অবিশ্বাস্য পৃথিবী!

প্রকাশ: ১০ নভেম্বর ২০২২ | ৮:২৭ পূর্বাহ্ণ আপডেট: ১০ নভেম্বর ২০২২ | ৮:২৭ পূর্বাহ্ণ

এই পোস্টটি 107 বার দেখা হয়েছে

অবিশ্বাস্য পৃথিবী!
বৈদিক শাস্ত্রানুসারে পৃথিবী হল একটি অদ্বিতীয় ও অসাধারণ এক স্থান যার বর্ণনা শ্রীমদ্ভাগবতে করা হয়েছে দেব-দেবী, মহান মুনি-ঋষিগণ যাদের উচ্চতর চেতনা রয়েছে তারা যেকোনো প্রতিকূল বা অনুকূল পরিস্থিতিতে বাস্তবতা দর্শন করতে পারেন । তারা উপলব্ধি করে যে বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ড বিশেষত এই পৃথিবী কোন সাধারণ স্থান নয়।

জিনিয়া আলিয়াবিভা


সংস্কৃত ভাষায় আমাদের পৃথিবীকে বলা হয় ভূমণ্ডল। এটি একটি বৃত্তাকার সদৃশ যার ব্যাস হলো ৬৪৪ কোটি কিলোমিটার। আধুনিক জ্যোতির্বিদ্যা অনুসারে যা শনি গ্রহের তিনটি কক্ষ পথ। ভূমণ্ডলকে সপ্তদ্বীপ হিসেবে উল্লেখ করা হয় অর্থাৎ এখানে সাতটি দ্বীপ রয়েছে। এটি শুনে হয়তো আধুনিক বিজ্ঞানের বিপরীত কিছু তথ্য বলে মনে হতে পারে। কিন্তু আসলে বিষয়টি কি সেটি নিম্নে অবলোকন করা যাক । মহা শূন্যের অনেক আলোক চিত্রে বিভিন্ন গ্যালাক্সি দর্শন করা যায়, যেখানে অনেক গ্রহানুপুঞ্জের সম্মিলন ঘটে। তদ্রুপ শ্রীল প্রভুপাদ ব্যাখ্যা করেছেন যে, ভূমণ্ডল হল অনেকগুলো গ্রহের সমন্বয়ে একটি ডিম্বাকৃতির তল বা ডিস্ক। এই গ্রহগুলো মহাকাশে অবস্থান করে ঠিক কোনো মহা সাগরে অবস্থিত দ্বীপ পুঞ্জের মতো।
প্রতিটি গ্রহ দেখতে একটি বলের মতো। কিন্তু যদি আমরা একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব থেকে দর্শন করি তবে ভূমণ্ডলকে মনে হবে ডিম্বাকৃতির (Disc Shaped) মতো। যত নিকটে অগ্রসর হব দেখতে পাব সেগুলো দেখতে ত্রিমাত্রিক বলের মতো। প্রতিটি গ্রহের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট এবং ভিন্ন ভিন্ন স্থানে অবস্থান করে। যদিও সেগুলো একে অপরের থেকে পৃথক নয়। তাদের মধ্যে রয়েছে আন্তঃসম্পর্ক। আমরা বিষয়টি উপলব্ধি করতে সক্ষম হব তখনই যদি একটি বহু মাত্রিক মহা শূন্যে প্রবেশ করতে পারি। ভূমণ্ডল গঠিত সপ্তদীপের সমারোহে। প্রতিটি দ্বীপ পূর্বের দ্বীপের চেয়ে বৃহৎ হয় এবং নির্দিষ্ট মহাসাগর দ্বারা পরিবেষ্ঠিত থাকে । মহা সাগরের যে তরল পদার্থ রয়েছে তা একটু ব্যতিক্রম। এখানে লবণ জল, স্বচ্ছ জল, সুরা, ঘৃত, দুগ্ধ, ক্ষীর এবং ইক্ষু রসের সমুদ্র রয়েছে।
আমাদের অভিজ্ঞতা রয়েছে লবণ সমুদ্রের, যদি লবণ সমুদ্র থেকে তাকে তবে কেন মিষ্টি জলের সমুদ্র থাকবে না? শ্রীল প্রভুপাদ বলেছেন যে, ইক্ষু রসের সমুদ্র রয়েছে তা অবিকল ইক্ষুর মতো সুস্বাদু। অর্থাৎ এর গঠন তন্ত্রে গ্লুকোজের আদিপত্য থাকতে পারে। দুধের সাগরে যে দুধ রয়েছে তা আমাদের কাছে অপরিচিত। এখানে এমন কিছু রাসায়নিক উপাদান রয়েছে যা নির্দিষ্ট রঙ প্রদান করে এবং খুব সম্ভবত দুধের মতোই স্বাদ প্রদান করে। একইভাবে ক্ষীর ও সুরার সাগরও একই রকম। সেখানে যে জল রয়েছে তা আমাদের এ জগতের মতো অবিকল ঘি বা সুরার মতো নয়। তবে শ্রীমদ্ভাগবতে যে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে তা এজন্যেই যাতে করে ভগবানের অচিন্তনীয় শক্তি সম্পর্কে উপলব্ধি করতে পারি। এগুলো আমাদের সাধারণ ইন্দ্রিয়জাত উপলব্ধির অতীত। প্রতিটি মহা সাগরের প্রস্থ বা বিস্তার চারদিকে বেষ্টিত দ্বীপের প্রস্থের সমান। নিন্ম সেই দ্বীপগুলোর বিবরণ দেওয়া হল।
১. জম্বুদ্বীপ: (এর বিস্তার ১৩ লক্ষ কিলোমিটার) দ্বীপটি ঠিক কেন্দ্রেয় অবস্থিত যেখানে আমরা বর্তমানে বাস করছি। এখানে সুমেরু নামে একটি পর্বত রয়েছে। এটি দেখতে ভূমণ্ডলের গ্রহ পুঞ্জের কাণ্ডের মতো। সুমেরু পর্বত সেই কাণ্ডের শিখর পর্যন্ত বিস্তৃত এবং পৃথিবীর উপরে ৮৪ হাজার যোজন (প্রায় ১১ লক্ষ কিলোমিটার যা আধুনিক জ্যোতির্বিদ্যা অনুসারে চাঁদ থেকে পৃথিবীর দূরত্বের ৩ গুণ) পর্যন্ত বিস্তৃত। আমাদের দ্বীপটি লবণ জলের সমুদ্র দ্বারা বেষ্টিত এবং এটিকে ৯ ভাগে ভাগ করা হয়েছে।
২. প্লক্ষদ্বীপ: এই দ্বীপটি ইক্ষু রসের সমুদ্র দ্বারা বেষ্টিত এবং এটি বিভিন্ন পর্বত ও বিশাল নদী দ্বারা সাতটি অঞ্চলে বিভক্ত। পুক্ষদ্বীপের অধিপতি হচ্ছেন প্রিয়ব্রতের পুত্র ইজিব। এই দ্বীপে স্বর্ণের মতো উজ্জ্বল একটি পক্ষ বৃক্ষ রয়েছে। সেই বৃক্ষের মূলে সাতটি শিখা সমন্বিত আগুণ রয়েছে। এই দ্বীপের বাসিন্দারা সূর্যরূপী ভগবানের আরাধনা করেন।
৩. শাল্মলীদ্বীপ: এই দ্বীপটি সুরার সমুদ্র দ্বারা পরিবেষ্টিত। মহারাজ প্রিয়ব্রতের পুত্র যজ্ঞবাহু শাল্মলী দ্বীপের অধিপতি। এই দ্বীপটি সাতভাগে বিভক্ত। এই দ্বীপটি পক্ষ দীপের দ্বিগুণ (৪ লক্ষ যোজন বা ৫২ লক্ষ কিলোমিটার)। এই দ্বীপে একটি শালালী বৃক্ষ রয়েছে যার থেকে এই দ্বীপটির নামকরণ হয়েছে। সেই বৃক্ষটি পক্ষ বৃক্ষটির মতনই ১০০ যোজন (৮০০ মাইল) বিস্তৃত এবং ১,১০০ যোজন (৮,৮০০ মাইল) উন্নত। এই দ্বীপের বাসিন্দারা ভগবানের প্রকাশ সোম নামক চন্দ্রদেবকে উপাসনা করেন।
৪. কুশদ্বীপ: এই দ্বীপটি ঘৃত তৈলের গলনের মাধ্যমে সৃষ্ট সমুদ্র দ্বারা বেষ্টিত যা ৮ লক্ষ যোজন বা ১০৪ লক্ষ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। দ্বীপটিতে একটি কুশ ঘাস রয়েছে যেটি দেখতে অগ্নি শিখার মত। কিন্তু সেগুলো পুড়ে যায় না বরং এই শিখার স্নিগ্ধতা সর্বদিক উদ্ভাসিত। মহারাজ প্রিয়ব্রতের আরেক পুত্র হিরণ্যরেতা এই দ্বীপের অধিপতি।
৫. কৌঞ্চদ্বীপ: এই দ্বীপটি ক্ষীর সমুদ্র দ্বারা বেষ্টিত, যার বিস্তার ১৬ লক্ষ যোজন বা ২ কোটি ৮ লক্ষ। ক্রৌঞ্চ নামক একটি বিশাল পর্বতের নামানুসারে দ্বীপটির নামকরণ করা হয়েছে। এটিও সাতভাগে বিভক্ত। মহারাজ প্রিয়ব্রতের আরেক পুত্র ঘৃতপৃষ্ঠ এই দ্বীপের অধিপতি। এই দ্বীপের অধিবাসীরা ভগবানের জলময় মূর্তি বরুণের উপাসনা করেন।
৬. শাকদ্বীপ: এটি দধির সমুদ্র দ্বারা পরিবেষ্টিত। দ্বীপটি ৩২ লক্ষ যোজন বা ৪ কোটি ১৬ লক্ষ কিলোমিটার বিস্তৃত। এই দ্বীপের অধিপতিও প্রিয়ব্রতের এক পুত্র মেধাতিথি। এটিও সাতভাগে বিভক্ত, যার প্রতিটিতে রয়েছে একটি করে বিশাল পর্বত ও নদী। শাকদ্বীপে একটি বিশাল শাকবৃক্ষ রয়েছে, যার থেকে সেই দ্বীপটির নামকরণ হয়েছে। সেই বৃক্ষটির সৌরভে সমগ্র দিক সুরভিত থাকে। শাকদ্বীপের অধিবাসীগণ প্রাণায়াম ও অষ্টাঙ্গযোগ অনুশীলন করেন। তারা বায়ুকে যিনি নিয়ন্ত্রণ করেন সেই বায়ুরূপী ভগবানের আরাধনা করেন।
৭. পুষ্করদ্বীপ: দ্বীপটি অত্যন্ত স্বাদু জলের সমুদ্রের দ্বারা পরিবেষ্টিত। এর বিস্তার ৬৪ লক্ষ যোজন বা ৮ কোটি ৩২ লক্ষ। মহারাজ প্রিয়ব্রতের পুত্র হচ্ছেন এই দ্বীপের অধিপতি । দ্বীপটি মানসোত্তর নামক একটি বিশাল পর্বত দ্বারা দুইভাগে বিভক্ত। এই ভাগগুলো আমাদের উপলব্ধিতে হল গ্রহপুঞ্জ। এই গ্রহের অধিবাসীরা ব্রহ্মারূপী ভগবানের আরাধনা করেন সেই দ্বীপে ১০ কোটি বিশুদ্ধ স্বর্ণপত্র সমন্বিত একটি বিশাল পদ্ম রয়েছে, যা জ্বলন্ত অগ্নিশিখার মতো উজ্জ্বল । সেই পদ্ম ফুলটিকে ব্রহ্মার উপবেশনের স্থান বলে মনে করা হয় এবং পরম শক্তিমান জীব হওয়ার ফলে ব্রহ্মাকে কখনো কখনো ভগবান বলে সম্বোধন করা হয়।
পুষ্কর দ্বীপের পরে দুটি দ্বীপ রয়েছে, তাদের একটি সর্বদা সূর্যকিরণের দ্বারা আলোকিত এবং অন্যটি সর্বদা অন্ধকারাচ্ছন্ন। তাদের মাঝখানে রয়েছে লোকালোক পর্বত, যা ব্রহ্মাণ্ডের প্রান্ত থেকে একশ কোটি মাইল দূরে অবস্থিত। ভগবান নারায়ণ তাঁর ষড়ৈশ্বর্য বিস্তার করে এই পর্বতে অবস্থান করেন। লোকালোক পর্বতের বহির্ভাগে আলোকবর্ষ এবং অলোকবর্ষের পর মুক্তি কামী ব্যক্তিদের বিশুদ্ধ গন্তব্যস্থান।
অদ্ভুত দ্বীপ: আমাদের জম্বুদ্বীপ নয়টি অঞ্চলে বিভক্ত যেগুলোকে বলা হয় বর্ষ। বর্ষ হল মানুষ ও সভ্যতার একটি স্থান। আমরা ভারতবর্ষে বসবাস করি এবং এটিকে বলা হয় পৃথিবী। ১৬ হাজার কিলোমিটার উচ্চতা বিশিষ্ট বিভিন্ন পর্বত দ্বারা অন্যান্য বর্ষ থেকে এটিকে পৃথক করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে অনেক বিশাল বিশাল সুড়ঙ্গ রয়েছে যার মধ্য দিয়ে অন্য বর্ষে পদার্পণ করতে পারে, যেখানেও মানুষ বসবাস করে থাকেন। কিন্তু তা একটু ভিন্ন স্তরে যা আমাদের ধারণারও অতীত। ভারতবর্ষের দৈর্ঘ্য দক্ষিণ থেকে উত্তর পর্যন্ত ১ লক্ষ ১৬ হাজার কিলোমিটার। পক্ষান্তরে আধুনিক বিজ্ঞান অনুসারে পৃথিবীর ব্যাস দেখানো হয় মাত্র ১২ হাজার ৮০০ কিলোমিটার, পরিধি হল ৪০ হাজার কিলোমিটার আর ব্যাসার্ধ হল ৬৪০০ কিলোমিটার। অর্থাৎ, ১ লক্ষ ১৬ হাজার কিলোমিটারের মধ্যে আমরা মাত্র ৪০ হাজার কিলোমিটারের তথ্য প্রাপ্ত হই। এখনো পৃথিবীর অধিকাংশ স্থান সম্পর্কে আমরা কোনো কিছুই অবগত নই।

জম্বু দ্বীপের নয়টিবর্ষ

১. ইলাবৃত বর্ষ: এই বর্ষের অধিবাসীদের মধ্যে একমাত্র পুরুষ হলেন শিব। তিনি তাঁর পত্নী ভবানীকে সাথে নিয়ে বাস করেন। যেখানে তাদেরকে সেবা করার জন্য অনেক সেবিকা রয়েছে। যদি কোন পুরুষ এই অঞ্চলে আগত হয় তবে ভবানী তাকে অভিশাপ প্রদান করেন এবং সে তখন নারীতে রূপান্তরিত হয়। শিব বিভিন্ন স্তুতির মাধ্যমে সঙ্কর্ষণের আরাধনা করেন ।
২. রম্যক বর্ষ: এইবর্ষে ভগবান মৎস্য অবতার রূপে পূজিত হন। তাই সেখানকার শাসক বৈবস্বত মনু এখনো পরম ভক্তি সহকারে ভগবানের এরূপের আরাধনা করেন।
৩. হিরন্ময় বর্ষ: এখানে পরমেশ্বর ভগবান কূর্ম অবতার রূপেই আরাধিত হন। এই বর্ষের অধিবাসীগণ তাকে পরম ভক্তি সহকারে আরাধনা করে থাকে।
৪. কুরুবর্ষ: জম্বুদ্বীপের উত্তরভাগে পরমেশ্বর ভগবান বরাহদেব রূপে এখানে বাস করেন। যিনি সমস্ত যজ্ঞের নিবেদিত দ্রব্য গ্রহণ করেন ।


কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন তাই সারা পৃথিবী জুড়ে বহু মঠ-মন্দির প্রতিষ্ঠা করে সারা পৃথিবীর মানুষকে শুদ্ধ কৃষ্ণভক্তদের সঙ্গ করার সুযোগ দিচ্ছে, যাতে তারা কৃষ্ণ-তত্ত্ববিজ্ঞান যথাযথভাবে হৃদয়ঙ্গম করে চরমে ভগবদ্ধামে ফিরে যেতে পারে।


৫. হরিবর্ষ: এই অঞ্চলে ভগবান শ্রীনৃসিংহদেব বাস করেন। পরম ভক্ত প্রহ্লাদ মহারাজের আরাধনায় নৃসিংহদেব প্রসন্ন হন। তার ভগবদ্ গুণাবলীর মাধ্যমে তার পরিবারের পতিত ও আসুরিক গুণাবলী সম্পন্ন সদস্যরা উদ্ধার লাভ করেন। ভগবান নৃসিংহদেব এই পরম ভক্তের প্রতি অত্যন্ত অনুরক্ত। তাই প্ৰহ্লাদ মহারাজ সহ এই বর্ষের অন্যান্য অধিবাসীরা ভগবানের এই রূপের আরাধনা করে থাকেন ।
৬. কিম্পুরুষ বর্ষ: এখানে মহান ভক্ত হনুমান অন্যান্য অধিবাসীদের সাথে নিয়ে লক্ষ্মণের জেষ্ঠ্যভ্রাতা ও সীতা দেবীর প্রিয় পতি ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের সেবা করেন ।
৭. ভারতবর্ষ: ভগবান এখানে নরনারায়ণ রূপে বদ্রীকা আশ্রম নামক একটি স্থানে আবির্ভূত হন। এটি সেই বর্ষ যেটিকে আমরা পৃথিবী বলে অভিহিত করি। পরবর্তীতে এটি ভারত নামে পরিচিত হয়। প্রাচীনকালে ভারতবর্ষ নামক এই গ্রহটিকে ‘পুণ্যভূমি’ নামেও ডাকা হতো। “বর্তমানে ভারতভূমি বা ভারতবর্ষ হিমালয় থেকে কন্যাকুমারিকা পর্যন্ত একটি ক্ষুদ্র ভুখণ্ড । এই উপমহাদেশকে কখনো কখনো পুণ্যভূমি বলা হয় ।” (শ্রীমদ্ভাগবত ৫/৪/৯ তাৎপর্য)
৮. কেতুমালা বৰ্ষ: এ বর্ষে ভগবান শ্রীবিষ্ণু কেবল তাঁর ভক্তদের সন্তুষ্টি বিধানের জন্য কামদেব রূপে বিরাজমান। তাঁর সেই ভক্তদের মধ্যে রয়েছেন লক্ষ্মীদেবী, প্রজাপতি সংবৎসর এবং সংবৎসরের পুত্র ও কন্যাগণ। প্রজাপতির কন্যারা হচ্ছেন রাত্রির অধিষ্ঠাত্রী এবং তাঁর পুত্রেরা দিনের অধিষ্ঠাতা। প্রজাপতির সন্তানদের সংখ্যা ছত্রিশ হাজার। তারা মানুষের আয়ুষ্কালের (একশ বছরের) প্রতিটি দিন এবং রাত্রির নিয়ন্তা বৎসরান্তে প্রজাপতির কন্যারা ভগবানের অত্যন্ত জ্যোতির্ময় চক্র দর্শন করে উদ্বিগ্ন হওয়ার ফলে তাদের সকলের গর্ভপাত হয়।
৯. ভদ্রাশ্ববর্ষ: ধর্মরাজের পুত্র ভদ্রশ্রবা ভদ্রাশ্ববর্ষের অধিপতি। ঠিক যেভাবে শিব ইলাবৃতবর্ষে সঙ্কর্ষণের আরাধনা করেন, ভদ্রশ্রবাও তেমনই তাঁর অন্তরঙ্গ সেবক এবং ভদ্রাশ্ববর্ষের অধিবাসীগণ সহ হয়শীর্ষ নামক বাসুদেবের অবতারের আরাধনা করেন।
“নয়টি বর্ষের মধ্যে ভারতবর্ষকেই কর্মক্ষেত্র বলা হয়। পণ্ডিত এবং মহাত্মাগণ বলেন যে, অন্য আটটি বর্ষ অতি পুণ্যবান ব্যক্তিদের পুণ্যশেষ উপভোগের স্থান। স্বর্গলোক থেকে ফিরে আসার পর, তাঁদের পুণ্যকর্মের অবশিষ্ট অংশ এবং আটটি বর্ষে ভোগ করেন।” ভোগ করার বাসনা চরিতার্থ করার বাসনা সৃষ্ট স্বর্গলোক তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত: দিব্য স্বর্গ, ভৌম স্বর্গ এবং পাতাল লোকস্থ বিল স্বর্গ। এই তিনটি স্বর্গের মধ্যে ভারতবর্ষ ছাড়া অন্য আটটি বর্ষ হচ্ছে ভৌম স্বর্গ। স্বর্গলোকগুলোতে উচ্চতর চেতনার লোকেরা বসবাস করে। তারা সেখানে প্রায় ১০ হাজার বছর বেঁচে থাকে এবং তাদের রয়েছে একটি বৈদিক সংস্কৃতি। শুধুমাত্র সবচেয়ে অধঃপতিত জনবহুল স্থান একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে অবস্থিত যেটি সম্পর্কে মাত্র ৪০ হাজার কিলোমিটার তথ্য আমরা প্রাপ্ত হই।

বিশেষ একটি স্থান

তথাপিও আমাদের গ্রহ হল বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে একটি অদ্বিতীয় স্থান। এটি উচ্চতর গ্রহগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নিন্মতর গ্রহ, আবার নিন্মতর গ্রহদের মধ্যে সবচেয়ে উচ্চতর গ্রহ। সমস্ত জীবের প্রধান কর্মগুলো এই পৃথিবীর বা ভারতবর্ষের মধ্য দিয়ে সাধিত হয়। অর্থাৎ যদি কেউ নিন্মতর গ্রহ থেকে উচ্চতর গ্রহলোকে যেতে চাই তবে তাকে অবশ্যই পৃথিবীতে জন্ম গ্রহণ করতে হবে। যদি কেউ অধঃপতিত হয় প্রথমে সে পৃথিবীতে অধঃপতিত হয় তারপর সে নিন্মতর গ্রহে অধঃপতিত হতে পারে। পৃথিবী হল ভাল বা মন্দ কর্মফল অর্জনের কর্মক্ষেত্র। বৈদিক শাস্ত্রানুসারে আমাদের গ্রহটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান বলে প্রতিভাত হয়। এ গ্রহের মধ্য দিয়েই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের অক্ষরেখা (axis) অতিবাহিত হয় এবং এই অক্ষের ভিতরে একটি পথ রয়েছে যার মাধ্যমে আমরা চিন্ময় জগতে গমন করতে পারি। এজন্যে অনেক জীব এমনকি উচ্চতর গ্রহলোক থেকেও পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করার অভিপ্রায় করে যাতে করে তারা চিন্ময় জগতে প্রত্যাবর্তনের একটি সুযোগ লাভ করতে পারে।
“যেহেতু মনুষ্যজন্ম আত্ম-উপলব্ধির সর্বশ্রেষ্ঠ উপায়, তাই স্বর্গের দেবতারা বলেন-আহা, এই ভারতবর্ষে জন্মগ্রহণ করেছেন যে মানুষেরা, তারা নিশ্চয়ই মহা পুণ্যজনক তপস্যা করেছেন, অথবা ভগবান নিশ্চয়ই তাঁদের প্রতি অত্যন্ত প্রসন্ন হয়েছেন। তা না হলে, কিভাবে তাঁরা এমনভাবে ভগবদ্ভক্তিতে যুক্ত হয়েছেন? আমরা ভগবদ্ভক্তি সম্পাদনের সৌভাগ্য লাভের জন্য ভারতবর্ষে মনুষ্যজন্ম লাভ করতে চাই, আর এই মানুষেরা ইতিমধ্যেই সেই সৌভাগ্য লাভ করেছেন।”

(শ্রীমদ্ভাগবত ৫/১৯/২১)

উচ্চতর গ্রহের জীবরা তাদের নিজেদের সিদ্ধি ও আনন্দ লাভের প্রতি অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে আসক্ত। সেক্ষেত্রে পৃথিবী নিরপেক্ষ স্তরে অবস্থিত। এখানে উচ্চতর গ্রহলোকগুলোর মতো এরকম প্রাচুর্য ও আনন্দ নেই। তাই এই পৃথিবীতেই পারমার্থিক পথ লাভ করার অধিক সম্ভাবনা রয়েছে। আমাদের সবারই একটি দিব্য প্রকৃতি রয়েছে এবং সেই দিব্য প্রকৃতির প্রগতি সাধন করার সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে। এজন্যে পৃথিবীকে চিন্ময় জগৎ বিশেষভাবে সুরক্ষিত করে রেখেছেন এবং অধিকাংশ ভগবানের প্রেরিত দূত, অবতারগণ আমাদের এই গ্রহে আবির্ভূত হন। শুধুমাত্র এই গ্রহেই তিনটি বিশেষ স্থান রয়েছে : জগন্নাথপুরী, নবদ্বীপ ধাম (মায়াপুর), শ্রীবৃন্দাবন। এই স্থানগুলি চিন্ময় জগতের প্রতিরূপ এবং চিন্ময় জগতে প্রত্যাগমনের দ্বার স্বরূপ।
শ্রীল প্রভুপাদ শ্রীমদ্ভাগবতের (৫/১৯/২৮) তাৎপর্যে লিখেছেন “ভারতবর্ষে যিনি মনুষ্যজন্ম লাভ করেছেন, তাঁর কৃষ্ণভক্তির বিকাশের এক বিশেষ সুযোগ রয়েছে। তাই যাঁরা ভারতবর্ষে জন্মগ্রহণ করেছেন, তাঁদের কর্তব্য শাস্ত্র ও গুরুর কাছে শিক্ষা গ্রহণ করা এবং পূর্ণরূপে কৃষ্ণভক্তি লাভ করার জন্য শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপা গ্রহণ করা। কৃষ্ণভক্তির পূর্ণ সুযোগ নিয়ে মানুষ অনায়াসে ভগবদ্ধামে ফিরে যেতে পারেন (যান্তি মদ্‌যাজিনোহপি মাম্‌) এই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন তাই সারা পৃথিবী জুড়ে বহু মঠ-মন্দির প্রতিষ্ঠা করে সারা পৃথিবীর মানুষকে শুদ্ধ কৃষ্ণভক্তদের সঙ্গ করার সুযোগ দিচ্ছে, যাতে তারা কৃষ্ণ-তত্ত্ববিজ্ঞান যথাযথভাবে হৃদয়ঙ্গম করে চরমে ভগবদ্ধামে ফিরে যেতে পারে।


 

এপ্রিল-জুন ২০১৮ ব্যাক টু গডহেড

সম্পর্কিত পোস্ট

‘ চৈতন্য সন্দেশ’ হল ইস্‌কন বাংলাদেশের প্রথম ও সর্বাধিক পঠিত সংবাদপত্র। csbtg.org ‘ মাসিক চৈতন্য সন্দেশ’ এর ওয়েবসাইট।
আমাদের উদ্দেশ্য
■ সকল মানুষকে মোহ থেকে বাস্তবতা, জড় থেকে চিন্ময়তা, অনিত্য থেকে নিত্যতার পার্থক্য নির্ণয়ে সহায়তা করা।
■ জড়বাদের দোষগুলি উন্মুক্ত করা।
■ বৈদিক পদ্ধতিতে পারমার্থিক পথ নির্দেশ করা
■ বৈদিক সংস্কৃতির সংরক্ষণ ও প্রচার। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ অনুসারে ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তন করা ।
■ সকল জীবকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ করানো ও তাঁর সেবা করতে সহায়তা করা।
■ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ অনুসারে ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তন করা ।
■ সকল জীবকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ করানো ও তাঁর সেবা করতে সহায়তা করা।