শ্রীকৃষ্ণকে প্রসন্ন করুন

0
34

১৯৭৩ সালের ২১ এপ্রিল লস-এঞ্জেলেসের।

আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন) এর প্রতিষ্ঠাতা-আচার্য
কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ প্রদত্ত প্রবচনের অনুবাদ

ন বেদন কশ্চিদ্ভগবংশ্চিকীর্ষিতং
তবেহমানস্য নৃনাৎ বিড়ম্বনম্ ।
ন যস্য কশ্চিদ্দয়িতোহস্তি কৰ্হিচিদ্
দ্বেষ্যশ্চ যস্মিন্ বিষমা মতিনৃর্ণাম্ ॥
(শ্রীমদ্ভাগবত ১/৮/১৯)

“হে পরমেশ্বর, তোমার অপ্রাকৃত লীলা কেউই বুঝতে পারে না, যা আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ মানুষের কার্যকলাপের মতো বলে মনে হয় আর তাই তা বিভ্রান্তিজনক। কেউই তোমার বিশেষ কৃপার অথবা বিদ্বেষের পাত্র নয়। মানুষ কেবল অজ্ঞতাবশত মনে করে যে, তুমি পক্ষপাতিত্বপূর্ণ।”
পরমেশ্বর ভগবান ভগবদ্গীতায় বলছেন- পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্। (গীতা ৪/৮)। অর্থাৎ ভগবান যখন এই জগতে অবতরণ করেন, তাঁর দুটি উদ্দেশ্য থাকে। একটি উদ্দেশ্য হলো পরিত্রাণায় সাধুনাং এবং অন্যটি হলো বিনাশায় দুষ্কৃতাম্। বিশ্বাসী ভক্ত বা সাধুগণের উদ্ধার একটি উদ্দেশ্য। সাধু মানে ভগবৎ ভক্তি সম্পন্ন ব্যক্তি। ইতোপূর্বে আমি অনেকবারই বর্ণনা করেছি যে সাধু মানে হলো ‘ভক্ত’। সাধু মানে জাগতিকভাবে সৎ থাকা বা নীতিসম্পন্ন হওয়া নয়। জাগতিক কার্যকলাপরূপ সৎ বা অসৎ, নৈতিক বা অনৈতিক থাকা নয়। জাগতিক কার্যকলাপের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। এটি কেবলই এক পারমার্থিক ব্যাপার। কখনো কখনো আমরা মনে করি যে, সাধু হচ্ছে একজন জাগতিকভাবে সৎ বা নীতিসম্পন্ন ব্যক্তি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে “সাধু”র অর্থটি রয়েছে পারমার্থিক স্তরে। যারা ভগবৎ
ভক্তিতে যুক্ত রয়েছেন। স গুণান্ সমতীত্যৈতান্ (গীতা ১৪/২৬) অতএব, সাধু জড় গুণাবলী অতিক্রম করে চিন্ময় স্তরে অধিষ্ঠিত। তবুও বলা হচ্ছে যে পরিত্রাণায় সাধুনাম। ‘পরিত্রাণায়’ মানে হচ্ছে উদ্ধার করা সাধু, যিনি চিন্ময় স্তরে অধিষ্ঠিত, তিনি ইতোমধ্যেই উদ্ধার প্রাপ্ত। তাহলে তাকে উদ্ধার করার প্রয়োজন কোথায়? এটি একটি প্রশ্ন? তাই বিড়ম্বন্ম কথাটি এখানে ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ এটি বিভ্রান্তিকর। বিষয়টি পরস্পর বিরোধী বলে মনে হয়। যদি একজন সাধু ইতোমধ্যেই উদ্ধার প্রাপ্ত অবস্থানে অবস্থান করেন, তবে আবার তার পরিত্রাণের জন্য ভগবানের আগমনের ব্যাপারটি বিভ্রান্তিকর। কেননা যিনি সাধু, তিনি ইতোমধ্যেই চিন্ময় অবস্থানে অধিষ্ঠিত। চিন্ময় অধিষ্ঠানের অর্থ হলো, তিনি আর সত্ত্ব, রজ, ও তম প্রকৃতির এই তিনটি গুণের নিয়ন্ত্রণাধীন নন। কারণ ভগবদ্‌গীতায় (১৪/২৬) পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে যে, স গুণান্ সমতীত্যৈতান্  অর্থাৎ তিনি (সাধু) জড় গুণাবলীকে অতিক্রম করেন। তাহলে আবার উদ্ধারের প্রশ্নটি কোথায়? তাঁর উদ্ধারের কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু যেহেতু সাধু কৃষ্ণকে চোখে চোখে প্রত্যক্ষভাবে দর্শন করার জন্য অত্যন্ত উদ্গ্রীব। সেটি তাঁর অন্তরের বাসনা, তাই কৃষ্ণ আগমন করেন। উদ্ধারের জন্য নয়। তিনি ইতোমধ্যেই উদ্ধার প্রাপ্ত। ইতোমধ্যেই তিনি জড় বন্ধন থেকে উদ্ধার লাভ করেছেন। কিন্তু তবুও তাকে সন্তুষ্ট করার জন্য কৃষ্ণ অবতরণ করেন। ভক্ত সর্ব বিষয়ে ভগবানকে সন্তুষ্ট করতে চান। এটি হচ্ছে প্রেম বিনিময়। ঠিক যেমন আপনি যদি কাউকে ভালোবাসেন তখন আপনি তাকে সন্তুষ্ট করতে চান। বিনিময়ে সে আপনাকে সন্তুষ্ট করতে চায়। প্রেমের এই বিনিময় যদি এই জড় জগতে এতটা হতে পারে তাহলে চিন্ময় জগতে তা আরও কতো বিরাটভাবে বা মহাভাবে উন্নীত হতে পারে? এই রকম একটি কবিতার লাইন রয়েছে, “সাধু আমার জীবন, আমিও সাধুর জীবন।” যিনি সাধু তিনি সদা সর্বদা কৃষ্ণের কথা চিন্তা করেন আর কৃষ্ণও সর্বদা তাঁর ভক্ত, সাধুর কথা চিন্তা করেন। তাই, এই জড় জগতে ভগবানের আবির্ভাব ও অন্তর্ধানকে চিকীর্ষতং, অর্থাৎ লীলা বলা হয়।
কৃষ্ণ যে আগমন করেন, এটি হচ্ছে তাঁর লীলা। তিনি যখন অবতরণ করেন, অবশ্যই তিনি তখন কিছু কার্য করেন। সেই কার্যটি হলো অসাধুকে হত্যা করা এবং সাধুকে সুরক্ষা প্রদান করেন। কিন্তু এই উভয় ধরনের কার্যাবলীই হলো তাঁর লীলা। তিনি কারো প্রতি বিদ্বেষপরায়ণ নন। অসুরদের হত্যা করাও তাঁর স্নেহ। ঠিক যেমন কখনো কখনো আমাদের ছোট ছেলে-মেয়েদের শাস্তি দিই, বেশ জোরে চড় মারি, “সেটিও ভালোবাসা”। তাই, কৃষ্ণ যখন কোনো অসুরকে বধ করেন, সেটি তিনি জড় ঈর্ষা বা বিদ্বেষের স্তর থেকে করেন না। সেটিও তাঁর ভালোবাসা। তাই শাস্ত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এমনকি অসুরেরাও, যারা কৃষ্ণের দ্বারা নিহত হন, তারা তৎক্ষণাৎ মুক্তি লাভ করেন। ফলাফলটি একই। ঠিক পুতনার মতো। পুতনা কৃষ্ণের দ্বারা বধ হয়েছিল। পুতনা কৃষ্ণকে হত্যা করতে চেয়েছিল, কিন্তু কে কৃষ্ণকে হত্যা করতে পারে? সেটি সম্ভব নয়।
উপরন্তু সে নিহত হলো। কিন্তু তার নিহত হওয়ার ফলটি কি হলো? এর ফলে সে কৃষ্ণের মায়ের পদ লাভ করেছিল। কৃষ্ণ তাকে মা রূপে গ্রহণ করেছিলেন। সে তার স্তন-বৃত্তে বিষ মেখে এসেছিল এই মনোভাব নিয়ে যে “কৃষ্ণ যখন আমার স্তন-বৃত্ত চুষে দুগ্ধ পান করবেন তখন তার তৎক্ষণাৎ মৃত্যু হবে।” কিন্তু সেটি সম্ভব হলো না। বরং সে নিহত হলো। কৃষ্ণ তার স্তনবৃত্ত চুষে তার প্রাণ বের করে নিলেন। কিন্তু কৃষ্ণ তাকে উত্তম অবস্থান প্রদান করলেন। তিনি এইভাবে ভাবলেন, “এই স্ত্রী অসুরটি আমাকে হত্যা করতে এসেছিল, কিন্তু যেভাবেই হোক না কেন, আমি তার স্তন্য পান করেছি। অতএব সে আমার মা।” এইভাবে পুতনা কৃষ্ণের মায়ের স্থান লাভ করেছিলো। এই ব্যাপারটি ভাগবতে বর্ণনা করা হয়েছে। উদ্ধব বিদুরের কাছে বর্ণনা করছেন, “কৃষ্ণ এতই দয়ালু যে, তাঁকে বিষ দিয়ে হত্যা করতে চেয়েছিল এমন একজনকে তিনি মা রূপে গ্রহণ করেছেন। ভগবান কৃষ্ণ এমনই দয়ালু, তাই কৃষ্ণকে ছাড়া আমি আর কাকে ভজনা করব?” এই উদাহরণটি ভাগবতে প্রদান করা হয়েছে। তাই প্রকৃতপক্ষে ভগবানের কোনো শত্রু নেই। আলোচ্য শ্লোকেও বলা হয়েছে ন যস্য কশ্চিদ্দয়িতঃ। দয়িতৎ মানে পক্ষপাত করা। না, কারোর প্রতি তিনি পক্ষপাত করেন না। ন যস্য কশ্চিদ্দয়িতোহস্তি কৰ্হিচিদ্ দ্বেষ্যশ্চ এবং কেউ তাঁর শত্রু নয়। আর কে-ই বা তাঁর শত্রু হতে পারে, কে-ই বা তাঁর মিত্র হতে পারে?
ধরা যাক আমরা কিছু বন্ধু সৃষ্টি করলাম। সেই বন্ধুদের থেকে আমরা কিছু লাভ বা কল্যাণ আশা করব। আর শত্রুর অর্থ হলো আমি তার থেকে কিছু ক্ষতিকর কার্যকলাপ আশা করব। কিন্তু কৃষ্ণ এতটাই যথাযথ যে, কেউই তাঁর কোনো ক্ষতি করতে পারেন না এবং কারোরই কৃষ্ণকে দেবার মতো কিছু নেই। তাহলে বন্ধু ও শত্রুর প্রয়োজনটি কোথায়? কোনো প্রয়োজন নেই। তাই, এখানে বলা হয়েছেন যস্য কশ্চিদ্দয়িতহোস্তি। তাঁর কারোরই অনুগ্রহের প্রয়োজন নেই। তিনি স্বয়ং সম্পূর্ণ। আমি হয়তো একজন খুব গরীব মানুষ হলাম। আমি তাই কিছু বন্ধু ও অন্যান্যদের আনুকূল্য আশা করি। কিন্তু আমার এই আশাটি এই জন্যই যে, আমি সম্পূর্ণ নই। আমি নানাভাবে অভাবগ্রস্ত। তাই আমি সকল সময়েই অভাবী। ফলে আমি কিছু বন্ধু সৃষ্টি করতে চাই এবং একইভাবে আমি শত্রুদের ঘৃণা করি। কিন্তু কৃষ্ণ পরম হওয়ার জন্য কেউই তাঁর কোনো ক্ষতি সাধন করতে পারে না, কারোরই কৃষ্ণকে কিছু দেওয়ার থাকতে পারে না। তাহলে কেন আমরা কৃষ্ণকে এতকিছু নিবেদন করি? আমরা কৃষ্ণকে পোশাক পরাই, নানাভাবে সাজিয়ে তুলি এবং সুন্দর সুন্দর খাবার প্রদান করি।
ব্যাপারটি তাহলে বোঝার চেষ্টা করুন। কৃষ্ণের আপনার সুন্দর পোশাক কিংবা সুন্দর ফুলের প্রয়োজন নেই। কৃষ্ণের কিছুরই প্রয়োজন নেই। কিন্তু আপনি যদি তাঁকে এসব নিবেদন করেন তখন আপনার কল্যাণ সাধিত হয়। এটি কৃষ্ণের অনুগ্রহ যে, তিনি তা গ্রহণ করেছেন। এবার এই উদাহরণটি বোঝার চেষ্টা করুন—ঠিক যেমন আপনি যদি একজন মানুষকে সাজান, তাহলে মূল মানুষটির আয়নায় প্রতিফলিত মূর্তিকে আপনার সাজানোর মতো সজ্জিতই মনে হবে। আমরাও তেমনি প্রতিফলিত মূর্তি। আমাদের এই দেহ হচ্ছে মূলের প্রতিফলন। বাইবেলেও সেকথা বলা হয়েছে, মানুষ ভগবানের কায়ার অনুসরণে নির্মিত। এই কথার অর্থ হলো আমরা ভগবানের মূর্তির প্রতিফলিত রূপ। মায়াবাদী দার্শনিকেরা মনে করে ‘ভগবানের কোনো রূপ নেই। ভগবান নিরাকার। কিন্তু যেহেতু আমরা হচ্ছি ব্যক্তি তাই পরম ব্রহ্মকেও আমরা ব্যক্তি রূপে কল্পনা করি।’ কিন্তু সেটি সত্য নয়। আমাদের রূপকে পেয়েছি ভগবানের রূপের প্রতিফলন রূপে। তাই প্রতিফলনে, যদি মূল ব্যক্তি লাভবান হন, সঙ্গে সঙ্গে প্রতিফলিত রূপও লাভবান হয়। এটিই হচ্ছে দর্শন। প্রতিফলনও লাভবান হয়। তাই আপনি যখন কৃষ্ণকে সাজান তখন প্রকৃতপক্ষে আপনিই সজ্জিত হচ্ছেন। আপনি যদি কৃষ্ণকে সন্তুষ্ট করেন তাহলে আপনিই সন্তুষ্ট হবেন। আপনি কৃষ্ণকে সুন্দর সুন্দর খাদ্য নিবেদন করলে অবশেষে সেটি আপনিই খাবেন। সম্ভবত যারা মন্দিরের বাইরে থাকে তারা এত সুস্বাদু প্রসাদ কল্পনাও করতে পারে না। কিন্তু যেহেতু সেটি কৃষ্ণকে নিবেদন করা হয় আমরা তাই সেটি গ্রহণের সুযোগ পাই। এটিই হচ্ছে দর্শন। তাই আপনারা সর্বতোভাবে কৃষ্ণকে প্রসন্ন করার চেষ্টা করুন। তাহলে আপনারাও সবদিক থেকে সন্তুষ্ট থাকবেন।
কৃষ্ণের যে আপনার সেবা অত্যন্ত প্রয়োজন এমন নয়। কিন্তু আপনি যদি সেটি করেন তাহলে তিনি দয়া করে সেটি গ্রহণ করেন। সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ (গীতা ১৮/৬৬)। কৃষ্ণ আপনাকে বলছেন, “তুমি আমার শরণাগত হও।” এর মানে এই নয় যে, কৃষ্ণের একজন সেবকের অভাব হয়েছে। আর আপনি শরণাগত হলে কৃষ্ণের খুব লাভ হবে। কৃষ্ণ কেবল তার ইচ্ছামাত্র কোটি কোটি সেবক সৃষ্টি করতে পারেন। তাই, সেটি কোনো ব্যাপার নয়। কিন্তু আপনি যদি কৃষ্ণের শরণাগত হন তাহলে আপনি সুরক্ষিত হবেন। আর সেটি হওয়াই আপনার কর্তব্য।
কৃষ্ণ বলছেন, অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ ॥ তুমি এখানে দুঃখ দুর্দশা ভোগ করছ। ঠিক যেন আশ্রয়হীন। আপনারা দেখুন কত মানুষ রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে, কোনো উদ্দেশ্য নেই, জীবন নেই। আমরা যখন সমুদ্র সৈকতে যাই তখন আমরা দেখি কত যুবক-যুবতী উদ্দেশ্যবিহীনভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তারা যে কি করবে তারা জানে না। সকলেই বিভ্রান্ত। তাই, আমাদের জানতে হবে যে, আমাদের জীবনের উদ্দেশ্যটি কী? আপনি যদি কৃষ্ণের আশ্রয় গ্রহণ করেন, তাহলে আপনি জানতে পারবেন। “ওহ্, আমি এখন আশ্রয় লাভ করেছি।” আর কোনো বিভ্রান্তি থাকবে না। আর কোনো হতাশা থাকবে না। আপনারা সেটি ভালোভাবেই বুঝতে পারেন। কেননা মানুষ কৃষ্ণভাবনামৃত বিষয়ে যে আশান্বিত এ ব্যাপারে প্রতিদিন আমি অনেক চিঠি পাই ।
তাই, কৃষ্ণ শুধুমাত্র কিছু সেবক পাওয়ার জন্য এই পৃথিবীতে অবতরণ করেন, সেটি সত্যি নয়। কিন্তু আমরা কৃষ্ণের সেবক হওয়ার পরিবর্তে আমরা বহু কিছুর সেবক হয়েছি, দাস হয়েছি। আমাদের ইন্দ্রিয়গুলিও ইন্দ্রিয়সমূহের কার্যাবলীর দাস। কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ। প্রকৃতপক্ষে সমগ্র জগৎটিই ইন্দ্রিয়সমূহের দাস। গোদাস। কিন্তু যদি আমাদের ইন্দ্রিয়গুলিকে কৃষ্ণের সেবায় নিযুক্ত করি তাহলে আমরা আর ইন্দ্রিয়ের দাস থাকব না। আমরা ইন্দ্রিয়ের প্রভু হবো। সেই শক্তি আমরা লাভ করব। আর তখনই আমরা সুরক্ষিত হব।


উদ্ধব বিদুরের কাছে বর্ণনা করছেন, “কৃষ্ণ এতই দয়ালু যে, তাঁকে বিষ দিয়ে হত্যা করতে চেয়েছিল এমন একজনকে তিনি মা রূপে গ্রহণ করেছেন। ভগবান কৃষ্ণ এমনই দয়ালু, তাই কৃষ্ণকে ছাড়া আমি আর কাকে ভজনা করব?”

আমরা মনে করি যে, “কৃষ্ণের কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে। তাই তিনি আবির্ভূত হয়েছেন।” না, এটি তাঁর লীলা। ঠিক যেমন কখনো কখনো রাজ্যপাল কারাগার পরিদর্শনে যান। কারগারে গিয়ে রাজ্যপালের কোনো কাজ নেই। তিনি কারাগারের অধ্যক্ষ ও অন্যান্য কার্যনির্বাহকদের কাছ থেকে সমস্ত তথ্যই পাচ্ছেন। তথাপিও তিনি কারাগার পরিদর্শন করেন। এটি তাঁর স্বাধীন ইচ্ছা। এমন নয় যে, তিনি কারাগারের নিয়ম কানুনের অধীন এবং তাঁকে কারাগারে যেতেই হবে। কিন্তু কয়েদীরা যদি ভাবে, “ওহ্, এখানে কারাগারে রাজ্যপালও রয়েছেন। তাহলে আমরা সমান। আমিও রাজ্যপাল।” সেটি হবে মূর্খতা।
মূর্খরা এরকমই মনে করে যে, “যেহেতু কৃষ্ণ অবতরণ করেছেন, তিনি অবতার, তাই আমিও অবতার।” এই রকম মূৰ্খামিই এখন চলছে। তাই এখানে বলা হয়েছে ন বেদ কশ্চিদ্ভগবংশ্চিকীর্ষিতম্। “কেউই তোমার আবির্ভাব ও অন্তর্ধানের কারণ জানতে পারে না। কেউই জানে না।” তবেমানস্য নৃনাৎ বিড়ম্বনম্। এটি বিভ্রান্তিকর। কেউই হৃদয়ঙ্গম করতে পারে না আসল উদ্দেশ্যটি কী? আসল উদ্দেশ্যটি হলো তাঁর স্বাধীন ইচ্ছা। অসুর হত্যা করার জন্য ভগবানের বহু প্রতিনিধি, ব্যবস্থাপনা রয়েছে। তিনি যদি এমন এক প্রচণ্ড ঝড়ের সৃষ্টি করেন তাহলে মুহূর্তের মধ্যে হাজার হাজার অসুর নিহত হবে। কেবলমাত্র তাঁর ইচ্ছাতেই সেটা সম্ভব। সবকিছুই তাঁর ইচ্ছার মধ্যে রয়েছে। কিন্তু লীলার মাধ্যমে তিনি আনন্দ গ্রহণ করেন।
কখনো কখনো তিনি যুদ্ধ করতে চান। কেননা যুদ্ধ করার শক্তিও তাঁর মধ্যে রয়েছে। তা না হলে আমরা সেটি কোথা থেকে পাবো? কেননা, আমরা কৃষ্ণের অবিচ্ছেদ্য অংশ, কৃষ্ণের সমস্ত গুণই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পরিমাণে আমাদের মধ্যে রয়েছে। আমরা হচ্ছি কৃষ্ণের নমুনা। তাহলে কোথা থেকে আমরা যুদ্ধের শক্তি পাচ্ছি? কৃষ্ণের কাছ থেকে। কৃষ্ণের মধ্যেও সেটি রয়েছে। আমরা কখনো কখনো দেখি যে, কোনো শক্তিশালী মানুষ বা রাজা কুস্তীগিরদের যুদ্ধ করার জন্য নিযুক্ত করে। রাজার সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য সেই কুস্তীগিরদের অর্থ প্রদান করা হয়। তার মানে এই নয় যে, সেই ভাড়াটে কুস্তীগিররা রাজার শত্রু। যুদ্ধের মাধ্যমে সে রাজাকে আনন্দ প্রদান করছে মাত্র। নকল যুদ্ধ।
তেমনই, কৃষ্ণ যখন যুদ্ধ করতে চান, লড়াই করতে চান, তখন কে তাঁর সঙ্গে যুদ্ধ করবে? তাঁর কয়েকজন ভক্ত, মহান ভক্তগণ তখন তাঁর সঙ্গে যুদ্ধ করেন। কোনো সাধারণ ভক্ত নয়। ঠিক যেমন রাজা যখন নকল যুদ্ধের মাধ্যমে যুদ্ধ অনুশীলন করতে চান, তখন বড় বড় যোদ্ধা বা কুস্তীগিররা নিযুক্ত হয়। তেমনই বড় বড় ভক্তগণ কৃষ্ণের যুদ্ধের ইচ্ছার সেবা করেন। এটিও সেবা।
যেহেতু কৃষ্ণ যুদ্ধ করতে চেয়েছেন, তাই তাঁর কিছু ভক্তও তখন তাঁর শত্রুরূপে অবতরণ করেন। ঠিক যেমন জয় ও বিজয়। তাঁরা ছিলেন হিরণ্যাক্ষ ও হিরণ্যকশিপু। তাঁরা সাধারণ জীব নয়। তাঁরা ভক্ত। কৃষ্ণের যুদ্ধের ইচ্ছা হয়। কিন্তু বৈকুণ্ঠে যুদ্ধের কোনো পরিস্থিতি নেই, কেননা সেখানে যুদ্ধের ব্যাপারটাই নেই, সেখানে সকলে কৃষ্ণের একনিষ্ঠ সেবক। সকলেই কৃষ্ণের সেবায় নিযুক্ত। সেখানে কার সাথে তিনি যুদ্ধ করবেন? তাই তাঁর কিছু ভক্তকে তাঁর শত্রুর পোশাকে সাজিয়ে কৃষ্ণ তাদের পৃথিবীতে প্রেরণ করেন এবং তাঁদের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য তিনি স্বয়ং অবতরণ করেন। একইসঙ্গে তিনি আমাদের এই শিক্ষাও প্রদান করেন যে, কৃষ্ণের শত্রু হওয়া মঙ্গলজনক নয়। বরং মিত্র হওয়া ভালো। সুতরাং এখানে বলা হয়েছে ন বেদ কশ্চিদ্ভগবংশ্চিকীর্ষিতম্। অর্থাৎ “কেউই জানে না আপনার আবির্ভাব ও অন্তর্ধানের কারণ কী।” তবেহমানস্য নৃনাম্ বিড়ম্বনম্ । “সাধারণ মনুষ্যরূপে আপনি এই জগতে অবতরণ করেন। সেটি বিভ্রান্তিকর।” ফলে সাধারণ মানুষেরা অবিশ্বাস করে বলে “ভগবান কিভাবে আমাদের মতো সাধারণ মানুষ হতে পারেন?” তাই, এটি কৃষ্ণের লীলা। কোনো সাধারণ মানুষ এই লীলা করতে পারে না। ভগবানই একমাত্র পারেন। যখন যেখানে প্রয়োজন, ভগবান তাঁর লীলার প্রকাশ ঘটান।
ঠিক যেমন তিনি ১৬,০০০ পত্নী গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু যখন তিনি বিবাহ করছেন তখন ১৬,০০০ স্ত্রীর কাছে তিনি একজনই। ষোল হাজার নারী কৃষ্ণের শরণাগত হয়ে প্রার্থনা করছেন, “আমরা অপহৃত হয়েছি। এখন আমরা যদি বাড়ি ফিরে যাই, কেউ আমাদের বিয়ে করবে না।” সেটি একটি বৈদিক প্রথা বা অনুশাসন। যদি কোনো অবিবাহিত মেয়ে এমনকি এক রাত্রির জন্যও বাড়ির বাইরে থাকে, কেউ তাকে বিয়ে করবে না। এটি একটি প্রাচীন প্রথা এই সকল ১৬ হাজার মেয়েরা ভৌমাসুর দ্বারা অপহৃত হয়ে কারারুদ্ধ ছিল। তাই তারা কৃষ্ণের কাছে প্রার্থনা করেছিলেন এবং কৃষ্ণ এসে ভৌমাসুরকে হত্যা করে তাদের সকলকে উদ্ধার করেছিলেন। এরপর কৃষ্ণ যখন তাদের বললেন, “তোমরা এখন নিরাপদে তোমাদের গৃহে ফিরে যেতে পার”। তারা তখন উত্তর দিয়েছিল, “হে প্রভু, আমরা যদি আমাদের গৃহে ফিরে যাই তাহলে আমাদের ভাগ্যে কি ঘটবে? কেউই আমাদের বিয়ে করবে না, কেননা আমরা রাক্ষস কর্তৃক অপহৃত।” কৃষ্ণ বললেন, “তাহলে তোমরা কি চাও?” তারা বললো, “আমাদের চাওয়া, বিবাহপূর্বক আপনিই আমাদের পতি হোন।” আর কৃষ্ণ এতই দয়ালু যে, তিনি সঙ্গে সঙ্গে তা স্বীকার করলেন।” এই হচ্ছেন কৃষ্ণ।
এখন, তাদের যখন কৃষ্ণ তাঁর গৃহে নিয়ে এলেন, এমন নয় যে ১৬ হাজার পত্নীকে একে একে ১৬ হাজার রাত্রি অপেক্ষা করতে হয়েছিল কৃষ্ণের সঙ্গে মিলিত হবার জন্য। কৃষ্ণ নিজেকে ষোল হাজার রূপে প্রকাশ করেছিলেন এবং ১৬ হাজার প্রাসাদ নির্মাণ করেছিলেন। প্রত্যেক পত্নীর জন্য এক একটি প্রাসাদ। প্রতিটি প্রাসাদেই কৃষ্ণ তাঁর পত্নীদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন। সেই বর্ণনা ভাগবতে রয়েছে। কিন্তু মূর্খরা সেটি হৃদয়ঙ্গম করতে পারে না। তারা কৃষ্ণের সমালোচনা করে বলে যে “তিনি খুব কামুক ছিলেন। তিনি ষোল হাজার স্ত্রীকে বিবাহ করেছিলেন।” তিনি যদি কামুক হনও, সেখানেও তিনি অসীমরূপে কামুক। কেননা তিনি স্বয়ং অনন্ত, অসীম। ষোল হাজার কেন, তিনি যদি ষোল কোটি স্ত্রীকেও বিবাহ করেন তবুও সেটি অসম্ভব কিছু নয়। এই হচ্ছেন কৃষ্ণ। প্রকৃতপক্ষে কোনো কিছু নেই যে যার দ্বারা আপনি কৃষ্ণকে কামুক বলে দোষী বা অভিযুক্ত করতে পারেন। না। তিনি তাঁর সকল ভক্তের প্রতি অনুগ্রহ প্রকাশ করেছেন মাত্র। কৃষ্ণের অসংখ্য ভক্ত রয়েছেন। কোনো কোনো ভক্ত কৃষ্ণকে তাদের স্বামী রূপে, কেউ বন্ধু রূপে, পুত্ররূপে, খেলার সাথী রূপে প্রার্থনা করেছেন ইত্যাদি। এইভাবে সমগ্র জগৎ জুড়ে কৃষ্ণের কোটি কোটি ভক্ত রয়েছে। আর কৃষ্ণকে সকলকেই সন্তুষ্ট করতে হয়। কিন্তু যেহেতু ভক্তগণ চান, তাই কৃষ্ণ কৃপা করে তাদের অনুগ্রহ করেন। তাই ১৬ হাজার ভক্ত কৃষ্ণকে স্বামী রূপে চেয়েছিলেন এবং কৃষ্ণ সন্মত হয়ে সেটি অনুমোদন করেছেন। এই হলো ঘটনা। ঠিক সাধারণ মানুষেরই মতো। কিন্তু যেহেতু তিনি ভগবান, তিনি নিজেকে ষোল হাজার রূপে বিস্তার করেছিলেন।
নারদ মুনি দেখতে এসেছিলেন, “কৃষ্ণ ষোল হাজার পত্নীকে বিবাহ করেছেন, তিনি তাদের সাথে কিভাবে কি করছেন, আমি দেখে আসি।” তিনি যখন এলেন, দেখলেন যে ষোল হাজার প্রাসাদ আর প্রতিটি প্রাসাদেই কৃষ্ণ ভিন্ন ভিন্ন আচরণ করছেন। কোথাও তিনি তাঁর পত্নীর সঙ্গে কথা বলছেন। কোথাও তিনি তাঁর শিশু সন্তানের সঙ্গে খেলা করছেন। কোথাও তিনি পুত্র বা কন্যার বিবাহের আয়োজন করছেন ইত্যাদি। এইভাবে ষোল হাজার প্রাসাদে কৃষ্ণ ষোল হাজারভাবে নিযুক্ত রয়েছেন। এই হচ্ছেন কৃষ্ণ। এইভাবেই যদিও কৃষ্ণ স্বয়ং ভগবান তবুও, তিনি একটি সাধারণ শিশুর মতোই খেলা করেছিলেন। কৃষ্ণ তাঁর মুখের মধ্যে সমগ্র বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডকে প্রদর্শন করিয়েছিলেন। এই হচ্ছেন কৃষ্ণ। যদিও তিনি সাধারণ শিশুর মতো খেলা করেন, সাধারণ মানুষের মতোই আচরণ করেন, কিন্তু যখন প্রয়োজন হয় তিনি তাঁর ভগবৎ-সত্তার প্রকাশ ঘটান ।
ঠিক যেমন অর্জুনের ক্ষেত্রে। কৃষ্ণ অর্জুনের রথের সারথি ছিলেন। কিন্তু অর্জুন যখন কৃষ্ণের বিশ্বরূপ দর্শন করতে চেয়েছিল, তিনি তৎক্ষণাৎ তা প্রদর্শন করেছিলেন। সহস্র সহস্র মস্তক ও অস্ত্র। অবর্ণনীয়, এই হচ্ছেন কৃষ্ণ। ন যস্য কশ্চিৎ। অন্যথায় কৃষ্ণের কোনো শত্রু নেই। কৃষ্ণের কোনো বন্ধু নেই । তিনি পূর্ণরূপে স্বতন্ত্র। এমন নয় যে, কৃষ্ণ কোনো বন্ধুর ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু তিনি তাঁর তথাকথিত বন্ধু ও শত্রুদের কল্যাণের নিমিত্তেই লীলা করেন। সেটিই কৃষ্ণের পরম প্রকৃতি । শ্রীকৃষ্ণ কাউকে তাঁর শত্রু রূপেই অনুগ্রহ করুন আর বন্ধু রূপেই অনুগ্রহ করুন, ফলাফল একই। কারণ কৃষ্ণ হচ্ছেন পরম। তাই আমাদের উচিত সর্বদা পরমেশ্বর ভগবান কৃষ্ণের প্রসন্নতা বিধানের চেষ্টা করা।


 

জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০১৫ ব্যাক টু গডহেড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here