আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব

0
115

বৈচিত্র্যময় কালের অদ্ভুত প্রভাব

আমরা অনেক সময় ভেবে অবাক হই ব্রহ্মার এক সেকেন্ড পৃথিবীর হাজার হাজার বছরের সমান। এটি কিভাবে সম্ভব? তাছাড়া পৃথিবীর ওপর কালের প্রভাব কেমন যা অনেকটা অগোচরে সাধিত হচ্ছে ?

কৌন্তেয় দাস


কাল বা সময় হাজার হাজার বছর ধরে প্রবাহিত হয়ে আসছে। এর প্রভাবে হারিয়ে গেছে বহু সভ্যতা। আবার জন্ম নিয়েছে নতুন সভ্যতা এবং একসময় এই নতুন সভ্যতাও কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে। যেটিকে আমরা বলি অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। আপনার জীবনের কথাই আসা যাক, আপনার পিতা-মাতার মাধ্যমে জন্ম নিয়েছেন। কিন্তু এরও পূর্বে আপনার পিতা-মাতারও ছিল অন্য পিতা-মাতা। এভাবে যতো পেছনের দিকে যাবে অনেক পিতা মাতার তথ্য লাভ করবেন যারা আপনার অস্তিত্বের সঙ্গে সম্বন্ধীয়। তাদের প্রত্যেকের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়কাল পর্যন্ত পারিপার্শ্বিক পরিবেশ বা সভ্যতাও ভিন্ন ভিন্ন ছিল। যেমন, এককালে বার্তা প্রেরণের জন্য পায়রা ব্যবহার করা হতো। পরবর্তীতে টেলিফোন, মোবাইল, স্কাইপে, ভাইবার, হোয়াটঅ্যাপ, ফেইসুক, টুইটার ইত্যাদি কতো কিছুর এখন আবির্ভাব ঘটেছে। অর্থাৎ, সময়ের সাথে সাথে কতো পরিবর্তন সাধিত হচ্ছে। আপনিও একসময় শিশু ছিলেন কিন্তু এখন সেই শারীরিক অবস্থারও পরিবর্তন হয়েছে। একসময় আপনার অস্তিত্বও এই জড়জগত থেকে বিলীন হয়ে যাবে। এভাবে কালের প্রভাবে জড়জগতের সবকিছুর উত্থান পতন চলছে। অথচ আমরা এই পরিবর্তনের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়ি। নিজেদের এই পরিবর্তন বা বৈচিত্র্যের মাঝে উজাড় করে দিয়ে, বর্তমানকেই শাশ্বত মনে করি। পৃথিবীর ইতিহাসে কত রাজার আবির্ভাব ঘটেছিল, তাদের কথা আমরা এখন ক’জনই বা ভাবি। এই যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যাকে বিশ্বকবির স্বীকৃত করা হয়েছে কিংবা শেকসপিয়ার ছিল অনেক প্রতিভাবান। তাদেরকে কয়জন স্মরণে রেখেছে। কিছু নির্দিষ্ট সময় বা উৎসবে তাদের কথা চর্চা করা হয় মাত্র, বছরের বাকি সময়গুলো তারা চলে যায় আলোচনার বাইরে। ধীরে ধীরে তারাও অবধারিতভাবে একসময় বিলিন হয়ে যাবে। তাদেরকে লোকে তখন আর কখনো স্মরণ করবে না। বিশ্বের তাবৎ বিখ্যাত ক্রীড়াবিদদের নিয়ে এখন যে আলোচনা তাও মাত্র কিছুদিনের জন্য। আধুনিক কোনো চলচ্চিত্র বা গ্রন্থ বের হতে না হতেই যতটা না আলোচিত হয়, পরবর্তীতে তা এর ভক্তদের কাছে পানসে হয়ে পড়ে। কেউ সেই চলচ্চিত্রকার, অভিনেতা, চলচ্চিত্র, গ্রন্থাকার, গ্রন্থ নিয়ে মাতামাতি করে না। একসময় নদী-নালা, গ্রামাঞ্চল, সবুজ গাছপালা, ঋতুর বৈচিত্র্য নিয়ে যে আলোচনা হতো সবকিছুই এখন এতো দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে যে, কেউ মাত্র এক বছর পূর্বের সেই পরিবেশ পর্যন্ত খুঁজে পায় না। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা সবসময় উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় থাকি। আবার কোনো নতুন বৈচিত্র্য আসলে অনেক সময় উল্লাসিত হয়ে পড়ি। এ সবকিছুই হলো আপেক্ষিক বা দ্বন্দ্বভাবযুক্ত। কালের বৈচিত্র্যময় প্রভাব বিজ্ঞান নিয়ে আইনস্টাইন একটি সাধারণ তত্ত্ব প্রদান করেছিলেন, যার নাম আপেক্ষিক তত্ত্ব। এই আপেক্ষিক তত্ত্বটি বৈদিক শাস্ত্রের পরিপ্রেক্ষিতে কতটা প্রামাণিক তা এখন দেখা যাক।

আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব ও রাজা ককুদ্মির কাহিনি

প্রাচীন ভারতের সাধুগণ কিরকম বৈজ্ঞানিক উপলব্ধি প্রাপ্ত হয়েছিল সে বিষয়ে উল্লেখ করে ভারতের প্রয়াত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী একসময় লিখেছিলেন, “প্রাচীন ভারতের যে গুণটি বিদ্যমান ছিল তা হলো এর দূরদর্শিতার প্রসারতা যা অত্যন্ত আশ্চর্যপ্রদ। তখন এমন ক্ষমতা ছিল যে, গৃহে বসেই সুবিশাল মহাকাশ সম্পর্কে অনুভব করা যেত এবং সে সাথে সময় বা কালের বৃহৎ প্রসারণ ও জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত সংখ্যা সম্পর্কে ভাবনা চিন্তা করা যেত। যা আমাদের বয়সকালে গণিতবিদরা মাত্রই তা প্রমাণ করেছিল।”
এমনকি হাজার হাজার বছর পূর্বে, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সম্পর্কে ভারতের বৈজ্ঞানিক উপলব্ধি ছিল অত্যন্ত উন্নত। এই সম্পর্কে সাধারণ একটি জ্ঞান প্রচলিত ছিল যে, আমাদের গ্রহই বিশ্বের কেন্দ্র নয় বরং বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে এটি একটি বিন্দুস্বরূপমাত্র এবং পৃথিবী ৫৪৭৮ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে ২৩ মে হঠাৎ সৃষ্টি হয়নি বরং বিলিয়ন বিলিয়ন বছর পূর্ব থেকে এর অস্থিত্ব ছিল। সৌভাগ্যবশত, আধুনিক বিজ্ঞান এ সমস্ত তথ্যের পেছনে ছুটছে এবং প্রতিদিনই এ বিষয়ে অগ্রগতি অব্যাহত রয়েছে। এক্ষেত্রে বিজ্ঞানের অন্যতম সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন হলো আলবার্ট আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব, যেটি গ্র্যাভিটি বা অভিকর্ষীয় ও বেগের মতো বিষয়ের অধীনে সময়ের পরিমাপ ও আবরণ সম্পর্কে বর্ণনা করে। এটি আপেক্ষিক তত্ত্ব সম্পর্কিত নীতিগুলোর মধ্যে অন্যতম।
শ্রীমদ্ভাগবতের নবম স্কন্ধে এই আপেক্ষিক তত্ত্বের কার্যকারিতা নিয়ে একটি কাহিনি রয়েছে। কাহিনিটি ককুদ্মি নামক এক রাজা ও তার কন্যা রেবতীকে নিয়ে। রাজা তাঁর কন্যার বিবাহের পরিকল্পনা করে সিদ্ধান্ত নিলেন ব্রহ্মাকে দর্শনের জন্য যাবেন। কেননা তিনি নিশ্চিত ছিলেন, ব্রহ্মার প্রভাবেই একজন আদর্শ পতি পাওয়া যেতে পারে। ব্রহ্মা হলেন দেবদেবীদের প্রধান এবং এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টিকর্তার পদে অধিষ্ঠিত। তাঁর আয়ুষ্কালের সঙ্গে সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের আয়ুষ্কাল নির্ধারিত। তাঁর নিবাসস্থল হলো ব্রহ্মলোক, যেটি এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সর্বোচ্চ লোক। সেখানকার বাসিন্দারা অতিন্দ্রিয় শক্তির অধিকারী; সেখানে মন্দ কার্য দুঃখ-কষ্ট ও উদ্বিগ্নতার অস্থিত্ব নেই, সেখানে ভোগ করার ক্ষমতা পৃথিবীর চেয়ে হাজার হাজার গুণ বেশি এবং আধ্যাত্মিক অগ্রগতি সহজেই লভ্য।
রাজা ককুদ্মি রেবতীকে সঙ্গে নিয়ে ব্রহ্মলোক ভ্রমণে গেলেন, যেখানে পৌঁছে তিনি দেখলেন ব্রহ্মা বাদ্যগীত শ্রবণে ব্যস্ত এবং ঐ মুহূর্তে তাঁর সাথে কথা বলতে পারছিলেন না। তাই, ককুদ্মি ব্রহ্মার জন্য প্রতীক্ষা করতে লাগলেন এবং প্রদর্শনী শেষ হলে তিনি ব্রহ্মার সম্মুখে গিয়ে তাঁর প্রতি প্রণতি নিবেদন করে তাঁর অনুরোধ উপস্থাপন করলেন। ককুদ্মির কাছ থেকে সবকিছু শ্রবণ করার পর ব্রহ্মা উচ্চস্বরে হাসতে লাগলেন। তিনি বললেন, “হে রাজন, তুমি যেসব পাত্রদেরকে তোমার কন্যার সঙ্গে বিবাহ দেওয়ার জন্য মনস্থ করে রেখেছ তারা ইতোমধ্যেই বহু পূর্বে মৃত্যুবরণ করেছে। তুমি তোমার রাজ্য ত্যাগ করার পর লক্ষ লক্ষ বছর ইতোমধ্যে পার হয়ে গেছে। সেসব পাত্ররা সবাই এখন মৃত এবং তাদেরকে সবাই ভুলেও গেছে, তাদের পুত্র, প্রপৌত্র ও অন্যান্য বংশধররাও সবাই মৃত ও তাদেরকে সবাই ভুলে গেছে।”
যখন রাজা তা শ্রবণ করলেন, তিনি তাঁর অঞ্চলে ফিরে গিয়ে দেখলেন তা শূন্য হয়ে গেছে। যেরকম আধুনিক আর্কিওলজিস্টরা প্রাচীন সভ্যতার বিভিন্ন নিদর্শন আবিষ্কার করে থাকেন এবং এসব নিদর্শন ধ্বংসের কারণ সম্পর্কে দুর্ভিক্ষ, বহিরাক্রমণ ও বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগকে দায়ী করা হয়। ককুদ্মি যখন সেখানে ফিরে এলেন তিনি দেখলেন যে, তাঁর বংশধরগণ বহুপূর্বে শত্রুভয়ে রাজ্য ছেড়ে পালিয়েছেন।
যখন রাজা ককুদ্মি ব্রহ্মলোকে ছিলেন, ব্রহ্মা তাকে উপদেশ দিয়েছিলেন, তাঁর কন্যাকে বলরামের সঙ্গে বিবাহ প্রদানের জন্য। বৈদিক শাস্ত্রানুসারে বলরাম হলেন পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রকাশ এবং তিনি সমগ্র জগৎকে পরিশুদ্ধ করার লক্ষে ভগবানকে সহায়তা করেছিলেন। তাঁর তথাকথিত রাজ্যে ফিরে আসার পর, ককুদ্মি বলরামের সঙ্গে তাঁর সুন্দরী কন্যার বিবাহ প্রদান করলেন। এরপর তিনি জাগতিক জীবন ত্যাগ করে অবসর গ্রহণের মাধ্যমে হিমালয়ের বদরিকাশ্রমে গমন করলেন, যেখানে অনেক পরমার্থবাদী পারমার্থিক সিদ্ধির উদ্দেশ্য গমন করে থাকেন।
রাজা ককুদ্মি এভাবে কালের ভিন্ন ভিন্ন প্রভাবের অভিজ্ঞতা প্রাপ্ত হয়েছিলেন যা আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্বের সঙ্গে একমত পোষণ করে। স্বাভাবিকভাবেই, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড জুড়ে সময় বা কালকে অসীম ও ধ্রুব হিসেবে গ্রহণ করার প্রবণতা রয়েছে। কিন্তু আপেক্ষিকতার তত্ত্ব অনুসারে সময় অসীম নয় বরং স্থান ও যে বেগে আমরা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে ঘুরছি তার ওপর নির্ভর করে সময় আমাদের প্রত্যেকের ওপর অদ্বিতীয়ভাবে প্রভাব বিস্তার করে। এ বিষয়টি উপলব্ধির জন্য আমরা যমজ দুজন ভ্রাতার একটি দৃষ্টান্ত প্রদান করতে পারে। তাদের একজন আমাদের গ্রহলোকীয় পদ্ধতির বাইরে নিকটস্থ কোনো উপগ্রহে রকেটে করে গমন করছে। প্রায় আলোর গতিতে (প্রতি সেকেন্ড ১৮৬,০০০ মাইল) তিনি পৃথিবীর ২২ বছর সময় ধরে চারদিকে ঘুরতে থাকবে, কিন্তু তার উচ্চ গতির কারণে, সময় শুধু পার্শ্বীয়ভাবে তাকে প্রভাবিত করবে এবং এরপর যখন তিনি পৃথিবীতে ফিরে আসবেন তিনি দেখবেন তাঁর বয়স অন্য ভ্রাতার চেয়ে সাড়ে ১২ বছর কম হয়ে গেছে।
এমনকি পৃথিবীতেও একই তত্ত্বের প্রয়োগ ঘটে। সমুদ্র স্তরে বসবাসরত যমজদের একজনের বয়স ৬০ বছর পর পর্বতের সুউচ্চে বসবাসরত অন্য ভ্রাতার চেয়ে ৬ সেকেন্ড কম হবে। কারণ পৃথিবীর অভিকর্ষ বা গ্র্যাভিটি তার নিজের সময়ের পরিমাপের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। কিন্তু সময়ের এরকম পার্থক্য এতটা উল্লেখযোগ্যহীন যে এটি অগোচরেই থেকে যায়। রাজা ককুস্মি আপেক্ষিক তত্ত্বের নীতিসমূহের অভিজ্ঞতা প্রাপ্ত হয়েছিলেন। ব্রহ্মলোকের উদ্দেশ্যে যাত্রাকালে পৃথিবীতে রেখে যাওয়া তার সমস্ত কিছুর চেয়ে কাল বা সময় ভিন্নভাবে তাঁর ওপর প্রভাব বিস্তার করে।

বৈচিত্র্যময় কালের একটি গণনা ও অন্য একটি কাহিনি

শ্রীল প্রভুপাদের বিজ্ঞানি শিষ্য সদাপুত দাস ব্রহ্মলোক সম্বন্ধে নিন্মোক্ত তথ্যসমূহ তুলে ধরেন: এক চতুর্যুগ হলো ৪,৩২০,০০০ বছর। এই তথ্যানুসারে আমরা ব্রহ্মলোকের সময়ের একটি ধারণা লাভ করতে পারি। যদি ব্রহ্মলোকে গন্ধর্বরা এক ঘণ্টা সময় সংগীত প্রদর্শন করে তবে সেই এক ঘণ্টা হবে পৃথিবীর ৪,৩২০,০০০ বছরের ২৭ গুণ। মজার ব্যাপার হলো ব্রহ্মার সময়ের এই ঘটনা আরেকটি কাহিনির সঙ্গে মিলে যায়।
সেই কাহিনিটি হলো ব্রহ্মার বিমোহন-লীলা বা কৃষ্ণ কর্তৃক ব্রহ্মার বিমোহন লীলা। পাঁচ হাজার বছর পূর্বে, কৃষ্ণ যখন বৃন্দাবনে একজন সাধারণ গোপবালকের মতো ক্রীড়া করছিলেন, গোচারণ করছিলেন তখন কৃষ্ণের ভগবত্তা পরীক্ষা করার জন্য ব্রহ্মা কৃষ্ণের গোবৎস ও গোপবালকদের অপহরণ করে একটি স্থানে লুকিয়ে রেখেছিলেন। এরপর পৃথিবীর সময়ে এক বছরের জন্য তিনি চলে যান।
কৃষ্ণ ব্রহ্মার কৌশল বুঝতে পেরে তিনি নিজেকে গোপবালক ও গোবৎস স্বরূপে প্রকাশ করলেন। ব্রহ্মা যখন পুণরায় পৃথিবীতে ফিরে এলেন তিনি দেখলেন কৃষ্ণ আগের মতোই গোপবালক ও গোবৎসদের নিয়ে খেলা করছে। ব্রহ্মা তখন বিমোহিত হয়ে পড়লেন। ব্রহ্মা যাদেরকে লুকিয়ে রেখেছিলেন তাদেরকে পরিলক্ষণ করে তিনি দেখলেন তারা অভিন্ন, তিনি তখন ভাবতে লাগলেন একি করে সম্ভব। অবশেষে কৃষ্ণ সবকিছু ব্রহ্মার কাছে প্রকাশ করলেন।
এখন এখানে যদিও ব্রহ্মা পৃথিবীতে এক বছর অনুপস্থিত ছিলেন কিন্তু ব্রহ্মার সময়ে তা মাত্র এক মুহূর্ত সময় ছিল। সংস্কৃত শব্দে এক মুহূর্ত সময়কে বলা হয় এক ত্রুটি। কিন্তু বৈদিক জ্যোতির্বিদ্যা বা সূর্য সিদ্ধান্ত অনুসারে এক ত্রুটি হলো এক সেকেন্ডের এক ভাগ। যদি আমরা এ গণনা গ্রহণ করি তবে, পৃথিবীর এক বছর হলো ব্রহ্মার এক সেকেন্ড সময়ের ১৩, ৭৫০ ভাগ।
রাজা ককুস্মির ব্রহ্মলোক পরিদর্শনের সময়কাল ছিল পৃথিবীর ৪,৩২০,০০০ বছরের ২৭ গুণ। এক্ষেত্রে রাজা ককুস্মির সেই পরিদর্শনের সময়কাল ছিল ব্রহ্মার সময়ের মাত্র ৩,৪৫৬ সেকেন্ড বা পৃথিবীর সময়ের এক ঘণ্টার কিছু কম।
শ্রীমদ্ভাগবত অনুসারে এ জড়জগৎ একটি আবরণ দ্বারা পরিবেষ্টিত এবং ব্রহ্মলোক সেই আবরণের সন্নিকটেই অবস্থিত। শ্রীমদ্ভাগবত অনুসারে সেই আবরণের ব্যাস হলো ৫০০ মিলিয়ন যোজন। ১ যোজন সমান ৮ মাইল হলে এই দূরত্ব হবে ৪ বিলিয়ন মাইল।
দূরত্বটি অত্যন্ত ক্ষুদ্র মনে হতে পারে। চৈতন্য চরিতামৃতে এ বিষয়ে শ্রীল প্রভুপাদ নিন্মোক্ত মন্তব্য প্রদান করেছেন :
তখনকার দিনে সবচাইতে বড় জ্যোতির্বিদ, শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত ঠাকুর, ‘সিদ্ধান্ত শিরোমণি’র উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন যে, ব্রহ্মাণ্ডের ব্যাস ১৮, ৭১২,০৬৯, ২০০০,০০০,০০০ X ৮ মাইল। কারো কারো মতে এটি ব্রহ্মাণ্ডের ব্যাসার্ধ।
এই তথ্যানুসারে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ব্যাস হওয়া উচিত ৫,৯৫৬,২০০,০০০ মিলিয়ন যোজন যা ৫০০ বিলিয়নের চেয়ে বেশি। বিষয়টি কিছু দ্বন্দভাবযুক্ত মনে হতে পারে। এ সম্পর্কে কিছুটা দ্বন্দ থাকলেও, মজার বিষয় হলো কেউ যখন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের এই আবরণের দিকে অগ্রসর হয় তখন স্থানের পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। ব্রহ্মলোক সম্বন্ধে যে কাহিনি এখানে তুলে ধরা হয়েছে তার অর্থ, কেউ যখন সেই আবরণের দিকে অগ্রসর হয় তবে সময়ের ব্যবধানটি পরিলক্ষণ করবেন এবং তখন স্থান ও কালের আপেক্ষিক একত্রে পরিবর্তিত হতে থাকে।

আপেক্ষিতার উর্ধ্বে

শ্রীমদ্ভাগবতে উল্লেখিত এরকম ইতিহাস শুধুমাত্র তথ্য সরবরাহ করা কিংবা কোনো বৈজ্ঞানিক বিবৃতি প্রদানের জন্য নয়। শাস্ত্রের উদ্দেশ্য হলো জীবনের অস্থিত্ব সম্পর্কে উপলব্ধি জাগ্রত করা ও কিভাবে সেই অনুসারে আচরণ করতে হয় সে সম্পর্কে শিক্ষা প্রদান করা। রাজা ককুদ্মির মতো যদি আমরাও একইভাবে ভ্রমণ করি এবং গৃহ থেকে দূরে চলে যাই এবং হঠাৎ যখন কয়েক হাজার বছর পর ঐ একই স্থানে পুণরায় ফিরে আসি, তবে দেখব সবকিছু এত পরিবর্তন হয়ে গেছে যে, জীবনকে সম্পূর্ণ ভিন্ন আলোকে দর্শন করতে বাধ্য হবো। এরকম একটি ভ্রমণের সময়ে আপনার অলক্ষ্যে অনেক দেশ সৃষ্টি হবে, আবার ধ্বংসও হয়ে যাবে, বংশ ও জাতিগুলো কিছুদিন থেকে আবার বিলীন হয়ে যাবে; জীবনধারা ও জনপ্রিয় ধারণা আসবে আবার যাবে; ভূতাত্ত্বিক ও পরিবেশ বিপর্যয় পুনঃ পুনঃ ঘটতে থাকবে। এরকম পরিবর্তনে সাক্ষী হয়ে আমরা স্বাভাবিকভাবে বলতে পারি, “জীবনে এমন কি রয়েছে যা সময় বা কালের প্রভাবে মুছে যায় না”?
ভগবদ্‌গীতায় (২/১৬) ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেন, “যাঁরা তত্ত্বদ্রষ্টা তাঁরা সিদ্ধান্ত করেছেন যে, অনিত্য জড় বস্তুর স্থায়িত্ব নেই এবং নিত্য বস্তু আত্মার কখনও বিনাশ হয় না। তাঁরা উভয় প্রকৃতির যথার্থ স্বরূপ উপলব্ধি করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন।”
আমরা সাধারণত পরিবার, কমিউনিটি দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে বিশেষ পরিস্থিতিকে খুব বেশি মূল্য দিই এবং কালকে পরম হিসেবে গ্রহণ করি। কিন্তু ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আমাদের শিক্ষা দিচ্ছেন যে, এসব কিছুই হলো অস্থায়ী ও গুরুত্বহীন, যেগুলোকে তিনি বর্ণনা করেছেন ‘অস্তিত্বহীন’ হিসেবে। জাগতিক জীবনের ওপর আমরা এত গুরুত্ব স্থাপন করি যে, আমরা নিজেদের প্রকৃত পরিচয়টিই হারিয়ে ফেলি যেটি আমাদের প্রকৃত নিত্য অস্থিত্বকে তুলে ধরে। পারমার্থিক জ্ঞান অনুশীলনের মাধ্যমে আমাদের প্রকৃত পরিচয় জাগ্রত করতে পারি এবং সে সাথে উপলব্ধি করতে পারি যে, আমাদের প্রকৃতি হলো এই অস্থায়ী জগতের ‘আপেক্ষিকতার’ উর্ধ্বে এবং আমাদেরকে নিত্য ও শাশ্বত চিন্ময় জগতে প্রবেশ করতে হবে। এটি প্রাপ্ত হওয়াটিই হলো জীবনের মূখ্য উদ্দেশ্য, আর এটি হচ্ছে কৃষ্ণভাবনার পন্থা। হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র জপকীর্তন আমাদেরকে তা অর্জনে সহায়তা করে।
পরিশেষে, কাল সম্পর্কে উপরোক্ত আলোচনার ওপর ভিত্তি করে। শ্রীমদ্ভাগবতে (৩/১০/১১) শ্রীল প্রভুপাদ কর্তৃক তাৎপর্য নিন্মে প্রদত্ত হলো:
“সমগ্র বিশ্ব পরমাণু থেকে শুরু করে বিশাল ব্রহ্মাণ্ড পর্যন্ত বিভিন্ন প্রকার সত্তার অভিব্যক্তি এবং শাশ্বত কালরূপে এখানে সব কিছুই পরমেশ্বর ভগবানের নিয়ন্ত্রণাধীন। বিশেষ বিশেষ দেহের সম্বন্ধ বা অনুপাত অনুসারে এই নিয়ন্ত্রণকারী কাল বিভিন্ন মাত্রায় প্রকাশিত হয়। আণবিক লয়ের একটি কাল রয়েছে আবার ব্রহ্মাণ্ড লয়ের আর একটি কাল রয়েছে। মানুষের শরীরের লয়ের একটি কাল রয়েছে, আবার বিরাটরূপের লয়ের একটি কাল রয়েছে। তার ওপর আবার বৃদ্ধি, বিকাশ এবং কর্মফল-জনিত কর্ম সবই নির্ভর করে কালের ওপর। বিভিন্ন প্রকার ভৌতিক অভিব্যক্তি এবং বিনাশের কাল সম্বন্ধে
বিদুর বিস্তারিতভাবে জানতে চেয়েছিলেন। ” শ্রীমদ্ভাগবতের (১/১৩/২০) একটি শ্লোক ও প্রভুপাদের ভাষ্যও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ :
“এক ভারতীয় বৈজ্ঞানিক, যিনি সর্বদা পরিকল্পনায় ব্যস্ত থাকতেন, তিনি পরিকল্পনা কমিশনেরই এক জরুরি সভায় যোগ দিতে যাওয়ার সময়ে, অকস্মাৎ অপ্রতিহত অনন্ত মহাকালের আহ্বানে তাঁকে জীবন, স্ত্রী, পুত্র, ধন-সম্পদ সব রেখে চলে যেতে হয়।”
ভারতবর্ষে রাজনৈতিক অভ্যুত্থানের সময় এবং পাকিস্তান ও হিন্দুস্থানরূপে দেশ বিভাগ হওয়ার সময়, কত ধনী এবং প্রভাবশালী ভারতবাসীকে কালের প্রভাবে ধন, মান ও প্রাণ সমর্পণ করতে হয়েছিল এবং সারা ব্রহ্মাণ্ড জুড়ে, এই রকম শতসহস্র দৃষ্টান্ত রয়েছে যা সবই হচ্ছে কালের প্রভাবগত পরিণাম।
সুতরাং সিদ্ধান্ত হচ্ছে এই যে, কালের প্রভাব অতিক্রম করতে পারে, এমন কোনো শক্তিমান জীবসত্তা ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে নেই। বহু কবি কালের প্রভাব নিয়ে অনেক কবিতা লিখেছেন। ব্রহ্মাণ্ডে অনেক প্রলয় ঘটে গেছে, এবং কেউ তা কোনোভাবেই প্রতিহত করতে পারেন না। এমনকি, আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও কত কিছুই আসছে আর যাচ্ছে, যার মধ্যে আমাদের কোনো হাত নেই, কিন্তু কোনো প্রতিকার পন্থা ছাড়াই সেগুলি থেকে আমাদের দুর্ভোগ পেতে হয় কিংবা সইতে হয়। সেটাই হলো কালের পরিণাম।


 

জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০১৬ ব্যাক টু গডহেড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here