যমরাজের ৪টি পত্রাবলী

0
39

যমুনা নদীর তীরে অবস্থিত একটি ছোট্ট শহরে অমৃত নামের একজন ব্যক্তি বাস করত। সেই মৃত্যুভয়ে সর্বদা ভীত থাকতো। একদিন তার মাথায় এক বুদ্ধি আসলো যে সে যদি যমরাজের সাথে বন্ধুত্ব করে তাহলে সে মৃত্যুকে এড়াতে পারবে। তাই সে যমরাজের প্রীতির জন্য নানা তপশ্চর্যা পালন করতে লাগল এবং যমের ধ্যান করতে লাগল। যমরাজ তপস্যায় অত্যন্ত প্রীত হলেন এবং তাকে দর্শন দান করলেন। যমরাজ বললেন, “আমার দিব্য ক্ষমতাবলে আমি জানি তুমি আমার সাথে বন্ধুত্ব করতে চাও, তোমার সে স্বপ্ন ইচ্ছা আজ পূর্ণ হয়েছে। শুধুমাত্র মৃত্যুপথযাত্রী ব্যক্তিরাই আমার দর্শন লাভ করে যাদের আত্মাকে আমি অথবা আমার দূতেরা আমার রাজ্যে নিয়ে যায়। যারা জন্মেছে তাদের অবশ্যই মরতে হবে যারা মরে গিয়েছে তাদের আবার জন্মাতে হবে। এটাই হচ্ছে নিত্য নিয়ম। কেউ মৃত্যুর হাত থেকে পালাতে পারে না। তবুও আমি তোমাকে তোমার জীবনে এসে আমার দর্শন লাভের সুযোগ দিয়েছি।
অমৃত বললেন, বন্ধুত্বের নিদর্শন স্বরূপ আমি তোমার থেকে একটি বর চাই। যদি মৃত্যু অনিবার্য হয়ে থাকে তবে আমার মৃত্যুর আগে যেন আমি খবর পাই যে, আমার মৃত্যু আসতে চলেছে। যাতে মৃত্যুর পূর্বে আমি আমার পরিবারের জন্য সবকিছু সুবন্দোবস্ত করে যেতে পারি।
যমরাজ উত্তর দিলেন, ‘এই আর এমন কি! আমি তোমাকে কথা দিলাম তোমার মৃত্যুর পূর্বে আমি তোমাকে জানিয়ে দিবো কিন্তু সে বার্তা পাওয়া মাত্রই তোমাকে প্রস্তুতি নিতে হবে এই বলে যমরাজ অদৃশ্য হলেন’। অনেক বছর কেটে গেল এবং অমৃতের চুল পেকে গেছে তবুও সে মৃত্যুভয় ভুলে সুখে দিন কাটাতে লাগলো। সে জীবনের সুখ ভোগে মত্ত ছিল। সে তখনও যমরাজ থেকে কোন বার্তা পায়নি এবং সে ভেবে আনন্দিত ছিল যে, যমরাজ তাকে এখনো কোন পত্র পাঠায়নি। আরো কিছু বছর কেটে গেল অমৃতের দাঁত পড়ে গিয়েছে। তবুও তার মৃত্যু সম্পর্কিত কোন চিন্তা ছিল না।
কারণ সে তার বন্ধু হতে এখনও কোন পত্র পায়নি। অমৃতের দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হতে লাগল। জরা তাকে গ্রাস করতে লাগলো। তবুও নিজেকে ভাগ্যবান বলে মনে করতে লাগল কারণ, তার বন্ধু তাকে মৃত্যুর পূর্ব সতর্কতা স্বরূপ কোন পত্র দেয়নি। আরো কিছুদিন পর সে এতই বৃদ্ধ হয়ে গিয়েছিল যে লাটির সাহায্য ছাড়া সে দাঁড়াতে পারত না। একদিন সে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়লো। তার অবস্থা খুবই সংকটাপন্ন ছিল। তবুও সে অত্যন্ত আনন্দিত ছিল। যতদিন না যমরাজ তাকে কোন পত্র না পাঠাচ্ছে তার মনে মৃত্যু সম্পর্কিত কোনো চিন্তায় আসবে না।
তারপর একদিন যা ঘটার তাই ঘটল। যমরাজ তার কক্ষে প্রবেশ করলেন। অমৃত চমকে উঠল এবং মৃত্যুভয় তাকে পুরোদস্তুর গ্রাস করল। যমরাজ বললেন, ‘হে বন্ধু, এবার চলো। তুমি অনেক কষ্ট ভোগ করেছো, এবার আমি তোমাকে নিতে এসেছি। অমৃত ভয়ে কাঁপছিল এবং বললো, “হায় হায়, তুমি আমার সাথে প্রতারণা করেছ, তুমি কথা দিয়ে কথা রাখোনি। তুমি আমাকে মৃত্যুর আগে সতর্কবার্তা দাওনি, এখন আমার কাছে এসেছ তোমার ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে আমাকে নিয়ে যেতে। বন্ধুকে এভাবে ঠকাতে তোমার কি লজ্জা করে না?” যমরাজ উত্তর দিলেন তোমার মায়ামোহ তোমাকে এতই অন্ধ করে দিয়েছে যে, তুমি আমার প্রেরিত পত্রগুলো দেখতেই পাওনি। একটি নয়, আমি তোমাকে চারটি পত্র পাঠিয়েছি। কিন্তু তুমি এগুলোকে খেয়াল করনি। অমৃত কিছুই বুঝতে পারল না। ‘চারটি পত্র’! কিন্তু আমিতো একটিও পাই নি। মনে হয় সেগুলো হারিয়ে গেছে বা ভুল ঠিকানায় চলে গেছে।
যমরাজ তখন বললেন, “তোমার চাতুর্যতা থাকা সত্ত্বেও বোকামিবশত তুমি ভেবেছো আমি খাতা-কলম নিয়ে তোমাকে পত্র লিখব। হে মোহগ্রস্থ মানব, সময় হচ্ছে আমার বার্তাবাহক যে তোমার নিকট পত্র নিয়ে এসেছিল। কিছু বছর আগে যখন তোমার চুল পেকে গিয়েছিল সেটি ছিল আমার প্রথম পত্র যাকে তুমি গুরুত্ব দাও নি বরং রঙ দিয়ে তোমার চুল কালো করেছ।
যখন তোমার দাঁত পড়তে শুরু করে সেটি ছিল আমার দ্বিতীয় পত্র, তবুও তুমি সতর্কবার্তা বুঝতে পারোনি বরং তুমি একটি কৃত্রিম দাঁত লাগিয়ে ছিলে।
আমি তৃতীয় পত্রটি পাঠাই যখন তোমার দৃষ্টি ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছিল।
আর চতুর্থ পত্রটি পাঠায় যখন তুমি পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হও।
ক্রন্দনরত অবস্থায় অমৃতলাল বলতে লাগল, “আমি মহা ভুল করে ফেলেছি, আমার এই ভুলের কোন ক্ষমা নেই তবুও শেষবারের মতো আমি ক্ষমা ভিক্ষা করছি, যমরাজ।”
যমরাজ বললেন, ‘ক্ষমা’! আমার আর কি দেয়ার আছে এই মানব জন্মের উপহার পেয়েও তুমি তা ঠিকভাবে ব্যবহার করেছ! দেহ সুখ ভোগ আর মাতলামি করে তুমি তোমার জীবনটা নষ্ট করেছো। এখন তুমি নির্লজ্জের মতো আরও সময় চাইছো।
অমৃতলাল বলতে লাগল, ‘যমরাজ, আমাদের পূর্বের কথা স্মরণ করুন। সে দিনগুলো মনে করার চেষ্টা করুন। আমাকে আরেকটি মাত্র সুযোগ দিন’।
যমরাজ বললেন, ‘আমাদের বন্ধুত্ব সেই সময় ছিল, এখন তা শেষ। আমি সেই আইনের বিধায়ক হয়ে এসেছি যেই আইন ন্যায্য আর পক্ষপাতবিহীন। আমি নিয়তির এই কঠোর নির্দেশ সবাইকে দিয়ে পালন করাই। সকল জীবকে এই দিব্য আইনের সামনে মাথা নত করতে হয়। চলো, এবার যাওয়ার পালা।’
যমরাজ সে ব্যক্তির গলায় ফাঁস পড়ালেন এবং সে ছটপট করতে করতে শ্বাসরুদ্ধ হল। মানুষ বলতে লাগল, “অমৃত মারা গিয়েছে।”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here