একাদশী একটি কি শুধুই উপবাস?

0
63

বিজ্ঞানীরা কি বলেন?

একাদশী উপবাস নিয়ে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করলেন বিজ্ঞানীরা?

অমর নাথ দাস


গণেশ চতুর্থী (যে দিবসে গণেশের আবির্ভাব হয়েছে), নাগ পঞ্চমী, ওড়ন ষষ্ঠী, অদ্বৈত সপ্তমী, রাধাষ্টমী, রাম নবমী, বিজয়া দশমী এবং সর্বশেষ একাদশী। অতএব বিভিন্ন সংখ্যানুসারে বিভিন্ন উৎসব নির্দিষ্ট রয়েছে। তবে অভ্যন্তরীন যে অর্থটি রয়েছে সেটি হলো “একাদশ’ অর্থ ‘এগার’ এবং ‘উপবাস’ শব্দে ‘উপ’ অর্থ হলো ‘নিকটে’ ও ‘বাস’ অর্থ ‘বাস করা’ অর্থাৎ, একদশীর অর্থ হলো আমাদের একাদশ ইন্দ্রিয় দিয়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সন্নিকটে অবস্থান করা। একাদশ ইন্দ্রিয়গুলো হলো- পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্ৰিয় (বাক্, পানি, পাদ, উপস্থ, পায়ু) ও মন। মাঝে মাঝে অনেক লোক প্রশ্ন করে শুধুমাত্র উপবাস থাকার মাধ্যমে আপনারা ভগবানকে কিভাবে সন্তুষ্ট করতে পারেন? উপবাস থাকার মাধ্যমে তো কৃষ্ণকে লাভ করা যায় না। কিন্তু পদ্ধতিটি হলো একাদশী দিবসে ভক্ত কৃষ্ণসেবায় এতোই নিবিষ্ট থাকেন যে, জীবনের সাধারণ জৈবিক চাহিদাগুলো যেমন আহার-নিদ্রা পর্যন্ত তার কাছে গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। ভক্ত চাহিদাগুলো দূরে সরিয়ে একাদশ ইন্দ্রিয় দিয়ে ভগবানের শ্রীপাদ পদ্মের সেবা বর্ধিত করেন।

একাদশী শব্দের অনেক অর্থ রয়েছে এর মধ্যে আমি দুটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থ নিয়ে আলোচনা করব। বাহ্যিকভাবে একাদশীর অর্থ হলো একদশীর দিনে রবি শস্যাদি বর্জন করে উপবাস থাকা। তবে এক্ষেত্রে আভ্যন্তরীন যে অর্থটি রয়েছে সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একাদশীকে যদি সংখ্যাগতভাবে বিবেচনা করা হয় তা হবে ১+১০=১১। আশ্চর্যজনকভাবে জ্যোতির্বিদ্যা অনুসারে পবিত্র যে তিথিগুলো রয়েছে সেগুলো একেকটি সংখ্যা হিসেবে পরিচিত যেমন- অক্ষয় তৃতীয়া,

বৈজ্ঞানিক প্রেক্ষাপটে একাদশী

বিজ্ঞানে ডি.এন.এ গবেষণায় জাঙ্ক ডি.এন.এ নামে একটি ধারণা প্রচলিত রয়েছে। ডি.এন.এ মূলত আমাদের শারীরিক বৈশিষ্টের তথ্য প্রদান করে থাকে। কিন্তু সেই ডি.এন.এ এর মধ্যে একটি অংশ রয়েছে যেটি শরীর সম্পর্কে কোনো তথ্যই (নাক, জিভ, চোখ, কান ও ত্বক), পঞ্চ কর্মেন্দ্ৰিয় প্রদান করে না এবং সে অংশটিকে বলা হয় জাঙ্ক ডি.এন.এ। আসলে অনেক বিজ্ঞানী এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে বলে থাকে ভগবানের কোনো অস্তিত্ব নেই। কেননা যদি ভগবানের অস্তিত্ব থাকে এবং তিনি যদি সৃষ্টিকর্তা হয়ে থাকেন তবে তার সৃষ্টির সবকিছুই সঠিক বা যথাযথ হতে হবে। কিন্তু ভুলটা হচ্ছে এখানেই। দেখুন ডি.এন.এ এর মধ্যে এই অংশটি অর্থাৎ জাঙ্ক ডি.এন.এ কোনো তথ্যই বহন করে না। তবে আপনাদের স্বয়ংসম্পূর্ণ ভগবান কেন এরকম অপ্রয়োজনীয় ডি.এন.এ এর অংশটি সৃষ্টি করলেন? এজন্যে এটিকে বলা হয় ডি.এন.এ। এমনকি অনেক বিজ্ঞানী এটিকে ভগবানের ভুল হিসেবে ব্যাখ্যা করে থাকে।
বিজ্ঞান মতে আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষে বিভক্ত হলে সেই বিভক্ত কোষ পুনরায় বিভক্ত হয় এবং এভাবে চলতেই থাকে। কিন্তু সাম্প্রতিক ক বিজ্ঞান অনুসারে বলা হয়, এটি অসম্ভব যে, অসীমভাবে এই প্রক্রিয়া চলতেই থাকবে। প্রতি বার একটি কোষ যখন বিভক্ত হয় তখন জাঙ্ক বি ডি.এন.এ এর একটি ক্ষুদ্র অংশ হারিয়ে যায় এবং প্রতিবার যখন এই ক্ষুদ্র অংশ হারিয়ে যায় তখন আপনার আয়ুষ্কালও ধীরে ধীরে কমতে থাকে। অর্থাৎ, আমাদের শরীরে জাঙ্ক ডি.এন.এ থাকবে আবার সে সাথে যত কমপরিমানে এই জাঙ্ক ডি.এন.এ হারিয়ে যাবে তত বেশি আমাদের আয়ুষ্কাল হবে।
পরবর্তীতে বিজ্ঞানীরা এই ধারণায় উপনীত হয় যে, কোষগুলো এভাবে চিরতরে অব্যাহত থাকে না বরং এগুলোর বিভক্তিকরণ ঘটে বড়জোেড় ৪০ থেকে ৪২ বার এবং এক সময় এরূপ বিভক্তি করণের শেষের দিকে এসে জাঙ্ক ডি.এন.এ সম্পূর্ণরূপে হারিয়ে যায়। তবে এই জাঙ্ক ডি.এন.এ এর সৃষ্টির উদ্দেশ্যই বা কি? পরবর্তীতে আরো গভীরভাবে বিষয়টি নিয়ে গবেষণার পর তারা দেখে যে, এটি একটি কেসিংয়ের মতো কাজ করে যেটি ডি.এন.এ এর দুই পাশের তথ্যগুলোর সুরক্ষা প্রদান করে। দেখুন কৃষ্ণের কি সুন্দর সৃষ্টি! যেইমাত্র ডি.এন.এ এর ঐ অংশটি অর্থাৎ, জাঙ্ক ডি.এন.এ হারিয়ে যায় তখন আপনার মৃত্যু অনিবার্য। এভাবে বিজ্ঞানীরা জীবনের আয়ুষ্কাল বৃদ্ধির জন্য অনেক গবেষণা করেন। জীবনের আয়ুষ্কাল বৃদ্ধির জন্য তারা দু’টি কাজ করে। একটি হলো কোষের বিভক্তিকরণের হার হ্রাস করা। কেননা বিভক্তি-করণ যত কম হবে তত্ত্ব কম পরিমাণে জাঙ্ক ডি.এন.এ হ্রাস পাবে। দ্বিতীয়টি হলো যদি জাঙ্ক ডি.এন.এ হ্রাসও পাই তবে তা যেন অনেক ক্ষুদ্র পরিমানে হয়। এভাবে একটা মানুষের আয়ুষ্কাল অনেক বৃদ্ধি পাবে। বৈজ্ঞানিক ভাষায় এই জাঙ্ক ডি.এন.এ কে টেলোমার হিসেবে অভিহিত করা হয়। আপনারা বিষয়টি নিয়ে গুগলে অনুসন্ধান করতে পারেন। এমনকি এই বিষয়টি যারা আবিষ্কার করেছেন তাদেরকে ২০০৯ সালে নোবেল পুরষ্কার প্রদান করা হয়।
তারা গবেষণা করতে শুরু করে কিভাবে কোষের বিভক্তিকরণ ও টেলোমার হ্রাসের পরিমাণ কমানো যায়। অবশেষে পুনঃ পুনঃ গবেষণার মাধ্যমে তারা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, যদি এই দুটি জিনিষের হ্রাস করতে হয় তবে আপনার শরীরে ক্যালরি কমাতে হবে। এটি সরাসরিভাবে ক্যালরি ইনটেক্ এর সঙ্গে সম্বন্ধীয়। ক্যালরি যত বেশি অক্ষত থাকবে ততবেশি পরিমাণে টেলোমার হ্রাস পেতে থাকবে বা কোষ বিভক্তিকরণ দ্রুত হতে থাকবে। যদি ক্যালরি কম অক্ষত থাকে তবে এই গবেষণার পর দু’টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে। প্রথমটি হলো যারা মাংসাহারী, মদ্যপায়ী, অত্যধিক মৈথুনে আসক্ত, নেশা আসক্ত তাদের ক্ষেত্রে অধিক পরিমাণে টেলোমার হ্রাস পায় এবং তারা মৃত্যুর দিকে দ্রুত ধাবিত হয়। অপরপক্ষে নিরামিষাশীদের ক্ষেত্রে খুব কম পরিমাণে তা হ্রাস পায় এবং তাদের আয়ুষ্কালও অধিক হয়, সুস্বাস্থ্যবান হয় এবং বার্ধক্য দ্রুত আসে না।
বিষয়টি ব্যবহারিকভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য তারা ঐ ১৪ জন শিক্ষার্থীকে ব্যবহার করে। ১৪জন শিক্ষার্থীর ক্যালরি ইনটেক্ কমিয়ে আনা হয় এবং বিজ্ঞানীরা তাদেরকে নিয়ে ১৫ দিন যাবৎ গবেষণা করেন। এরপর যে ফলাফলটি আসে তা আশ্চর্যজনক এবং প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু একটি সমস্যা হলো শিক্ষার্থীদের ক্যালরি কম থাকায় তারা দুর্বল হয়ে পড়ে। ১৫ দিন পর পুনরায় শিক্ষার্থীরা পূর্ব খাদ্যাভাসে ফিরে আসে। এভাবে পুনঃ পুনঃ গবেষণার পর তারা দেখতে পায় যে, ১৫ দিনের যে ফলাফলটি পাওয়া গেছে সেই একই ফলাফল পাওয়া যাবে যদি কেউ ১ বা ২ সপ্তাহ অন্তর ৩৬ ঘণ্টা উপবাস থাকে। এই আবিষ্কারের জন্য তারা নোবেল পুরষ্কার পেয়েছিল। কৃষ্ণ এই উপবাসটির নাম করণ করেছেন ‘একাদশী’। এখন প্রশ্ন হলো একাদশী কিভাবে ৩৬ ঘণ্টা হয়? দশমীর সূর্যাস্ত থেকে একাদশীর সূর্যোদয় পর্যন্ত ১২ ঘণ্টা এবং ঐ দিবসেই বাকি ২৪ ঘণ্টা উপবাস থাকতে হয় এবং এরপরই পারণা করা হয়। অর্থাৎ একাদশী শুধু পারমার্থিক প্রেক্ষাপটে নয় বরং জাগতিক প্রেক্ষাপট থেকেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। যদি আপনি দীর্ঘায়ু লাভ করতে চান তবে অনুগ্রহ করে উপবাস থাকুন। বিজ্ঞানীরা দেখতে পায় যে, উপবাস থাকার ফলে কোষ বিভক্তকরণ প্রক্রিয়ার হারও হ্রাস পেতে থাকে। উপাবাসকারী স্বাস্থ্যবান ও দীপ্তিমান হয় এবং তাদের রোগব্যাধিও হ্রাস পায়। এমনকি বিজ্ঞানীরা এটিও মত পোষণ করেন যে, এই উপবাস প্রক্রিয়াটি অবশ্যই অনুশীলন করতে হবে ৮ থেকে ৮০ বছর বয়স পর্যন্ত প্রত্যেক ব্যক্তিকে। এই একই উক্তি প্রদান করা হয়েছে পদ্মপুরাণে।

টেলোমারের দৈর্ঘ্য প্রসারনে করণীয়

(১) আমিষ আহার বর্জন করে অধিক পরিমাণে শাকসবজি ও ফলমল গ্রহণ করা
(২) নেশা জাতীয় দ্রব্য যেমন-ধূমপান, মদ্যপান ইত্যাদি বর্জন করা
(৩) অতিরিক্ত মৈথুন পরিহার করা
(৪) উপবাস থাকা
(৫) প্রত্যহ কিছু সময়ের জন্য শারীরিক অনুশীলন করা
(৬) মানসিক চাপমুক্ত থাকার জন্য ধ্যান অনুশীলন করা (হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র জপ হলো এক্ষেত্রে সরোষ্ট পন্থা)
(৭) অত্যাহার পরিত্যাগ ইত্যাদি।

সুফল

১। কার্ডিওভাসকুলার রোগের ঝুঁকি হ্রাস পায়
২। বার্ধক্য সংক্রান্ত রোগ-ব্যাধি হ্রাস পায়
৩। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
৪। ক্যান্সার প্রতিরোধে সহায়ক
৫। অকাল বার্ধক্য রোধ হবে
৬। আয়ুস্কাল দীর্ঘ হয়

টেলোমার সম্পর্কে ধারণা
টেলোমার কি?

টেলোমার কোষের অভ্যন্তরে ক্রোমোজেমের দুই প্রান্তের শেষের দিকে একটি ক্যাপের মতো কাজ করে। এটি গঠিত হয় হেক্সামেরিক নিউক্লিওটাইড সিকোয়েল (মানুষের ক্ষেত্রে যেটি TTAGGG) দ্বারা। টেলোমার ক্রোমোজোমের প্রোটিন কোডিং পর্যায়ক্রম রক্ষা করে এবং পর্যায়ক্রমিক কোষ বিভাজনের সময় টেলোমোরের ছোট হয়ে আসার বিষয়টি কোষের আয়ুষ্কাল কেমন হবে তা নির্দেশ করে।

টেলোমার যেভাবে ছোট হয়

ডিএনএ শুধুমাত্র যেকোন এক দিকেই সমন্বয়ক সংশ্লেষণ করে থাকে। যখন ডিএনএ এর হেলিক্স বা প্যাচানো অবস্থা খুলে যায় তখন তার ফলে ডিএনএ পলিমেরাস প্রবেশ করে যেটি নিউক্লিওটাইডগুলোকে যুক্ত করে দুইটি সূত্র (Strand) তৈরি করে। এদের একটি অর্থাৎ শীর্ষ সূত্রে পলিমেরাস এর শেষ প্রান্তে ডিএনএ অনুকে ক্রমান্বয়ে কপি করে এবং ল্যাগিং বা পশ্চাতের সূত্রটিতে ক্রমান্বয়ে পলিমেরাস সংযুক্ত হতে থাকে। আর এটি হয় যখন ডিএনএ এর প্যাচ খুলে যায়। এবং এতে ইতোমধ্যে কপি করা হয়েছে এরকম ডিএনএ (অন্য নাম ওকাজাকি) এর দিকে পশ্চাতে নিউক্লিওটাইড দ্বারা পূর্ণ হয়। এক্ষেত্রে একটি সমস্যার সৃষ্টি হয় সেটি হলো, শীর্ষ সূত্রের প্রথম প্রিমার (Primer) কিংবা ল্যাগিং সূত্রের একেবারে শেষ প্রিমার পূর্ণ করতে শেষ বিট অপত্য (daughter) কোষগুলোতে কপি হয় না। ফলশ্রুতিতে ডিএনএ রেপ্লিকেশন এর জন্য কোনো পথ খোলা থাকে না। কারণ বন্ধন করার মতো এর আর কোনো ডিএনএ থাকে না। ফলে ক্রোমোজোমের শেষ প্রান্তে ডিএনএ পর্যায়ক্রমের টেপোমারগুলো ক্রমান্বয়ে ছোট হয়ে আসে (চিত্র-B)। সৌভাগ্যবশত টেলোমেরিক ডিএনএতে কোনো জিন বিদ্যমান থাকে না, তাই কোডিং তথ্য হারিয়ে যায় না। যখন টেলোমারগুলো অত্যন্ত ছোট হয়ে যায়, তখন কোষগুলো তাদের বিভাজন প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেয় কিংবা মারা যায়।

টেলোমার যেভাবে দীর্ঘ হয়।

টেলোমার ছোট হয়ে আসার প্রক্রিয়াটি বন্ধ করা যাবে এনজাইম টেলোমেরাস (TERT) এর মাধ্যমে। এটি একটি ট্রান্সক্রিপটেট্স যেটি একটি আরএনএ টেম্পলেট ব্যবহার করে এবং ক্রোমোজোমের প্রান্তদ্বয়ের প্রসারণ ঘটায় অতিরিক্ত টেলোমেরিক পর্যায়ক্রমের মাধ্যমে (চিত্র-গ)।
এই প্রক্রিয়া কোষগুলোর আয়ুষ্কাল বাড়িয়ে দিয়ে টেলোমার ছোট হয়ে আসার বিপরীতে কাজ করে। বিভিন্ন ধরনের উপবাস পদ্ধতি আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের পতঞ্জলী সূত্র অনুসারে মাংসাহারীরা ১ মাস উপবাস থাকা উত্তম এবং উপবাস শেষ করতে হবে সূর্যাস্তের পর আশ্চর্যজনকভাবে বিশ্বে এরকম ধর্মাবলম্বী আমরা দেখতে পাই যারা মাংসাহারী এবং সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত উপবাস পালন করে ১ মাস পর্যন্ত। এটি খুবই বিজ্ঞান সম্মত এবং বেদেরও অনুমোদিত। এমনকি পতঞ্জলী সূত্রে এটিও বলা। হয়েছে যে, যারা নিরামিষাশী তাদেরকে ১ বা ২ সপ্তাহ অন্তর এক বারের জন্য হলেও সম্পূর্ণ উপবাস থাকা উত্তম। সেখানে বিভিন্ন স্তরের উপবাস সম্পর্কে বর্ণনা রয়েছে। পারমার্থিক প্রেক্ষাপট থেকে কষ্টসাধ্য হলেও সর্বোত্তম উপবাস পদ্ধতি হলো নির্জলা উপবাস। পারমার্থিকভাবে কিভাবে সমৃদ্ধ হওয়া যায় সেই গতিবিধি আমাদের অবলম্বন করতে হবে। অর্থাৎ, দেহ হয়তো উপবাস করছে কিন্তু হরিনাম জপ-কীর্তনের মাধ্যমে আমরা যেন আত্মাকে আহার প্রদান করি। দ্বিতীয়টি হলো নির্জলা উপবাস থাকতে অসমর্থ হলে জল পান করে উপবাস থাকা। তৃতীয়ত হলো শুধু জল নয় এর সাথে বিভিন্ন ফলের রস পান করে উপবাস থাকা চতুর্থত অসমর্থপক্ষে বিভিন্ন ফলাদি গ্রহণ করে উপবাস থাকা যায় পঞ্চমত হলো রবি শস্য বর্জন করে অন্যান্য খাদ্য আহারের মাধ্যমে উপবাস থাকা। আমাদেরকে দেখতে হবে উপরোক্ত স্তরগুলোর মধ্যে আমি কোন্ স্তরে উপনীত হওয়ার যোগ কি ত্তু যোগসূত্র অনুসারে এবং সেসাথে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুসারে নির্জলা উপবাস থাকাও শরীরের জন্য ততটা ভাল নয়। এমনকি যদি আপনি উপবাস থাকতে উদ্যোগী হন তবে অন্তত উষ্ণ জল পান করতে পারেন। কেননা আপনার শরীরে হজমী রস উৎপাদন হচ্ছে এবং সেসাথে পাকস্থলীতে এসিডও জমা হচ্ছে। যদি পাকস্থলীতে এসিড জমা হয় তবে সেটি শরীরের জন্য তত ভাল নয়। যদি আপনি উষ্ণ জল পান করেন তবে পাকস্থলীর ঐ এসিডগুলো জলের সাথে মিশ্রিত হয় এবং সময়ে সময়ে যেকোনো উপায়ে বের হয়ে যায়। শাস্ত্রানুসারে জল হচ্ছে এমন একটি বস্তু যদি আপনি তা গ্রহণ করেন তবে তা একই সাথে উপবাস থাকা আবার উপবাস ভঙ্গ করা হিসেবে গ্রহণযোগ্য। এর উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হলো মহারাজ অম্বরীয়। পরম বিষ্ণুভক্ত অম্বরীষ মহারাজ কোনরূপ আহার ব্যতীত একাদশী পালন করতে অভ্যস্ত ছিলেন।

একাদশী পারণার নিয়ম

আপনি একাদশী ভঙ্গ করতে পারেন সে সমস্ত আহার্য দ্রব্য দ্বারা যা একাদশীর দিনে গ্রহণ করা হয় না। যেমন, আপনি যদি নির্জলা উপবাস থাকেন, তবে পরদিন একাদশী উপবাসের পারণা করতে পারেন জল গ্রহণের মাধ্যমে। যদি আপনি শুধুমাত্র ফলের রস খেয়ে একাদশী থকন, তবে ফল খেয়ে একাদশীর পারণা করতে পারেন। যদি শুধুমাত্র সাগুদানা খেয়ে একাদশী উপবাস থাকেন তবে পরদিন শষ্যাদি গ্রহণের মাধ্যমে পারণা করতে পারেন। আর যদি একাদশীর দিন শষ্যাদি গ্রহণ করেন তবে আপনি নরকগামী হবেন। একাদশীর উপবাস করলে পরবর্তী দিন নির্দিষ্ট সময়ে পারণ করা বিধেয় অম্বরীষ মহারাজ ও দুর্বাসা মুনির কাহিনি থেকে আমরা দেখতে পাই যে, যখন দুর্বাসা মুনির আগমন ঘটে তখন ছিল একাদশীর পারণার সময়। এদিকে দুর্বাসা মুনি যখন প্রাতঃস্নানে যান তখন পারণার সময় প্রায় অতিবাহিত হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু দুর্বাসা মুনি ছিলেন অতিথি। তাই অতিথিকে অভুক্ত রেখে তিনি কোনো কিছু গ্রহণ করতে পারছিলেন না এভাবে এক সঙ্কটময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। এমতাবস্থায় তিনি সমস্ত বৈষ্ণবদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করেন। তখন জ্যেষ্ঠ ব্রাহ্মণ বৈষ্ণবগণ পরামর্শ দিলেন হয় একাদশীকে না হয় বৈষ্ণবকে (দুর্বাসা মুনি) বেছে নিন। পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত হয় হয়। একাদশী উপবাস ভঙ্গ করতে হবে। কিন্তু জল গ্রহণের মাধ্যমে উপবাস ভঙ্গ করতে হবে। এভাবে ভক্ত পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে। কেননা, পারণা হিসেবে জলগ্রহণ করার মানে হলো আপনি। একাদশী ভঙ্গ করছেন আবার ভঙ্গ করছেন না।

জল পান বিষয়ক কিছু তথ্য

পতঞ্জলীর সূত্রে জলের গুরুত্ব সম্পর্কে উল্লেখ রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে জল কখনো সরাসরি কণ্ঠ দিয়ে পান করা উচিত নয়। মুখের মধ্যে রেখে জল পান করা নিরাপদ ও উত্তম। যদি আপনি সরাসরি জল পান করেন, তবে সেটি ভাল নয়। কিন্তু যদি আপনি মুখের মধ্যে রেখে লালা মিশ্রিত করে জল পান করেন, তবে তা উত্তম। মুখের মধ্যে রেখে ধীরে ধীরে কণ্ঠ দিয়ে প্রবাহিত করতে হয়। এর কারণ হলো আমাদের মুখের লালার একটি জাদুকরি শক্তি রয়েছে। যদি মুখগহ্বরে কোন ক্ষত সৃষ্টি হয় তখন ঔষধ ব্যতীতই অধিকাংশ সময় ভাল হয়ে যায়। মাঝে মাঝে জিহ্বায় কামড় পড়লে বা মুখের আভ্যন্তরীণ মাংসপেশীতে কামড় খেলে, সে ক্ষতগুলো খুব বেশি দিন থাকে না। কিন্তু শরীরের ঐ অন্যান্য বাহ্যিক অঙ্গে এই ধরনের ক্ষতগুলো শুকাতে দীর্ঘ দিন লাগে। মুখের অভ্যন্তরের লালার এই রকম আশ্চর্যজনক প্রভাব রয়েছে যে, শুধুমাত্র এর উপস্থিতিতে ক্ষতগুলো আপনা আপনিই সেরে উঠে । অতএব, আপনি যখন মুখের মধ্যে রেখে জলপান করেন তখন সেই লালা জলের সাথে মিশ্রিত হয়ে পাকস্থলী তথা গ্যাস্ট্রোইন্টেটাইনাল ট্র্যাকে গিয়ে পৌঁছে। তারপর কল্পনা করুন এর ফলে কি সুফল আপনি ভোগ করতে পারেন। অ্যাসিডিটি, আলসারের মতো রোগগুলো সেরে ওঠে। এই কারণে প্রকৃতিতে আমরা দেখতে পাই কোন পশু-পাখি সরাসরি জল পান করে না। তারা একটু একটু করে জল চেটে চেটে খায়। কিন্তু আমরা সে সমস্ত বিষয়গুলো লক্ষণ করি না। পাখি, কুকুর, বাঘ, গরু ইত্যাদি প্রাণীদের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, তারা একটু করে জল মুখে নেয়, এর স্বাদ আস্বাদন করে এরপর তা পান করে। অর্থাৎ তারা প্রথমে জলকে লালার সাথে মিশ্রিত করে এরপর পান করে।
পতঞ্জলি সূত্রে এটিও বলা হয়েছে যে, ঘুম থেকে উঠে খালি পেটে জল পান করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেন না সারা দিন-রাত উপবাস থাকার পর পাকস্থলীতে অনেক গ্যাস জমা হয়। এমনকি গ্যাসগুলোর শব্দও মাঝে মাঝে শোনা যায় মঙ্গলারতির সময় অর্থাৎ খুব ভোরে একটু মনোযোগী হলে তা আপনি বুঝতে পারবেন। তাই ঘুম থেকে উঠার সঙ্গে সঙ্গে যদি আপনি জল পান করেন তবে, তা গ্যাস বেরিয়ে যেতে সহায়তা করে। জল পান করার অনেক সুফল রয়েছে তবে এর কুফলও রয়েছে যদি আমরা এই সংক্রান্ত ভুল করে থাকি। আমরা সাধারণত খাদ্য গ্রহণের পরপরই জল পান করতে অভ্যস্থ যা শরীরের জন্য বিষবৎ আমরা যখন খাদ্য গ্রহণ করি তখন পাকস্থলীর হজম অগ্নি তার কার্য শুরু করে। আপনি খাচ্ছেন তো খাচ্ছেন আর এদিকে হজম অগ্নি সেগুলোকে দহন বা পরিপাক করছে। এই প্রক্রিয়ায় খাদ্য হজম হয় এবং পুষ্টিগুলো রক্তে সঞ্চারিত হয়। হজম প্রক্রিয়া চলাকালীন যদি জল ঢেলে দেওয়া হয় তবে সেটি জঠরাগ্লিকে নিভিয়ে নিষ্ক্রিয় করে দেয়। ফলে খাদ্যগুলো যথাযথভাবে হজম হওয়ায় পাকস্থলীতে পঁচে যায়, সেখান থেকে রোগজীবাণু সৃষ্টি হয়। আর যখন এ সমস্ত রোগ জীবাণুর উৎপত্তি হয় তখন বিভিন্ন ধরনের ব্যাধির সৃষ্টি হয় অতএব উপরোক্ত পন্থায় জল পানের সদ্ব্যবহার করে একাদশী ব্রত উদযাপন করা যায়।

একাদশীতে রবিশস্য বর্জন প্রসঙ্গে বৈজ্ঞানিক প্রেক্ষাপট

জ্যোতির্বিদ্যা অনুসারে চন্দ্রের আকর্ষণের কারণে জোয়ার ভাটা হয় যদিও আমরা জানি চন্দ্রের কারণে ফসলের মধ্যে স্বাদের সৃষ্টি হয়। বিজ্ঞান অনুসারে চন্দ্রের আকর্ষণে জোয়ার ভাটা হয় এবং সে আকর্ষণটি সর্বোচ্চ দশমী থেকে দ্বাদশী সময় কালের মধ্যে এর অর্থ হলো চন্দ্রের সর্বোচ্চ আকর্ষণ বা টানের মাধ্যমে সর্বোচ্চ জোয়ার সৃষ্টি হয় একাদশী তিথিতে। এক্ষেত্রে রবি শস্যের একটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে যে তারা জল ধারণ করে এবং এমনকি আহারের পরও সেই বৈশিষ্ট্যটি রয়ে যায় সেগুলো পাকস্থলী থেকে বেরিয়েও আসে না আমরা এটিও জানি যে, আমাদের শরীরে ৭০-৮০ ভাগ জল রয়েছে। এর মধ্যে আপনি যদি জল ধারণ করে এমন খাদ্য গ্রহণ করেন তবে আপনার শরীরে জলের পরিমান বেড়ে যায়। ফলে ঐ দিন চন্দ্রের আকর্ষণের ফলে আমাদের শরীরে কি দুর্ভোগ সৃষ্টি হতে পারে একটু ভাবুন? শরীরের কথাই বাদ দিন বিশাল মহাসাগরের জলরাশি ফেপে উঠে জোয়ারের সৃষ্টি হয়। সেক্ষেত্রে আমাদের শরীরে ২% জল রয়েছে। এমনকি বিজ্ঞান ও চিকিৎসকদের মতে অধিকাংশ রোগ-ব্যাধির সূত্রপাত ঘটে অথবা বেড়ে যায় একাদশী দিবসে রবিশস্য গ্রহণের কারণে পক্ষান্তরে একাদশীতে যদি ফলমূল খাওয়া হয় তবে কি প্রতিক্রিয়া হয়? ফলমূলে যে পরিমান জল থাকে তা শরীর থেকে মূত্রের মাধ্যমে বা অন্যকোনো উপায়ে খুব সহজে বের হয়ে যেতে পারে। কিন্তু রবিশস্য জলগুলো ধারণ করে থাকে এবং হজম প্রক্রিয়ার দুর্ভোগের সৃষ্টি করে। উল্লেখ্য  রবিশস্য যেমন ধান ফলানোর ক্ষেত্রে এবং এমনকি রান্না করার সময়ও অধিক জলের প্রয়োজন হয় এবং এমনকি রান্না করার পরও অন্নের মধ্যে অধিক জল ধারণ হয়ে থাকে।
শাস্ত্রে একাদশী প্রসঙ্গ পদ্মপুরাণে একাদশী প্রসঙ্গে বলা হয়েছে একসময় জৈমিনি ঋষি তাঁর গুরুদেব মহর্ষি ব্যাসদেবকে জিজ্ঞাসা করলেন, হে গুরুদেব! একাদশী কি? একাদশীতে কেন উপবাস করতে হয়? একাদশী ব্রত করলে কি লাভ? একদশী ব্রত না করলে কি ক্ষতি? এই সব বিষয়ে আপনি দয়া করে বলুন।”
মহর্ষি ব্যাসদেব তখন বলতে লাগলেন-“সৃষ্টির প্রারম্ভে পরমেশ্বর ভগবান এই জড় সংসারে স্থাবর, জঙ্গম সৃষ্টি করলেন। মর্ত্যলোকবাসী মানুষদের শাসনের জন্য একটি পাপপুরুষ নির্মাণ করলেন। সেই পাপপুরুষের অঙ্গগুলি বিভিন্ন পাপ দিয়েই নির্মিত হল। পাপপুরুষের মস্তক ব্রহ্মহত্যা পাপ দুই চক্ষু মদ্যপান, মুখ স্বর্ণ অপহরণ, দুই কর্ণ-গুরুপত্নী গমন, দুই নাসিকা-স্ত্রীহত্যা, দুই বাহু-গো হত্যা পাপ, গ্রীবা—ধন অপহরণ, গলদেশ-ভ্রণহত্যা, বক্ষ —পরস্ত্রী-গমন, উদর-আত্মীয়স্বজন বধ, নাভি শরণাগত বধ, কোমর-আত্মশ্লাঘা, দুই উরু গুরুনিন্দা, শিশু-কন্যা বিক্রি, মলদ্বার-গুপ্তকথা প্রকাশ পাপ, দুই পা—পিতৃহত্যা, শরীরের রোম সমস্ত উপপাতক। এভাবে বিভিন্ন পাপ দ্বারা ভয়ঙ্কর পাপপুরুষ নির্মিত হল।
পাপপুরুষের ভয়ঙ্কর রূপ দর্শন করে ভগবান শ্রীবিষ্ণু মর্ত্যের মানব জাতির দুঃখ মোচন করবার কথা চিন্তা করতে লাগলেন। একদিন গরুড়ের পিঠে চড়ে ভগবান চললেন যমরাজের মন্দিরে । ভগবানকে যমরাজ উপযুক্ত স্বর্ণ সিংহাসনে বসিয়ে পাদ্য অর্থ ইত্যাদি দিয়ে যথাবিধি তাঁর পূজা করলেন।
যমরাজের সঙ্গে কথোপকথনকালের ভগবান শুনতে পেলেন দক্ষিণ দিক থেকে অসংখ্য জীবের আর্তনাদ ধ্বনি। প্রশ্ন করলেন—“এ আর্তনাদ কেন?” যমরাজ বললেন, “হে প্রভু, মর্ত্যের পাপী মানুষেরা নিজ কর্মদোষে নরকযাতনা ভোগ করছে।”
ভগবান বিষ্ণু তখন যমরাজকে বললেন, “কিভাবে এই নারকীয় যন্ত্রণা থেকে এই সমস্ত পতিত জীবরা উদ্ধার পাবে?” তখন যমরাজ বললেন, “আমি তো জানি না। আপনি আমার আরাধ্য ভগবান, এ বিষয়টি কিভাবে সমাধান করা যায় তা আপনিই একমাত্র বলতে পারেন।” এভাবে বিষ্ণু যখন গভীর ভাবনায় নিমগ্ন হন তখন তার হৃদয়ের অনুকম্পা থেকে এক নারী শক্তির প্রকাশ ঘটে। তখন সেই নারী শক্তি বলেন “এই দিবসে কেউ যদি পারমার্থিক কার্যকলাপের মাধ্যমে আমার প্রভু বিষ্ণুর অনুসন্ধান করে তবে আমি প্রতিজ্ঞা করছি। যে, আমি তার সমস্ত পাপ বিদূরিত করব।”
তখন নরকের সে সমস্ত পাপী একনিষ্ঠভাবে এই বাণী গ্রহণ করে ভগবান বিষ্ণুর পবিত্র নাম করতে লাগলেন এবং এর মাধ্যমে খুব দ্রুত তারা পাপ থেকে মুক্ত হন। তখন বিষ্ণু জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কে? তোমাকে কে প্রেরণ করেছে?” তিনি বলেন, “আমি আপনার সেবিকা এক দাসী।”
ভগবান বললেন, “তুমি কিভাবে আবির্ভূত হলে?” তখন একাদশী বলেন, “যে পতিত জীবদের জন্য আপনার হৃদয়ে ক্রন্দন হচ্ছে সেই হৃদয়ের অনুকম্পা থেকেই আমি প্রকাশিত হয়েছি। হে ভগবান, আমাকে এই বর দিন যে এই দিনে কেউ যদি আপনার পবিত্র নাম জপ কীর্তন করে। তবে তারা যেন এই নরকের জীবদের মতো সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত হয়ে আপনার ধামে প্রবেশ করতে পারে।” বিষ্ণু একাদশীর এই প্রার্থনা শ্রবণ করে বললেন, “তথাস্তু।”
শ্রীব্যাসদেব বললেন, “হে জৈমিনি! শ্রীহরি কে প্রকাশ এই একাদশী সমস্ত সুকর্মের মধ্যে শ্রেষ্ঠ এবং সমস্ত ব্রতের মধ্যে উত্তম ব্রত।”
কিছুদিন পরে ভগবানের সৃষ্ট পাপপুরুষ এসে শ্রীহরির কাছে করজোড়ে প্রার্থনা জানাতে লাগল “হে ভগবান! আমি আপনার প্রজা। আমাকে যারা আশ্রয় করে থাকে, তাদের কর্ম অনুযায়ী তাদে? করে — দুঃখ দান করাই আমার কাজ ছিল। কিন্তু সম্প্রতি অধি একাদশীর প্রভাবে আমি কিছুই করতে পারছি না, তুল বরং ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছি। কেননা একাদশী ব্রতের ফলে প্রায় সব পাপাচারীরা বৈকুণ্ঠের বাসিন্দা হয়ে যাচ্ছে। হে ভগবান, এখন আমার কি হবে? আমি কাকে আশ্রয় করে থাকব? সবাই যদি বৈকুণ্ঠে চলে যায়, তবে এই মর্ত্য জগতের কি হবে? আপনিই বা কার সঙ্গে এই মর্ত্যে ক্রীড়া করবেন?
পাপপুরুষ প্রার্থনা করল-“হে ভগবান, যদি আপনার সৃষ্ট এই বিশ্বে ক্রীড়া করবার ইচ্ছা থাকে তবে, আমার দুঃখ দূর করুন। একাদশী তিথির ভয় থেকে আমাকে রক্ষা করুন। হে কৈটভনাশন, মি একমাত্র একাদশীর ভয়ে ভীত হয়ে পলায়ন করছি। মানুষ, পশুপাখী, কীট-পতঙ্গ, জল-স্থল, বন-প্রান্তর, পর্বত-সমুদ্র, বৃক্ষ, নদী, স্বর্গ-মর্ত-পাতাল সর্বত্রই আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু দশীর প্রভাবে কোথাও নির্ভয় স্থান পাচ্ছি না দেখে আজ আপনার শরণাপন্ন হয়েছি।”
“হে ভগবান, এখন দেখছি, আপনার সৃষ্ট অনন্ত কোটি ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে একাদশীই প্রাধান্য লাভ করেছে, আমি কোথাও আশ্রয় পাচ্ছি না। আপনি কপা করে আমায় নির্ভয় স্থান প্রদান করুন।
পাপপুরুষের প্রার্থনা শুনে ভগবান শ্রীহরি বলতে লাগলেন— “হে পাপপুরুষ। তুমি দুঃখ করো না। যখন একাদশী তিথি এই ত্রিভুবনকে পবিত্র করতে আবির্ভূত হবে, তখন তুমি অনু ও রবিশস্যের মধ্যে আশ্রয় গ্রহণ করবে। তা হলে আমার মূর্তি একাদশী তোমাকে বধ করতে পারবে না।”
“একাদশী ব্রত এবং দ্বাদশী ব্রত পালন করার উদ্দেশ্য হল ভগবানের প্রসন্নতা বিধান করা। যাঁরা কৃষ্ণভক্তিতে অগ্রসর হতে চান, তাদের অবশ্য কর্তব্য নিয়মিতভাবে একাদশী ব্রত পালন করা।”
শ্রীমদ্ভাগবত ৯/৪/২৯ প্রভুপাদ তাৎপর্য পুরাকালে মূঢ়া নামে এক অসুর দেবতাদের আক্রমন করলে তারা ভগবান বিষ্ণুর শরণাগত হয়। তখন বিষ্ণু স্বয়ং সেই অসুরটির রাজ্য চন্দ্রাবতী আক্রমন করে। তাদের মধ্যে হাজার হাজার বছর যুদ্ধ হয়। অবশেষে মুষ্টিযুদ্ধের সময় বিষ্ণু ক্লান্ত হয়ে পড়লে বিশ্রামের জন্য বদ্রীকা আশ্রমে হিমাবতী নামে একটি গুহায় প্রবেশ করেন। ঐ বিশ্রামকালে মূঢ়া ভগবানকে ঐ গুহায় আক্রমণ করতে উদ্যত হলে ভগবানের বাম অঙ্গ থেকে এক দেবী প্রকাশিত হয়ে অসুরটির মস্তক ছিন্ন করেন। বিষ্ণু তখন নিদ্রা ভঙ্গ করে সেই দেবীকে জিজ্ঞাসা করেন, “যাকে আমি হাজার হাজার বছর যুদ্ধ করেও পরাস্ত করতে পারলাম না তাকে আপনি বধ করলেন।?” একাদশী মৃদু হেসে উত্তর দিলেন, “আমি আপনার কৃপা ও অনুকম্পার প্রতিমূর্তি আমি আপনার চেয়েও অধিক দ্রুত জীবকে মুক্ত করতে পারি।
এই একাদশীতে যারা ভগবানের পবিত্র নাম জপ করে তারা ভগবানের কৃপায় মুক্তি লাভের চেয়েও অধিক বড় কিছু লাভ করে। কেননা একাদশী ও তুলসী দেবী উভয়ই হলেন অধিক কৃপালু।
“যারা একাদশী দিবসে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নাম জপ-কীর্তন করে এবং তুলসী ও চন্দন দ্বারা ভগবানের বিগ্রহ আরাধনা করে তারা নিশ্চিত ভগবানের ধামে প্রত্যাবর্তন করবে।” –হরিভক্তিবিলাস তাই যারা একাদশী পালন করছেন তারা এই সুমঙ্গল লাভ করছেন, আর যারা করেন না তাদের জন্য অনতিবিলম্বেই এই ব্রত পালন করা কর্তব্য। সাধারণত একাদশী পালনের নিয়ম হলো দশমী ও দ্বাদশীতে একাহার এবং একাদশীতে নির্জলা উপবাস থাকা। অসমর্থপক্ষে দেহকে সচল রাখার জন্য যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু বিধি সম্মতভাবে আহার করা এবং আমাদের একাদশ ইন্দ্রিয় দিয়ে ভগবানের সেবায় যুক্ত থাকা। এজন্যে আমরা শাস্ত্র অধ্যয়ন, শ্রবণ ও বৈষ্ণব সঙ্গ করতে পারি। সম্ভব হলে পবিত্র তীর্থস্থান ভ্রমণ করতে পারি। ভগবানের নাম-কীর্তন, তুলসী দেবী ও ভগবানের অর্চা বিগ্রহের সেবা করতে পারি এবং দৈহিক প্রয়োজন হ্রাস করে আত্মার প্রয়োজন বৃদ্ধি করতে পারি বিনম্ৰতা, সহিষ্ণুতা সরলতা সহকারে বৈষ্ণবের সেবা করতে পারি।

লেখক পরিচিতি : শ্রীমান অমরনাথ দাস শ্রীল প্রভুপাদের শিষ্য শ্রীমৎ রাধাগোবিন্দ দাস গোস্বামী মহারাজের একজন শিষ্য। তিনি সারা বিশ্বের বিভিন্ন শহর, বিশ্ববিদ্যালয়, মন্দির, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ইউটিউব, হোয়াটস অ্যাপস ও ফেইসবুকে কৃষ্ণভাবনামৃত নিরলসভাবে প্রচার করে চলেছেন। বিশেষত বিজ্ঞান ও পারমার্থিকতার সম্মিলনে তার প্রবচনগুলো ছাত্র সমাজের জন্য বেশ বিখ্যাত। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তিনি ম্যাসাচুসেটস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর ওপর মাষ্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন এবং সেসাথে মায়াপুরে ভক্তিশাস্ত্রী ডিগ্রি লাভ করেন। তার জীবনের আমুল পরিবর্তনের জন্য বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ শ্রীল প্রভুপাদের শিষ্য শ্রীমৎ ভক্তিস্বরূপ দামোদর গেস্বামীর কাছে। তিনি তাঁকে এবং তার পরিবারকে কৃষ্ণভাবনা পালনের জন্য উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন। বর্তমানে তিনি আমেরিকার ইস্‌কন বোস্টনে নিয়মিত কৃষ্ণভাবনামৃতের ওপর প্রবচন প্রদান করেন।


 

এপ্রিল-জুন ২০১৭ ব্যাক টু গডহেড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here