্ন ব্যক্তিরা কেউই ভগবানের আদি ও অন্ত সম্পর্কে জ্ঞাত নন। এজন্য তিনি হলেন সর্বশ্রেষ্ঠ । শ্রীমদ্ভাগবতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সম্পর্কে এই পরম মহিমা সম্পর্কে উল্লেখ রয়েছে। শ্রীমদ্ভাগবতে ৩৫০টি অধ্যায় রয়েছে এবং সর্বশেষ অধ্যায়টি হলো উপসংহার। সূত গোস্বামী পদ্যের মাধ্যমে অমূল্য রত্ন প্রদান করেছেন। তিনি বলেছেন, দেবায় তস্মৈ নমঃ, আমি সেই পরমেশ্বর ভগবানকে প্রণতি নিবেদন করি। অতএব, সূত গোস্বামী বলেছেন, শ্রীকৃষ্ণই হলেন ভগবান। দুর্গা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশে তাঁর সেবা করছেন। গণেশ ভগবানের শ্রীপাদপদ্ম তাঁর মস্তকে ধারণ করে আছেন।

ইন্দ্র, সরস্বতী কি বলেছেন?

শ্রীমদ্ভাগবতের ১০/২৫/৫ নং শ্লোকে গোবর্ধন লীলায় ইন্দ্ৰ বলেছেন,

বাচালং বালিশং স্তব্ধমজ্ঞং পন্ডিমামানিনম্ ।

ইন্দ্র এই শ্লোকের মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে কৃষ্ণের সমালোচনা করছেন। তিনি বলছেন, বাচালং বালিশং, এই শিশুটি অত্যন্ত বাচাল। এই ছোট্ট শিশুটি তার পিতাকে কি কর্তব্য ও কি অকর্তব্য সম্পর্কে বলছে। এটি সংঘটিত হয়েছিল গোবর্দ্ধন লীলায়। কৃষ্ণ কর্ম মীমাংসা দর্শন সম্পর্কে নন্দ মহারাজকে বলছিলেন, ইন্দ্রকে পূজা করার দরকার নেই। তিনি এমনিতেই বৃষ্টি বর্ষণ করবেন। এর বিনিময়ে তাকে কোনোকিছু দিতে হবে না। আপনি আপনার কর্তব্য সম্পাদন করুন আর ইন্দ্র তার কর্তব্য সম্পাদন করবে। ধান ক্ষেতে, পর্বতে, সাগরে বৃষ্টি বর্ষিত হয়, তারা তো ইন্দ্রের উদ্দেশ্যে যজ্ঞ করে না। তিনি তাদেরকে যা দিচ্ছেন আপনাকেও তাই দিবেন। তার কর্তব্য হল বৃষ্টি বর্ষণ করা। এইভাবে ইন্দ্রের মিথ্যা অহঙ্কার বিচূর্ণ হয়েছিল। তাই ইন্দ্ৰ বলছেন, এই সাত বছরের এই শিশুটি অত্যন্ত বাচাল ও অপরিপক্ক। স্তদ্ধম, এই বালক কৃষ্ণ অত্যন্ত অহঙ্কারী। অজ্ঞং, সে অত্যন্ত মূৰ্খ অথচ নিজেকে জ্ঞানী মনে করছে। ইন্দ্র মিথ্যা অহঙ্কারের বশবর্তী হয়ে এইসব বলছিলেন।
কিন্তু এই বিষয়ে আচার্যরা ব্যাখ্যা করেছেন, দেবী সরস্বতী প্রকৃতপক্ষে ভগবানের গুণমহিমা সূচক এই বাক্যগুলি যথাযথভাবে বহন করার স্পর্ধা করেন নি। এইজন্যে ইন্দ্রের মাধ্যমে সেগুলো ব্যক্ত করেছেন। যেমন, একজন রাধুনী রান্না করতে গিয়ে কিছু পুড়ে ফেলেছে কিন্তু ওয়েটার বা পরিবেশককে সেই খাবার পরিবেশন করতে হচ্ছে। যিনি আহার করবেন তিনি এই পোড়া খাদ্য দেখে পরিবেশকের প্রতিই ক্রুদ্ধ হবেন, রাধুনীর প্রতি নয়। তিনি (সরস্বতী) ভগবানের মহিমা যথাযথভাবে উপস্থাপন করার স্পর্ধা করতে পারেন নি বরং উল্টোভাবে তা প্রদর্শনের মাধ্যমে ভগবানের মহিমা ব্যক্ত করেছেন । অর্থাৎ, ইন্দ্র প্রকৃতপক্ষে ভগবানের মহিমা কীর্তন করছেন। ইন্দ্ৰ যখন বলছেন-বাচালং তার মাধ্যমে তিনি প্রকৃতপক্ষে প্রকাশ করলেন যে, ‘এই বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডে আপনার মতো কেউ কথা বলতে পারে না।’ সরস্বতী ইন্দ্রের মাধ্যমে বলছেন, যে এই পাঁচ বছরের অত্যাশ্চর্য শিশুটি কত সুন্দরভাবে বার্তালাপ করে। বালিশং অর্থাৎ হে কৃষ্ণ! আপনি পরমেশ্বর ভগবান হয়েও শুধুমাত্র ভক্তদের আনন্দ বিধানের উদ্দেশ্যে আপনি একজন সাধারণ শিশুর ভূমিকায় আবির্ভূত হন। স্তব্ধং, ইন্দ্ৰ বলছিল আপনি হলেন অহঙ্কারী এই জন্যেই আপনি কারো কাছে অবনত হন না। সরস্বতী বলছেন যে, “হে কৃষ্ণ! আপনাকে এই ত্রিভুবনে কারোর নিকট অবনত হতে হয় না। কেননা আপনিই হলেন পরমেশ্বর ভগবান।” অজ্ঞং, ইন্দ্ৰ বলছিলেন, কৃষ্ণ হলেন মূর্খ। কিন্তু সরস্বতী বলছেন, ‘অ-অর্থ কোন প্রয়োজন নেই। অর্থাৎ আপনার জ্ঞান লাভের কোনো প্রয়োজন নেই কেননা সমস্ত জ্ঞানের উৎস আপনিই। তিনি আরো বলছেন, এ জগতে কোনো জ্ঞান নেই যা আপনি অবগত নন। পন্ডিমামানিনম্ কৃষ্ণ নিজেকে জ্ঞানী মনে করেন। পক্ষান্তরে এবিষয়ে দেবী সরস্বতী বলছেন, ‘বাচালং বালিশং স্তব্ধমজ্ঞং পন্ডিমামানিনম্। এই বিশেষণগুলো হলো । প্রকৃতপক্ষে একজন মহান পন্ডিতের বিভূষণ।’ কেননা, কৃষ্ণ কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে ৪৮ মিনিটে গীতার জ্ঞান প্রদান করেন। এজন্যে তার মতো এজগতে কেউ কথা বলতে পারে না।

নন্দঃ কিমকরোদ্ ব্রহ্মন্ শ্রেয় এবং মহোদয়ম্।
যশোদা চ মহাভাগা পপৌ যস্যাঃ স্তনং হরিঃ ॥

‘মা যশোদার পরম সৌভাগ্যের কথা শুনে, পরীক্ষিৎ মহারাজ শুকদেব গোস্বামীকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন-হে ব্রাহ্মণ, ভগবান যাঁর স্তন্য পান করেছিলেন, সেই যশোদা দেবী এবং নন্দ মহারাজ পূর্বে এমন কি তপস্যা করেছিলেন, যার ফলে তাঁরা এই প্রেমময়ী সিদ্ধি প্রাপ্ত হয়েছিলেন?’ (ভাগবত ১০/৮/৪৬)
তার কাছে ব্রহ্মা, ইন্দ্ৰ সবাই নত মস্তকে প্রণতি নিবেদন করেন। তিনি সবকিছুর উৎস এবং সবকিছু সম্পর্কে অবগত। এভাবে ইন্দ্ৰ অপ্রত্যক্ষভাবে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বন্দনা করছিলেন। এমনকি দেবী সরস্বতী যিনি জড় জগতের সমস্ত জ্ঞানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী তিনি উপলব্ধি করেছেন যে এই বন্দনাগুলো অপ্রত্যক্ষভাবেই উপস্থাপন করতে হবে কেননা তিনিই হলেন সমস্ত জ্ঞানের উৎস। এজন্য কৃষ্ণকে বলা হয় ‘উত্তমশ্লোক’ । কেননা তিনি উত্তমশ্লোকের মাধ্যমে বন্দিত হন।

অর্জুন, দেবর্ষি নারদ, অসিত, দেবল, ব্যাস আদি ঋষিরা কি বলছেন?

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ১০/১২ ১৩ শ্লোকে অর্জুন বলছেন-

পরং ব্রহ্ম পরং ধাম পবিত্রং পরমং ভবান্ ।
পুরুষং শাশ্বতং দিব্যমাদিদেবমজং বিভুম্ ॥

অর্জুন বলছেন, পরম ব্রহ্ম তুমিই (শ্রীকৃষ্ণ) সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি; পরং ধাম – তুমিই পরম ধাম যার কাছে যে কেউ পৌঁছতে পারে; পবিত্রং- তুমি পরম পবিত্রতার উৎস; পরমং ভবান্- তুমি সর্বশ্রেষ্ঠ; ভগবান নির্বিশেষ নন, নির্বিশেষ জ্যোতি তাঁর দেহ নিৰ্গত রশ্মিছটা। কিন্তু তিনি হলেন একজন ব্যক্তি; শাশ্বত- তিনি নিত্য, তিনি জন্ম ও মৃত্যু রহিত, তিনি সূর্যের মতো আবির্ভূত ও অপ্রকাশিত হন। সূর্যের কখনো জন্ম ও মৃত্যু হয় না; দিব্যং- তাঁর কলেবর সাধারণ মানুষের মতো রক্ত-মাংস দিয়ে গঠিত নয়। তাঁর দেহ সম্পূর্ণরূপে অপ্রাকৃত, সৎ (নিত্য) চিৎ (জ্ঞানময়) ও আনন্দময়; আদি দেবং- তিনি হলেন সমস্ত দেব দেবীর উৎস; অজং তিনি জন্মরহিত; বিভুম্ সর্বশ্রেষ্ঠ। অর্জুন একই বিশেষণগুলো প্রায় পুনঃ পুনঃ ব্যক্ত করার মাধ্যমে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ভগবত্তা সম্পর্কে জোড়ালোভাবে তুলে ধরছেন ।
কেননা তিনি শ্রীমদ্ভাগবতে (১/১/১০) ভবিষ্যৎ বাণী সম্পর্কে অবগত ছিলেন। ‘হে মহাজ্ঞানী! এই কলিযুগের মানুষেরা প্রায় সকলেই অল্পায়ু । তারা কলহপ্রিয়, অলস, মন্দ মতি, ভাগ্যহীন এবং সর্বোপরি তারা নিরন্তর রোগাদির দ্বারা উপদ্রুত।’
কলিযুগের লোকদের কাছে এটা উপলব্ধি করা দূরুহ, প্রকৃতপক্ষে কৃষ্ণই কি ভগবান? তিনি কি অপ্রাকৃত? নিত্য? এজন্যই অর্জুন এই বিশেষণগুলো আরোপ করেছেন।

আহুস্ত্বামৃষয়ঃ সর্বে দেবর্ষিনারদস্তথা।
অসিতো দেবলো ব্যাসঃ স্বয়ং চৈব ব্রবীষি মে ৷
(ভ.গীতা ১০/১৩)

তিনি বলছেন, “শুধু তাই নয়, মহান ব্যক্তিবর্গ দেবর্ষি নারদ, অসিত, দেবল, ব্যাসদেব আদি ঋষিরা তোমাকে সেভাবেই বর্ণনা করেছেন এবং তুমি নিজেও এখন আমাকে তা বলছ।” অর্জুন পরমেশ্বর ভগবানের ভগবত্তা সম্পর্কে স্বীকার করে কিছু স্বীকারোক্তি তুলে ধরেছেন।

শুকদেব গোস্বামী কি বলছেন?

তিনি নিন্মোক্ত শ্লোকের পূর্বে অনেক অবতার সম্পর্কে তুলে ধরেছেন এবং পরিশেষে বলছেন-

এতে চাংশকলাঃ পুংসঃ কৃষ্ণস্তু ভগবান্ স্বয়ম্।
ইন্দ্রারিব্যাকুলং লোকং মুড়য়ন্তি যুগে যুগে ॥
(শ্রীমদ্ভাগবতে ১/৩/২৮)

“পূর্বোল্লিখিত এই সমস্ত অবতারেরা হচ্ছেন ভগবানের অংশ অথবা কলা অবতার, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান স্বয়ং। যখন নাস্তিকদের অত্যাচার বেড়ে যায়, তখন আস্তিকদের রক্ষা করার জন্য ভগবান এই ধরাধামে অবতীর্ণ হন।” এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো – কৃষ্ণস্তু ভগবান স্বয়ং অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণই হলেন পরমেশ্বর ভগবান স্বয়ং। শুকদেব গোস্বামী হলেন সেই মহান ব্যক্তি যিনি শ্রীমদ্ভাগবতের ১৮ হাজার অপ্রাকৃত শ্লোক উক্ত করেছেন। শ্রীমদ্ভাগবতে মহামুনিকৃতে – মহান ব্যক্তি কর্তৃক এই শ্রীমদ্ভাগবত রচিত ও কীর্তিত হয়েছে এবং যারা তা শ্রবণ করেন তারাও মহান। মহামুনি বেদব্যাস (উপলব্ধির পরিপক্ক অবস্থায়) এই শ্রীমদ্ভাগবত রচনা করেছেন। কিন্তু তাঁকে উৎসাহিত করেছেন নারদ মুনি। সেই নারদ মুনি বলছেন, জড় জগতের বিভিন্ন নিয়ন্তারা ঠিক একটি বৃক্ষের কাণ্ড, শাখা-প্রশাখা, পত্র-পুষ্পের ন্যায় কিন্তু সেই বৃক্ষের শিকড় হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো বৃক্ষকে পুরিপুষ্ট করতে হলে শাখা-প্রশাখায় জল সিঞ্চন করলে হয় না বরং সেই বৃক্ষের শেখরে জল সিঞ্চন করতে হবে।
নারদ মুনির দ্বিতীয় উদাহরণটি হল, দেহের সমস্ত অঙ্গ পৃথকভাবে কাজ করে যেমন-হস্ত, পদ, মুখ ইত্যাদি। কিন্তু যখন আমরা ক্ষুধার্ত হই তখন উদর সন্তুষ্ট হলেই সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পরিপুষ্ট হয়। নারদ মুনি প্রচেতাদের উপরোক্ত দৃষ্টান্তের মাধ্যমে বলেছিলেন যে, বৃক্ষের শেখর ও উদর হলো পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এবং বৃক্ষের স্কন্ধ, শাখা ইত্যাাাদি ও দেহের ইন্দ্রিয়সমূহ হলো ভগবানের বিভিন্ন অংশ দেব-দেবীগণ। শ্রীমদ্ভাগবতের ৪/৩১/১৪নং শ্লোকে নারদ মুনি বলছেন—
“বৃক্ষের মূলদেশে জল সিঞ্চন করা হলে তার স্কন্ধ, শাখা ইত্যাদি সঞ্জীবিত হয়, এবং উদরে আহার্য দ্রব্য প্রদান করলে যেমন সমস্ত ইন্দ্রিয়ের তৃপ্তি সাধন হয়, তেমনই ভগবদ্ভক্তির মাধ্যমে ভগবানের আরাধনা করা হলে, ভগবানেরই বিভিন্ন অংশ দেবতারাও আপনা থেকেই তৃপ্ত হন।”
এর মাধ্যমে আমরা উপলব্ধি করতে পারি আপনাকে আর অন্য কারো পূজা করতে হবে না। অর্থাৎ যদি আমি কৃষ্ণের আরাধনা করি তবে কি কার্তিক, গণেশ, দুর্গা কি সন্তুষ্ট হবে, এ ধরনের সন্দেহের কোনো ভিত্তি নেই। উপরোক্ত উক্তির মাধ্যমে আমরা উপলব্ধি করতে পারি যে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আরাধনা করার মাধ্যমে সমস্ত দেব-দেবীরা সন্তুষ্ট হবেন। যেটি শ্রীমদ্ভাগবতের ১১/৫/৪১ শ্লোকেও বলা হয়েছে-
“হে রাজন, যিনি সকল প্রকার জড়জাগতিক কর্তব্যকর্ম পরিত্যাগ করেছেন এবং সকলের আশ্রয়দাতা শ্রীমুকুন্দের শ্রীচরণকমলে আশ্রয় গ্রহণ করেছেন, তিনি কোনো দেব দেবতা, মুনিঋষি, সাধারণ জীব, লোকজন, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব মানবজাতি কিংবা পরলোকগত পিতৃপুরুষদের কাছেও কোনোভাবে ঋণী হয়ে থাকেন না। যেহেতু ঐ সমস্ত শ্রেণির জীবগণই পরমেশ্বর ভগবানের অবিচ্ছেদ্য বিভিন্নাংশমাত্র, তাই শ্রীভগবানের সেবায় আত্মনিবেদিত মানুষকে আর ঐ সমস্ত মানুষদের পৃথকভাবে সেবা করার প্রয়োজন থাকে না।”
এখানে বিশেষভাবে উল্লেখিত যদি কেউ ভগবান মুকুন্দের (শ্রীকৃষ্ণের) সেবা করে তবে তাকে আর কাউকে (কোন দেব-দেবীকেও) পৃথকভাবে কারো সেবা করতে হয় না। অপরদিকে উপরোক্ত শ্লোকে এটিও উল্লেখ করা হয়েছে যে, আমরা অনেকের কাছে ঋণী যেমন আমরা সূর্যদেব থেকে আলো, ইন্দ্রদেব থেকে বৃষ্টি, অগ্নিদেব থেকে অগ্নি, বরুণদেব থেকে জল, সরস্বতী দেবী থেকে বিদ্যা, কুবের থেকে সম্পদ গ্রহণ করি। এভাবে আমরা অনেকের কাছেই ঋণী। তাদের থেকে এ সমস্ত কিছু গ্রহণ করে আমরা নিজেদের ইন্দ্রিয়তৃপ্তি করি। এর বিনিময়ে আমাদের কিছু পরিশোধ করা উচিত। কোনো সুপার মার্কেট থেকে বিভিন্ন জিনিস ক্রয়ের পর মূল্য পরিশোধ করা না হয় তবে কি শোভনীয় হয়? বিভিন্ন জিনিস ক্রয়ের পর কোনো একজন নির্দিষ্ট একজন ক্যাশিয়ারকে মূল্য পরিশোধ করতে হবে। তেমনি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আরাধনা করার মাধ্যমে আমরা সবাইকে সন্তুষ্ট করতে পারি। যদি কোনো কোম্পানির মালিক থেকে সুপারিশ পত্র পাওয়া যায় তবে সে কোম্পানির অন্য কেউ থেকে আর সুপারিশ নেওয়ার প্রয়োজন হয় না। যদি কোনো কর্তৃপক্ষের অনুসন্ধান করা হয় তখন ব্যাপারটা অনেক কঠিন হয়ে যায়। প্রকৃত অহঙ্কার হলো, আমি এমন একজন ব্যক্তির সেবক যিনি হলেন সর্বশ্রেষ্ঠ, পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। ভক্তিবিনোদ ঠাকুর বলেছেন-

(জীব) কৃষ্ণদাস, এ বিশ্বাস,
করলে ত’ আর দুঃখ নাই ।

‘যদি শ্রীকৃষ্ণকে শুধু অবলম্বন কর এবং তাঁর চরণ কমলকে আশ্রয় কর, তা হলে পুনরায় তুমি দুঃখময় জড় বন্ধন থেকে মুক্ত হবে। কিন্তু আমাদের মিথ্যা অহঙ্কার এমনই যে, পরমেশ্বর ভগবানের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে এই অস্থায়ী ও ক্ষণভঙ্গুর দেহটির ওপর আমরা নির্ভরশীল হয়ে পড়ি যেটি ৬০-৮০ বছর স্থায়ী হবে। তাই যদি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সাথে সম্বন্ধ স্থাপিত হয় আমাদের আর দুঃখ থাকবে না। ভগবানকে বিস্মৃত হওয়াই যত দুঃখের কারণ।

কৃষ্ণ ভুলি’ সেই জীব অনাদি-বহির্মুখ ।
অতএব মায়া তারে দেয় সংসার -দুঃখ ॥
(চৈঃ চঃ মধ্য ২০/১১৭)
উদ্ধব ও রূপ গোস্বামী কি বলেছেন?

শ্রীমদ্ভাগবত ৩/২/২১ উদ্ধব বলছেন,

স্বয়ং ত্বসাম্যাতিশয়ন্ত্র্যধীশঃ স্বারাজ্যলক্ষ্যাপ্তসমস্তকামঃ।
বলিং হরদ্ভিশ্চিরলোকপালৈঃ কিরীটকোট্যেড়িতপাদপীঠঃ ॥

“অসংখ্য লোকপালেরা (দেব-দেবীরা) তাঁদের মুকুট তাঁর শ্রীপাদপদ্মে স্পর্শ করে বিধি সামগ্রীর দ্বারা তাঁর পূজা করেন।” অর্থাৎ কোটি কোটি দেব দেবী সারিবদ্ধভাবে একত্রে তাঁদের মুকুট তাঁর শ্রীপাদপদ্মে স্পর্শ করেন। উদ্ধব আরো বলছেন স্বয়ং তু অসাম্য, কে সেই শ্ৰীকৃষ্ণ? এই সেই শ্ৰীকৃষ্ণ যার সমপর্যায় কেউ নেই, অতিশয় – অর্থাৎ, তাঁর চেয়ে কেউ মহান নেই। তিনি তিনের অধীশ্বর।
অর্থাৎ তিনি ত্রিগুণের (সত্ত্ব, রজ, তম) অধীশ্বর, ত্রিকালের (অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ) অধীশ্বর। ব্রহ্মা-(উপ সৃষ্টিকর্তা), বিষ্ণু-(পালনকর্তা ও শিব (ধ্বংসকর্তা) এই তিন ব্যক্তির অধীশ্বর,
তিন বিষ্ণুর (ক্ষীরোদকশায়ী, কারণোদকশায়ী, গর্ভোদকশায়ী) অধীশ্বর, ত্রিভুবনের (দেবীধাম, মহেশধাম, গোলকধাম) অধীশ্বর।
ভক্তিরসামৃতসিন্ধুর ২২ অধ্যায়ে শ্রীল রূপ গোস্বামী ব্যাখ্যা করেছেন “সবচেয়ে বিখ্যাত ও প্রভাবশালী দেবগণও শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য প্রতীক্ষা করতে থাকেন। দ্বারকায় ভগবৎ-দর্শনে প্রতীক্ষারত দেবগণের ব্যবস্থাপনাকারী একজন দ্বারপাল কোন এক ব্যস্ত দিনে বলেন, “হে ব্রহ্মা, হে শিব! কিছুক্ষণের জন্য আপনারা এই আসনে উপবেশন করে প্রতীক্ষা করুন। হে ইন্দ্র! আপনার স্তবপাঠ এখন কিছুক্ষণের জন্য বন্ধ করুন। হে বরুণ! আপনি এখন এখান থেকে চলে যান। হে দেববৃন্দ! আপনারা অনর্থক কালক্ষেপন করবেন না; শ্রীকৃষ্ণ এখন অত্যন্ত ব্যস্ত তিনি এখন আপনাদের সঙ্গে দেখা করতে পারবেন না।”

অন্যান্য আচার্যগণ কি বলছেন?

রামানুজ আচার্য, মধ্বাচার্য, বিষ্ণুস্বামী, নিম্বাকাচার্য এমনকি আদি শঙ্করাচার্য স্বীকার করেছেন যে, পরমেশ্বর ভগবান হলেন একমাত্র শ্রীকৃষ্ণ। এ বিষয়ে আদি শঙ্করাচার্যের রচনায় একটি শ্লোক বেশ উল্লেখযোগ্য। তিনি তাঁর অন্তিম রচনায় লিখেছেন—

ভজ গোবিন্দং ভজ গোবিন্দং ভজ গোবিন্দং মূঢ়মতে।
সম্প্রাপ্তে সন্নিহিতে কালে ন হি ন হি রক্ষতি ডুকৃঞ্করণে ॥

“হে মূর্খের দল, তোমরা গোবিন্দের ভজনা কর, গোবিন্দের ভজনা কর, গোবিন্দের ভজনা কর। তোমাদের ব্যাকরণ-জ্ঞান আর বাক্যবিন্যাস মৃত্যুর সময়ে তোমাদের রক্ষা করতে পারবে না।”
অতএব, সমস্ত বৈদিক শাস্ত্র যেমন গীতা, সমস্ত পুরাণ, উপনিষদ, শ্রীমদ্ভাগবত, চৈতন্য চরিতামৃত, ভক্তিরসামৃতসিন্ধু, ইতিহাস, অরণ্যক, সংহিতা শুধুমাত্র একজন ভগবানকেই নির্দেশ করছেন এবং তিনি হলেন পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। এসমস্ত বৈদিক শাস্ত্রে কৃষ্ণ সম্পর্কে প্রকৃত সত্য অবগত হওয়া উচিত এবং যারা কৃষ্ণ সম্পর্কে অবগত তাদের উদ্দেশ্যে ভগবদ্‌গীতার (৪/৯) বলা হয়েছে-

জন্ম কর্ম চ মে দিব্যমেবং যো বেত্তি তত্ত্বতঃ ।
ত্যক্ত্বা দেহং পুনর্জন্ম নৈতি মামেতি সোহর্জুন ॥

“হে অর্জুন! যিনি আমার এই প্রকার দিব্য জন্ম ও কর্ম যথাযথভাবে জানেন, তাঁকে আর দেহত্যাগ করার পর পুনরায় জন্মগ্রহণ করতে হয় না, তিনি আমার নিত্য ধাম লাভ করেন।” আমরা শ্রীল প্রভুপাদের গ্রন্থ সম্ভার থেকে আরো বিস্তৃতভাবে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সম্পর্কে জানতে পারি। (সংকলিত)

লেখক পরিচিতি : শ্রীমান অমরনাথ দাস শ্রীল প্রভুপাদের শিষ্য শ্রীমৎ রাধাগোবিন্দ দাস গোস্বামী মহারাজের একজন শিষ্য। তিনি সারা বিশ্বের বিভিন্ন শহর, বিশ্ববিদ্যালয়, মন্দির, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ইউটিউব, হোয়াটস অ্যাপস ও ফেইসবুকে কৃষ্ণভাবনামৃত নিরলসভাবে প্রচার করে চলেছেন। বিশেষত বিজ্ঞান ও পারমার্থিকতার সম্মিলনে তার প্রবচনগুলো ছাত্র সমাজের জন্য বেশ বিখ্যাত। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তিনি ম্যাসাচুসেটস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর ওপর মাষ্টার্স ডিগ্রি এবং মায়াপুরে ভক্তিশাস্ত্রী ডিগ্রি লাভ করেন। তার জীবনের আমুল পরিবর্তনের জন্য বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ শ্রীল প্রভুপাদের শিষ্য শ্রীমৎ ভক্তিস্বরূপ দামোদর গেস্বামীর কাছে। তিনি তাঁকে এবং তার পরিবারকে কৃষ্ণভাবনা পালনের জন্য উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন। বর্তমানে তিনি আমেরিকার ইস্‌কন বোস্টনে নিয়মিত কৃষ্ণভাবনামৃতের ওপর প্রবচন প্রদান করেন।


 

জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০১৭ ব্যাক টু গডহেড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here