শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সন্ন্যাস গ্রহণের উদ্দেশ্য

0
499

বেনুধারী দাস ব্রহ্মচারী:
কলির প্রথম সন্ধ্যায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ পঞ্চতত্ত্বরূপে প্রকাশিত হয়ে ভগবৎ প্রেম বিতরণ করেছিলেন। তাই বলা হয়েছে-
পঞ্চতত্ত্বাত্মকং কৃষ্ণং ভক্তরূপ স্বরূপকম্।
ভক্তাবতারং ভক্ত্যাখ্যং নমামি ভক্তশক্তিকম্॥
অর্থাৎ “শ্রীকৃষ্ণের ভক্তরূপ, ভক্তস্বরূপ, ভক্তাবতার, ভক্ত ও ভক্তশক্তি এই পঞ্চতত্ত্বাত্মক শ্রীকৃষ্ণকে আমি প্রণতি নিবেদন করি।”
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, ভক্তরূপে হলেন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ভক্তস্বরূপে শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা রূপে প্রকাশিত হলেন আর শ্রীঅদ্বৈতাচার্য প্রকাশিত হলেন মহাপ্রভুর ভক্তাবতার রূপে। এই তিনতত্ত্ব হচ্ছেন ঈশ্বর-তত্ত্ব “এই তিন তত্ত্ব সবে প্রভু করি গাই।” এরপর ভক্তাখ্যং অর্থাৎ ভক্ততত্ত্ব হচ্ছেন শ্রীবাস প্রভু ও ভক্তশক্তিরূপে শ্রীগদাধর প্রভু প্রকাশিত। এইভাবে পঞ্চতত্ত্বরূপে ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু পৃথিবীতে সংকীর্তন যজ্ঞের প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন। তিনি নিজে প্রেম আস্বাদন করেছিলেন এবং জগতের জনসাধারণের মধ্যে এই প্রেমধন দান করেছিলেন।
কৃষ্ণ অবতারে তিনি এই অপ্রাকৃত প্রেমভাণ্ডার সঙ্গে আনলেও তা রুদ্ধ করা ছিল, তিনি সকলকে এই প্রেম বিতরণ করেন নি।
কেবলমাত্র শরণাগত ভক্তদের তা প্রদান করেছিলেন। কিন্তু শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু যখন পঞ্চতত্ত্বসহ অবতীর্ণ হলেন, তখন তাঁরা সেই শীলমোহর ভেঙে এই কৃষ্ণপ্রেমের ভাণ্ডার লুণ্ঠন করে পেয়েছেন এই প্রেমামৃত পান করিয়ে তাকেই উন্মত্ত করে তুলেছেন।
এই বিষয়ে শ্রীচৈতন্য চরিতামৃতে বলা হয়েছে-
দীনহীন পতিত পামর নাহি বাছে।
ব্রহ্মার দুর্লভ প্রেম সবাকারে যাচে॥
পঞ্চতত্ত্বের এই পাঁচজন যতই এই ভগবৎ প্রেম বর্ষণ করলেন, ততই এর ভাণ্ডার শত শত গুনে বৃদ্ধি পেতে থাকল এবং এই প্রেম বন্যার ঢেউ জগতে ছড়িয়ে পড়তে লাগলো। আর ভগবৎ প্রেমে নিমজ্জিত হওয়ার ফলে জীবের জড় ভোগ বাসনার বীজ সম্পূর্ণরূপে নষ্ট হয়েছে জানতে পেরে পাঁচজন খুবই উল্লাসিত হলেন।
জগৎ ডুবিল জীবের হৈল বীজ নাশ।
তাহা দেখি পাঁচজনের পরম উল্লাস॥
ভগবৎ প্রেমের এই বন্যা চারদিকে বর্দ্ধিত হয়ে সকলকে নিমজ্জিত করলেও দুর্ভাগা মায়াবাদী, যারা জড় ভোগ বাসনায় বিশ্বাসী ও জড় কর্মে আসক্ত দক্ষতার সঙ্গে তারা এই কৃষ্ণপ্রেমের বন্যাকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল। তার ফলে এই কৃষ্ণভাবনামৃতের এই প্রেমবন্যা তাদের স্পর্শ করল না।
মায়াবাদী, কর্মনিষ্ঠ, কুতার্কিকগণ।
নিন্দুক, পাষণ্ডী, যত পড়ুয়া অধম॥
সেইসব মহাদক্ষ ধাঞা পলাইল।
সে বন্যা তা সবারে ছুঁইতে নারিল॥
এই সমস্ত ভগবৎ বিদ্বেষীদের কৃষ্ণপ্রেম গ্রহণ না করে পালাতে দেখে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু চিন্তা করলেন, “আমি এসেছিলাম সমগ্র জগতকে দুর্লভ কৃষ্ণপ্রেমে নিমজ্জিত করতে, কিন্তু এইসমস্ত দুর্ভাগা ব্যক্তিরা তা এড়িয়ে চলছে, গ্রহণ করছে না। অথচ আমি ছাড়া তো তাদের উদ্ধার করার আর কোন উপায় নেই।”
তোমারে লইতে আমি হৈনু অবতার।
আমি বিনা বন্ধু আর কে আছে তোমার॥
তখন মহাপ্রভু ঠিক করলেন এরা এখন আমাকে এড়িয়ে চললেও আমি এদেরকেও প্রেম দান করব। সকলকে কৃষ্ণপ্রেমে নিমজ্জিত করার জন্য আমি কিছু কৌশল অবলম্বন করব। অবশেষে বাদ পড়ে যাওয়া বা পালিয়ে বেড়ানো এইসব মানুষদের কৃষ্ণ প্রেম প্রদানের জন্য মহাপ্রভু সিদ্ধান্ত নিলেন “আমি সন্ন্যাস আশ্রম গ্রহণ করব।”
এতবলি মনে কিছু করিয়া বিচার।
সন্ন্যাস আশ্রম প্রভু কৈলা অঙ্গীকার॥
চতুরাশ্রমের মধ্যে সন্ন্যাস আশ্রম শ্রেষ্ঠ ও শ্রদ্ধার্ঘ। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু সাক্ষাৎ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, তিনি চতুর্বর্ণাশ্রমের গণ্ডি থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত। কিন্তু যারা মহাপ্রভুর কৃষ্ণপ্রেম বিতরণকে এড়িয়ে ছিল তারা তাঁর ভগবত্তা না বুঝে তাঁকে মনুষ্য জ্ঞান করেছিল। সমাজে সন্ন্যাসীর স্থান শ্রেষ্ঠ সম্মানের আসনে বিরাজিত। তাই তাঁরা মহাপ্রভুকে সন্ন্যাস বেশে দেখে শ্রদ্ধাশীল হবে জেনে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এই জাল পেতে তাদেরকে কৃষ্ণপ্রেমে নিমজ্জিত করার বাসনায় ধরতে চাইলেন। অবশেষে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তাদের সকলকে এইভাবে আকর্ষণ করলেন-
সন্ন্যাস করিয়া প্রভু কৈলা আকর্ষণ।
যতেক পালাঞাছিল তার্কিকাদিগণ॥
পড়ুয়া, পাষণ্ডী, কর্মী, নিন্দকাদি যত।
তারা আসি প্রভু পায়ে হয় অবনত॥
অপরাধ ক্ষমাইল, ডুবিল প্রেমজলে।
কেবা এড়াইবে প্রভুর প্রেম মহাজালে॥
এইভাবে বিভিন্ন প্রকার কৌশল অবলম্বন করে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু সমস্ত প্রকার অধঃপতিত জীবদের উদ্ধার করেছিলেন। তিনিই সকলের আদি পিতা। পিতা হিসাবে সকল সন্তানের প্রতি স্নেহবশতঃ তিনি সকলকে এই জড় সংসার দুঃখ থেকে উদ্ধার করে নিত্য আনন্দময় জীবনে নিয়ে আসতে চান। তিনি এইভাবে সকল প্রকার জীবকে উদ্ধার করেছিলেন এবং এই কাজে সহযোগিতার জন্য তিনি সকল ভক্তগণকে আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি সকল ভক্তগণকে গুরু হওয়ার আদেশ প্রদান করে গুরু দায়িত্ব গ্রহণ করার নির্দেশ দিয়ে গিয়েছেন।
যারে দেখ তার কহ কৃষ্ণ উপদেশ।
আমার আজ্ঞায় গুরু হঞা তার এই দেশ॥
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু আরও বলেছেন-
প্রভু কহে, আমি বিশ্বম্ভর নাম ধরি।
নাম সার্থক হয়, যদি প্রেমে বিশ্ব ভরি॥
অর্থাৎ “আমার নাম বিশ্বম্ভর, যার অর্থ হল সমগ্র বিশ্বের পালন কর্তা। যদি ভগবৎ প্রেমে সারা বিশ্ব ভরে দিতে পারি তাহলেই কেবল আমার নামের অর্থ যথার্থভাবে সার্থক হয়।” পরে তিনি বলেছেন যে তাঁর একার পক্ষে এই কাজটি কতদূর সফল হতে পারে। যদিও তিনি স্বয়ং ভগবান তথাপি তিনি বলেছেন ‘আমার একার পক্ষে এই কাজটি সম্পন্ন করা অসম্ভব।’ অর্থাৎ সকল ভক্ত এই কার্যে অংশগ্রহণ করুক এই ইচ্ছা পোষণ করে তিনি সকল শ্রেণীর ভক্তকে একত্রিত করে এই প্রকার সেবায় অংশগ্রহণ করার সুযোগ দিতে চাইছেন এবং ভক্তদের মাধ্যমে কৃষ্ণভাবনামৃতকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা বলছেন-
একলা মালাকার আমি কাঁহা কাঁহা যাব।
একলা বা কতফল পাড়িয়া বিলাব॥
একলা উঠাইয়া দিতে হয় পরিশ্রম।
কেহ পায়, কেহ না পায়, রহে মনে ভ্রম॥
অতএব আমি আজ্ঞা দিনু সবারে।
যাঁহা তাঁহা প্রেমফল দেহ যারে তারে॥
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর এক গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ এই যে, এই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনকে সারা পৃথিবী জুড়ে বিতরণ করে ছড়িয়ে দাও। যাকে তাকে এই প্রেমফল দান কর যাতে তারা এই জরা ও মৃত্যুরূপ দুর্দশার কবল থেকে মুক্ত হয়ে তাদের নিত্য স্বরূপে অধিষ্ঠিত হতে পারে। ভক্তমাত্রেই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর হৃদয়ের এই চিন্তা ও ঐকান্তিক উদ্দেশ্যকে দৃঢ়তার সঙ্গে উপলব্ধি করতে পারবেন এবং নিজেকে প্রচার কার্যে যুক্ত করে মহাপ্রভুর কৃপালাভ করে জীবন সার্থক করে তুলবেন। বিশেষত ভারতবাসীর কাছে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ-
ভারত ভূমিতে হৈল মনুষ্য জন্ম যার।
জন্ম সার্থক করি কর পর উপকার॥
যারা ভারতবর্ষে মনুষ্য জন্ম লাভ করেছেন, তাদের কর্তব্য হচ্ছে কৃষ্ণভাবনামৃতকে গ্রহণ করে নিজের জীবনকে সার্থক করা এবং পৃথিবী জুড়ে কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচার করে জীবের উপকার সাধন করা।
আসুন! শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর চরণাশ্রয় করে ভগবৎ প্রেমে নিমজ্জিত হই এবং এই প্রেম ধারার বহুল প্রচার ও প্রসার ঘটিয়ে সমাজের পরোপকার করে জীবন সার্থক করার ব্রত গ্রহণ করি। কেননা এটাই ছিল শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সন্ন্যাস গ্রহণের উদ্দেশ্য।

হরেকৃষ্ণ!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here