কমেডিয়ান

0
36
একজন টেলিমার্কেটার (যারা ফোনে  বেচাকেনা করেন) একটি মন্দিরে ফোন করে, এবং তাদের ফোনালাপ শেষ হয় একটি ভগবদগীতা কেনার চুক্তির মাধ্যমে ভক্তটি বলল “দয়া করে আপনার ঠিকানাটা দিন এবং আমি এটা ঠিক সময় মত পাঠিয়ে দেব।” এরপর ঐ ভক্ত তার টেবিলে। সাজানো জিনিসপত্র সব এক ঝলকে পরিবর্তন করে ঐ টেলিমার্কেটারের ভূমিকায় অভিনয় করে | পারমার্থিক শিক্ষা নিচ্ছে। আর এ দৃশ্যটি দেখেই উপস্থিত দর্শকরা হাসিতে ফেটে পড়েছে। যধুনাথ নিজেও বুঝতে পারেনি যে এটা এতটা হাসির খোরাক যোগাবে।  প্রকৃতপক্ষে দর্শকদের হাসির কারণ একটাই ছিল, তা হল যদুনাথ তার একক এ অভিনয়টিতে কিভাবে একজন
ভগবদগীতা গ্রহন করার মাধ্যমে ভক্ততে পরিণত হল এবং কিভাবে তিনি তৎক্ষণাৎ তার টেবিল পরিবর্তন করে একজন টেলিমার্কেটার ভূমিকায় রূপ নিল। ২০০৯ সালে একটি ফেস্টিভ্যালে যদুনাথ এইরকম আরো হরেক রকমের পারমার্থিক কৌতুক উপস্থাপনের মাধ্যমে উপস্থিত দর্শক শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছিল। ঐ উসব তার The horse Race নামক একটি কৌতুক অভিনয়ও খুব জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। এ অভিনয়টিতে তিনি একজন ভক্ত এবং  তার অহংকারের মধ্যকার এবং | প্রতিযোগীতামূলক একটি শিক্ষণীয় বিষয়বস্তু তুলে ধরে। পুরো বিষয়বস্তুই সমস্ত দর্শকদের জন্য একটি শিক্ষণীয় ও হাসির উৎস হিসেবেও স্থান পায়। এভাবেই যদুনাথ (দীক্ষিত নাম) যার আগের নাম ছিল ‘জো, তার অভিনয় কলাকৌশলের মাধ্যমে দর্শক শ্রোতার মন জয় করে চলেছেন।
যদিও তার শুরুর দিকের জীবনটা মোটেও সুখকর ছিল না। বরঞ্চ অবহেলায় তার শুধুমাত্র প্রাপ্য ছিল। নিউ জার্সির একটি ছোট পরিবারে জন্ম নেয়ার পর তার দাদাদাদীর অনুপ্রেরণায় নিকটস্থ একটি স্কুলে ভর্তি হয়েছিল অভিনয় শেখার জন্য। তখন তিনি, বন্ধুদের নিয়ে দলগতভাবে অভিনয় করতেন। ১৯৮০ সাল পর্যন্ত টানা ৫টি বছর তার এভাবেই দলগত পারফর্মেন্সের মাধ্যমে খুব সফলভাবে কেটেছিল। পরবর্তীতে জো একটি চাকুরীতে ঢুকে পড়ে। মূলত জাহাজের ঐ চাকুরীতে তার ভালই কাটছিল। পরবর্তীতে অনেক বছর এ চাকুরী করার পর তার মনে হল “আমি এখানে কি করছি?” কেননা তার লক্ষ্য ছিল যে, তিনি ভবিষ্যতে একজন অভিনেতা হবে। ফলশ্রুতিতে চাকুরীটি ছেড়ে দিয়ে ১৯৯৩ সালে তিনি Chicago city limits নামে নিউইয়র্কের সবচেয়ে বড় কমেডিমূলক প্রতিষ্ঠানে যোগ দেয়। ওখানে তিনি পূর্ণরূপে অভিনয় শেখতে মনোনিবেশ করে। কিন্তু অর্থের অভাবে তার সেই অভিনয় শেখা আর হয়ে উঠেনি। দু’বছর যেতে না যেতেই তাকে ঐ প্রতিষ্ঠান ছাড়তে হয়। তার মানসিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন সাধিত হয়। তিনি ধার্মিকতায় মনোনিবেশ করেন। যথারীতি মাঝেমধ্যেই কাথলিক প্রার্থনাসমূহ জপ করতেন এবং তার ব্রান্ড বিটলসের প্রখ্যাত অ্যালবাম থেকে জর্জ হ্যারিসনের গাওয়া হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র শুনতেন। তার মধ্যে তখন ধীরে ধীরে পারমার্থিক চেতনা বিকশিত হতে শুরু করে। সে সবসময়ই ভাবত যে, “কিভাবে আমি ভগবানের নিকটস্থ হতে পারি”? সেসময় অনেকটা আশ্চর্যভাবেই তার একজন বন্ধুর কাছ থেকে ইস্কনের কয়েকটি গ্রন্থসমূহ অধ্যয়নের সুযোগ পান। ‘জপ করুন এবং সুখী হউন, এবং মুক্তির অনুসন্ধান করুন’ এসব বাক্যসমূহ তার হৃদয়কে নাড়া দেয়। তিনি পরবর্তীতে ইস্কন ভক্তদের সাথে দেখা করার জন্য খুবই আগ্রহী হয়ে উঠেন। ১৯৯৬ সালের মে মাসে  অত্যন্ত সৌভাগ্যবশতই নিউজার্সির একটি ইস্কন মন্দির খুঁজে পান। যদুনাথ তার মন্তব্যে বলেন, “যখন আমি সেখানে যাই, তখন মন্দিরের বাইরেই দু’জন ভক্ত একটি টেবিল নিয়ে বসে ছিল । তারা কিছু গ্রন্থ বিক্রি করছিল । আমি তাদের সন্নিকটে গেলে প্রথমেই তারা আমাকে বলে ‘হরে কৃষ্ণ’ এবং আমি তাদেরকে বলি যে, আমি এখানে এমন কাউকে খুঁজছি যিনি আমার কিছু প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেন। তখন তারা আমাকে একজন ভক্ত দেখিয়ে দিল। ভক্তটির নাম ছিল মহামুনি। মহামুনি আমাকে সাপ্তাহিক  Sunday feast উপলক্ষে কিছু সুস্বাধু প্রসাদ দেন, আর আমার সমস্ত প্রশ্ন অত্যন্ত সাবলীলভাবে গ্রহনযোগ্য উত্তর দেন। আমি তাদের অমায়িক ব্যবহার ও এত উচ্চতর দর্শনে মুগ্ধ হয়েছিলাম। এভাবে পরম সত্যকে উপলব্ধি করতে পেরে আমি ইসকনের একজন ভক্ত হিসেবে যোগ দিই। ভক্তি জীবন পালনের সময় আমি অনেক বছর আমার অভিনয় জীবন থেকে দূরে সরে ছিলাম। কেননা আমি শিখেছিলাম যে, পারমার্থিক জীবনই হল গুরুত্বপূর্ণ, পক্ষান্তরে কমেডি এর কোন মূল্য নেই। কিন্তু পরবর্তীতে সে ধারণা পাল্টে গেল যখন আমি ধনুর্ধন মহারাজের সঙ্গে ভারত পরিভ্রমনে গেলাম। যখন আমরা মুম্বাইতে অবস্থান করছিলাম তখন তিনি আমাকে সবার সাথে পরিচয় করে দেন নিউইয়র্কের একজন বিখ্যাত কৌতুক অভিনেতা হিসেবে। আর তাই সবার ‘অনুরোধে আমাকে কৌতুক অভিনয় উপস্থাপন করতে হয়েছিল। আমি ঐ ভ্রমনে প্রায় অনেকবার অভিনয় করেছিলাম। পরবর্তীতে ভক্তি চারু স্বামী মহারাজের সাথে আমার পরিচয় হয়। আমি উনার নিকট থেকে দীক্ষা গ্রহন করলাম এবং আমার নাম জো থেকে যদুনাথ হল। তিনি আমার অভিনয় দক্ষতা দেখে তার পরিচালিত অভয়চরণ সিরিয়ালে আমাকে অভিনয় করান। মূলত তারই অনুপ্রেরণায় ও ভক্তদের আমার প্রতি উৎসাহ ও উদ্দীপনার মাধ্যমেই আমি আবার কৌতুক অভিনয় শুরু করলাম। তবে তা পারমার্থিক শিক্ষামূলক কৌতুক হিসেবেই। এরপর বিভিন্ন বড় বড় ইসকনের ফেস্টিভ্যাল গুলোতে আমার অভিনয়শৈলী পরিদর্শন করে খুবই জনপ্রিয়তা পেয়েছিলাম। আর এখন আমি ইস্‌কনের একজন পরিচিত ‘কমেডিয়ান’ হিসেবেই পরিচিত। মুখ কমেডিয়ান যদুনাথ এভাবেই তার জীবনের একটি বিরাট পরির্তনের কাহিনী তুলে ধরেছিল। তিনি এখন খুবই খুশি কেননা তিনি ইস্কন ভক্তদের তথা সমগ্র দর্শক শ্রোতাদেরকে আনন্দ দান করতে পারছেন। ভগবনের জন্য ব্যতিক্রমধর্মী এ সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করতে পেরে তিনি নিজেকে একজন সফল কমেডিয়ান বলে মনে করেন। হরে কৃষ্ণ ॥

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here