সপ্ত মাতার মধ্যে গো-মাতা শ্রেষ্ঠ

0
36

সুরসেন দাস ব্রহ্মচারী

শাস্ত্রে সপ্ত মায়ের কথা বর্ণিত আছে-বিশেষ করে মানব প্রজাতির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। প্রথম মাতা-আমাদের সকলের গর্ভধারীনী মাতা। দ্বিতীয়-ধাত্রী মাতা ধাইমা, যিনি আমাদের প্রথম ধারণ করেন এবং বেশকিছু সেবাও করে থাকেন। তিনি আমাদেরকে পরে প্রদান করেন ধরিত্রী মাতার কোলে, তাই তৃতীয় ধরিত্রী মাতা। আর এই ধরিত্রী মাতা আমাদের সারা জীবন ধারণ করে আছেন। তাঁর কোলে আমরা মল-মূত্র ত্যাগ থেকে শুরু করে খেলা ধূলা, চাষ বাস, ছুটাছুটি, আনন্দ ফূর্তি কত কিনা করে চলেছি। নিজের গর্ভধারী মায়ের মতো সবকিছু তিনি সহন করে আমাদের পালন করছেন। চতুর্থ গো-মাতা। আমরা যখন জন্মগ্রহণ করি, তখন আমাদের গর্ভধারীনী মাতা অজ্ঞান অবস্থায় থাকেন। তাই তিনি আমাদের আহার দানে অক্ষম থাকায় ধাইমাতা আমাদের প্রথম গো-দুগ্ধ প্রদান করেন এবং অনেক সময় মায়েরা দুগ্ধদানে অক্ষম থাকেন, তখনও আমরা গো-মায়ের দুগ্ধ পান করে আমাদের জীবন রক্ষা করে থাকি। শুধু জন্মের পরে নয় সারা জীবন আমরা গো-দুগ্ধ পান করি এমনকি মৃত্যুর আগের মুহূর্ত পর্যন্ত।
যখন আমরা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করবো সেই সময়ও আমাদের মুখে গো-দুুুুুুুুুুুুুুুগ্ধ স্বজনগণকে প্রদান করতে দেখতে পাই। আর সারা জীবন দুধ, দই, মাখন, ঘি, নানাবিধ খাবার-যেমন-লুচি, হালুয়া, পুরী পকোরা, ঘিয়ে রান্না বিভিন্ন প্রকার সবজী আবার দুধ থেকে ছানা-ছানা থেকে রসগোল্লা, সন্দেশ, লেডিকেন চম্‌চম্‌ , দানাদার, রসকদম, ছানাপোড়া, সরভাজা, বিভিন্ন প্রকার নানাবিধ খাবার, পুষ্টিকর, সুস্বাদু তৃপ্তিকর আহার্য বস্তু আমরা গো-মাতার কাছ থেকে পাচ্ছি।
বেদে সাতপ্রকার পিতার কথাও রয়েছে। তাই বৃষ বা বলদ আমাদের চতুর্থ পিতা-আমাদের জন্মদাতা পিতা যেমন আমাদেরকে বাল্যকালে চাকরী করে হোক আর ব্যবসা বা খেত মজুর করে হোক, রোজগার করে আমাদের জীবন রক্ষার জন্য আহার প্রদান করেন, ঠিক তেমনি বলদ বা বৃষ জমিতে লাঙ্গল প্রদান করে জমির মাটি উর্বর করে। আর সেই উর্বর মাটিতে নানা প্রকার শস্যাদি, ফল মূল, শাক সবজী উৎপন্ন হয়। আর আমরা মানব সহ ৮৪ প্রকার জীব জাতির মাতা-পিতা, স্বামী-স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে, আত্মীয়-স্বজন, পশু-পাখি, কীট-পতঙ্গ সবাই মিলে সেই সকল আহার্য বস্তু গ্রহণ করে বেঁচে আছি। তাই বৃষ বা বলদ আমাদের পিতা এবং এই মাতা-পিতার সেবা করাটাও আমাদের একটা ধর্ম। আমাদের মাতা-পিতা যেমন বৃদ্ধ হলে আমরা তাঁদের আহার, পান ও বস্ত্র দ্বারা রক্ষণাবেক্ষণ করে থাকি, ঠিক তেমনি গো- মাতা ও পিতা যখন দুধ ও লাঙ্গল দিতে পারছে না, তখন তাদের রক্ষা ও সেবা করা আমাদের একান্ত দায়িত্ব ও কর্তব্য। তারা দুধ দিতে পারছে না, লাঙ্গল করতে পারছে না, তাই তাদের বিক্রী করে দাও। পয়সার চেয়ে বেশী পয়সা দেখা গেলো বাড়ীর কোন ব্যক্তির পিছনে-নার্সিংহোমে, ডাক্তারখানাতে, ঔষধ আর ডাক্তার বাবুতে শেষ করে দিলো। তাই হে মানবজাতি, ভগবানের সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব-আমরা কেউ কখনও কখনও কোন সময়ে গো- সম্পদ বা গোধন কোন ব্যবসায়ীর হাতে বিক্রি করবো না। গরু যদি গোয়ালে রাখার জায়গা নেই, বেশ হয়েছে খেতে দিতে পারছি না, তাহলে গো-দান করুন ব্রাহ্মণ বৈষ্ণবদেরকে।  একশটি কন্যা দান করলে যে পূণ্য আর একটা গাভী দান করলে সেই পূণ্য লাভ করতে পারবেন। অন্যভাবে এর অর্থ ব্যাখ্যা করলে বোঝাবে-৪০০০ কেজি সোনা আর একশটি কন্যা দানে যে ফল লাভ হয়- এক গো দানে সেই ফল লাভ হয়ে থাকে। বৈদিক প্রথা অনুসারে মাতৃ-পিতৃ শ্রাদ্ধ কর্ম্মে গো- দানের পন্থা আছে।
যার ফলে মাতা-পিতা বা যার উদ্দেশ্য শ্রাদ্ধ করা হয় তিনি নিশ্চতরূপে গো-লোকে প্রবেশ করেন এবং তাঁর বংশধরগণ গো-লোকের পথযাত্রীর নথিভূক্ত হয়ে থাকেন সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। গো-দানে অতি সহজে বৈতরণী পার হওয়া যায় বলে ভবসাগর পার হওয়া যায়। এইরূপ পদ্মপুরাণে গো-দানের বহু মাহাত্ম্য বর্ণনা করা আছে। দান মাহাত্ম্যে বর্ণনা আছে-গো-দান, দ্রব্য দান, অন্ন দান যে কোন দানে বলা হচ্ছে-ভিক্ষুক, সাধারণ মানুষ, এবং স্বজনবৃন্দের দান করার ফলে দ্বিগুণ প্রাপ্তি হয়। সাধারণ ব্রাহ্মণদের দানে শতগুণ, সদ্ ব্রাহ্মণবৃন্দের দানে সহস্রগুণ, বৈষ্ণব এবং বিষ্ণু বা ভগবানকে দান করার ফলে অনন্তগুণ ফল লাভ বা প্রাপ্তি হয়ে থাকে। তবে গো-দানের চেয়ে গো-সেবার মাহাত্ম্য বেশী জানতে হবে।
ভগবান বলেছেন-আমার সম্মুখে ও পশ্চাদভাগে গাভীগণ থাকুক। হৃদয়ে গাভীরা বাস করুন। গাভীর চিন্তাই এবং আমি গাভীকুলের মধ্যেই বসবাস বা অবস্থান করি সর্বক্ষণ। এইভাবে গাভী মহিমা সমস্ত বৈদিক শাস্ত্রেই প্রতিপাদিত হয়েছে। গীতায় ১০ম অধ্যায় বিভূতি যোগে স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন- ধেনুদের

মধ্যে আমি কামধেনু- ধেনুনামাস্মি কামধূক।
গবাং সেবা তু কর্তব্য গৃহস্থৈঃ পুন্যলিপ্সুভিঃ।
গবাং সেবাপরো যস্তু তস্য শ্রীবর্ধতেহচিরাৎ

অর্থাৎ পূণ্য লাভেচ্ছু গৃহস্থের কর্তব্য গো-সেবা করা। যে গো-সেবা করে তার ঘরে লক্ষীদেবী শীঘ্র অবস্থান করেন।গোশালা এবং গোরক্ষা ও সংরক্ষণের জন্য নিজের উপার্জনের নির্দিষ্ট অংশ দান করে বৃদ্ধ দুগ্ধদানরহিত গাভীদের ভরণ-পোষণের যথাযোগ্য ব্যবস্থা করা উচিত ॥
পঞ্চম মাতা-বেদ মাতা। যিনি আমাদের এইসকল শাস্ত্র নিয়ম-নীতি জ্ঞান দান করছেন। যা আমরা বেদ থেকে লাভ করছি। ষষ্ঠ-গুরু মাতা-বেদকে জানতে হলে গুরুর মাধ্যমে বেদের জ্ঞান লাভ করা যায়। যেকোন কাজে বা ক্ষেত্রে গুরু আমাদের একান্ত প্রয়োজন গুরুপত্নী মাতা। সপ্তম রাজমাতা। যে রাজার দেশে আমরা বাস করি সেই রাজপত্নী মাতা। রাজমাতা। রাজা পিতার মতো তাঁর প্রজারূপ পুত্রগণকে পালন করেন। সুখ-দুঃখ, ভালো-মন্দ লক্ষ্য রাখে এবং বিপদ সংকট থেকে রক্ষা করেন। তাই রাজা আমাদের পিতার মতো এবং রাজপত্নী আমাদের মাতা-রাজমাতা। এই হলো সপ্তম মাতার কথা। শ্রীমদ্ভাগবতে (১১/১১/৪২,৪৩) শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, গাভীদের তৃণ এবং অন্যান্য শস্যাদিসহ, তাদের সন্তুষ্টি ও সুস্বাস্থ্যের উদ্দেশ্য, উপকরণাদি প্রদানের মাধ্যমে, তাদের মাঝেও আমাকে পূজা অর্চনা করা চলে।


 

চৈতন্য সন্দেশ নভেম্বর-২০২১ প্রকাশিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here