ইস্‌কন সিলেটের উদ্যোগে বন্যার্তদের মাঝে খাবার বিতরণ

0
39

বন্যাকবলিত মানুষদের মাঝে শুকনো ও রান্না করা খাবার, ঔষধ ও পানি বিতরণ

শ্রীমান সুলোচন কানু দাস: প্রবল বৃষ্টির পাশাপাশি পাহাড়ি ঢল অব্যাহত থাকায় বাংলাদেশের সিলেট ও সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল। এই বন্যা ১৯৮৮, ১৯৯৮ ও ২০০৪ সালের বন্যার ভয়াবহতাকেও ছাড়িয়ে গেছে। গত ১৫ জুন সপ্তাহব্যাপী প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢল নেমে আসায় বন্যার পানি বৃদ্ধি পেতে থাকে। এটি ছিল চলতি মৌসুমের তৃতীয় দফা বন্যা।

একের পর এক বন্যায় বিপর্যস্ত হয়েছে এ অঞ্চলের অসংখ্য মানুষ। আসাম ও মেঘালয়ে ২ হাজার ৫০০ মিলিমিটারেরও বেশি বৃষ্টি হয়েছে, যা গত ২৭ বছরের মধ্যে তিন দিনে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাতের রেকর্ড। এমন পরিস্থিতিতে তলিয়ে গিয়েছিল সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার লাখ লাখ মানুষের ঘরবাড়ি, ক্ষেতের ফসল ও গবাদিপশু। আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছিল লাখ-লাখ মানুষ। বন্যাকবলিত এলাকার মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে উঁচু স্থান, স্কুল ও আশ্রয়কেন্দ্রে মাথা গুজেছিল। তাছাড়া, অনেকেই কর্মহীন হয়ে পড়েছিল। হাতে কাজ নেই, ঘরে খাবার নেই, সংকট দেখা দিয়েছিল বিশুদ্ধ পানিরও। এ অবস্থায় বন্যাকবলিতদের উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা জোরদারের কোনো বিকল্প ছিল না। নগরীসহ সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলায় দীর্ঘদিন ধরে পানিবন্দি মানুষজন চরম খাদ্য সংকটে ভুগছিল। সংকটকালীন সময়ে সুরক্ষা প্রদান করাই প্রকৃত ধর্ম। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইস্‌কন) বরাবরের মত এবারও সাধারণ মানুষদের সহায়তায় পাশে দাঁড়িয়েছে। মন্দিরে খোলা হয়েছে আশ্রয় কেন্দ্র। যেখানে শতাধিক মানুষের আশ্রয় ও খাবারের সু-ব্যবস্থা ছিল।

বিভিন্ন সংকটকালীন সময়ে নিঃস্বার্থভাবে ব্যাপক সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে ইস্‌কন। করোনাকালীন সময়সহ বিভিন্ন সময়ে ইস্‌কনের পক্ষ থেকে সকলের মধ্যে বিনামূল্যে খাদ্য ও অনান্য সামগ্রী বিতরন করা হয়েছে। সেই মানবকল্যাণমূলক কর্মসূচির ধারবাহিকতা বজায় রেখে গত ১৮ জুন হতে বন্যার্তদের মাঝে এ পর্যন্ত ব্যাপক আকারে ত্রাণ সামগ্রী প্রদান করার মাধ্যমে ইস্‌কন বাংলাদেশর সহ-সভাপতি ও ইস্‌কন সিলেট মন্দিরের অধ্যক্ষ শ্রীমৎ ভক্তি অদ্বৈত নবদ্বীপ স্বামী মহারাজ একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। মহারাজের নেতৃত্বে মন্দিরবাসী ভক্তরা নিজেদের পারমার্থিক সাধনা সম্পূর্ণ করে ১৮ জুন থেকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে রান্না করা খাবারসহ চিড়া-মুড়ি, বিশুদ্ধ পানীয় জল, ঔষধপত্রাদি বিতরনের জন্য প্রতিদিন হাজারো বন্যার্তদের মাঝে ছুটে চলেছেন।

কখনো পায়ে হেঁটে কিংবা কখনো বা নৌকায় করে ত্রাণ সেবা দানকারী ভক্তরা পৌঁছে গিয়েছেন সেই সকল বন্যার্তদের মাঝে। একসাথে তাদের কষ্ট ভাগাভাগি করে নেওয়ার জন্য। উদ্দেশ্য একটাই, নিরন্ন মানুষের মুখে খাবার তুলে দিয়ে তাদের কষ্ট লাঘব করা। এমন দৃশ্য দৃষ্টিগোচর হয়েছে সিলেট শহরের বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্রে, কখনো সুনামগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলায়, কখনো বা প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে। প্রতিদিন ৮-১০টি ভাগে বিভক্ত হয়ে ছুটে ভক্তরা যাচ্ছেন বানভাসী ব্যক্তিদের নিকট।

খাদ্য বিতরণ কর্মসূচি পরিচালনার জন্য প্রস্তুতি শুরু করতে হয়েছে ভোররাত থেকে। কখনো ত্রাণ বিতরনকারী দলের সদস্যরা নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন নৌকায় কিংবা বন্যার্তদের সাথে আশ্রয়কেন্দ্রে। অনেক বিরূপ পরিস্থিতিতেও থেমে থাকেনি মানবসেবার অদম্য সংকল্প। সেই দৃঢ় সংকল্পের পরিচয় মেলে শ্রীমৎ ভক্তি অদ্বৈত নবদ্বীপ স্বামী মহারাজের করুণাদ্র বক্তব্যে। তিনি ব্যক্ত করেন, সিলেটে বন্যার কারণে অনেক মানুষ অসহায় হয়ে পড়েছে। তাই ইস্‌কন সিলেট মন্দির কর্তৃপক্ষ বন্যার্তদের বাড়িতে গিয়ে খাদ্য সহায়তা দিচ্ছে। উল্লেখ্য, যতদিন বন্যা থাকবে ততদিন মানুষকে খাবার দিয়ে যাওয়ার তাঁর একটি শক্তিশালী হৃদয়স্পর্শী মন্তব্য অনলাইনে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে।

যেহেতু একজন সাধারণ ব্যক্তির পক্ষে ব্যাপক আকারে বন্যার্তদের সাহায্য করা সম্ভব নয়, তাই সমাজের সবাইকে একত্রিত করে ইস্‌কন সবার মাঝে খাবার পৌঁছে দিয়ে ভ্রাতৃত্ববোধের পরিচয় স্থাপন করেছে। কারণ সবাই জানেন “দশের লাঠি একের বোঝা”। শুধু খাবার নয় জরুরী ঔষধসহ প্রয়োজনীয় বিভিন্ন জিনিসপত্র সরাবরাহ করা হয়েছে।

প্রশাসনসহ সাধারণ জনগণ সকলকে ইস্‌কনের এধরনের সুন্দর মানবকল্যাণমূলক সেবার ভূয়সী প্রশংসায় মুখরিত হতে দেখা গিয়েছে।

ত্রাণ কার্যক্রমে ধর্ম-বর্ণ সকলের প্রতি সাংবিধানিক সমদর্শিতা ও কু-প্রতিযোগিতা বিহীন সমাজ ব্যবস্থাপনার আদর্শ সুস্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়। সংবিধানের ১৮ ‘ক’ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রসেবামূলক কার্যের অংশ হিসেবে গৃহপালিত গবাদি পশুর জন্য সীমিত পরিসরে মন্দির থেকে “বন্যা আক্রান্ত গবাদি পশু সুরক্ষা প্রকল্প” গ্রহণ করা হয়। দেশ-বিদেশে সকলের সহযোগিতার ফলেই খাদ্য বিতরণসহ বিভিন্ন কর্মসূচির উদ্যোগ সফল হয়েছে। মানুষ মানুষের জন্য, আর বিপদেই প্রকৃত বন্ধুর পরিচয়। বন্ধুর সংখ্যা বৃদ্ধিতে জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমের আরোও পরিবর্ধন সম্ভব বলে জানিয়েছেন ইস্‌কন সিলেট কর্তৃপক্ষ।

উক্ত ত্রাণ কার্যক্রমে বিভিন্ন সময়ে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গসহ ইস্‌কন বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক চারুচন্দ্র দাস ব্রহ্মচারী, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জগৎগুরু গৌরাঙ্গ দাস ব্রহ্মচারী, ইস্‌কন ফুড ফর লাইফ কার্যক্রমের পরিচালক রুপানুগ গৌর দাস ব্রহ্মচারী, সহ-পরিচালক অমানী কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী, সিসিকের ওয়ার্ড কাউন্সিলর রকিবুল ইসলাম ঝলক, ইস্‌কন সিলেটের সাধারণ সম্পাদক ভাগবত করুণা দাস ব্রহ্মচারীসহ ইস্‌কন সিলেটের অধিকাংশ ভক্তবৃন্দ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here