এক মহান কৃষ্ণভক্তের অমিয় জীবন গাথা

0
90

এক দূরচেতনা, আধ্যাত্মিক শক্তিসম্পন্ন নেতার জীবন কথা। যিনি সমগ্র জীবন গুরুদেবের মিশনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে উৎসর্গ করে গেছেন, যা সকলের অনুপ্রেরণার উৎস।

সত্যরাজ দাস

শ্রীমৎ ভক্তিতীর্থ স্বামী মহারাজ (১৯৫০-২০০৫) যিনি ছিলেন একাধারে আমার পরম বন্ধু ও পথ প্রদর্শক। তিনি ছিলেন লক্ষ্যে অটল এবং কৃষ্ণভাবনামৃতের একজন সাহসী ও বিদগ্ধ প্রচারক। তিনি গুরুদেবের মিশনকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য অপ্রকটের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত সংগ্রাম করে গেছেন। তবে তিনি বেশী প্রচার কার্য চালিয়েছেন পূর্ব ইউরোপে। বিশেষত শ্রীল প্রভুপাদের গ্রন্থ প্রচারের জন্য তিনি সারাবিশ্বে সুপরিচিত। গ্রন্থ প্রচারের জন্য তিনি অনেকবার জীবনের ঝুঁকি নিয়েছেন।
আফ্রিকার রাজা ও রাণী তাঁকে সর্বোচ্চ পর্যায়ের একজন আত্মাধিক নেতা হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছিলেন। তিনি শ্রীল প্রভুপাদ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ইস্কনের একজন সন্ন্যাসী এবং তাঁর শতশত শিষ্যদের কাছে তিনি একজন আদর্শ গুরু। তিনি ছিলেন আফ্রো-আমেরিকার প্রথম আধ্যাত্মিক বৈষ্ণব গুরু। তিনি অনেকগুলো গ্রন্থ রচনা করেছেন। যার বিষয়বস্তু হলো আধুনিক বিশ্বে কিভাবে কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচার করা যায়। তাঁর বইগুলোর ভাষাশৈলী ও দার্শনিকতত্ত্ব বর্তমান সমাজের প্রতিটি মানুষের হৃদয়কে আকর্ষণ করতে সক্ষম। তাঁর আরেকটি বিশেষ গুণ ছিল তিনি প্রতিটি মানুষের হৃদয়ের গভীরে প্রবেশ করতে পারতেন। মানুষের ভিতরের কি দুঃখ তা তিনি, কেউ স্বীকার না করলেও বলে দিয়ে তাদের জীবনের পরিবর্তন করতে পারতেন, যা তাঁর অগণিত গুরুভ্রাতা, বন্ধু, শিষ্য কর্তৃক স্বীকৃত। ইস্কনে শ্রীমৎ ভক্তিতীর্থ স্বামী মহারাজ বিভিন্ন নামে পরিচিত ছিলেন। যখন তিনি প্রকট ছিলেন তখন আমি অনেকের মুখে তাঁর বিভিন্ন নাম শুনেছি।
শ্রীল প্রভুপাদ তাঁর নাম দিয়েছিলেন ঘনশ্যাম দাস, যার অর্থ ঘন নিকষ কালো মেঘের ভৃত্য। ঘনশ্যাম হলো ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আরেক নাম। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিকষ কালো মেঘের মতো সুন্দর অথবা তার চেয়েও বেশী সুন্দর। শ্রীল প্রভুপাদ এই আফ্রো আমেরিকান ব্যক্তিটির মাঝে খুঁজে পেয়েছিলেন জাগতিক ও আধ্যাত্মিক উৎকর্ষতার এক মূর্তিমানকে। তাই তিনি এই কৃষ্ণবর্ণের ব্যক্তিটির নাম দিয়েছিলেন ভগবানের কালো বর্ণকে প্রকাশ করে এরূপ একটি নাম। তাঁর সন্ন্যাসকালীন সময়ে নাম দেওয়া হয়েছিল ভক্তিতীর্থ। আসলেই তিনি সত্যিকার অর্থে ভক্তিতীর্থ ছিলেন। যার অর্থ পবিত্র মহিমান্বিত স্থান। এরূপ স্থানগুলোকে আধ্যাত্মিক জগতের সেতুর সাথে তুলনা করা যায়। এই তীর্থ শব্দটির সাথে আরেকটি শব্দের ঘনিষ্ট সম্পর্ক আছে, যা হলো তীর্থংকর। শব্দটির অর্থ হলো সেতু নির্মাণকারী। তীর্থ হলো এমন একটি স্থান যা আধ্যাত্মিক জগতের
সাথে সেতুবন্ধন রচনা করে। আর যে ব্যক্তি তথা গুরু যিনি তাঁর শিষ্যদের মধ্যে তাদের যোগ্যতা অনুসারে সেই আধ্যাত্মিক জগতের সাথে সেতুবন্ধন করে দেয়। তিনি হলেন তীর্থংকর। অর্থাৎ যার মাধ্যমে মানুষ কৃষ্ণভক্তি লাভ করে তিনিই তো ভক্তিতীর্থ। তিনি সারা বিশ্বের মানুষের মধ্যে কৃষ্ণভাবনামৃত পৌঁছে দিতে এবার তাদের সাথে চিন্ময় গোলকধামের সেতুবন্ধন রচনার জন্য সারা জীবন সংগ্রাম করে গেছেন। তার সংস্পর্শে এসে অনেক মানুষ কৃষ্ণভাবনামৃত গ্রহণ করে ধন্য হয়েছে। ইস্কনের এই সুদীর্ঘ ইতিহাসে তিনি আরেকটি নামে পরিচিত ছিলেন, তা হলো শ্রীল কৃষ্ণপদ। যা নির্দেশ করে শ্রীকৃষ্ণের পাদপদ্মে তাঁর অচলা ভক্তির কথা এবং অন্যকে সেই অভয় পদে স্থান করে দেওয়ার অত্যাশ্চর্য ক্ষমতার কথা। তিনি শুধুমাত্র এই অভয় পদে স্থান পেয়ে ক্ষান্ত হননি, সেই অভয় পদে স্থান প্রদান করেছেন অনেক দীন-দুঃখী পতিত জনকে। তিনি বাস্তবেই একজন স্বামী ছিলেন, যিনি তাঁর সমস্ত চেতনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। আমরা তাঁর জীবনীতে দেখতে পাবো এমন সব গুণাবলীর অপূর্ব সমাবেশ, যা কৃষ্ণকে পর্যন্ত আকর্ষণ করতে সক্ষম।

জন ভগবানকে এবং ভগবান জনকে ভালবাসে

ভক্তিতীর্থ স্বামী মহারাজ ক্লেবল্যান্ড গ্যাথোর এক দরিদ্র পরিবারে ১৯৫০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। চার বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। তাঁর পূর্বাশ্রমের নাম ছিল জন এডওয়িন ফেবোর। জন্মগতভাবে তাঁর একটি ত্রুটি ছিল তোতলামী। তিনি ভাবতেই পারতেন না যে, কখনো তিনি এই সমস্যা থেকে রক্ষা পাবেন। একদিকে তাঁর এই তোতলামী অন্যদিকে দরিদ্র পরিবার তাই তাকে ছোট বেলায় অনেক প্রতিকূলতাকে সহ্য করতে হয়েছিল। যদিও তাঁর পরিবার দরিদ্র ছিল, কিন্তু যথোপযুক্ত শিক্ষার ব্যবস্থা করার ব্যাপারে পিতা-মাতা কোনো কার্পণ্য করেনি। পিতা-মাতা আত্মবিশ্বাস যুগিয়েছেন, আধ্যাত্মিকতা ও দানশীলতার শিক্ষা দিয়েছেন। যেমন, যদিও তাঁর স্বল্প সংখ্যক পোশাক ছিল, তবুও তাঁর মা সেই সামান্য পোশাক থেকে কিছু তার প্রতিবেশী দরিদ্রদের দান করতেন। শুধুমাত্র তার সন্তানদের সেবার মানসিকতা শিক্ষা দেওয়ার জন্য তিনি নিকটস্থ গীর্জাতে দিনের একটি বিশাল অংশ সেবা করে কাটাতেন, সন্তানদের জীবন উৎসর্গের মানসিকতা তৈরী করার জন্য।
জন শৈশব থেকেই যীশুখ্রিষ্টের মহিমা কথা প্রচার করতেন এবং তাঁর প্রচার করতে খুব ভাল লাগতো। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, তিনি যখন কোনো আধ্যাত্মিক বিষয় নিয়ে কথা বলতেন অথবা প্রচার করতেন তখন তার তোতলামী কর্পূরের মতো উবে যেত। আবার জাগতিক কথা বললে তোতলামী চলে আসতো। সেই থেকে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, আধ্যাত্মিক কথা ছাড়া আর কিছু বলবোই না। যুবক বয়সে তিনি স্থানীয় টেলিভিশনে প্রতিদিন খ্রিষ্ট ধর্ম নিয়ে প্রবচন দিতেন। তাঁর ভাষ্যমতে, “আমি দরিদ্রতার নির্মমতাকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। তাই আমি চেষ্টা করছিলাম এমন কিছু করতে, যা সমাজের জন্য চিরকল্যাণকর”।
তিনি যখন ক্লেবল্যান্ড কারিগরি উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন, তখন তিনি অবসর সময়ের একটি বিরাট অংশ জনহিতকর কাজে অতিবাহিত করতেন। তিনি বৃত্তি নিয়ে হাওকেন একাডেমিতে ভর্তি হলেন। সেখানেই অধ্যয়ন করার সময় তিনি জড়িয়ে পরলেন ড. মার্টিন লুথার কিংয়ের নাগরিক অধিকার আন্দোলনের সাথে এবং একসময় তিনি এই আন্দোলনের স্থানীয় নেতা রূপে অধিষ্ঠিত হন। যদিও তিনি রাজনৈতিক আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন, তবুও ছাত্র হিসেবে ছিলেন মেধাবী। কোর্স সমাপনী পরীক্ষায় তিনি রেকর্ড সংখ্যক নাম্বার পেয়ে উত্তীর্ণ হলেন। তারপর আবার বৃত্তি নিয়ে ভর্তি হলেন প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে মনোবিজ্ঞান ও আফ্রো আমেরিকান তত্ত্ব নিয়ে পড়াশুনা শুরু করলেন। প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে তার রাজনৈতিক আগ্রহ যেন আরেক ধাপ এগিয়ে গেল। তিনি যুক্ত হলেন অহিংস সহযোগ সমিতি ব্ল্যাক পেনথার পার্টির সাথে। তিনি ছাত্রনেতা হিসেবে ১৯৭১
এবং চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্ত হন ১৯৭২ সালে।
ম্যালডিন আর ম্যাকরেই ছিলেন তার প্রিন্সটনের সহকর্মী। তার ভাষ্য মতে তিনি ছিলেন একজন অসাধারণ মেধা সম্পন্ন ছাত্রনেতা। তিনি তার অসাধারণ গুণাবলীর কথা লিপিবদ্ধ করেছেন পিন্সটন এ্যালুমনি নামক এক সাপ্তাহিক পত্রিকায় ৷
“আমার সাথে জনের প্রথম দেখা হয় অ্যাসোসিয়েশান অব ব্যাল্ক কলিগেনস্ এর এক সভায়। তিনি সমিতির সভাপতি হিসেবে এক জ্বালাময়ী বক্তব্য দিলেন। তাঁর সমিতির বিভিন্ন অর্জন ও কার্যকারিতার কথা বললেন, তাঁর উচ্চতা ছিল ৫ ফুট ৯ ইঞ্চির মতো। তিনি যখন হাঁটতেন তখন মনে হতো কোনো রাজা বীরদর্পে রাজ্য জয় করে তার রাজ্যে ফিরে আসছে। তাঁর মুখমণ্ডলে এক ধরনের জ্যোতিপ্রভা ছিল, যা সকলকেই আকর্ষণ করতো।
প্রিন্সটনের পাঠ চুকিয়ে তিনি যোগদান করলেন সহকারি পরিচালক হিসেবে, নিউজার্সি প্রদেশের জনপ্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে। তিনি পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন বিভিন্ন মাদক নিরাময় ক্লিনিকগুলোতে এবং তিনি আমেরিকার শিক্ষা বিষয়ক পরীক্ষামূলক পরিসেবার বিশেষ নির্দেশক ছিলেন। এই সময়গুলোতে তিনি নিজেকে একজন কট্টরপন্থী খ্রিষ্টান বলে পরিচয় দিতে পছন্দ করতেন। তবুও তার মধ্যে যেন এক শূন্যতা কাজ করতো। তিনি ভাবতে লাগলেন তাঁর ফেলে আসা কলেজের দিনগুলোর কথা। তিনি বলতেন, “কলেজের দিনগুলোতে আমি ভগবানকে ভুলে যেসব কর্মকাণ্ডের পিছনে লাগামহীন ঘোড়ার মত ছুটেছি, সেই কাজগুলোর নেপথ্যে কি ছিল, আধ্যাত্মিক প্রগতি সাধিত হয় এমন কোনো কর্মকাণ্ড ছিল কি? ছিল না, ছিল শুধুমাত্র যৌনতা ও মাদক। আমি সর্বশক্তি দিয়ে ঈশ্বরকে ভুলে থাকার চেষ্টা করেছি। কিন্তু কি পেয়েছি আমি? আমি কি আসলেই কোনো জনহিতকর কাজ করতে পেরেছি?” যখন তিনি এরূপ মানসিক দোটানায় দিন কাটাচ্ছিল ঠিক সেই সময় পরিচয় হয় আধ্যাত্মিক গুরুদেব তথা তাঁর চিন্ময় জগতের পথ প্রদর্শক, যাকে তিনি সবসময় চিন্ময় সচ্চিদানন্দ স্বামী বলতে পছন্দ করতেন। প্রথম দিকে তিনি শ্রীল প্রভুপাদ ও তাঁর শিক্ষার প্রতি খুব বেশী আগ্রহী ছিলেন না। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমার সাথে হরে কৃষ্ণ ভক্তদের প্রথম সাক্ষাৎ হয় হাভার্ড স্কয়ারে। সেদিন ছিল প্রচণ্ড ঠাণ্ডা, দেখলাম তাদের একটি দল রাস্তার এক কোণায় দাড়িয়ে জপ করছে। তাদেরকে এই অবস্থায় দেখে মনে হলো পাগলের একটি দল। তখন আমেরিকাতে কিছু ধনাঢ্য সন্তানদের মাথা বিগড়ে যেত। তারা নেশাগ্রস্থ হয়ে এমন কিছু করার চেষ্টা করতো যা তাদের অন্য সবার থেকে স্বতন্ত্র বলে মনে হয়। আমি ভাবলাম এরকম কিছু উন্মাদ বালকের কার্যকলাপ। আমি বিশেষ একটি কাজে সেখানে গিয়েছিলাম, কাজটি শেষ করতে আমার প্রায় দু’ঘন্টার মত লেগেছিল, কাজ শেষ করে যাওয়ার সময় দেখলাম সেই পাগলের দল এখনো দাড়িয়ে আছে এবং জপ করছে। তখন আমার মনে হলো, এরা তো দেখি বড্ড পাগল। আরেকটি বিষয় আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করলো তা হলো, এমন ঠাণ্ডার মধ্যে আমি ৭টি মোটা পোশাক পরেও শীতে কাঁপছি। সেখানে এরা সামান্য তিনটি অদ্ভুদ পোশাক পড়ে আছে, যা আমি ইতোপূর্বে কখনোই দেখিনি। তখন আমার মনে হলো, না! এদের মধ্যে বিশেষ কিছু আছে। সেদিন আর বেশী কিছু চিন্তা না করে এই পাগলগুলোর কাছ থেকে পালালাম। কিছু দিন পর, এক বান্ধবী আমাকে শ্রীল প্রভুপাদের গাওয়া ‘কৃষ্ণ মেডিটেশন’ নামে একটি অ্যালবাম দিল। সেই অ্যালবামের মাধ্যমেই আমি পরিচিত হলাম আমার নিত্যকালীন গুরুদেবের সাথে। তিনি আমাকে এমন কিছু স্মরণ করিয়ে দিলেন, যা আমি ভুলে গিয়েছিলাম। তিনি আমার স্বরূপ সম্পর্কে শিক্ষা দিলেন। তাঁর কিছু কথা আমার হৃদয়কে এমনভাবে নাড়া দিল যে, সেদিন আমি দীর্ঘক্ষণ কেঁদেছি অঝোর ধারায় ঋণী হয়ে গেলাম তার কাছে। সিদ্ধান্ত নিলাম তাঁর সাথে দেখা করতে যাব। দেখলাম এলবামের নীচে মন্দিরের ঠিকানা দেওয়া আছে। সিদ্ধান্ত নিলাম শীঘ্রই তাঁর সাথে দেখা করব।”
পরদিন তিনি ব্রুকলীন হরেকৃষ্ণ মন্দিরে গিয়ে কৃষ্ণভাবনামৃত সম্পর্কে বিশদ জ্ঞান লাভ করে সেদিনই এই দর্শনকে জীবনের চরম সিদ্ধান্ত বলে গ্রহণ করলেন। অবিশ্বাস্যভাবে সেদিনেই মন্দিরে যোগদানও করলেন। মন্দিরের ভক্তরা তাঁর মেধা, প্রজ্ঞা ও শিক্ষা দেওয়ার অদ্ভুত ক্ষমতা দেখে তাকে ডাগলাস মন্দিরে প্রেরণ করলেন। টেক্সাসে তখন ইস্কন গুরুকূল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে তার সাক্ষাৎ হলো সস্বরূপ দাস গোস্বামীর সাথে। তাঁর সংস্পর্শে এসে জীবনে পরিবর্তন সাধিত হলো। সৎস্বরূপ দাস গোস্বামীর অতি সাধারণ ও তেজোদীপ্ত কৃষ্ণভাবনামৃত বিষয়ক উপস্থাপনা তাকে আকৃষ্ট করলো। সেই সময় শ্রীমৎ সৎস্বরূপ দাস গোস্বামী একটি ভ্রাম্যমান সংকীর্তন দল করলেন। এই দলটির ভূমিকা ছিল বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে সংকীর্তন এবং শ্রীল প্রভুপাদের গ্রন্থ প্রচার করা। জন তাদের সাথে সানন্দে যোগদান করলেন।

এক অতি মনোহর ঘন শ্যামের আবির্ভাব

খুব শীঘ্রই সবাই বুঝতে পারলো জন ফেবোর কোনো সাধারণ ভক্ত নয়; উদাহরণ স্বরূপ এই জন প্রথমদিন থেকেই, প্রতিদিন ঘুমাতে যাওয়ার আগে বত্রিশ মালা জপ করতো, যেখানে নির্ধারিত ছিল ষোল মালা, তিনি সবার আগে ঘুম হতে উঠতেন এবং ঘুমাতেন সবার শেষে। তাঁর সাথে একটি ডায়েরি ছিল তিনি প্রতিদিন শ্রীল প্রভুপাদের কাছে পত্র লিখতেন। সারা পত্র জুড়ে থাকতো তাঁর দুর্বলতা ও অযোগ্যতার কথা এবং এগুলো হতে পরিত্রাণের জন্য প্রার্থনা ও ভগবানের একজন শুদ্ধভক্ত হওয়ার আর্তি। তার আহারও ছিল স্বল্প, কখনো সামান্য ফল এবং বাদাম, মাঝে মাঝে সামান্য কিছু গাজর, কলা ও সল্প পরিমাণ মাখন। যে জিনিসটি সবাইকে আকর্ষণ করছিল, তা হলো সংকীর্তন দলটির সদস্যদের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে বেশী শ্রীল প্রভুপাদের গ্রন্থ বিতরণ করেছেন। মনে হয়, গ্রন্থ বিতরণ সম্পর্কে তাঁর পূর্ব কোনো অভিজ্ঞতা আছে। হৃদয়ানন্দ মহারাজ ঘনশ্যামের প্রতিভা দেখে তাকে বিশেষ প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করলেন। তারপর মহাবুদ্ধি দাস ও জনকে বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিগুলোতে গ্রন্থ বিতরণের দায়িত্বভার অর্পণ করলেন। জন বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মাঝে শ্রীল প্রভুপাদের গ্রন্থ প্রচার করতে লাগলেন। শ্রীমৎ সৎস্বরূপ মহারাজ তাকে দীক্ষা দেওয়ার জন্য শ্রীল প্রভুপাদের কাছে বিশেষ অনুরোধ জানিয়ে চিঠি লিখলেন। প্রভুপাদ প্রত্যুত্তরে ১৯৭৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক পত্র লিখলেন। তিনি তার নাম দিয়েছেন ঘনশ্যাম দাস। তিনি আধ্যাত্মিক সাহিত্যের এক স্বতন্ত্র অবিশ্রান্ত জলধারা সৃষ্টি করলেন, যা অনবরত বর্ষণ করে যাবে আধ্যাত্মিক সাহিত্যে।
১৯৭৪ ও ১৯৭৫ সালে শ্রীল প্রভুপাদ বেশ কিছু চিঠিতে শ্রীমৎ সৎস্বরূপ মহারাজ ও শ্রীমৎ রামেশ্বর মহারাজের কাছে জানতে চেয়েছেন ঘনশ্যাম কিরূপ সেবা করছে? শ্রীল প্রভুপাদ তাঁর কাজের ভূয়সী প্রশংসা করতেন এবং তাঁর গ্রন্থ বিতরণের খবর শুনে খুব উদ্বেলিত হতেন। এই সময়গুলোতে শ্রীল প্রভুপাদ নিজে বেশ কয়েকটি পত্র লিখেছিলেন ঘনশ্যামের কাছে। যার একটিতে তিনি লিখেছিলেন, ‘তুমি কৃষ্ণের সবচেয়ে প্রিয় সেবাটি করছো, তুমি আমার আশীর্বাদ গ্রহণ কর এবং তুমি সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাও। অচিরেই কৃষ্ণ তোমাকে আত্মসাৎ করবেন। এর কিছুদিন পর কালাকান্ত দাস ও ঘনশ্যাম দাস ইউরোপে বিশেষ করে ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটিগুলোর লাইব্রেরিতে ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে গ্রন্থ বিতরণ করতে গেলেন। সেখানে সাফল্য আসলো মোটামুটি। কালাকান্ত দাসের ভাষ্য মতে তখন বৃটিশরা ভারতীয়দের কোনো কিছু গ্রহণ করতে ইচ্ছুক ছিল না। মনে হলো তারা কেমন যেন বীতশ্রদ্ধ। এরপর ইসকনের আরেকটি দলের সাথে ঘনশ্যাম পূর্ব ইউরোপে গেলেন। সেখানে তিনি সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে শ্রীল প্রভুপাদের গ্রন্থ বিতরণ শুরু করলেন, যেখানে ধর্ম সর্বতোভাবে নিষিদ্ধ। তিনি বাইরে জাগতিক ভাব রাখতেন কিন্তু ভিতরে কৃষ্ণভাবনাময় জীবন-যাপন করতেন। রাশিয়াতে তিনি পাবলিক ট্রেনগুলোতে থাকতেন এবং রাতের বেলা এক জায়গা হতে অন্য জায়গায় যেতেন। তার নির্ধারিত হরিনাম করতেন পাবলিক স্নানাগারগুলোতে। সকল বাধাকে অতিক্রম করে তিনি তার গ্রন্থ বিতরণ চালিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর দৃঢ়তা ও কাজের সাফল্য শ্রীল প্রভুপাদকে খুবই আনন্দ প্রদান করতো।

করুণার শ্রাবণধারা

শ্রীল প্রভুপাদ তখন অসুস্থ, এই জগৎ হতে অপ্রকট হওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সেই সময় এক গ্রীষ্মের দুপুরে শ্রীল প্রভুপাদের ব্যক্তিগত সহকারি তমালকৃষ্ণ মহারাজ ঘনশ্যামের কার্যক্রম নিয়ে প্রভুপাদকে লেখা বেশ কিছু চিঠি পড়ে শুনালে প্রভুপাদ খুব আনন্দিত হন। প্রভুপাদ শেষ পাশ্চাত্য ভ্রমণে ইংল্যান্ডে ঘন শ্যামের সাথে সাক্ষাৎ করেন। সে সময় শ্রীল প্রভুপাদ তাকে বিশেষ করুণা প্রদান করেন।
শ্রীল প্রভুপাদ তাঁর কক্ষে ঘনশ্যামকে ডেকে এনে পাশে বসিয়ে তাকে আলিঙ্গন করলেন। অশ্রুসজল নয়নে শ্রীল প্রভুপাদ তাকে বললেন, তোমার জীবন সার্থক, ধন্য তোমার মানব জন্ম। শ্রীল প্রভুপাদের অপ্রকটের পর ঘনশ্যাম তাঁর গ্রন্থ বিতরণ আরও দ্বিগুণ গতিতে চালিয়ে যেতে লাগলেন। ১৯৭৯ সালে তিনি পশ্চিম ভার্জিনিয়ার নব বৃন্দাবনে শ্রীমৎ কীর্তনানন্দ মহারাজ হতে সন্ন্যাস প্রাপ্ত হন। সন্ন্যাস প্রাপ্তির পর তাঁর নাম হলো শ্রীল ভক্তিতীর্থ স্বামী মহারাজ। এরপর তিনি এক কমিটি গঠন করলেন যার প্রধান কাজ হলো গ্রামীণ
আধ্যাত্মিক জীবন উন্নয়ন। এই প্রকল্পটি তাঁর খুব প্রিয় ছিল। কেননা শহুরে শিশু হিসেবে তিনি বেড়ে উঠেছেন। তিনি দেখেছেন শহুরে জীবনে কৃষ্ণভাবনামৃতের পথে কত বাঁধা। সে তুলনায় গ্রামীণ জীবন অনেক সহজ সরল। শহুরে জীবন মাত্রাতিরিক্ত যান্ত্রিক ও জটিল। কিন্তু গ্রামে প্রকৃতির খুব কাছাকাছি থাকা যায়, যা কৃষ্ণভাবনার জন্য অনুকূল। তিনি শহর কেন্দ্রিক প্রচার কার্যক্রম শুরু করলেন, নগরে নগরে নগর সংকীর্তন, প্রসাদ বিতরণ ও শহুরে নগরীতে কৃষ্ণপ্রসাদের রেস্টুরেন্ট স্থাপন। ওয়াশিংটন ডিসিতে তাঁর স্থাপিত রেষ্টুরেন্ট খুব সাফল্য লাভ হয়েছিল।
ঠিক এই সময়গুলোতেই একদিন শ্রীল প্রভুপাদ তাঁর স্বপ্নে আবির্ভূত হলেন এবং
তাকে বললেন, ‘দরজা খোল, দরজা খোল’। স্বপ্নের মধ্যে তিনি প্রভুপাদের অনুরোধটি গ্রাহ্য করলেন না। কয়েক সেকেন্ড পরে শ্রীল প্রভুপাদ আবার অনুরোধ করলেন ‘দরজা খোল, দরজা খোল’ এভাবে তৃতীয়বার। অবশেষে তিনি দরজা খুললেন, দেখলেন বিভিন্ন বর্ণের আফ্রিকান কিছু লোক তাঁর ঘরে ঢুকে গেলো এবং ডুকরে ডুকরে কান্না করতে লাগলো। সঙ্গে সঙ্গে স্বপ্ন ভঙ্গ হলো। স্বপ্নভঙ্গের পর মহারাজ ভাবতে লাগলেন নিশ্চয়ই প্রভুপাদ আমাকে আফ্রিকা যাবার জন্য আদেশ করছেন। নিশ্চয়ই সেখানে আমার কোনো সেবা আছে। ঠিক সেই মুহূর্তে ওয়াশিংটনের সাফল্যপূর্ণ প্রকল্প ছেড়ে দিয়ে সামান্য পরিকল্পনা নিয়ে আফ্রিকার পথে যাত্রা করলেন। অন্তিমে তাঁর আফ্রিকা পরিভ্রমণ সার্থক হয়েছিল, তাঁর প্রচার কার্যক্রম খুব দ্রুত আফ্রিকার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়লো। আফ্রিকাতে তিনি দুটি কৃষি ভিত্তিক জীবন যাপনে অভ্যস্ত সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে দু’টি পাবলিক বিদ্যালয়ও স্থাপন করেন এবং শুরু থেকেই যাতে মানুষের জীবনে কৃষ্ণভাবনামৃত প্রবেশ করতে পারে তার জন্য বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। সম্ভবত আফ্রিকার কার্যক্রমের মধ্যে সবচেয়ে সাফল্যমণ্ডিত কার্যক্রম হলো ফলিত আধ্যাত্মিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান (IFAST) চালু করা। যা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮৮ সালে। এই প্রতিষ্ঠানটির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল এমন একটি কৃষিভিত্তিক জনগোষ্ঠী গড়ে তোলা, যাতে নিজেরা স্বয়ংসম্পূর্ণ থাকবে যা পেনসিলভানিয়ার পোর্ট রয়েলের গীতা নগরীর মতো।

স্বর্ণালী অধ্যায়

১. সন্ন্যাস গ্রহণের কিছুদিন পর তিনি জগন্নাথ পুরীতে যান। সেখানে ভারতীয় ব্যতীত প্রবেশাধিকার না থাকলেও তিনি জগন্নাথের কৃপায় অবিশ্বাস্যভাবে গভমন্দিরে ঢুকে জগন্নাথ বিগ্রহ দর্শন করে এসেছেন।
২. তিনি বিশ্বখ্যাত মুষ্টিযোদ্ধা আলীর সাথে সাক্ষাৎ করেন ১৯৮১ সালে। তার একজন আধ্যাত্মিক উপদেষ্টা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন।
৩. ইস্কন জিবিসির এক সদস্য হিসেবে মনোনীত হন ১৯৮২ সালে এবং ১৯৮৫ সাল হতে ইস্কনের গুরুদেব হিসেবে দীক্ষাদান শুরু করেন।
৪. তিনি আফ্রিকায় গিয়ে সেখানে ১৬ বছর অবস্থান করে আফ্রিকার নেতৃস্থানীয় রাজনীতিবিদ ও গণমাধ্যম ব্যক্তিদের মাঝে কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচার করেন। তাদের মধ্যে নোবেল বিজয়ী নেলসন ম্যান্ডেলার কথা প্রণিধানযোগ্য।
৫. তিনি বিভিন্ন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবচন দেন, টেলিভিশন এবং রেডিওতে বাক্য বিনিময় অনুষ্ঠানে সারা বছর ব্যাপী আন্তধর্ম সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন।
৬. তাঁর ১৬টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে এবং তিনটি গ্রন্থ প্রকাশের
জন্য প্রস্তুত। গ্রন্থগুলো নিম্নলিখিত ভাষাগুলোতে প্রকাশ করার জন্য অনুবাদকরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছে। ভাষাগুলো হলো: জার্মান, ফরাসি, স্প্যানিশ, পর্তুগীজ, মেসিডোনিয়ান, ফার্সিয়ান, রাশিয়ান, হিব্রু, সলভেনিয়ান, বেলিয়েনম এবং ইতালির কিছু কিছু গ্রন্থ এই ভাষাগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে এবং কিছু প্রকাশিত হওয়ার অপেক্ষায় আছে।
৭. তিনি ১৯৯০ সালে নাইজেরিয়ার ওয়ারির সর্বোচ্চ সম্মানজনক পদক লাভ করেন। আফ্রিকা উপমহাদেশের সর্বত্র আধ্যাত্মিক জ্ঞান প্রচারের স্বীকৃত স্বরূপ তাকে এই সম্মানে ভূষিত করা হয়।

মৃত্যুর পূর্বেই মৃত্যু

ভক্তিতীর্থ মহারাজের বামপায়ে মেলানোমিয়া হয় (বিশেষ এক ধরনের ত্বকের ক্যান্সার)। তিনি বলেছিলেন দশ বছর পূর্বে সেখানে একটি বিষাক্ত ফোড়া উঠেছিল। ধীরে ধীরে এটি বড় হতে লাগলো এবং ফোঁড়াটি থেকে তাঁর পাকে বাঁচাতে হলে সেই পায়ের ব্যবহার সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে। অবশেষে ফোড়াটি অস্ত্রপচার করতে গিয়ে ডাক্তাররা দেখলো, ফোড়াটির অবস্থা ধারণাতীত বিপজ্জনক।
প্রথমে তারা প্রাকৃতিক উপায়ে চেষ্টা শুরু করল কিন্তু তার তেমন একটি সুফল পাওয়া গেল না। ২০০৪ সালের আগস্টে ডাক্তাররা তাকে কেমোথেরাপি নেওয়ার জন্য পরামর্শ দিলেন এবং পা-টিকে রক্ষা করার জন্য পায়ের আক্রান্ত এলাকাটি কেটে বাদ দেওয়ার জন্য বললেন। অবশেষে সার্জারি হলেও দুর্ভাগ্যবশত সাফল্য আসলো সামান্য। তিনি বুঝতে পারলেন এই জগতে তার সেবা সম্পাদন করার সময় সীমা শেষ হয়ে এসেছে। যেহেতু কৃষ্ণের এই জগতে তাকে দিয়ে আর কোনো সেবা করানোর পরিকল্পনা নেই, তাই তিনি এই জগত থেকে বিদায় নেওয়ার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে লাগলেন। শ্রীমৎ ভক্তিতীর্থ মহারাজ এটিকে একটি সুযোগ হিসেবে দেখলেন। তিনি বললেন, কৃষ্ণ হয়তো আমাকে আরও পরিশুদ্ধ করে নিতে চান। বিশেষ দক্ষতা প্রদানের জন্য বিশেষ পরিবর্তনের প্রয়োজনে তিনি অন্য কোনো জগতে আমাকে দিয়ে সেবা করাতে চান, তাই কৃষ্ণের ইচ্ছাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত আমার। তিনি কৃষ্ণের কাছে প্রার্থনা করেছেন, অন্যকে পাপমুক্ত করার জন্য এবং অন্যের পাপ তিনি নিজে গ্রহণ করতে চেয়েছেন।
তিনি আরও লিখেছেন তিনি অন্যের পাপকর্মের ফলভোগ করে মৃত্যুবরণ করতে চান। তিনি যেকোনো উপায়ে যেন তার গুরুভ্রাতা ও বন্ধুদের একত্রিত করতে পারেন। কেউ যদি কোনো বিশেষ পাপকার্য করে তবেই সে ইস্কন থেকে দূরে সরে যেতে পারে, তার সেই পাপের শাস্তি আমাকে দেন এবং তাদের ক্ষমা করে পূণরায় ইসকনে ফিরিয়ে আনেন। তার প্রার্থনা ভগবান অনুমোদন করেছিলেন এবং অবশেষে তাই ঘটেছিল। তিনি যা প্রার্থনা করেছিলেন, শ্রীমৎ ভক্তিচারু স্বামী মহারাজ যিনি ইস্কনের আরেকজন আধ্যাত্মিক গুরু এবং শ্রীমৎ ভক্তিতীর্থ মহারাজের ঘনিষ্ট বন্ধু। তিনি তার অস্তিম সময়ে তার পাশে ছিলেন, তার ভাষ্য মতে তিনি সবসময় ভক্তদের কষ্ট দেখলে ব্যধিত হতেন। তিনি সবসময় ভক্তদের কষ্ট হতে রক্ষা করার জন্য জোরালোভাবে কৃষ্ণের কাছে প্রার্থনা করতেন এবং তাদের কর্মফল পর্যন্ত গ্রহণ করতে দ্বিধা করতেন না। তিনি শ্রীল প্রভুপাদের কাছে অশ্রুসজল নয়নে প্রার্থনা করছেন। তিনি যেন পরিশুদ্ধ হন, খুব ভাল একজন শিষ্য হতে পারেন এবং যারা সংগ্রাম করেছে কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচারের জন্য তাদের তিনি যেন যেকোনো মূল্যে সাহায্য করতে পারেন। শ্রীমৎ রাধানাথ স্বামী মহারাজ ইস্কনের আরেকজন গুরু, যিনি ছিলেন মহারাজের খুব অন্তরঙ্গ বন্ধু। তিনি মহারাজের অন্তিম শ্বাস পর্যন্ত তার পাশে ছিলেন। অবশেষে অন্তিম যাত্রার সময় ঘনিয়ে এল। শ্রীমৎ রাধানাথ স্বামীর ভাষ্যমতে তিনি জীবনের শেষ সপ্তাহ তার চেতনাকে আরও আরও বেশী কৃষ্ণের মধ্যে কেন্দ্রীভূত করতে শুরু করলেন। তিনি সর্বদা গভীর ধ্যানের মধ্যে মগ্ন থাকতে শুরু করলেন। যারা কৃষ্ণকথা বলতে পারে শুধুমাত্র তাদেরই তাঁর কাছে যাওয়ার অনুমতি ছিল। তিনি অন্তিম যাত্রার পূর্ব মুহূর্তে পূর্ণরূপে কৃষ্ণের মধ্যে নিজেকে কেন্দ্রীভূত করলেন। তখন তিনি কৃষ্ণের বৃন্দাবন লীলা স্মরণ করছিলেন এবং শ্রীবিগ্রহের একটি ছবির দিকে অপলক নয়নে তাকিয়ে রইলেন এবং প্রভুপাদের একটি ছবি তাঁর বিছানার সামনে ছিল। তাঁর দুটি আরাধ্য বিগ্রহ ছিল, তার মধ্যে শালগ্রামটিকে তিনি করতলের মধ্যে নিলেন, আর বাকীটা রাখলেন মাথার ওপর। শরীরে রাধাকুণ্ডের জল ছিটিয়ে দেওয়া হলো এবং একটি তুলসী পত্র দেওয়া হলো জিহ্বায় । এভাবেই তিনি নিত্য শাশ্বত আলয়ের দিকে যাত্রা করলেন। সত্যিকার অর্থে তিনি এই ধরাধাম হতে বিদায় নিয়েছেন, কিন্তু অমর হয়ে আছেন সকল ভক্তদের হৃদয়ে এক আদর্শ কৃষ্ণভক্ত হিসেবে।


সত্যরাজ দাস (স্টিভেন জে. রোজেন) একজন আমেরিকান লেখক। শ্রীল প্রভুপাদের অন্যতম একজন শিষ্য এবং শ্রীমৎ ভক্তিতীর্থ স্বামী মহারাজের অন্তরঙ্গ জন। বৈদিক শাস্ত্রের বিবিধ বিষয়ের ওপর ২০টিরও বেশী গ্রন্থ রচনা করেছেন। তিনি জার্নাল অব বৈষ্ণব স্টাডিজ এর প্রধান সম্পাদক ও আন্তর্জাতিক ব্যাক টু গডহেড এর সহ সম্পাদক। তাঁর অন্যতম বিখ্যাত একটি গ্রন্থ হলো, শ্রীমৎ ভক্তিতীর্থ স্বামী মহারাজের জীবনী সম্বলিত ব্ল্যাক লোটাস : দ্যা স্পিরিচুয়াল জার্নি অব এন আর্বান মিস্টি


 

জানুয়ারি-মার্চ ২০১৫ ব্যাক টু গডহেড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here