শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর শিক্ষাষ্টক (পর্ব-৩)

0
52

সনাতন গোপাল দাস ব্রহ্মচারী

নাম সাধকের কামনা:

ন ধনং ন জনং ন সুন্দরীং,
কবিতাং বা জগদীশ কাময়ে।
মম জন্মনি জন্মনীশ্বরে,
ভবতাদ্ভক্তিরহৈতুকী ত্বয়ি ॥

হে জগদীশ! আমি ধন, জন বা সুন্দরী রমণী কামনা করি না। আমি কেবল এই কামনা করি যে, জন্মে-জন্মে তোমাতেই আমার অহৈতুকী ভক্তি হোক।

ন ধনম্:  ধন চাই না। বর্ণাশ্রমনিষ্ঠ ধর্মধন, ঐহিক ও পারলৌকিক জড় সুখকর ধন, ইন্দ্রিয় তর্পণের জন্য কামধন এগুলি চাই না। ধন সম্পদ আহরণেই লোকেরা সকল শক্তি-সামর্থ্য নিয়োগ করে। কিন্তু পরিণামে সব অর্থই অনর্থের মূল হয়, যখন কৃষ্ণপ্রেমধন আহরণে মন থাকে না।

ন জনম্: স্ত্রী, পুত্র, দাস-দাসী, প্রজা, বন্ধু-বান্ধব প্রভৃতি দেহ সম্বন্ধিত বা দেহ অনুগত লোকজন চাই না। এরা সবাই তাদের জড় সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য দাবী করবে। তাদেরকে সেসব যোগান দিয়েই চলতে হবে। অন্যথায় আপত্তি শুরু হবে। মুখ্য কর্তব্য কৃষ্ণভজন বিঘ্নিত হবে। স্বভাবতই লোকজন জড় চাহিদায় মেতে থাকে।

ন সুন্দরীম্ কবিতাম্: সুন্দরী পত্নী চাই না। মহা পাণ্ডিত্য, সুন্দর বাক্য, গান, কবিতা, ছড়া, উপন্যাস রয়েছে। কিন্তু সেগুলি শ্রীহরির মহিমা বর্ণনা করে না, সেসমস্ত জড়জাগতিক তথাকথিত সুন্দর বিদ্যা চাই না।

সাবিদ্যা তন্মতিয়া: যে বিদ্যায় শ্রীকৃষ্ণে মতি জন্মায় তা-ই আমি চাই। অন্য কিছু নয়।

মম জন্মনি জন্মনি: আমরা কৃষ্ণসেবা বিমুখ হয়ে এই জড় ব্রহ্মাণ্ডে জন্ম-মৃত্যুর চক্রে বহু কাল আবর্তিত হচ্ছি। এই উৎকন্ঠাপূর্ণ জগতে ইন্দ্রিয় সুখ লালসায় জন্ম-জন্মান্তর ধরে ছুটেছি। অনেক কিছু চেয়েছি। যা চাই তা ভুল করে চাই যা পরিণামে দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। চাহিদার ও উৎকন্ঠার শেষ নেই। হে কৃষ্ণ! তোমার প্রতি যদি প্রীতি উন্মুখ করতে পারতাম তাহলে এই জন্মান্তর চক্রের দুর্দশা থেকে উদ্ধার পেতে পারতাম। ঈশ্বরে ভবতাদ ভক্তি পরমেশ্বর ভগবানে আমার ভক্তি হোক। যিনি সর্বময় হর্তা-কর্তা, বিধাতা তাঁর শরণাগত হওয়াই কাম্য। গাছের গোড়ায় জল দিলে যেমন গাছের অসংখ্য শাখা-প্রশাখা, উপশাখা, অসংখ্য পাতা, ফুল-ফল সবটাতে জল দেওয়া আপনা আপনি হয়ে যায়। তেমনই সর্বকারণের কারণ শ্রীকৃষ্ণের চরণে ভক্তি নিবেদন করলে জীবন চক্রের সমস্ত কর্তব্য আপনা হতেই সম্পাদিত হয়ে যায়। “শ্রদ্ধা শব্দে বিশ্বাস কহে সুদৃঢ় নিশ্চয়। কৃষ্ণভক্তি কৈলে সর্বকর্মকৃত হয়।”

অহৈতুকী ত্বয়ি: হে কৃষ্ণ, তোমাতে আমার অহৈতুকী ভক্তি হোক। এই জড় জাগতিক কিছু কামনা চরিতার্থ করতে আমি শরণাগত হচ্ছি না। তুমি আমাকে এই করে দাও, সেই সমস্যার মোকাবিলা করে দাও, সেজন্যে ভক্তি- এটা সংকীর্ণ স্বার্থের খাতিরে ভক্তি, আমি তা চাই না। আমার কর্মবিপাকে যদি জন্ম-জন্মান্তর এই জগতে পড়ে থাকতেও হয়, তবুও হে কৃষ্ণ, কায়মনোবাক্যে চিরদিন যেন তোমাকে ভালোবাসতে পারি। ভক্তি, মুক্তি, সিদ্ধি চাওয়ার উদ্দেশ্যেও তোমার শরণাগত হচ্ছি না। আমি কেবল তোমাকে যেন সেবা করতে পারি, তোমাকে স্মরণ করতে পারি, তোমাকে চিরকাল সমাদর করতে পারি সেই অহৈতুকী ভক্তি আমার হোক, এই প্রার্থনা করি।

নামসাধকের স্বরূপ লক্ষণ

অয়ি নন্দতনুজ কিঙ্করং,
পতিতং মাং বিষমে ভবাম্বুধৌ।
কৃপয়া তব পাদপঙ্কজ,
স্থিতধূলীসদৃশং বিচিন্তয় ॥ ৫ ॥

হে নন্দনন্দন, আমি তোমার নিত্য দাস। কিন্তু আমার স্বকর্ম বিপাকে আমি এই ভয়ঙ্কর ভবসমুদ্রে পতিত হয়েছি। তুমি কৃপা করে আমাকে তোমার পাদপদ্ম স্থিত ধূলিকণা সদৃশ চিন্তা করো।

অয়ি নন্দ-তনু-জ: হে প্রভু, নন্দনন্দন শ্রীকৃষ্ণ! অতি দৈন্য সহকারে আর্তি নিবেদন সূচক শব্দ ‘হে’ ‘অয়ি’। নন্দ মহারাজের তনু বা শরীর থেকে যিনি জাত হয়েছেন, নন্দতনুজ।

কিঙ্করম্: দাস, জীব নিত্য কৃষ্ণদাস। জীব হচ্ছে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের চিরন্তন অংশ চিৎকণা।

মমৈবাংশো জীবলোকে জীবভূতঃ সনাতনঃ (গীতা ১৫.৭)

অংশ জীবাত্মার কাজ হচ্ছে সেই পরমপূর্ণ শ্রীকৃষ্ণের সেবায় যুক্ত থাকা।
জীবের ‘স্বরূপ’ হয় কৃষ্ণের ‘নিত্যদাস’ (চৈতন্য চরিতামৃত মধ্য ২০.১০৮)। কৃষ্ণসেবা না করে বিমুখ থাকে, যেটি জীবের বিরূপ বা বিকৃত অবস্থা।

পতিতম্ মাম্ বিষমে ভব-অম্বুধৌ: নিজ কর্মফলে ভীষণ ভবসাগরে পতিত তোমার এই নিত্য দাস আমাকে কৃপা করো। আমি তোমার নিত্য দাস হয়েও নিজ কর্মদোষে এই বিষম ভবসাগরে পতিত হয়েছি। হে কৃষ্ণ, আমি তোমার দাস্যে উদাসীন হয়ে অন্য কিছু বাসনা করেছি, যার ফলে, অত্যন্ত বিভীষিকাপূর্ণ সংসার সমুদ্রে পতিত হয়েছি। কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্যের কত ঢেউ আমার জীবনকে উত্তাল করছে। কু-বাসনা, কু-চিন্তা, কু-সঙ্গ বারংবার পীড়া দিয়ে আমাকে দিশাহারা করে তুলছে।
জন্ম, মৃত্যু, জরা, ব্যাধির যাতনাময় নানা উদ্বেগ উৎকন্ঠায় পূর্ণ জগতকে ভব বলা হয়। এখানে জীব বিষয়সুখ লাভের আশায় দুঃখ বয়েই বেড়াচ্ছে। শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর গান করেছেন-

অনাদি করম-ফলে
পড়ি ভবার্ণব জলে
তরিবারে না দেখি উপায়।
দিবানিশি হিয়া জ্বলে
এ বিষয় হলাহলে মন
কভু সুখ নাহি পায় ॥

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here