একটি দুঃসাহসিক অভিযান

প্রকাশ: ১৬ জুন ২০১৮ | ৬:৩৯ পূর্বাহ্ণ আপডেট: ২১ জুন ২০১৮ | ৯:৪৭ পূর্বাহ্ণ

এই পোস্টটি 1147 বার দেখা হয়েছে

একটি দুঃসাহসিক অভিযান

১৯৮০সালে ধ্রুব তখন খুব ছোট । নব বৃন্দাবনের এক ভক্ত পরিবারে জন্ম নিল। শৈশব থেকেই নিকটস্থ ইস্‌কন মন্দিরেই আসা- যাওয়া শুরু। তবে নৃসিংহ দেবকে চিনতে লাগলেন আরেকটুু পরে । যখন তার বয়স ছয়, তখন সে শিখতে শুরু করেছে কিভাবে নৃসিংহদেবের উদ্দেশ্যে প্রাথর্না নিবেদন করতে হয়। অবশ্য তারও আগে তার মা-বাবা তাকে নৃসিংহদেব কিভাবে ভক্ত প্রহ্লাদকে রক্ষা করেছিল সেই ঘটনাটি শুনিয়েছিল। ভক্তপ্রহ্লাদ সর্বদা বিষ্ণুকে স্মরণ করতো বলে তার পিতা হিরণ্যকশিপু তার উপর অনেক অত্যাচার করেছিল । কখনো বা বিষ প্রয়োগে কখনো বা সাপের গর্তে নিক্ষেপ করে বা আগুনে পুড়িয়ে বা বিরাট পাথর বেঁধে সাগরে নিক্ষেপের মাধমে ডুবিয়ে ডুবিয়ে, মারধর করাসহ অনেক অত্যাচার করেছিল।কিন্তু পুনঃ পুনঃ চেষ্টার পরও পিতা হিরণ্যকশিপু তাকে মারতে ব্যর্থ হয়। কথায আছে না, “রাখে কৃষ্ণ মারে কে, মারে কৃষ্ণ রাখে কে”। পরবর্তীতে ভগবান নৃসিংহদেব (অর্ধেক মানুষঅর্ধেক সিংহ) একটি পিলার থেকে বের হয়ে অত্যাচারী হিরণ্যকশিপুকে বধের মাধ্যমে ভক্ত প্রহ্লাদকে রক্ষা করেছিলেন। নৃসিংহ দেবের এই অপ্রাকৃত লীলা দ্রব দাসের নৃসিংহদেবের প্রতি প্রবলভাবে আসক্ত হতে সাহায্য করেছিল। যখন শৈশবে উন্নীত হল তখনও তাঁর প্রাত্যহিক জীবনে নৃসিংহদেবে বিনা অন্য কোন কিছিুই যেন চিন্তা করতে পারতেন না। হঠাৎ একদিন ধ্রুব Back to godhead’ পত্রিকায় অহোভলামের (নৃসিংহদেবের আবির্ভাব স্থান) নয়টি নৃসিংহ বিগ্রহ সম্বলিত ইন্দ্রদ্যুন্ম স্বামী মহারাজের ঐ স্থান অভিযানের একটি দারুন লেখা পড়ে সিদ্ধান্ত নেন, তিনি অহোভলাম দর্শন করবেন। ভারতে পৌঁছানোর পর তিনি ইস্‌কন তিরুপতি মন্দির দর্শন করেন এবং সেখানে থেকেই অহোভলাম দর্শনের জন্র তিনি বেরিয়ে পড়েন। কিন্তু প্রথমদিকে অনেকেই তাকে ঐ ভয়ংকর স্থানে না যাওয়ার জন্য পরামর্শ দেয়। কেননা ঐ অঞ্চল ঘন অরণ্যে ঘেরা, তার উর রয়েছে হিংস্র প্রাণীর আক্রমনের অজানা আশঙ্কা। সে যখন অহোভলামের বাসে উঠল তখন বাসের সবাই তার ঐ স্থান ভ্রমনের কথা শুনে আঁতকে উঠে। তারা সবাই তাকে নিরাশ করে। এ যাবৎ ঐস্থানে যারা গেছে তাদের কেউই প্রাণ নিয়ে ফিরে আসতে পারেনি। কিন্তু ধ্রুব দাস নাছোড়বানাদ। তিনি ভাবলেন, নৃসিংহদেবের প্রতি কতটা তার বিশ্বাস আছে সেটি যাচাইয়ের জন্য এটি সেরা সুযোগ। অহোভলামের নিম্ন এলাকায় পৌঁছতেই গুটগুটে অন্ধকার হয়ে গেল। সেখানে মাধু নামের এক ভক্তের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। মাধু (রামানুজ সম্প্রদায়ের একজন ভক্ত) ও ধ্রুব সিন্ধান্ত নিল পরদিনই এই অহোভলামের ৯টি নৃসিংহ বিগ্রহ দর্শনের অভিযান শুরু করবে। মাধুকে উদ্দেশ্যে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করতে ভুললেন না। ইতোমধ্যেই প্রথম বিগ্রহ লক্ষ্মী নৃসিংহ দর্শন হয়েছে সেখানে থেকে বাকি বিগ্রহগুলো দর্শনের জন্য যাত্রা শুরু করলেন। পরবর্তীতে সেখানকার একজন নৃসিংহদেবের পূজারী তাদের একটি জঙ্গলের ভিতর দিয়ে নিয়ে গেলেন ভর্গব নৃসিংহদেবের মন্দিরে। এই বিগ্রহ ভগবানর পরশুরামের নামেই নামকরণ করা হয়েছিল। অতীতে বহু সাধু-সন্ন্যাসীরা এই বিগ্রহেই ভগবান পরশুরাম তার কৃচ্ছসাধনা করেছিলেন যেটি এখন রামতীর্থ নামে পরিচিত। পরবর্তীতে তাদের যাত্রা শুরু হয় ‘চট্রভধ নৃসিংহ’ বিগ্রহ দর্শনের জন্র এটিও ঐ স্থানে থেকে অনেক দূরে ছিল অবশেষে হাস্যোজ্জল চট্রভধ নৃসিংহদেব দর্শনের পর এর নিকটে অবস্থিত ‘যোগনন্দ’ নৃসিংহদেব দর্শন করে যেটি অহোভলামের নিম্ন অঞ্চলের মধ্যে সর্বশেষ বিগ্রহ। এরপর তাদের অভিযান শুরু হয় অহোভলামের উপরিভাগ। উপরিভাগেই এসে তারা সেখানে ঘন অরণ্য ছাড়া যেন আর কিছুই দেখতে পাচ্ছিল না। যথারীতি তারা এই বিপজ্জনক স্থানে প্রথমেই দর্শন করলেন ‘করঞ্জ নৃসিংহ’ বিগ্রহ। তার কিছু দূরেই দুই পর্বেতেরন মাঝখানে একটি গুহার মধেড্য ‘উগ্র নৃসিংহ’ বিগ্র দর্শন করে। এ বিগ্রহ দর্শনের জন্য তাদের অনেক হাটতে হয়েছিল। অনেক সময় বিপজ্জনক পাহাড় থেকে পিছলে পড়ার উপক্রমও হয়েছিল। ঐ স্থানটিতেই যতসব হিংস্র জীবজন্তুদের বসবাস। তবুও তারা জীবনের ভয় নরা করে নৃসিংহদেবের কৃপায় ‘উগ্র স্তম্ভ’ দর্শন করেছিলেন। যেই পিলার থেকে ভগবান নৃসিংহদেব বেরিয়েছিলেন সে পিলার দর্শনের মাধ্যমে তাদের উচ্ছাসের সীমা ছিল না। এর পাশেই তারা ‘বরাহ নৃসিংহদেব’ এর মন্দিরে বরাহ নৃসিংহদেব বিগ্রহ দর্শন করে। পরক্ষণেই তারা ‘যোওয়াল’ নৃসিংহদেব দর্শনের জন্য বেরিয়ে পড়ে। পাহাড়ী সুবিশাল। ঝর্না, উঁচু পাহাড় এবং যেসব লোকেরা আগে এখানে এসে মৃত্যুবরণ করে তাদের বক্সগুলো দর্শন করেও আঁতকে উঠেনি। বরঞ্চ তারা সামনের দিকেই এগিয়ে গেল, পালাক্রমে তারা ‘রক্ত কুণ্ড’ দর্শনের পর ‘মোহালোহা’ নৃসিংহ মন্দির দর্শন করে। শাস্ত্র মতে এ স্থানেই লক্ষ্মীদেবী ভগবানকে বিবাহ করার জন্য কৃচ্ছসাধনা করেছিলেন। ধীরে ধীরে তারা প্রহ্লাদের বিদ্যালয়, ‘যোগ’ নৃসিংহ বিগ্রহ এবং প্রহ্লাদের বিদ্যালয়ের দেয়ালে খোদাইকৃত সেই পুরানো সংস্কৃত লেখা দর্শন করে। এরপর তারা ‘ভবন’ মন্দিরে যেতে চাইলে গ্রামের কতিপয় লোকেরা তাদেরকে এ ভয়ংকর স্থানের বর্ণনা দিয়ে না যাওয়ার জন্য পরামর্শ দেয় প্রথমত ঘন অরণ্য তার উপরে গুটগুটে অন্ধকারময় রাত সব মিলিয়ে এক ভীতিপ্রদ স্থান, তাছাড়া রাতে নাকি সমস্ত দেবদেবীরা ঐ স্থানে ‘ভবন নৃসিংহকে’ দর্শন করতে আসে। কিন্তু নাছোড়াবান্দা ধ্রুব ও মাধু এক ফ্লাশলাইট জালিয়ে সবার নিষেধ সত্ত্বেও যাত্রা শুরু করলেন। গভীর বনে বিষাক্ত সাপের আক্রমন, ভয়ংকর সব প্রাণীদের হাত থেকে অনেকটা অবিশ্বাস্যভাবেই তারা রক্ষা পেয়েছিল। তারা পাহাড়ের চূড়ায় ঐ মন্দিরে একটি অদ্ভুদ আগুনের শিখা দেখতে পেয়েছিল। পরবর্তীতে যখন তারা এই মন্দির দর্শন করে তখন বাতাসের দশকা হাওয়া এসে সেই শিখা ও ফ্লাশ লাইটের আলো নিভিয়ে দিয়েছিল। এখন তারা অন্ধকারের মধ্যে রয়েছে। তারা বিগ্রহ দর্শনের পর ক্লান্তির ঘুম দিলে ধ্রুব দাস মাঝরাতে খেয়াল করে কে যেন তার ঘাড় এবং কান শুকছিল এবং স্পর্শ করছিল। কিছুক্ষণ পর দ্রুব দাস ভয়ে জেগে উঠলে তখন মাধু তাকে মন্দিরের ভিতর টেনে নিয়ে যায়। সেই রাতে ধ্রুব দাস মাঝে মাঝে কি যে হুংকারের শব্দও দাস মাঝে মাঝে কি যেন হুংকারের শব্দও শুনতে পেয়েছিল কিন্তু মাধু সেটি ধ্রুব দাসকে ‘ও কিছু না’ বলে উড়িয়ে দেয়। পরদিন সকালে ধ্রুব ঘুম থেকে উঠেই দেখে তিনি নৃসিংহদেবের ঠিক চরণতলে শুয়ে আছে। এরপর যথারীতি ‘গিরিধারী’ এবং ‘জয়োথী’ নামক আরও দুটি বিগ্রহ দর্শনের পর একটি দুঃসাহসিক ও সফল অভিযান শেষ করে অহোভলামের সেই আগের জায়গায় ফিরে আসে। যেখানে থেকে তারা তাদের অভিযান শুরু করেছিল। স্থানীয় গ্রামবাসীরা তাদের জীবন্ত ফিরে আসতে দেখে খুবই প্রথম অভিযাত্রীক যারা কিনা এরকম দুর্গম অভিযান শেষে প্রাণ নিয়ে ফিরে আসতে পেরেছে। ধ্রুব দাস যখন মাধুর কাছ থেকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে বিদায় নিয়ে ফিরে আসছিল। তখন কিছুদূর যেতে না যেতেই ধ্রুব দাস দৌড়ে এসে মাধুকে জিজ্ঞেস করল আসলে সেদিন রাতে কি হয়েছিল? তখন মাধু বলল কয়েকটা ভাল্লুক তাদের দু’জনকে শুকেছিল এবং মৃত ভেবে পরবর্তীতে চলে গিয়েছিল। সেই হুংকারগুলো ছিল ঐ সব ভাল্লুকগুলোর তাইতো মাধু তাকে টেনে ঐ সময় মন্দিরের ভিতর নিয়ে এসেছিল”। এ কথা শুনার পর ধ্রুব ও মাধু দু’জনই হাসতে থাকে। তাদের দুজনের এ হাসি কিসের ছিল? কি একটি দুর্গম পথে সফল অভিযানের জন্য? কিংবা নৃসিংহদেবের বিগ্রহ দর্শনের প্রবল উচ্ছাসের জন্য? নাকি সেদিন রাতের সেই ঘটনাটির জন্য? নাকি সেদিন রাতের সেই ঘটনাটির জন্য? কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না। তবে তাদের ক্লান্তির ছাপ দেখে এটুকুই বোঝা যাচ্ছিল যে এটি আসলে ছিল একটি দুঃসাহসিক অভিযান। হরে কৃষ্ণ ॥

(মাসিক চৈতন্য সন্দেশ মে ২০০৯ সালে প্রকাশিত)

সম্পর্কিত পোস্ট

‘ চৈতন্য সন্দেশ’ হল ইস্‌কন বাংলাদেশের প্রথম ও সর্বাধিক পঠিত সংবাদপত্র। csbtg.org ‘ মাসিক চৈতন্য সন্দেশ’ এর ওয়েবসাইট।
আমাদের উদ্দেশ্য
■ সকল মানুষকে মোহ থেকে বাস্তবতা, জড় থেকে চিন্ময়তা, অনিত্য থেকে নিত্যতার পার্থক্য নির্ণয়ে সহায়তা করা।
■ জড়বাদের দোষগুলি উন্মুক্ত করা।
■ বৈদিক পদ্ধতিতে পারমার্থিক পথ নির্দেশ করা
■ বৈদিক সংস্কৃতির সংরক্ষণ ও প্রচার। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ অনুসারে ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তন করা ।
■ সকল জীবকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ করানো ও তাঁর সেবা করতে সহায়তা করা।
■ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ অনুসারে ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তন করা ।
■ সকল জীবকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ করানো ও তাঁর সেবা করতে সহায়তা করা।