আমরা অন্যের দোষ দেখি কেন?

0
34

শ্ৰী মহাত্মা দাস


আমরা কেন অন্যের সমালোচনা করি? শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর বলেছেন যে, আমরা অপরের ত্রুটিগুলো খুঁজে বেড়াই, কারণ আমাদের মধ্যে বিনয়ের যথেষ্ট অভাব রয়েছে।
কিন্তু, অনুচিত হওয়া সত্ত্বেও কী কারণে আমরা অন্যের ভুলগুলো দর্শন করি? এতে কি কেউ উপকৃত হচ্ছে? এই প্রশ্নটি আমাকে বিহ্বল করে তুলছে। এই প্রশ্নটি নিয়ে অনুধ্যান করে এর ৩৭টি উত্তর পেয়েছি। এই ৩৭টি কারণে আমরা অন্যের দোষ খুঁজি। আমি সে কারণগুলো নিম্নে বর্ণনা করছি।
আশা করি আপনারা এই তালিকাটি পড়ে উপকৃত হবেন। কেননা, আপনার সাথে সম্পৃক্ত কিছু কারণও আপনি এখানে পেয়ে যেতে পারেন অথবা আপনি চাইলে অন্যদের সাথেও মিলিয়ে নিতে পারেন। আমি আশা করি, এই চর্চাটির মাধ্যমে আমরা নিজেদের যাচাই করে নিতে পারব এবং এটি আমাদের অন্যের সমালোচনার প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করবে।
অন্যকে দোষারোপ এবং অন্যের সমালোচনা করার কারণসমূহ:
১। নিজেকে উত্তম হিসেবে নিরূপণ করা, আর অন্যের নেতিবাচক সমালোচনা করার দ্বারা তাকে তুলনামূলক খারাপ প্রতিপন্ন করা।
২। যখন আপনি কাউকে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবেন, তখন তাকে খাটো করার চেষ্টায় তার সমালোচনা করেন।
৩। কারো উপর আপনার অসন্তোষের কারণে (হয়তো এটি আপনার গ্রহণযোগ্যতার সীমাবদ্ধতা) তার সৌন্দর্য, গুণ এবং বুদ্ধিমত্তা ইত্যাদির দ্বারা আপনি ভয়ভীত হয়ে থাকেন।
৪। আপনি কারো উচ্চ পর্যায়ের সফলতাকে স্বীকার করতে অনিচ্ছুক এবং আপনি এই সফলতাকে খাটো করতে বা কম মর্যাদা দিতে গিয়ে তার সমালোচনা করেন।
৫। বিভিন্ন কারণবশত অন্যের ব্যর্থতা আপনার জন্য অসহনীয় হয়ে ওঠে এবং আপনার এই বিশ্বাস থাকে যে, আপনি চাইলে তাদেরকে তাদের কাম্য স্থানে পৌঁছে দিতে পারেন অথবা তাদের ব্যর্থতা ও ব্যর্থতার কারণগুলো অন্যদেরকে জানিয়েও আপনি তাদের সমালোচনা করেন।
৬। আপনার আত্মসম্মানের মূল্য আপনাকে দাম্ভিকতার দ্বারা দিতে হয় এবং অন্যের সমালোচনার মাধ্যমে আপনি আপনার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য চেষ্টা করেন।
৭। আপনার অপূর্ণ চাহিদাগুলোকে আপনি অন্য কারো দ্বারা পূরণ করিয়ে নিতে চান: যখনই তারা আপনার ইচ্ছানুসারে আপনার চাহিদাগুলো পূরণে অস্বীকৃতি জানায় বা ব্যর্থ হয়, তখন আপনি তার সমালোচনা করতে শুরু করেন।
৮। আপনি অন্যকে দোষারোপ করার মাধ্যমে নিজের দোষ এড়াতে চান।
৯। আপনার অহংবোধ নিজের ভুলগুলোকে স্বীকার করতে বা দেখতে বাধা প্রদান করে। যে কারণে আপনি অন্যের ভুল, সীমাবদ্ধতা এবং অসফলতাগুলোতে মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করেন।
১০। একটি পাত্রের অর্ধেক জলপূর্ণ রয়েছে। সেক্ষেত্রে পাত্রটিকে অর্ধেক জলপূর্ণ দেখার পরিবর্তে আপনার প্রবণতা হলো পাত্রটিকে অর্ধেক জলশূন্য দেখার, আর তাই আপনি অন্যের ভালো গুণের চেয়ে খারাপ গুণগুলোই বেশি দেখেন।
১১। আপনি নিজের দোষগুলো অন্যের মধ্যে দেখেন, যে কারণে আপনার ভুলগুলো সংশোধনের কোনো চেষ্টাই করেন না। বরং, অন্যের এই ত্রুটি থাকার কারণে তাদের নিন্দা করে থাকেন।
১২। নিজের ব্যর্থতার কারণে আপনি অন্যের সফলতাকে স্বীকার করে নিতে পারেন না এবং তাদের সমালোচনা করে থাকেন।
১৩। আপনার স্বভাবই থাকে নিজেকে প্রতারিত বা নির্যাতিত লোক হিসেবে আবিষ্কার করার, আর স্বাভাবিকভাবেই নির্যাতনকারীদের নিন্দা এবং সমালোচনা করেন।
১৪। আপনার যোগ্যতাকে আপনি স্বর্ণমানের ভাবেন। আর তাই আপনার মান-মর্যাদার সাথে খাপ খায়না, এমন ক্রিয়াকলাপ এবং বাক্যসমূহ আপনার কাছে অসহ্য মনে হয়।
১৫। আপনি জগতের সবকিছুকে দুটি ভাগের অন্তর্ভুক্ত মনে করেন হয় গ্রহণ নতুবা বর্জন। সমঝোতা না করে যারা আপনার সাথে একমত নয়, তাদের আপনি মেনে নিতে পারেন না।
১৬। হয়ত আপনি কাউকে সংশোধন করার গভীর প্রয়োজন বোধ করেন, কিন্তু যদি তারা আপনার মতাদর্শ গ্রহণ না করে, তখন আপনি তাদের সীমাবদ্ধতা আর ভুলগুলো সবাইকে জানিয়ে বেড়ান ।
১৭ । অন্য ধর্ম, অন্য মতাদর্শ বা অন্য দেশকে তুচ্ছ জ্ঞান করাই আপনার বিশ্বাস। আপনার মতটিকে প্রতিষ্ঠার জন্য আপনি সমালোচনার আশ্রয় গ্রহণ করেন।
১৮। আপনি নিজের জীবন নিয়ে হতাশায় ভুগছেন এবং এই হতাশার প্রভাবে আপনি প্রত্যেককে, এমনকি জীবনের সবকিছুকেই দোষারোপ করতে থাকেন।
১৯। আপনি অনুমাননির্ভর হয়ে অন্যের উদ্দেশ্যকে স্বার্থবাদী বা অশুভসূচক ভাবেন, আর এভাবে হয়তো আপনি তাদের কোনো হিতৈষীমূলক কাজেরও সমালোচনা করে বসেন। (অন্যের উদ্দেশ্যকে অনুমান করার মাধ্যমে আপনি নিজের উদ্দেশ্যকে তার উপর প্রতিভাত করতে চান)
২০। আপনি অন্যদের দোষগুলো শোনে থাকেন এবং তা নিয়ে চর্চা করেন, এমনকি তা আপনি অন্যদেরও বলে বেড়ান। (আমাদের প্রশ্ন করা উচিত যে, কেন আমরা এমন করি বা করতে চাই)
২১। আপনি তাদের সমালোচনা করেন, যারা কি না আপনার থেকে সুবিধা ভোগ করছে বা আপনার ওপর নির্ভর করে কাজ করছে।
২২। আপনি ভাবেন, অন্যদের চেয়ে আপনার জীবন আপনার প্রতি অন্যায্য আচরণ করছে। কিন্তু যখন আপনি দেখতে পান কেউ তার জীবনে সফল বা জীবনের অসফল অবস্থা কাটিয়ে উঠতে পেরেছে, তাদের সমালোচনা করতে থাকেন অথবা সফল ব্যক্তিরা তাদের সফলতার চাবিটি আপনাকে অবগত না করলে, আপনি ঐ ব্যক্তির সমালোচনা করেন ।
২৩। আপনি হয়ত কোনো বিশেষ অবস্থা বা স্থিতিকে নিজের প্রাপ্য অধিকার ভাবতে থাকেন। কিন্তু, যা আপনাকে দেয়ার কথা, তা যখন আপনি হাতের কাছে পান না, তখন আপনি তাদের সমালোচনা করেন।
২৪। আপনার অতিরিক্ত মাত্রায় নিজেকে সঠিক বলে জাহির করার প্রবণতাই প্রমাণ করে যে, হয়ত অন্যেরা সঠিক নয় বা তারা ভুল।
২৫। আপনি আপনার অনুভূতিগুলো অন্যদের মাঝে ছড়ানোর মাধ্যমে তাদের মনযোগ আকর্ষণ করতে চান বা নিজেকে প্রচার করতে চান। কিন্তু আপনার সেই দক্ষতা বা কৌশলের অভাবের ফলে তা হচ্ছে না। সেক্ষেত্রে একমাত্র অবলম্বন হিসেবে সমালোচনা করাকেই বেছে নেন।
২৬ । আপনি হয়ত কোনো বিশেষ ক্ষেত্রে খুব দক্ষ, আর সেই বিষয়ে কেউ যদি অজ্ঞ বা অদক্ষ থাকে, তখন আপনি তার নিন্দামন্দ করতে থাকেন ।
২৭। যখন আপনি কোনো বিষয়ে ভুল বোঝেন, তখন হতাশাগ্রস্ত হওয়ার কারণে আপনি অন্যদের সমালোচনা করেন যে, তারা আপনাকে বুঝতে সমর্থ হয়নি বা তাদেরই বোঝানোর অদক্ষতার জন্য আপনি বিষয়টি সঠিক বুঝতে পারেননি।
২৮ । আপনি কারো বাক্য বা আচরণ দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হলে তাদের নিন্দা করে থাকেন।
২৯ । প্রতিহিংসার কারণে আপনি অন্যদের লজ্জিত বা হীন প্রতিপন্ন করার চেষ্টায় থাকেন।
৩০ । আপনি হয়তো কোনো নির্দিষ্ট পরিবার, গোষ্ঠী, সংগঠন, প্রতিষ্ঠান বা পৃথিবীর যেকোনো বিষয়ের ওপর রাগান্বিত বা হতাশ রয়েছেন, আর সে কারণে তাদের অযোগ্য বিবেচনা করেন, এমনকি তাদের কলঙ্কিত করার চেষ্টাও করেন ।
৩১ । যারা আপনার সমালোচনা করে, আপনি উল্টো তাদের সমালোচনা করার মাধ্যমে প্রতিরক্ষা করেন।
৩২ । আপনি তাদের সমালোচনা করেন, যারা কি না আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় অথবা আপনাকে নির্দেশ দেয়, কীভাবে জীবনে চলা উচিত ।
৩৩। আপনার প্রতিষ্ঠানের প্রধান বা কর্তা ব্যক্তিত্বদের আপনি সমালোচনা করেন, যখন আপনি ভাবেন যে তারা প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন সমস্যাগুলো সমাধান করতে অপারগ অথবা প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের প্রয়োজন মিটাতে তারা অনুভূতিহীন। এমনকি তাদের কর্মপরিকল্পনা এবং আনুষঙ্গিক চিন্তাভাবনা, উদ্দেশ্য নিয়েও আপনি সন্দিহান থাকেন ।
৩৪ । আপনি তাদের সমালোচনা করেন, যারা কি না আপনাকে কোনো পরামর্শ বা পথ দেখানোর মাধ্যমে সাহায্য করতে চেয়েছে। কিন্তু সেই পথটি গ্রহণে আপনি অস্বীকৃতি জানান, কারণ আপনি হয়তো ভাবেন সে পথটি সঠিক নাও হতে পারে বা সমস্যাবহুল হতে পারে।
৩৫ । আপনি যখন আপনার কঠোর পরিশ্রম, যোগ্যতা, বুদ্ধিমত্তা, মেধা বা অন্যান্য অবদানের স্বীকৃতি পান না, তখন আপনি তাদের নিন্দা করেন, যাদের উচিত বা কর্তব্য ছিল আপনার কাজের মূল্যায়ন করা (হতে পারে মালিক, পিতামাতা বা সহধর্মিণী ইত্যাদি)।
৩৬ । আপনার প্রত্যাশিত স্বীকৃতিটি অন্য কেউ প্রাপ্ত হলে আপনি তার সমালোচনা করেন।
৩৭। আপনার নম্রতার অভাবের জন্য বা নীচু মানসিকতার কারণে অন্যের সমালোচনা বা অন্যকে দোষারোপ বন্ধ করাটা একরকম অসম্ভব ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।
অপরের সমালোচনা করার কারণসমূহ যদি আপনাদের আরো কিছু জানা থাকে, যা কি না আপনাদের সাথে সম্পৃক্ত, তাহলে দয়া করে তা লিখে ফেলুন আর নিজেকে সংশোধন করুন। এ সমস্ত সমালোচনা বা নিন্দা প্রবণতা প্রশমিত করতে কী ধরনের আচরণ, অভ্যাস বা চর্চা সাহায্য করতে পারে, চিন্তা করুন । এটা কি সত্য নয় যে, যখন আপনি বেশি ইতিবাচক, তখন পাত্রটি অর্ধেক পূর্ণ, আর যখন আপনি নেতিবাচক ভাব পোষণকারী, তখন আপনার দৃষ্টিতে ঐ একই পাত্র অর্ধেক খালি বা শূন্য?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here