রুটিন- সুস্বাস্থ্যের এক রহস্য!

0
942

বৈদিক ডাক্তার এই বিভাগটি চৈতন্য সন্দেশের নতুন একটি বিভাগ। এই বিভাগে প্রতি সংখ্যায় ধারাবাহিকভাবে দেহ, মন ও আত্মার পরিচর্যার মাধ্যমে কিভাবে সুস্বাস্থ্য বজায় রাখা যায় সে বিষয়ে বৈদিক শাস্ত্র ও বিশ্বের বিশেষজ্ঞরা তাদের দিক নিদের্শনা এখানে তুলে ধরবেন।

শ্রীমৎ প্রহ্লাদানন্দ স্বামী : সুস্বাস্থ্যের সবচেয়ে গুরুত্ব রহস্য কী? শ্রীল প্রভুপাদ শ্রীমদ্ভাগবতের ১/১/১০ এর তাৎপর্যে এ বিষয়টি ব্যক্ত করেছেন: কলিযুগে মানুষদের আয়ু অল্প এবং অনাচার। সুনিয়ন্ত্রিতভাবে জীবন যাপন করলে, সাদাসিধে খাদ্য আহার করলে যে কোনো মানুষ সুস্থ ও সরলভাবে জীবনধারণ করতে পারে। অত্যাহার , অত্যধিক ইন্দ্রিয়তৃপ্তি, অন্যের করুণার ওপর অত্যধিক নির্ভরশীলতা এবং কৃত্রিমভাবে জীবনের মান উন্নত করার চেষ্টা মানুষের জীবনী-শক্তি শোষণ করে নেয়। তাই তাদের আয়ু কমে যায়।” আয়ুর্বেদ শাস্ত্রানুাসারে, খারাপ বা অসুস্থ স্বাস্থ্যের অন্যতম প্রধান কারণ হলো মানসিক চাপ। এই মানসিক চাপ হতে পারে প্রাকৃতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে যেমন-দিন-রাতের তাপমাত্রার বৈচিত্র্যের কারণে। জাগতিক জীবনে যখন মানসিক চাপ উত হয়, তখন দেহের শক্তির দোষসমূহ একটি ভারসাম্যহীনতা শরীরকে যথোচিতভাবে সেই চাপের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিরোধ সৃষ্টি করতে পারে। ফলশ্রুতিতে যা হয়, তা হল নানা রকম রোগব্যাধির সৃষ্টি। আমাদের জীবনকে বিধি নিষেধের মধ্যে রেখে, মানসিক চাপের প্রভাবকে কমিয়ে আনতে হবে। অতএব বলা যেতে পারে যে, জীবন যত বেশি বিধিবদ্ধ হবে, তত বেশি সুস্বাস্থ্যবান হওয়া যাবে।
আয়ুর্বেদ শাস্ত্রনুসারে দৈনিক ও ঋতুভিত্তিক বিধিনিষেধের কথা উল্লেখ রয়েছে। যা খুব সংক্ষেপে এখানে তুলে ধরা হলো :
১। রাতে তাড়াতাড়ি নিদ্রা যাওয়া।
২। প্রত্যুষের পূর্বে শয্যা ত্যাগ।
৩। যথা যথভাবে মলমূত্র ত্যাগ করা, যেন হজমের স্থানটি শূন্য থাকে। ফলে নতুন ভাবে খাদ্যদ্রব্যের মাধ্যমে পরিপুষ্ট হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় শূন্যস্থান থাকে।
৪। সর্বদা হাত, পা, মুখ, চোখ ও নাক (সমস্ত ইন্দ্রিয়) জল দিয়ে ধৌত করে পরিষ্কার রাখতে হবে, যাতে করে শুদ্ধ ইন্দ্রিয় ব্যবহার করে আমরা ইন্দ্রিয়ের জল দিয়ে ধৌত করে পরিষ্কার রাখতে হবে, যাতে করে শুদ্ধ ইন্দ্রিয় ব্যবহার করে আমরা ইন্দ্রিয়ের বিষয়গুলো যথাযতভাবে গ্রহণ করতে পারি। যেমন: ¯œান কার্য।
(৫) বিগ্রহের ধ্যান।
(৬) হালকা ম্যাসেজ বা মর্দন, অনুশীলন।
(৭) সকালের নাস্তা।
নিদ্রা
একটি শুভ সকালের সূচনা ঘটে পূর্ব রাতের ভাল নিদ্রা থেকে। যথাযথ নিদ্রার অনেক সুফল রয়েছে। যেমন- দেহের শক্তিসমূহের ভারসাম্য রক্ষা করা। নিদ্রা, মন সহ সমস্ত ইন্দ্রিয়ের পরিপূর্ণ বিশ্রাম প্রদান করে। যে রকম খাদ্য, মল-মূত্র ত্যাগের মাধ্যমে কার্বোহাইড্রেট, মিনারেল ও অন্যান্য উপাদানের ঘাটতি পূরণে সহায়তা করে। নিদ্রা মানসিক ভারসাম্য রক্ষায় সহায়তা করে এবং সে সাথে মনকে প্রদান করে সতেজতা ও অনুপ্রেরণা। গভীর নিদ্রা হল ধ্যানের একটি স্বাভাবিক রূপ। নিদ্রা শুধু দেহের ওজন রক্ষায় সহায়তা করে না, বরং বীর্য গঠনেও ভূমিকা রাখে। বীর্য হল একটি সূক্ষ শক্তি যা দেহের উজ্বলতা প্রদান করে এবং দৃঢ়তা ও বুদ্ধিদীপ্ততা প্রদান করে। পরিশ্রমের ওপর নির্ভর করে কি পরিমাণ নিদ্রা প্রয়োজন। শারীরিক শ্রম প্রদানকারী ব্যক্তির অফিস কর্মকর্তার চেয়েও বেশি নিদ্রার প্রয়োজন। সাধারণত, বয়স বৃদ্ধির সাথে নিদ্রার পরিমাণ কমে আসে। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা অনুসারে: “যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত আহার করে, সে ঘুমন্ত অবস্থায় নানা রকম স্বপ্ন দেখে এবং তার ফলে সে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ঘুমায়। ৬ ঘন্টার বেশি ঘুমানো কারো পক্ষেই উচিত নয়। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে যে ছয় ঘন্টার বেশি ঘুমায়, সে স্বভাবতাই অলস এবং অত্যাধিক নিদ্রাতুর। সে মানুষ যোগ অনুশীলন করতে পারে না।”(ভগবদ্গীতা ৬/১৬ তাৎপর্য)
অন্য আরেকটি স্থানে শ্রীল প্রভুপাদ ব্যাখ্যা করেছেন, ভিন্ন ভিন্ন ব্যাক্তির নিদ্রার পরিমাণটি ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু যে কোনো ভাবে হোক এটিকে কমিয়ে আনার প্রচেষ্ঠা করা উচিত:
তদ্রুপ নিদ্রা, তোমার কিছু বিশ্রামের প্রয়োজন, কিন্তু চব্বিশ ঘন্টা ঘুমিও না। ব্যাপারটি সে রকম নয়। বড় জোর ৬ ঘন্টা থেকে ৮ ঘন্টা নিদ্রা, যে কোনা স্বাস্থ্যবান লোকের জন্য যথেষ্ট। এমনকি ডাক্তাররাও বলে থাকে, যদি কেউ ৮ ঘন্টার বেশি নিদ্রা যাপন করে তবে সে অসুস্থ।
তিনি অবশ্যই শারিরীকভাবে দূর্বল, স্বাস্থ্যবান ব্যক্তি ৬ ঘন্টার মতো নিদ্রা যাপন করেন। এটাই যথেষ্ট এবং যারা তপস্বী, তাদের ও নিদ্রা কমিয়ে আনা উচিত। যেরকম গোস্বামীগণ করেছিলেন। তাঁরা শুধুমাত্র দেড় ঘন্টা কিংবা বড়জোর দু’ঘন্টা ঘুমাতেন। (শ্রীমদ্ভাগবত প্রবচন ১/৫/৩৫, বৃন্দাবন,আগষ্ট ১৬,১৯৭৪)
অতিরিক্ত নিদ্রা, মানসিক ভারসাম্যহীনতা কিংবা শারীরিক নানা সমস্যা, যেমন-বদহজম, অতিরিক্ত হাই তোলা ও অসংলগ্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ (disjointedlimbs) ইত্যাদির কারণ হতে পারে। যাদের মারাত্মক কণ্ঠনালীর সমস্যা রয়েছে, যারা সাপের কাঁমড়ে আক্রান্ত কিংবা যারা বিষ পান করেছে, তাদের রাতে ঘুমানোর ব্যাপারটি যোগ্য ফিজিশিয়ানের দিক নির্দেশনা অনুসারে হওয়া উচিত।
অনিয়মিত ঘুম বিবিধ সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। যেমন-সাইনাসিটস্, মাথাব্যথা, ক্ষুধামন্দা এবং এমনকি জ্বর। সাধারনত কারো দিনে ঘুমানো উচিত নয়, কিন্তুু গ্রীষ্মকালীন সময়ে দিনে কিছুক্ষণ নিদ্রা মন্দ নয়। অপর্যাপ্ত নিদ্রার কারণে শরীর ব্যাথা, মাথা ভারী হওয়া, হাই তোলা (yawning), বদ হজম এবং তন্দ্রাভাব সৃষ্টি হতে পারে। অপরদিকে অতিরিক্ত নিদ্রা উন্মাদগ্রস্ততার কারণ হতে পারে। আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের একজন কর্র্তৃপক্ষ ভগবৎ অনুসারে: যিনি ব্রক্ষচর্য পালন করছেন, যিনি ইন্দ্রিয়গত (sensuous) নন এবং যিনি আত্মতৃপ্ত তাঁর যথাসময়ে স্বাভাবিক নিদ্রা যাপন হবে।
যাদের অনিদ্রাজনিত (insomonia) সমস্যা রয়েছে তাদের জন্য নিন্মলিখিত বিষয় করণীয় ঃ
১। নিয়মিত খাদ্যভাস, নিদ্রাযাপন, কর্ম ও বিনোদন এই অনিদ্রা থেকে মুক্ত হতে সাহায্য করতে পারে। প্রতি রাতে একই থেকে উঠা উত্তম।
২। তিল বা সরিষার তেল দিয়ে মাথার পেছনে ও ঘাড়ে এবং পায়ের তালু ম্যাসেজ বা মর্দন নিদ্রা সৃষ্টিতে সহায়তা করতে পারে।
৩। একটি উষ্ণ স্নান।
৪। অর্ধ চা-চামচ ঘি মিশ্রিত এক কাপ গরম দুধ পান।
৫। উভয় কানের ছিদ্রে এক বা দুই ফোঁটা তেল দেওয়া।
৬। ভগবান ও তাঁর অপ্রাকৃত লীলাবিলাসের ধ্যান শান্তিপূর্ণ নিদ্রার সৃষ্টি করতে পারে।
৭ । শারীরিক শ্রম নিদ্রা সৃষ্টিতে সহায়তা করতে পারে। শারীরিক অনুশীলনের ফলে মানসিক ধকল, চাপ ও উদ্বিগ্নতা হ্রাস হয় যা নিদ্রা সৃষ্টি করতে পারে। যখন মস্তিক শান্ত থাকবে, তখন নিদ্রা আপনা থেকেই আগত হয়।
নিদ্র থেকে উঠা সুর্যোদয়ের পূর্বে নিদ্রা থেকে উঠার অনেক সুফল রয়েছে, যাদের মধ্যে অন্যতম হল দেহ নিজে নিজেই সূর্যোদয়ের সাথে সাথে সহজেই অরো বেশি সুসংগত (synchronize) হয়ে উঠে। রাতের শেষের দিকে ভাট প্রাধন্য বিস্তার করে এবং এর হালকা হয়ে যাওয়ার গুণটি ঘোর নিদ্রার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। যেহেতু ভাট মলমূত্র ত্যাগের সঙ্গে জড়িত , তাই প্রতুষ্যের পূর্বেই দেহ থেকে এ সমস্ত মল-মূত্র ত্যাগ করাটা সর্বোত্তম।
হজমস্তলী খালি রাখা
অগ্নিস্থলে , অগ্নি প্রজ্বলন সবেচেয়ে ভালো হয় যখন প্রধমেই ভষ্মিভুত অবশেষ বা ছাই পরিষ্কার করে ফেলা হয়। তদ্রুপ খাদ্য হজম তখনই উত্তম হবে যখন খাদ্য গ্রহণের পূর্বে শরীরের আবর্জনাগুলো বের করে ফেলা হয়।
ধৌতকরণ ও স্নান
শরীর থেকে আর্বজনা বর্জনের ক্ষেত্রে চামড়া হল দেহের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তখন বাকি সব যেমন, কিডনি ও অন্ত্র (intestines) কম বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। যদি দেহের অন্য সমস্ত আবর্জনা অধিক সহজভাবে পরিত্যাগ বা বর্জন হয়। এই প্রক্রিয়ার জন্য উত্তম মাধ্যম হল নিয়মিত স্নান ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ধৌতকরণ।
বিগ্রহের ধ্যান
যেহেতু শরীরকে শুদ্ধ রাখতে হবে, তাই মনকে শুদ্ধ রাখতে হবে। চক্র সংহিতা, একটি আর্দশ আয়ুর্বেদ শাস্ত্র। এটি অনুসারে ভগবানের পবিত্র নাম জপ কীর্তন হলো মনের শুদ্ধতার জন্য সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা।
হালকা মর্দন (ম্যাসেজ) ও অনুশীলন
দেহের বিভিন্ন চ্যানেল বা প্রণালী রয়েছে যেগুলোকে বলা হয় স্রোত। যখন এ সমস্ত প্রণালী পরিষ্কার ও খোলা বা উন্মুক্ত থাকে তবে দেহের প্রতিটি কোষে খাদ্যদ্রব্য থেকে সংগৃহীত পুষ্টি দক্ষতার সহিত বিতরণ হয় এবং আবর্জনাগুলো অপসারণ করে। শারীরিক অনুশীলন (ব্যায়াম) ও মর্দন এই প্রণলীগুলোর উন্মুক্তকরণ ও পরিষ্কার রাখতে সহায়তা করে। যখন অনুশীলন যথাযথভাবে করা হয় তখন তা মন ও শরীরের মধ্যে বা প্রাণ এর শক্তি বৃদ্ধি করে। এভাবে শারীরিক অনুশীলন ইন্দ্রিয়সমূহকে উদ্দীপ্ত করে, হজমী শক্তি বৃদ্ধি করে ও ভালো থাকার সাধারণ অনুভূতি সৃষ্টি করে।
সকালের নাস্তা
সকালে যখন দেহ থেকে আর্বজনা অপসারণ করা হয় এবং হজম অগ্নি জাগ্রত হয় তখন দিনের কার্যকলাপের জন্য শক্তি যোগাতে খাদ্য গ্রহণ করতে পারে। গ্রীষ্মকালীন সময়ে হালকা ও শীতকালীন সময়ে সকালের নাস্তা হিসেবে ভারী খাদ্য গ্রহণ করা উচিত।
উপরোক্ত এই সরল রুটিন আপনাম দেহের রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করবে এবং আমাদের শক্তিস্তরকে উন্নত অবস্থানে উন্নীত করবে, যাতে করে আমরা মনের ও শরীরের প্রতিবন্ধকতা থেকে মুক্ত হয়ে উৎসাহ উদ্দীপনার সহিত ভগবানের প্রতি ভক্তিপ্লুত সেবা নিবেদন করতে পারি। হরে কৃষ্ণ

লেখক পরিচিত : শ্রীমৎ প্রহ্রাদানন্দ স্বামী ১৯৪৯ সালে নিউইয়র্কের বাফালোতে আর্বিভূত হন। ইউনিভার্সিটি অব বাফালোতে তিনি অধ্যায়ন করে পূর্ণ বৃত্তি লাভ করেন। ১৯৬৯ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি ইস্কনে যোগদান করে শ্রীল প্রভুপাদের কাজ থেকে হরিনাম ও ব্রাক্ষণ দীক্ষা লাভ করেন। তিনি মন্দির প্রতিষ্ঠা, বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গ্রন্থ ও হরিনাম প্রচার করেন। ১৯৯০ সালে তাঁকে ইস্কনের স্বাস্থ্য-কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। বর্তমানের সারাবিশ্বে তিনি এ বিষয়ে বিভিন্ন দিক-নির্দেশনা প্রদানের মাধ্যমে কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচার করে চলেছেন। হরে কৃষ্ণ!

(মাসিক চৈতন্য সন্দেশ ২০১৪ ডিসেম্বর সালে প্রকাশিত)
এরকম চমৎকার ও শিক্ষণীয় প্রবন্ধ পড়তে চোখ রাখুন ‘চৈতন্য সন্দেশ’‘ব্যাক টু গডহেড’
যোগাযোগ: ০১৮৩৮-১৪৪৬৯৯

Stay Connected:

fb.com/monthlycaitanyasandesh

youtube.com/caitanyasandeh

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here