এক আধুনিক সাধু

0
55

হরেকৃষ্ণ ভক্তরা

কৃষ্ণভাবনার এক অত্যুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত শ্রীমান জয়ানন্দ দাস, একজন শুদ্ধ ভক্তের শুদ্ধ শিষ্য

ভয়হারি দাস

১৯৬৭ সাল, ১৬ জানুয়ারি, শ্রীল প্রভুপাদ নিউইয়র্ক থেকে সানফ্রান্সিসকোর হরে কৃষ্ণ মন্দিরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। তার আগমনের খবরটি চ্যানেল ফোর নিউজ ও কয়েকটি দৈনিক পত্রিকায় ফলাও করে ছাপানাে হয়।

নিউইয়র্কে রথযাত্রা উৎফুল্ল জয়ানন্দ

এ ব্যাপারটি হয়তাে সানফ্রান্সিসকোর অনেক ব্যক্তির চোখ এড়িয়েছে, কিন্তু জিম কোর নামে এক যুবকের তাতে নজর কাড়ে। ওহিও স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর উপর ডিগ্রি লাভের পরও সানফ্রান্সিসকোর রাস্তায় ট্যাক্সি চালাতাে। উচ্চবিত্তদের ইঁদুর দৌড় প্রতিযােগিতার সঙ্গে যেন কখনােই খাপ খাওয়াতে পারতেন না। তাঁকে দেখতে প্রায়শই অসুখী মনে হতাে এবং প্রকৃতপক্ষে নিজেও এর কারণটি কি জানতেন না। যদিও জিম মােটেই একজন ধার্মিক ব্যক্তি ছিলেন না, কিন্তু পত্রিকার ঐ প্রবন্ধ যেন তাকে কেমন জানি আশার আলাে দেখাল। সিদ্ধান্ত – নিলেন এই ভারতীয় স্বামীর সঙ্গে তিনি মিলিত হবেন।

জিম জানতই না যে তিনি অজান্তেই তার লক্ষ্য = পূরণার্থে প্রথম পদক্ষেপ নিয়ে ফেলেছেন। যদিও তিনি আর মাত্র দশ বছর বেঁচে ছিলেন। কিন্তু এ সংক্ষিপ্ত পরিসরে পারমার্থিক সফলতার চরমে তিনি উপনীত হয়েছিলেন। এ পৃথিবী থেকে প্রস্থানের পূর্বে ভবিষ্যত বৈষ্ণব প্রজন্মের জন্য, ভগবানের ভক্তদের জন্য অনেক অমুল্য শিক্ষা রেখে গেছেন। এক সন্ধ্যায় জিম মন্দিরে এসে উপস্থিত হলেন, তখন সেখানে অধিকাংশই হিপ্পিরা ছিল। তার মাথায় খাটো চুল, বেশ পরিচ্ছন্ন দেখতে এবং বেশভূষনও সাদামাটা ছিল। তিনি বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তার বয়স ২৮, ওখানে উপস্থিত অনেকের চেয়েও বয়সে বড় ছিলেন। জিম কিছুটা ইতস্তত বােধ করলেও যখন স্বামীজিকে কক্ষে প্রবেশ করতে দেখলেন, তার সেই ইতস্তত বােধ উধাও হয়ে গেল। জিম প্রভুপাদের প্রবচন শােনার জন্য সবার মাঝে বসলেন এবং পরবর্তীতে তিন খণ্ডের শ্রীমদ্ভাগবত সেট ক্রয় করলেন, যাতে শ্রীল প্রভুপাদ অটোগ্রাফ দিলেন এবং সেখানে লিখলেন, ‘শ্রীমান জিম কোরের প্রতি। শ্রীল প্রভুপাদের সাথে সাক্ষাতের অনেক বছর পর প্রথম বারের মতাে জিম প্রশান্তি অনুভব করলেন। তিনি এই মাত্রই তার জন্ম-জন্মান্তরের গুরুদেবের কাছ থেকে কৃষ্ণকথা শ্রবণ করলেন।


সবার বন্ধু

একবার, এক যুবক সানফ্রান্সিসকো মন্দিরে বেড়াতে এসেছিলেন। তিনি মন্দিরে সেবা করতে চেয়েছিলেন। তাই মন্দির অধ্যক্ষ তাকে ময়লা আবর্জনা রাখার স্থানে পাঠালেন, যেখানে জয়ানন্দ তার সাপ্তাহিক ময়লা ফেলার সেবায় নিয়ােজিত।
জয়ানন্দ যুবকটিকে বললেন, “আমি এখানে ময়লা আবর্জনা ফেলার সেবা করি। অনেক বছর ধরে আমি লক্ষ্য করছিলাম ময়লা ফেলার লােকেরা এসে এগুলাে নিয়ে যায়, এখন তার সেবার জন্য কৃষ্ণ আমাকে এই সুযােগটি দিয়েছেন।
এটি শুনে যুবকটি ময়লাগুলাে শুধু ট্রাশেই ভরলেন না বরং জয়ানন্দকে শেষ পর্যন্ত সহায়তাও করলেন। তিনি তখন ভাবছিলেন, এই মন্দিরের ময়লা ফেলার লােকটি যদি এত আনন্দময় হতে পারে, তাহলে মন্দিরের বাকি সব লােকেরা না কত আনন্দময়। পরবর্তীতে সে যুবকটি কৃষ্ণভক্তে পরিণত হয়েছিলেন
জয়ানন্দ ভাল বা মন্দ সব ব্যক্তিদের কাছেই প্রিয় পাত্র ছিলেন। তিনি যখনই রাস্তায় হরিনাম সংকীর্তনে বের হতেন কাউকে না কাউকে বন্ধু করে ফেলতেন। তারা তার কাছে আসত এবং বলত “আপনি কোথায় থাকেন?
একবার সানফ্রান্সিসকোতে এক ভক্তের সঙ্গে এক মদ্যপায়ীর সাক্ষাত ঘটে। মদ্যপায়ী ব্যক্তিটি ভক্তের গেরুয়া বসন দেখে জিজ্ঞেস করে “আরে, আমার পুরানাে বন্ধু জয়ানন্দ কোথায়?”
জয়ানন্দ যে সব স্থান থেকে পূর্বে বাজার করতেন সেখানে ভক্তরা গেলে সবাই জিজ্ঞেস করে, “কোথায় জয়ানন্দ?” কিংবা বলে, “জীবনে এমন সুন্দর ও শুদ্ধ লােক আর দেখেনি। আমি আপনাদের দর্শন সম্বন্ধে ততটা জানি না, তবে যেহেতু জয়ানন্দ এর সঙ্গে জড়িত তার অর্থ সব অবশ্যই ঠিক আছে।
একবার জয়ানন্দ ও অন্য এক ভক্ত ভারী রেফ্রিজারেটরটি ট্রাকে তুলতে পারছিলেন না। পাশ দিয়ে দু’জন মাতাল ব্যক্তি যেতে দেখলে জয়ানন্দ বলে উঠে, “এদেরকে কৃষ্ণসেবার একটি সুযােগ দেয়া যাক।
ভক্তিমূলক সেবার প্রতি তার যে উৎসাহ তা অন্যের মাঝে তিনি ছড়িয়ে দিতেন। এদের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হল না। তারা দু’জন খুব সুন্দরভাবে কাজটি সুসম্পন্ন করল। এরপর জয়ানন্দ তাদেরকে বললেন,
এখন বলুন, ‘হরে
মাতালরাও তাকে অনুসরণ করে বলল, হরে
এবার বলুন ‘কৃষ্ণ’
– কৃষ্ণ
এখন বলুন, ‘হরে কৃষ্ণ’
– হরে কৃষ্ণ
জয়! হরিবােল! আপনাদের ধন্যবাদ। সমস্ত মহিমা শ্রীল প্রভুপাদের।
– কলকান্ত দাস
 

 

জিম এরপর থেকে নিয়মিতই মন্দিরে আসতে শুরু করলেন। তিনি বিশেষভাবে প্রাতঃকালীন অনুষ্ঠানটি পছন্দ করতেন। ঐ সময় অধিকাংশ হিপ্পিই ঘুমিয়ে থাকতেন। মাঝে মাঝে ভাগবতীয় ক্লাসগুলােতে তিনিই একমাত্র শ্রোতা হিসেবে উপস্থিত থাকতেন। কিছু বছর পর তিনি প্রকাশ করলেন যে, তিনি স্বামীজির উপর আস্থা স্থাপন করেছেন এবং আত্মবিশ্বাসী অনুভব করছেন যে, স্বামীজী তাকে প্রতারণা করবেন না। ৪ বছর বয়সে জিম যখন একবার গীর্জায় দাঁড়ালেন তখন চারদিকে উদ্বিগ্নচিত্তে দেখতে লাগলেন। যখন তাঁর ঠাকুরমা তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, কি হয়েছে? তখন জিম জিজ্ঞেস করলেন, কোথায় ভগবান? এখন তিনি অনুভব করছেন যে, তার চেতনার গভীরে লুকায়িত এ প্রাচীন প্রশ্নটির উত্তর শ্রীল প্রভুপাদ প্রদান করেছেন। ১৯৬৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাস, প্রভুপাদ জিমকে তার শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করে তার দীক্ষানাম দেন জয়ানন্দ দাস।

বৈষ্ণব শাস্ত্রে, শ্রীল বিশ্বনাথ চক্রবর্তী ঠাকুরের মাধুর্য-কাদম্বিনি থেকে আমরা শিক্ষা পাই যে, ভগবানের প্রতি স্বতস্ফূর্ত প্রেম লাভের পূর্বে একটি বদ্ধ আত্মা সাধন ভক্তির স্তরের মধ্য দিয়ে উন্নতি লাভ করে। সানফ্রান্সিসকো মন্দিরের নবীন ভক্তরা প্রায়ই তাদের জাগতিক বাসনা ও দৈনন্দিন পারমার্থিক অনুশীলনের সঙ্গে সংগ্রাম করে, পূর্ণরূপে কৃষ্ণভাবনাময় হতে নানারকম প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হত। কিন্তু তিনি কৃষ্ণভাবনাকে স্বাভাবিকভাবে এবং প্রচেষ্টাহীনভাবেই গ্রহণ করেছিলেন। তিনি কৃষ্ণভাবনার সবগুলাে পর্যায় আস্বাদন করেছেন মালায় হরিনাম জপ, কীর্তন, প্রসাদ আস্বাদন, বিগ্রহ অর্চন এবং আরাে অনেক কিছু। তিনি প্রায়ই একটি কথা বলতেন, “কৃষ্ণভাবনা এত মধুর”।

প্রকৃতপক্ষে, জয়ানন্দ কৃষ্ণভাবনাকে এত মধুর হিসেবে দেখেছিলেন যে, তিনি শীঘ্রই অন্যসব কিছুর স্বাদ হারিয়ে ফেলেছিলেন। তিনি তাঁর জীবনকে শ্রীল প্রভুপাদের কাছে গচ্ছিত রেখেছিলেন। ভক্তিরসামৃতসিন্ধু গ্রন্থের ভূমিকাতে প্রভুপাদ তাঁকে ধন্যবাদ জানান : ধন্যবাদ জানাচ্ছি আমার প্রিয় শিষ্য শ্রীমান জয়ানন্দ ব্রহ্মচারীকে, এই বইটি ছাপাতে যার দান ছিল অসামান্য।


দেহাত্মবুদ্ধির উর্ধ্বে

লিউকোমিয়া রােগে আক্রান্ত হয়ে ১৯৭৭ সনের ১ মে জয়ানন্দ প্রভু মাত্র ৩৮ বছর বয়সে লসএঞ্জেলেস ইস্কন মন্দিরে পরলােকগমন করেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে তিনি আর বেশিদিন এই জগতে থাকবেন না। তাই তার চিকিৎসার জন্য গচ্ছিত পাঁচ হাজার আমেরিকান ডলারের একটি ডলারও খরচ করতে দেন নি এবং কোনও ঔষুধও খান নি। তাঁর পরমারাধ্য গুরুমহারাজ শ্রীল প্রভুপাদকে লেখা তার অন্তিম চিঠির সঙ্গে ঐ পাঁচ হাজার ডলার ব্যাংক ড্রাফট করে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন কৃষ্ণভাবনায় এমনই দৃঢ়ব্রত।

শ্রীল প্রভুপাদের সেবক

যখন আমি এ ঘটনাটি স্মরণ করি, তখন আমার কান্না চলে আসে। আমি এরকম ঘটনা পূর্বে কখনাে শুনিনি, দয়া করে জয়ানন্দ প্রভুর অমৃতময় ভক্তির গল্পটি শ্রবণ করুন। কয়েকটি কারণে জয়ানন্দ প্রভুকে নিকটস্থ সানডিয়াগাের ক্যালিফোর্নিয়ার একটি ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। যার মধ্যে অন্যতম কারণ হল তার শারীরিক অবস্থার অবনতি। একজন ভক্ত, মুক্তকেশ প্রভু বলছিলেন, কিভাবে কিছু জিনিষ নিয়ে জয়ানন্দ প্রভুর হাসপাতালের কক্ষে এসেছিলেন। মুক্তকেশ প্রভু কক্ষে প্রবেশ করেই সাধারণভাবেই তার (জয়ানন্দ প্রভুর) শয্যার পাশে বসতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু জয়ানন্দ হঠাৎ তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, অনুগ্রহ করে খালি বিছানায় বসবেন না। মুক্তকেশ অবাক হয়ে গেলেন, কেন নয়? এবং তখন একটু ঘুরেই তিনি লক্ষ্য করলেন বিছানার অগ্রভাগে একটি বালিশের উপর শ্রীল প্রভুপাদের চিত্রপট। জয়ানন্দ তখন এর ব্যাখ্যা দিলেন যে, একজন ভক্ত হিসেবে তার কখনােই এত সুন্দর বিছানা ছিল না। তাই তিনি ভাবলেন যে, এত সুন্দর উপভােগ্য বিছানা তাঁর গুরুদেব শ্রীল প্রভুপাদের জন্যই অধিক যথার্থ হবে। আমি যখন এটি লিখছিলাম আমার শরীর কাঁপছিল। জয়ানন্দ তাঁর সুন্দর বিছানাটি প্রিয় গুরুদেবকে পরম ভক্তি ও ভালােবাসায় নিবেদন করলেন এবং তাঁর ক্যান্সার আক্রান্ত রুগ্ন শরীরটি বিছানার সামনে মেঝের একটি ছােট জায়গায় শুয়ে আছে।
– বিশােকা দাস
 

বিল পরিশােধ

জয়ানন্দ ব্যবহারিক ভক্তিমূলক সেবার প্রতি মনােনিবেশ করেন। তিনি নিরবচ্ছিন্নভাবে সেবা করে যেতেন। গুরুত্বপূর্ণ জিনিস কেনা, প্রসাদ রন্ধন, রান্নাঘর পরিস্কার, ডাস্টবিন পরিস্কার, কখনাে বা নতুন ভক্তদের শিক্ষা দেওয়ার মাধ্যমে ভগবানের সেবা করতেন। তিনি এত সব সেবাগুলাে করতেন সারাদিন ধরে ট্যাক্সি চালিয়ে। এরকমও হয়েছে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৫ ঘণ্টাই ট্যাক্সি চালিয়ে এসে উপার্জিত সমস্ত ডলার মন্দির তহবিলে জমা দিয়েছেন। কৃষ্ণভাবনা প্রচারের জন্য যা কিছু প্রয়ােজন তা করতে তিনি ধীরে ধীরে সুদক্ষ হয়ে উঠেছিলেন। তিনি শ্রীল প্রভুপাদ বিরচিত শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর শিক্ষা গ্রন্থটি বিক্রির উদ্দেশ্যে বের হতেন। এর মাধ্যমে তিনি প্রভুপাদের প্রিয় সেবকে পরিণত হয়েছিলেন।

রথ তৈরিতে ব্যস্ত জয়ানন্দ

ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর আবির্ভাব দিবসে শ্রীল প্রভুপাদ জয়ানন্দের প্রতি অত্যন্ত প্রসন্ন হন, কেননা জয়ানন্দ তখন মন্দিরের বাইরের রাস্তায় প্রাণ খুলে কীর্তন করছিলেন। জয়ানন্দ এর মাধ্যমে উৎসাহিত হয়ে, নিয়মিতভাবে ভক্তদের সাথে নিয়ে ব্যস্ততম রাস্তাগুলােতে কীর্তন শুরু করেন। এর মাধ্যমে তাঁর পরিকল্পনা ছিল তিনি একটি সংকীর্তন দল গঠন করবেন যা দেশের সর্বত্র ভ্রমণ করবে।

শুধু ভক্তরাই নন, এমনকি বাইরের যে কেউ জয়ানন্দের শুদ্ধতার প্রতি আকর্ষিত হতেন। একসময় তিনি শ্রীল প্রভুপাদের গলায় মালা পড়াচ্ছিলেন, তিনি তখন তার অপরিচ্ছন্ন পােশাকের জন্য শ্রীল প্রভুপাদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিলেন।

শ্রীল প্রভুপাদ তখন মন্তব্য করলেন, “এখানে নিশ্চিতভাবে কোনাে অপরাধ নেই। তােমরা (আমার শিষ্যরা) অপরিচ্ছন্ন হতে পার, কিন্তু তােমাদের হৃদয় শুদ্ধ।

জয়ানন্দ অনেক লােকের হৃদয় ছুঁয়েছিলেন এবং তাঁরা তখন কৃষ্ণের জন্য কিছু সেবা নিবেদন করতে সারা দিতেন। তিনি মন্দিরের জন্য যা কিছু পেতেন। তা হয় বিনামূল্যে, নতুবা কোনাে সুলভ কমিশনে। তিনি দোকানদার থেকে শুরু করে শহরের উর্ধ্বতন, মদ্যপায়ী বা অকেজো ব্যক্তিদের জন্য ছিলেন একজন শুভাকাঙ্ক্ষী। প্রত্যেকেই জয়ানন্দকে ভালােবাসতেন এবং তিনিও সানন্দে সবাইকে ভগবানের সেবায় নিয়ােজিত করতেন। তিনি নিজে কঠোর পরিশ্রম করতেন, অথচ প্রশংসা করতেন অন্যের সেবা সম্পাদনের। তিনি ছিলেন বিনয়ী, সহনশীল, দয়াশীল ও ত্যাগী। তার কার্যকলাপ, বচন, জীবন ও মৃত্যু সবই ছিল ভগবানের প্রতি ভক্তিমূলক সেবার এক অত্যুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

শ্রীল প্রভুপাদের নির্দেশনাবলী বিশেষত যেগুলাে ব্যবহারিক সেবার প্রতি উৎসাহপ্রদ-সেগুলাে জয়ানন্দের জীবনের পাথেয় স্বরূপ। একবার যখন একজন ভক্ত তাকে জিজ্ঞেস করলেন কীভাবে কৃষ্ণভাবনায় অগ্রসর হওয়া যায়, জয়ানন্দ স্বাভাবিকভাবেই বলে উঠলেন, “আমি সত্যিই জানি না। আমি সবসময় সেবায় অত্যন্ত ব্যস্ত।”

তিনি শ্রীল প্রভুপাদের নির্দেশনা পালনার্থে এতটাই ডুবে থাকবেন যে, শ্রীল প্রভুপাদের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্যও খুব কম সময় পেতেন। এটি হল বিচ্ছেদের মাধ্যমে সেবা। এর মাধ্যমে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, দৈহিক সঙ্গ লাভের চেয়ে বাণী সঙ্গ করা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। প্রচলিত আছে যে, সবারই এমনভাবে আচরণ করা উচিত, যাতে কৃষ্ণ তাকে দেখতে চায়; জয়ানন্দ তার এরূপ সেবা মনােভাবের মাধ্যমে এই দৃষ্টান্তই স্থাপন করেছেন।

শ্রীল প্রভুপাদ সময়ে সময়ে জয়ানন্দের খোঁজ করলে তখন কাউকে গিয়ে তাকে নিয়ে আসতে হতাে। জয়ানন্দের জন্য শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীল প্রভুপাদ ছিলেন একমাত্র দুই পরম সত্য। তাঁর দেহসহ সবকিছুই তাদের সেবায় নিয়ােজিত করেছিলেন।

রথযাত্রার সূচনা

একদিন কিছু ভক্ত একটি স্টোর থেকে ভগবান জগন্নাথের একটি ছােট বিগ্রহ পেয়েছিলেন। শ্রীল প্রভুপাদ তখন তাদেরকে বলরাম ও সুভদ্রা দেবীর বিগ্রহও সেই স্টোর থেকে আনতে পাঠালেন। শ্রীল প্রভুপাদ মন্দিরে তাদের পূজা অর্চনা শুরু করলেন। জগন্নাথের বিগ্রহের ধ্যান করে, শ্রীল প্রভুপাদ তাদের কৃপা বিস্তৃত করার উদ্দেশ্যে রথযাত্রা । আয়ােজনের তীব্র বাসনা করলেন। ভারতের পুরীতে প্রতিবছর একবার এ রথযাত্রা উৎসবের আয়ােজন করা হয়ে থাকে। জয়ানন্দ নিজেকে প্রভুপাদের এ বাসনা পূরণের জন্য উৎসর্গ করলেন। সবার কাছ থেকে যতটুকু সাহায্য পেয়েছিলেন এবং নিজের প্রচেষ্টায় সমতল ট্রাককে রথ বানিয়েছিলেন। ৯ জুলাই ১৯৬৭
সানফ্রান্সিসকোতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল পাশ্চাত্যের প্রথম রথযাত্রা। আর এটি সম্ভব হয়েছিল জয়ানন্দের রক্ত, ঘাম আর অক্লান্ত শ্রমের মাধ্যমে।

জয়ানন্দ বছরের পর বছর ধরে উৎসবটিকে আরাে উন্নত করেন, অর্থ সংগ্রহ করেন, অনুমতি নেন, জনসমক্ষে প্রচার করেন, বিশাল রথ তৈরি, প্রসাদ তৈরি, ইউ.এস. পার্ক সার্ভিস ও সিটি পুলিশের সাথে সুসম্পর্ক রাখা ইত্যাদি । যখন রথ তৈরি চলত তিনি সেখানেই ঘুমাতেন। অনেক সময় উৎসব প্রায় নিকটে এলে, তিনি কম ঘুমাতেন কিংবা ঘুমাতেন না। পরিশেষে গােল্ডেন গেইট পার্কে উদযাপিত রথযাত্রা উৎসবটিতে বছরের পর বছর ধরে জনতার ভীড় বৃহৎ থেকে বৃহত্তর হতে লাগল। জয়ানন্দের অক্লান্ত প্রচেষ্টাকে ধন্যবাদ জানাই, যার কারণে আজ হাজার হাজার জনতা ভগবান জগন্নাথের অপ্রাকৃত কৃপা লাভ করছে। এ রথযাত্রা উৎসব এখন বিশ্বের প্রায় অনেক শহরেই উদযাপিত হচ্ছে।

শ্রীল প্রভুপাদ এ উৎসবগুলাের জন্য প্রায়ই জয়ানন্দের প্রতি তার গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেন। যখন জয়ানন্দ অপ্রকট হলেন শ্রীল প্রভুপাদ বলেছিলেন যে, প্রত্যেক রথযাত্রায় তার চিত্রপট কোনাে একটি রথে রাখা উচিত।

রােগাক্রান্ত শরীর

১৯৭৬ সালে যখন নিউইয়র্কের রথযাত্রার জন্য প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছিল, জয়ানন্দের শরীরের ব্যাথা আরাে বৃদ্ধি পেয়েছিল। তাঁর একজন গুরুভ্রাতা উদ্বিগ্ন হয়েছিলেন যে, এটি ক্যান্সার হতে পারে, কিন্তু জয়ানন্দ সেই গুরুভ্রাতাকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করালেন যে, উৎসব শেষ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত যেন শ্রীল প্রভুপাদকে তিনি এ বিষয়টি না জানান। জয়ানন্দের প্রধান চিন্তার বিষয় ছিল যেন রথযাত্রা সর্বাঙ্গিনভাবে সফল হয়; এ ছাড়া অন্য সবকিছুই ছিল তার জন্য গৌণ।

শ্রীল প্রভুপাদের সাথে প্রাতঃভ্রমণে জয়ানন্দ দাস

প্রকৃতপক্ষে নিউইয়র্কের রথযাত্রা বিরাট সফল হয়েছিল। ফিফ্থ অ্যাভিনিউর উপর দিয়ে তিনটি বিশাল রথের সঙ্গে হাজার হাজার জনতার অংশগ্রহণ এটিকে আলােকিত করেছিল। অনেকে এর মাধ্যমে কৃষ্ণভাবনা অনুশীলনে প্রয়াসী হয়। শ্রীল প্রভুপাদ তখন অপ্রাকৃতভাবে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি এটিকে বিশাল সফলতা হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন এবং তাঁর সেবার জন্য জয়ানন্দকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।

জয়ানন্দ লিউকোমিয়া রােগে আক্রান্ত হন, যেটি ক্রমান্বয়ে তার শরীরকে রুগ্ন করে দেয়। চিকিৎসা বিজ্ঞান মতে তিনি শীঘ্রই মারা যাবেন। জয়ানন্দ ঐ অবস্থায়ও শ্রীল প্রভুপাদের প্রতি তার গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে থাকেন। তার শুভাকাঙ্ক্ষীরা হতবাক ও বিষন্ন হন তার বর্তমান রােগাক্রান্ত জীর্ণ শরীরটি দেখে। কিন্তু তবুও ঐ অবস্থায় জয়ানন্দ ভক্তিমূলক সেবা সম্পাদনে ব্যস্ত ছিলেন। এক পর্যায়ে তিনি সম্মত হন যে, মেডিক্যাল চিকিৎসা নিবেন। তিনি হাসপাতালে তার সময় অতিবাহিত করতেন ডাক্তার, নার্স, রােগীদের সঙ্গে কৃষ্ণভাবনা বিষয়ক কথা বলার মাধ্যমে।

জয়ানন্দ ক্রমাগত ভাবতেন কিভাবে রথযাত্রাকে অন্যান্য শহরগুলােতে বিস্তার করা যায়। তার শেষ মাসগুলােতে তিনি লস্এঞ্জেলসে রথযাত্রা আয়ােজনে সহায়তা করেছিলেন, এদিক ওদিক ফোন করে, অর্থ সংগ্রহ আর ভক্তদের দিক নির্দেশনা দানের মাধ্যমে। একদিন তিনি ভেনিস বীচের উপর দিয়ে হাঁটছিলেন, যেখানে রথযাত্রা উৎসব অনুষ্ঠিত হবে। তিনি চারদিক দেখে বললেন, “কি সুন্দর রথযাত্রা!” যেন তিনি পুরাে উৎসবটি পূর্বেই দর্শন করলেন।

১ মে ১৯৭৭, রথযাত্রা উৎসবের ঠিক কয়েক মাস পূর্বে জয়ানন্দ এই পৃথিবী থেকে অপ্রকট হন। জয়ানন্দের প্রয়ানের পর, এক পত্রে শ্রীল প্রভুপাদ তার মহিমান্বিত জীবন স তাঁর মহিমান্বিত মৃত্যু সম্পর্কে স্বাগত জানান। যেহেতু জীবন ও মৃত্যুর সন্ধিক্ষনেও তিনি ছিলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেবায় সম্পূর্ণরূপে নিমগ্ন। প্রভুপাদ আদেশ করলেন যে, জয়ানন্দের তিরােভাব দিবস অন্যান্য বৈষ্ণবের তিরােভাব দিবসের মত উদ্যাপন করা হবে। কেননা শ্রীল ভক্তিবিনােদ ঠাকুর বলেছেন-

“তারাই মূখ যারা বলে যে বৈষ্ণবের মৃত্যু হয়েছে, যখন অন্যদের ক্ষেত্রেও তাই ঘটছে। একজন বৈষ্ণব বাঁচার জন্যই মৃত্যুবরণ করেন এবং পবিত্র নাম সমগ্র পৃথিবীতে প্রচারের জন্য আত্মত্যাগ করেন।”

জয়ানন্দ সম্পর্কে আমি যখন ভাবি, আমার সামনে এই দৃশ্যটি ভেসে উঠে : কোথাও ইস্কনের একটি রথযাত্রা প্রায় শুরুর পথে, শঙ্খধ্বনি বেজে উঠল, আর তখন সবাই জয় জগন্নাথ’ বলে চিৎকার করে উঠল, যে ধ্বনি গগন ভেদ করল। তখন চিন্ময় জগৎ থেকে জয়ানন্দ শ্রীল প্রভুপাদের দিকে তাকালেন। শ্রীল প্রভুপাদ তখন হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়িয়ে তাঁকে বললেন “তােমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।” 

 

ত্রৈমাসিক ব্যাক টু গডহেড, জুলাই -সেপ্টেম্বর ২০১৩

 

 

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here