অদ্ভুত গিরি গোবর্ধন, অদ্ভুত লীলা বিলাস

0
28

অচ্যুত কৃষ্ণ দাস

আজ থেকে ৫০০০ বছর পূর্বে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ‘গোবর্ধন’ নামে একটি পর্বত কনিষ্ঠ আঙ্গুলে ধারণ করেছিলেন। সেই কাহিনি এবং গোবর্ধন পর্বতের চারপাশে অনুষ্ঠিত ভগবানে মাধুর্যপূর্ণ লীলাবিলাসের সচিত্র বিবরণ প্রদর্শিত হল।


একবার বৃন্দাবনের গ্রামে, বয়োজ্যেষ্ঠরা ইন্দ্রের প্রতি এক যজ্ঞের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। ইন্দ্র হলো বৃষ্টির দেবতা এবং বৃন্দাবনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ছিল তাঁর পূজা করা। কিন্তু পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যার বয়স ছিল মাত্র ৭ বছর তিনি দেব দেবীর পূজা সমর্থন করেননি। কারণ তা সর্বোচ্চ উপলব্ধি নয় । তাই তিনি ইন্দ্রের পরিবর্তে স্থানীয় গোবর্ধন পর্বতের পূজা করার জন্য অনুপ্রাণিত করলেন। কথিত হয় যে, গোবর্ধন পর্বত চিন্ময় জগৎ থেকে আসেন এবং তিনি স্বয়ং কৃষ্ণ থেকে অভিন্ন ।
ইন্দ্রের দর্পকে চূর্ণ করার জন্য, এভাবে ইন্দ্রের পরিবর্তে গোবর্ধন পর্বতের পূজা করা হলো। সেখানে সমস্ত গ্রামবাসীর আগমন ঘটে এবং পর্বতসম খাবার রান্না করা হয় এবং অতঃপর তা ভগবানকে নিবেদন করা হয়। উৎসবের মাঝে একটি অত্যন্ত অদ্ভুত ব্যক্তির আগমন ঘটে, যিনি ছিলেন বিশাল দেহী। তিনি ছিলেন গোবর্ধন পর্বত আবার অন্যদিকে কৃষ্ণ স্বয়ং। সেই বিশাল ব্যক্তিটি আসন গ্রহণ করে সমস্ত নিবেদিত দ্রব্য আহার করতে লাগলেন। ব্রজবাসীরা আরও দ্রব্য আনতে শুরু করলেন। এভাবে নিবেদিত দ্রব্য গ্রহণ করার পরও সমস্ত ভোগ বিস্ময়করভাবে যথাস্থানে ছিল এবং পরবর্তীতে ব্রজবাসীরা ভগবানের সেই উচ্ছিষ্ট প্রসাদ আস্বাদন করেন।
কিন্তু ইন্দ্ৰ ক্রোধান্বিত হয়ে পড়েন। তিনি প্রলয়ংকরী বৃষ্টি বর্ষন করে বৃন্দাবনকে প্লাবিত করেন। তখন ব্রজবাসী, গাভী ও গো-বৎসরা কৃষ্ণের কাছে ছুটে গেলে তাদেরকে রক্ষার জন্য কৃষ্ণ ৭ দিন পর্যন্ত বাম হস্তের কনিষ্ঠ আঙ্গুলে গোবর্ধন পর্বতকে ছাতার মতো ধারণ করলেন।

ঐরাবত ও সুরভী কুণ্ড

৭ দিন পর ইন্দ্র তার ভুল বুঝতে পেরে সেই ধ্বংসাত্মক কার্য বন্ধ করেন । তিনি কৃষ্ণকে একটি নির্জন স্থানে দেখতে পেয়ে তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করার জন্য ছুটে আসেন। ইন্দ্রের বাহন ঐরাবত গঙ্গার জল দিয়ে এবং চিন্ময় জগৎ থেকে আগত সুরভী গাভীর দুগ্ধ দিয়ে কৃষ্ণকে অভিষেক করান। কথিত হয় যে, ইন্দ্র তার এই ভুলের জন্য ক্রন্দন করতে থাকেন এবং সে চোখের জলে একটি সরোবর সৃষ্টি হয়, যা ইন্দ্ৰ সরোবর নামে পরিচিত। ঐরাবত কৃষ্ণকে যে জল দিয়ে বিধৌত করেছিল সেই জল থেকে সৃষ্টি ঐরাবত কুণ্ড এবং সুরভী গাভীর দুগ্ধ থেকে সৃষ্টি হয় সুরভী কুণ্ড। এই সরোবরগুলো এখনও বৃন্দাবনে বিদ্যমান ।

অনন্ত শেষ (চিত্র-১)

পরিশেষে ইন্দ্রের সঙ্গে সমস্ত দেবদেবীরাও কৃষ্ণের পূজা করেন। তারা খাঁটি স্বর্ণ দিয়ে তৈরি বিভিন্ন পাত্র দিয়ে ভগবানের পূজা সম্পন্ন করেন। দেবদেবীদের আসতে দেখে গোপবালিকারা পালাতে শুরু করলেও মধুমঙ্গল নামে এক গোপবালক স্থূলকায় হওয়ায় পালাতে অক্ষম হলে দেব-দেবীদের আগমনের সেই দৃশ্য পূর্ণরূপে অবলোকন করেন।
পরবর্তীতে নন্দ মহারাজ পরিত্যক্ত এ সমস্ত স্বর্ণের পাত্র দেখে তিনি মনে করেন কৃষ্ণ এগুলো চুরি করেছেন। মধুমঙ্গল সমস্ত ঘটনা নন্দ মহারাজের কাছে বর্ণনা করেন। কৃষ্ণের এই অতি সুন্দর লীলার জন্য বৃন্দাবনবাসীরা তাকে মুকুট উপহার দেন এবং তারা কৃষ্ণের আরেকটি নাম প্রদান করেন, তা হল ‘গোবিন্দ’।

গন্থলী (চিত্র-২)

গন্থলী নামক স্থানে একসময় কৃষ্ণ গোপীদের সঙ্গে হোলি উৎসব করছিলেন। এই হোলি উৎসবে সবাই একে অপরকে রঙ দিয়ে রাঙিয়ে দেয়। এক পর্যায়ে রাধারাণী ও কৃষ্ণ একত্রে একটি স্থানে আসন গ্রহণ করলে গোপীরা গোপনে তাদের দু’জনের বস্ত্র একত্রিত করে বন্ধন করেন। (সাধারণত বিবাহ উৎসবে নব দম্পতিদের বস্ত্র বন্ধনের মাধ্যমে তাদের নব দাম্পত্য জীবনের প্রতীক প্রদর্শন করে)। যখন রাধারাণী ও কৃষ্ণ দাড়াতে গেলেন তাদের এই অবস্থা দেখে দু’জনই লজ্জিত হন। কিন্তু গোপীরা তা দেখে অত্যন্ত উৎফুল্ল হন। গোপীরা তখন আরো রঙ দিয়ে তাদের রাঙিয়ে দিয়ে সে বন্ধন থেকে মুক্ত করেন। তখন থেকে ঐ স্থানটি ‘গন্থলী’ নামে পরিচিত হয়।

মানসী গঙ্গা :

মানসী গঙ্গা নামক এ সরোবরটি কৃষ্ণ সৃষ্টি করেছিলেন। একদিন রাধারাণী ও অন্যান্য গোপীরা এক যজ্ঞ সম্পাদনের জন্য বিবিধ দুগ্ধজাতীয় দ্রব্য এ সরোবরের মধ্যে দিয়ে নিয়ে যেতে চাইলে, কৃষ্ণ ছদ্মবেশী মাঝি হিসেবে কৃষ্ণ তাদেরকে নৌকায় তুলতে সম্মত হন। কৃষ্ণ সর্বদা রাধারাণীর সঙ্গে মিলিত হতে চান, তাই তিনি এই কৌশল অবলম্বন করেন।
সরোবর দিয়ে যাওয়ার অর্ধেক পথে, কৃষ্ণ বললেন, তিনি খুব ক্ষুধার্ত আর তাই তাকে যেন তাদের তৈরি ঐ দুগ্ধজাত দ্রব্যগুলো খেতে দেওয়া হয়। এরপর কৃষ্ণ বললেন, তিনি ক্লান্ত আর তাই তার দেহমর্দন প্রয়োজন। গোপীরা তখন ক্রোধান্বিত হলে কৃষ্ণ এ পরিকল্পনা ত্যাগ করেন। পরবর্তীতে কৃষ্ণ বলেন, নৌকাটি অত্যন্ত ভারী হয়ে গেছে, আর তাই তিনি গোপীদের সমস্ত পাত্র ও অলংকার সরোবরে ছুড়ে মারেন যাতে নৌকাটি হালকা হয়। এরপর এক প্রবল ঝড় শুরু হয়, সেই ঝড়ে সরোবরটি উত্তাল হয়ে পড়ে। রাধারাণী যখন দেখেন যে, নৌকাটি প্রায় উল্টে যাবে, তিনি মাঝিকে আকড়ে ধরেন। এই ঘটনার জন্য গোপীরা রাধারাণীকে তিরস্কার করলেও, এর মধ্যে রাধারাণী সেই মাঝির পরনের বস্ত্রের নিচে কৃষ্ণের বাঁশিটি আবিস্কার করেন। এভাবে রাধারাণী তখন কৃষ্ণকে চিনতে পারেন। অবশেষে কৃষ্ণ রাধারাণী ও গোপীগণ একত্রে সেই সরোবরের ওপর ভাসমান নৌকাটিতে অত্যন্ত সুন্দর একটি সময় উপভোগ করেন।

মানসী গঙ্গার উৎপত্তি (চিত্র-৩)

একবার কৃষ্ণ ও বলরাম সখাদের সঙ্গে ক্রীড়ারত ছিলেন। এমন সময় বাছুরের বেশ ধরে এক অসুর এসে সেখানে উপস্থিত হন। সে অন্য বাছুরদের সাথে মিশে যান। সে কৃষ্ণকে হত্যা করার সুযোগের প্রতীক্ষা করছিল। কৃষ্ণ তার অভিপ্রায় বুঝতে পেরে তাকে চিহ্নিত করে হত্যা করেন।
গোপসখারা কৃষ্ণের বীরত্বের প্রশংসা করলেন, কারণ তারা দেখল এটি প্রকৃতপক্ষে একটি অসুর ছিল। কিছুক্ষণ পর তারা পুণরায় কৃষ্ণকে বললেন, “হ্যাঁ, সে অসুর হতে পারে, কিন্তু সে তখনও একটি বাছুর ছিল, গো-হত্যা একটি মস্ত বড় পাপ কর্ম, তাই তুমি পাপকর্ম করেছ।” কৃষ্ণ বললেন, “আমি তা জানি-এজন্যে আমি এখানে গঙ্গাকে প্রকট করব।” কৃষ্ণ তখন ধ্যানাস্থিত হয়ে গঙ্গাকে আহ্বান করলেন, গঙ্গা আবির্ভূত হলে তখন এ সরোবরটি সৃষ্টি হয়।
আরেক সময় কৃষ্ণের পালক পিতা-মাতা নন্দ ও যশোদা গঙ্গা সম্পর্কে একটি কাহিনি শ্রবণ করেন। গঙ্গা নদী থেকে একসময় বিষ্ণুর বাহন গড়র পক্ষী আহারের জন্য একটি সর্প ধরেছিলেন। কিন্তু সর্পটি নিয়ে উড়ে যাওয়ার সময়, সর্পটির মস্তক গঙ্গার জল স্পর্শ করে। সর্পটি তখন চিন্ময় জগতে বৈকুণ্ঠ লোকের বাসিন্দাদের মত সুন্দর চতুর্ভুজ বিষ্ণুরুপ পরিগ্রহ করেন। গড়ুর তখন তাকে আহারের পরিবর্তে সম্মানের সহিত বৈকুণ্ঠে নিয়ে যান। নন্দ-যশোদা এ কাহিনি শুনে অনুপ্রাণিত হন এবং গঙ্গাস্নানের অভিলাষ করেন।
কিন্তু কৃষ্ণ তার বৃন্দাবনের পার্ষদরা বৃন্দাবন প্রস্থান করুক তা চাননি। তিনি চেয়েছিলেন প্রত্যেকে তার লীলাবিলাসের সঙ্গী হোক, তাই তিনি বলেছিলেন, তারা বৃন্দাবনে প্রকটিত গঙ্গায় স্নান করতে পারেন। প্রথমে তাঁর শিশুসুলভ কথায় তারা বিশ্বাস না করলে; কৃষ্ণ তাদেরকে গঙ্গার তীরে নিয়ে যান এবং জোড় দিয়ে বলেন এটা হল গঙ্গা। সে মুহূর্তে, সেই সরোবরে গঙ্গা নদীর অধিষ্ঠাত্রী দেবী গঙ্গা দেবীর আবির্ভাব ঘটে এবং গঙ্গাদেবী নন্দা-যশোদাকে নিশ্চিত করেন যে, কৃষ্ণ যা বলছেন তা প্রকৃতপক্ষে সত্য। গঙ্গা দেবীকে দর্শন করার পর সানন্দে তারা মানসী গঙ্গায় স্নান করেন।
একসময় রাধারাণী তাঁর একটি অলংকার এই স্থানের নিকটেই হারিয়ে ফেলেন। কৃষ্ণ তখন রাধারাণীকে এ নিয়ে উত্যক্ত করছিলেন, ফলে রাধারাণী কৃষ্ণের প্রতি ক্রোধান্বিত হন। তখন কৃষ্ণ হাসতে লাগলেন এবং মাটি খনন করতে লাগলেন। মাটি খনন করতে করতে সেখানে সুন্দর সুন্দর অলংকারের সন্ধান পেলে তা রাধারাণীকে প্রদান করেন। রাধারাণী তখন উৎফুল্ল হন ।

মধুমঙ্গলের মিষ্টি (চিত্র-২)

একবার বৃন্দাবনের গোপীরা একটি যজ্ঞ সম্পাদনের জন্য কৃষ্ণের সহায়তা কামনা করলে, কৃষ্ণ তার ব্রাহ্মণ সখা মধুমঙ্গলকে পাঠান। পরে গোপীরা মধুমঙ্গলকে অনেক মিষ্টান্ন দ্রব্য প্রদান করেন, অপরদিকে রাধারাণী তাকে তার কণ্ঠহার উপহার দেন। কিন্তু যখন কৃষ্ণ ও মধুমঙ্গল গোপবালকদের মাঝে ফিরে আসলে মধুমঙ্গলের কাছে বৃত্তান্ত জানার ফাঁকে লুকানো মিষ্টিগুলো গোপসখারা ছিনিয়ে নেন। তা দেখে কৃষ্ণ হাসতে হাসতে বলেন, তারা যেন কিছু মিষ্টি মধুমঙ্গলের জন্য রাখেন। কৃষ্ণ তখন মধুমঙ্গলের কাছ থেকে সেই কণ্ঠাহারটি নিয়ে নিজে পরিধান করেন ।

মহা কীর্তন (চিত্র-৪)

ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অন্তর্ধানের পর, তার ১৬,১০৮ জন পত্নী (যাদেরকে কৃষ্ণ বৃন্দাবন প্রস্থানের পর বিবাহ করেছিলেন এবং যাদের অনেকেই একসময় এক অসুর কর্তৃক অপহৃত হলে কৃষ্ণ তাদের উদ্ধার করেছিলেন) কৃষ্ণবিরহে চরম দুঃখে দিনাতিপাত করছিলেন। কৃষ্ণের প্রপৌত্র বজ্রনাভ একবার তাদের সবাইকে বৃন্দাবনে গোবর্ধন পর্বতের নিকট নিয়ে আসেন। তারা একত্রে খুব সুন্দর কৃষ্ণের পবিত্র নাম কীর্তন করেন। সেটি এমন এক কীর্তন ছিল যে, সে কীর্তনে অংশগ্রহণ করার জন্য শ্রীকৃষ্ণের পার্ষদরাও সেখানে প্রকট হন । ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অন্তরঙ্গ সখা ও মহান ধনুর্ধারী অর্জুনের আবির্ভাব ঘটেছিল। অর্জুন আবির্ভূত হয়ে সে কীর্তনে মৃদঙ্গ বাজান। উদ্ধব একট ঘাস থেকে প্রকাশিত হয়ে কীর্তনে অংশগ্রহণ করেন। উদ্ধব পূর্বে বৃন্দাবনের ঘাস হিসেবে জন্মগ্রহণ করার বাসনা করেছিলেন, যাতে তিনি গোপীদের চরণধূলি মস্তকে ধারণ করতে পারেন। এরপর স্বয়ং কৃষ্ণও আভির্ভূত না হয়ে থাকতে পারলেন না। তিনি রাধারাণীসহ সমস্ত গোপী ও গোপ সখাদের নিয়ে সেখানে আবির্ভূত হন। তারা সবাই একত্রে সেই মহা কীর্তনে অংশগ্রহণ করেন এবং এভাবে কৃষ্ণের রাণীরা সন্তুষ্ট হন।

মুক্তাবৃক্ষ (চিত্র-৫)

একবার কৃষ্ণ তাঁর মাতা থেকে কিছু মুক্তা নিয়ে সেগুলো রোপন করেন। তখন সেই মুক্তাগুলো থেকে বৃক্ষ বেড়ে উঠে এবং একসময় সেগুলো পুষ্পের পরিবর্তে মুক্তা উৎপাদন করতে থাকে। কৃষ্ণ তখন গোপসখা, বানরসহ বৃন্দাবনের সমস্ত জীবকে মুক্তার তৈরি কণ্ঠহার উপহার দেন। কিন্তু গোপীদের না দিলে গোপীরা অপমানিত অনুভব করে কৃষ্ণের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হন। তারা কৃষ্ণকে বলেন যে, তারা নিজেরাই মুক্তার চাষ করবে এজন্যে গোপীরা নিজেদের মুক্তাগুলো খুলে সেগুলো রোপন করে। কিন্তুি সে জমিতে মুক্তাবৃক্ষের পরিবর্তে কাঁটাযুক্ত গাছ, আগাছাই বৃদ্ধি পেল। এ ঘটনায় গোপীরা সম্পূর্ণ অপদস্থ হন, কেননা মুক্তার বৃক্ষতো হয়নি উল্টো পরিধান করার মত আর কোনো মুক্তাই অবশিষ্ট রইল না ।
অবশেষে তারা কৃষ্ণের শরণাপন্ন হলে, কৃষ্ণ মৃদু হেসে নিজের নতুন মুক্তার কণ্ঠাহার ও একটি ছোট অলংকারের বাক্স প্রতিটি গোপীকে প্রদান করলেন । কিন্তু রাধারাণীকে কিছুই দিলেন না । রাধারাণী এতে বেদনাহত হয়ে কাঁদতে লাগলে কৃষ্ণ রাধারাণীকে বিশেষ মুক্তাহার ও অলংকার ভর্তি বাক্স উপহার দেন। এ ঘটনায় সবাই আনন্দিত হন।

শৃগাল (চিত্র-৫)

এক সময় শিবখড়ি কুণ্ডের নিকটে একদল শিশু একটি শৃগালকে উৎপীড়ন করছিল। শৃগাল তখন কুণ্ডের নিকটে অবস্থিত একটি খরগোশের গুহায় আশ্রয় নেয়। তখন শিশুরা সেই গুহার মুখে আগুন লাগিয়ে দেয়। এ সংবাদ শুনে রাধারাণী অত্যন্ত বেদনাহত হন, কারণ তিনি চাইতেন যেন বৃন্দাবনের কেউ কোন কষ্ট না পায়। তাই তিনি ও গোপীরা সেই শিশুদের তাড়া করলে শিশুরা পালিয়ে যায়। অবশেষে শৃগালটি ক্রন্দন করতে করতে বাইরে বেরিয়ে এসে রাধারাণীকে প্রণাম করে । রাধারাণী তখন সেই শৃগালটির প্রতি স্নেহ প্রদর্শন করে তার কাছে প্রতিজ্ঞা করেন যে, চিন্ময় জগতে শৃগালটি তার নিত্য লীলায় অংশগ্রহণ করবেন।

অদৃশ্য সেতু! (চিত্র-৫)

কথিত হয় যে, রাধাকুণ্ডের ওপর একটি স্ফটিকের সেতু এখনও অদৃশ্যভাবে বর্তমান। সেতুটি একটি অদৃশ্য দ্বীপের সঙ্গে সংযুক্ত যেটি দেখতে বিশাল ভাসমান পদ্মের ন্যায়। দ্বীপটি রাধাকুণ্ডের মধ্যখানে অবস্থিত। সেতুটি শ্রীমন নিত্যানন্দ প্রভুর পত্নী জাহ্নবা মাতার স্নানস্থল থেকে শুরু হয়। জাহ্নবা মাতা ৫০০ বছর পূর্বে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর লীলায় অংশগ্রহণ করেছিলেন। দ্বীপটি হল প্রকৃতপক্ষে রাধারাণীর কনিষ্ঠ ভগ্নী অনঙ্গ মঞ্জুরীর কুঞ্জ। শুদ্ধ ভক্তেরা বলে থাকেন প্রকৃতপক্ষে জাহ্নবা মাতাই হলেন অনঙ্গ মঞ্জুরী।

অপ্সরা ও নবলকুণ্ড (চিত্র-৬)

বলা হয় যে, গোবর্ধন পর্বত দেখতে একটি ময়ূর পুচ্ছ আকৃতির, সোজাভাবে বিস্তৃত। এখানে দুটি কুণ্ড বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সেগুলো হল অপ্সরা কুণ্ড ও নবল কুণ্ড। যখন রাধারাণী ও কৃষ্ণ রাসনৃত্যের সময় একে অপরের দিকে দৃষ্টিপাত করেন তখন শুদ্ধ প্রেমে তারা বিগলিত হন। আর এভাবে এই দুটি কুণ্ডের সৃষ্টি হয়।

বিভিন্ন অবতার

এই গোবর্ধন পর্বতে কৃষ্ণ তার সখাদের নিয়ে আসতেন এবং সেখানে তাদের আনন্দ বিধানার্থে তিনি তার অবতারদের বিভিন্ন রূপ প্রকাশ করতেন। একবার তিনি গোপীদের দর্শনার্থে দ্বাদশ ভূজধারী বিষ্ণু রূপ পরিগ্রহ করেন এবং তার সখা সুবল বিষ্ণুর বাহন গড়ুরের রূপ পরিগ্রহ করেন। আরেকবার তিনি বরাহ রূপ পরিগ্রহ করে লীলা প্রকাশ করেন। একসময় তিনি ভগবান রামচন্দ্রের রূপ পরিগ্রহ করেন ও সখারা ভগবান রামচন্দ্রের বানর বন্ধু রূপ পরিগ্রহ করেন।

লৌঠা বাবা

গোবর্ধনের সর্ব দক্ষিণের অংশটি লৌঠা বাবা পাহাড়া দিচ্ছেন। এই লৌঠা বাবা কৃষ্ণের একজন গোপসখা। যিনি এখনও মথুরায় কৃষ্ণের প্রত্যাবর্তনের জন্য প্রতীক্ষা করছেন। তিনি কৃষ্ণের কাছে এজন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। লৌঠা বাবার এত দৃঢ় বিশ্বাস যে, কৃষ্ণ এখনও মথুরা থেকে প্রত্যাবর্তন করবেন। ভক্তরা তীর্থ পরিক্রমায় গেলে তার কাছ থেকে গুরু ও গৌরাঙ্গের নির্দেশনার প্রতি দৃঢ়তা, সহিষ্ণুতা ও দৃঢ় বিশ্বাস প্রার্থনা করেন ।
কাহিনিটি ছিল, লৌঠাবাবা একসময় কৃষ্ণ বলরামের জন্য একটি বিশেষ ভোজনের আয়োজন করেছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত ঐ দিন অক্রুর কৃষ্ণ ও বলরামকে মথুরায় নিয়ে যেতে এসেছিলেন। লৌঠা বাবা হঠাৎ তাদেরকে অক্রুর এর রথে করে চলে যেতে দেখলেন। কৃষ্ণ তখন তাকে বললেন, “চিন্তা করো না, আমি শীঘ্রই মথুরা থেকে ফিরে আসব।” কিন্তু কৃষ্ণ আর কখনো ফিরে আসেন নি এবং বলা হয় যে, লৌঠা বাবাও এখনও অভুক্ত থেকে কৃষ্ণের জন্য প্রতীক্ষা করছেন।
তিনি গো-চারনের জন্য একটি লাঠি বহন করেন। কথিত হয় যে, যখন কৃষ্ণ গোর্বন পর্বত উত্তোলন করছিলেন, তখন অন্যান্য গোপসখাদের মত লৌঠা বাবাও তার লাঠি দিয়ে সে পর্বত ধারণ করতে সাহায্য করেছিলেন। যেহেতু লৌঠা বাবা বেশ হৃষ্টপুষ্ট বা শক্তিশালী ছিলেন, তিনি ভেবেছিলেন কৃষ্ণ নয় প্রকৃতপক্ষে তিনিই পর্বতটি ধারণ করে আছেন। সখার এ মনোভাব বুঝতে পেরে, কৃষ্ণ মৃদু হাসলেন পরবর্তীতে নিজের ভুল বুঝতে পেরে তিনি কৃষ্ণের কাছে পুণরায় সেই সেবা প্রার্থনা করেন ।

দোকা দাউজী মন্দির (চিত্র-৭)

আরেকটি সুন্দর কাহিনি রয়েছে, যেটি দোকা দাউজী মন্দির তৈরি করতে অনুপ্রাণীত করে। দাউজী মানে ‘বড় ভাই’ যেটি বলরামকে নির্দেশ করে। রাসনৃত্যের এক রাতে বলরাম কৃষ্ণকে গভীরভাবে অবলোকন করছিলেন। কৃষ্ণের লীলাবিলাসে তিনি এতটাই নিমগ্ন হন যে, তিনি অপলক দৃষ্টিতে কৃষ্ণের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তখন বলরামের শ্বেত রঙের দেহ কৃষ্ণের মত কৃষ্ণবর্ণে পরিণত হয়েছিল। এখানে দোকা মানে হল ‘অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা’।

মনি কন্ডলী গুহা (চিত্র-৬)

এই গুহায় রাধারাণী কৃষ্ণ বিভিন্ন লীলাবিলাস করতেন।

রুদ্র কুণ্ড (চিত্র-৬)

এই স্থানে শিব (রুদ্র) কৃষ্ণের লীলাবিলাসে মগ্ন হন। তিনি তখন এতটাই অপ্রাকৃতভাবে অধিষ্ঠিত হন যে, তার চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে আসে। সেই চোখের জলে এই কুণ্ডের সৃষ্টি হয় ।

হরিজু কুণ্ড (চিত্র-৬)

কৃষ্ণের বিরহে ক্রন্দন করতে করতে গোপীদের চোখের জলে এই কুণ্ডের সৃষ্টি হয়। রাধা-কৃষ্ণ এখানে অনেক লীলাবিলাস করেন।

যজ্ঞস্থল (চিত্র-৮)

আনিয়র নামক গ্রামে গোবর্ধন পর্বতের প্রতি যজ্ঞ সম্পাদেন করা হয় এবং এখানেই গোবর্ধন পর্বতের সেই সুবিশাল রুপটি প্রকাশিত হয়ে ব্রজবাসীদের নিবেদিত নৈবেদ্য গ্রহণ করেন।

কুসুম সরোবর

‘কুসুম’ অর্থ পুষ্প অর্থাৎ, কুসুম সরোবর অর্থ “পুষ্প সরোবর’। এই সরোবরটি ব্রজের মধ্যে সবচেয়ে দর্শনীয়। সরোবরকে ঘিরে ধরে আছে অনেক সুন্দর সুন্দর মন্দির এবং এগুলো প্রতিসম ও রাজকীয়ভাবে সাজানো। কুসুম সরোবরের দক্ষিণে একটি কুঞ্জ রয়েছে, যেটি ‘অশোক-লতা’ নামে পরিচিত। যেখানে কৃষ্ণ শ্রীমতী রাধারাণীর বিনুনি করেছিলেন।
অশোক-লতার পিছনে একটি ছোট মন্দির রয়েছে যেখানে উদ্ধবের বিগ্রহ পূজা করা হয়। এই স্থানটি ‘উদ্ধব বৈঠক’ নামে পরিচিতি। কৃষ্ণ উদ্ধবকে পাঠিয়েছিলেন গোপীদের বার্তা সরবরাহ করার জন্য। উদ্ধব গোপীদের কৃষ্ণপ্রেমে এতটাই উদ্ভাষিত হন যে, তিনি ঘাস বা লতাগুলো পরিণত হওয়ার জন্য প্রার্থনা করেছিলেন। যাতে গোপীদের শ্রীপাদপদ্মের ধূলা তিনি মস্তকে ধারণ করতে পারেন। উদ্ধবের সেই বাসনা পূর্ণ হয়েছিল, এবং তিনি এই কুসুম-সরোবরে ঘাস হয়ে বাস করেন ।
শ্রীমদ্ভাগবত মাহাত্ম্যে একটি সুন্দর লীলা বর্ণিত আছে, যেটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল উদ্ধব এই স্থানে ঘাস হওয়ার পর। একবার কৃষ্ণ ও যদুদের প্রস্থানের পর ভগবানের রাণীদেরকে কালিন্দি উপদেশ দেন যেন তারা ভগবানের বিচ্ছেদ বিরহ উপশমের জন্য উদ্ধবের কাছ থেকে শ্রীমদ্ভাগবত শ্রবণ করেন। কালিন্দি, যিনি হলেন যমুনা দেবী।
তাই রাণীরা বজ্রনাভ ও পরীক্ষিৎ মহারাজকে সাথে নিয়ে উদ্ধবকে অনুসন্ধানের জন্য এই কুসুম সরোবরে এসেছিলেন। তারা জানতেন উদ্ধব সেখানে ঘাস রুপে বিরাজ করছেন। সেখানে পৌঁছে তারা বীণা, মৃদঙ্গ ও অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র সহকারে ভগবানের মহিমা কীর্তন করলে অবশেষে উদ্ধব স্বরুপে প্রকাশিত হন এবং তিনি নিজেও সেই নৃত্য কীর্তনে অংশগ্রহণ করেন। কিছুক্ষণের জন্য প্রত্যেকে নিজেদের স্বরুপ বিস্তৃত হয়ে ভগবানের পবিত্র নামের আনন্দময় মহাসমুদ্রে বিলিন হয়ে যান। এরপর তারা উদ্ধবের কাছ থেকে শ্রীমদ্ভাগবত শ্রবণ করতে আসন গ্রহণ করেন। ইতোমধ্যে পরীক্ষিৎ মহারাজকে উদ্ধব ভিন্ন একটি সেবা প্রদান করেন; তাকে বলা হয় কলিকে খুঁজে বের করে তাকে দমন করার জন্য। প্রকৃতপক্ষে কলহের যুগ ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে এবং উদ্ধব জানতেন কলি শ্রীমদ্ভাগবত আলোচনায় বাধা প্রদানের চেষ্টা করবে। এতে পরীক্ষিৎ মহারাজ শ্রীমদ্ভাগবত শ্রবণ করতে পারবে না জেনে হতাশ হন। তখন উদ্ধব তাকে শান্ত করেন। তিনি বলেন, শীঘ্রই শুকদেব গোস্বামীর শ্রীমুখ থেকে পরীক্ষিত শ্রীমদ্ভাগবত শ্রবণ করার সৌভাগ্য লাভ করবেন। পরীক্ষিৎ মহারাজ তখন সেখান থেকে প্রস্থান করেন। উদ্ধব তখন শ্রীমদ্ভাগবত কথা আরম্ভ করলেন ।
সেই শ্রীমদ্ভাগবত কথা শ্রবণ করার জন্য যারা যারা সেখানে উপস্থিত ছিল সবাই তখন গভীরভাবে সেই কথায় পূর্ণভাবে নিমগ্ন হন। ধীরে ধীরে তারা কৃষ্ণের অপ্রাকৃত লীলাবিলাস দর্শন করে, সেখানে প্রবেশ করে পুণরায় এ জগতে আর কখনো ফিরে আসেননি। এভাবে তারা শ্রীমদ্ভাগবত শ্রবণের চরম সিদ্ধি লাভ করলেন।

নারদ কুণ্ড

গোবর্ধন পর্বতের পাশে একটি ছোট বন রয়েছে যেখানে নারদ মুনি নারদ ভক্তি শাস্ত্র রচনা করেছিলেন। সেই বনটিকে নারদ বন বলা হয়। ভক্তি-রত্নাকর অনুসারে তিনি বৃন্দা দেবীর নির্দেশনা লাভ করার জন্য এখানে তপস্যায় ব্রতী হয়েছিলেন।
নারদ মুনির দৃঢ় বাসনা ছিল তিনি রাধাকুণ্ডে রাধাকৃষ্ণের লীলাবিলাস দর্শন করবেন। কিন্তু তার শরীরটি ছিল পুরুষের, তাই যেখানে এই লীলা অনুষ্ঠিত হচ্ছিল সেখানে তিনি প্রবেশ করতে অসমর্থ। দাম্পত্য রসের লীলাবিলাসের ক্ষেত্রে একমাত্র পুরুষ হলেন কৃষ্ণ। একদিন তিনি সেই বাসনার কথা বৃন্দা-দেবীর কাছে প্রকাশ করেন। তিনি তাকে ব্রজে বাস করে তপস্যা করার উপদেশ দেন। এই আদেশ বৃন্দাদেবীর আশীর্বাদ ছিল এবং এভাবে নারদ উপযুক্ত রূপ লাভ করে তার এই বাসনা পূরণ করতে পারেন। বৃন্দাদেবী নারদকে কুসুম সরোবরে নিয়ে গেলেন এবং সেখানে জলের মধ্যে ডুব দিতে বললেন। ডুব দেওয়ার পর তিনি নারদী গোপীতে পরিণত হন।
সেখানে একটি নারদ কুণ্ড রয়েছে এবং সেখানে নারদ মুনির বিগ্রহ পূজিত হয় ।
“নারদ মুনি প্রদত্ত এই সমস্ত উপদেশ যিনি শ্রদ্ধাসহকারে পালন করতে রাজী হবেন, তিনি অবশ্য ভক্তিলাভ করার জন্য আশীর্বাদ পুষ্ট হয়ে, পরম প্রিয় ভগবানকে লাভ করবেন। হ্যাঁ, তিনি অবশ্যই প্রিয়তম ভগবানকে প্রাপ্ত হবেন।” নারদ ভক্তি সূত্র, ৮৪

শ্যামবন ও রত্ন সিংহাসন

সেই বনের মধ্যে একটি রত্ন-সিংহাসন রয়েছে যেখানে শ্রীমতী রাধারাণী বসে তাঁর লীলাবিলাস উপভোগ করতেন। ভক্তি রত্নাকরে বলা হয়েছে, কৃষ্ণ এখানে শঙ্কচূড় অসুরকে বধ করেছিলেন। কারণ শঙ্কচূড় গোপীদের অপহরণ করতে চেয়েছিল। ভগবান তখন শঙ্কচূড়ের মস্তক থেকে মূল্যবান রত্ন নিয়ে তা বলরামকে উপহার দেন। শঙ্কচূড় হল রাধারাণীর ভ্রাতা শ্রীধামের প্রকাশ।
গর্গ সংহিতা অনুসারে, চিন্ময় জগতে দুই ভাই বোনের মধ্যে অভিশাপ আদান-প্রদান হয়েছিল। ফলে শ্রীধাম শঙ্কচূড় হয়ে আবির্ভূত হন এবং শ্রীমতি রাধারাণী কৃষ্ণ-বিচ্ছেদ বিরহে শত বছর অতিবাহিত করেন। ভগবানের হাতে এভাবে মৃত্যুবরনের পর, শঙ্কচূড় পুণরায় তার স্বরুপে ফিরে আসেন।
শ্যামবন হল সেই স্থান যেখান থেকে গোবর্ধন পর্বত দৃশ্যমান হতে শুরু করে। শ্যামবন ও রাধাকুণ্ডের মধ্যে গিরিরাজ ইতোমধ্যে ভূমিতলে প্রবেশ করেছে। সম্ভবত শ্যামরনই হল সেই স্থান যেখানে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু গিরিরাজকে দর্শন করেছিলেন। শ্রীচৈতন্য চরিতামৃত (মধ্য ১৮/১৬) বলা হয়েছে,
“গিরি গোবর্ধন দর্শন করে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু দণ্ডবৎ প্রণাম করলেন এবং একটি শিলাকে আলিঙ্গন করে তিনি প্রেমে উন্মত্ত হলেন।”

ব্ৰহ্মা কুণ্ড

“এই সরোবরের জলে অবগাহনের মাধ্যমে ব্রহ্মা ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে প্রসন্ন করেন। সেসময় ইন্দ্ৰ সহ সমস্ত দেব-দেবী নিকটে অন্যান্য সরোবর সৃষ্টি করেন।” (মথুরা-মাহাত্ম্য, শ্লোক-৪৩২) এই ব্রহ্মা কুণ্ড মানসী গঙ্গার পাশেই অবস্থিত। হরিদেব মন্দির নামক একটি মন্দিরে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু অপ্রাকৃত নৃত্য-কীর্তন প্রদর্শনের পর তিনি সেই রাতে ঐ মন্দিরে অবস্থান করার সিদ্ধান্ত নেন। বলভদ্র ভট্টাচার্য ব্রহ্মা কুণ্ডে তার ভোজন রন্ধন করেন। মহাপ্রভু সেই কুণ্ডে স্নান করে সেখানে প্রসাদ আস্বাদন করে। পরদিন মহাপ্রভু গোবর্ধন পরিক্রমায় অংশগ্রহণ করলে তিনি ক্রমাগত শ্রীমদ্ভাগবতের নিম্নোক্ত শ্লোকটি বলতে থাকেন ।

হন্তায়মদ্রিরবলা হরিদাসবর্যো যদ্ রামকৃষ্ণচরণস্পরশপ্রমোদঃ।
মানং তনোতি সহগোগণয়োস্তয়োর্যৎ পানীয়স্যবসকন্দরকন্দমূলৈঃ ॥

“ভক্তগণের মধ্যে এই গোবর্ধন পর্বত শ্রেষ্ঠ। হে সখীগণ, এই পর্বত গোবৎস, গাভী ও গোপগণের সঙ্গে কৃষ্ণ ও বলরামকে পানীয় জল, অত্যন্ত কোমল ঘাস, গুহা, ফল, ফুল ও শাক-সবজি সমস্ত রকমের প্রয়োজনীয় দ্রব্যই সরবরাহ করে। এভাবেই এই পর্বত ভগবানকে শ্রদ্ধা নিবেদন করছে। কৃষ্ণ ও বলরামের চরণস্পর্শ লাভ করার ফলে গোবর্ধনকে অত্যন্ত উৎফুল্ল মনে হচ্ছে।” (শ্রীমদ্ভাগবত ১০/২১/১৮)

দান-ঘাটি

গোবিন্দ কুণ্ডে যজ্ঞ সম্পাদনের উদ্দেশ্যে গমন করলে কৃষ্ণ ও গোপসখারা গোপীদেরকে এই স্থানে বাধা দেন। তারা দুগ্ধজাত দ্রব্যের জন্য কর দাবি করেছিলেন।

গোবিন্দ কুণ্ড

ইন্দ্র যখন দুধ, গঙ্গাজল, তুলসী মঞ্জুরী ও পদ্মফুল দিয়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে অভিষেক করান তখন এই কুণ্ডের সৃষ্টি হয়েছিল। কৃষ্ণ তখন গোবর্ধন পর্বতের ওপর বসেছিলেন।
গর্গ সংহিতায় একটি সুন্দর ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে, “হে রাজা, কলিযুগ আরম্ভের ৪,১০৮ বছর পর, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গোবর্ধন পর্বতের একটি গুহা থেকে প্রকাশিত হবেন এবং শৃঙ্গারমণ্ডলে তার অপ্রাকৃত রূপ প্রকাশ করবেন। সাধু ব্যক্তিগণ ভগবানের এই রূপকে শ্রীনাথ হিসেবে আরাধনা করবে। তিনি সর্বদা গোবর্ধন পর্বতে লীলাবিলাস উপভোগ করবেন। কলিযুগের যে সমস্ত মানুষ এই রূপ দর্শন করবেন তারা সমস্ত পারমার্থিক সফলতা অর্জন করবেন। (গর্গ সংহিতা পৃ: ২৪৪)
চৈতন্য লীলার মাধবেন্দ্র পুরীর মাধ্যমে ভগবানের এই রুপ আবির্ভূত হয়। (চিত্র-৯)


 

অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০১৭ ব্যাক টু গডহেড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here